৫০ বছরের কম বয়সী নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের উচ্চ ঝুঁকি নির্ধারণে বর্তমানে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত নির্দেশিকা বড় ধরনের সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, কেবল পারিবারিক রোগ-ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকি মূল্যায়নের বর্তমান পদ্ধতি ভবিষ্যতে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া ৯৫ শতাংশ নারীকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
গবেষকদের মতে, ঝুঁকি নির্ধারণে আরও বিস্তৃত পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে অনেক বেশি নারীকে আগেভাগে শনাক্ত করা সম্ভব হবে, যা দ্রুত চিকিৎসা শুরু এবং কিছু ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধের সুযোগও বাড়াতে পারে।
আরও কার্যকর ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রস্তাব
বর্তমানে ৫০ বছরের কম বয়সী যেসব নারীর পরিবারে স্তন ক্যানসারের শক্তিশালী ইতিহাস রয়েছে, তাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়। প্রয়োজন হলে তাদের জেনেটিক পরীক্ষা বা নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হয়, যাতে ভবিষ্যতে ক্যানসার হলে তা প্রাথমিক পর্যায়েই ধরা পড়ে।

তবে ব্রিটিশ জার্নাল অব ক্যানসারে প্রকাশিত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ১,২৫৮ জন নারীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধুমাত্র পারিবারিক ইতিহাসের ভিত্তিতে ঝুঁকি নির্ধারণ করলে ভবিষ্যতে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া অধিকাংশ নারী শনাক্তই হন না।
গবেষকরা একটি নতুন ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরি করেছেন, যেখানে পারিবারিক ইতিহাসের পাশাপাশি প্রজনন-সংক্রান্ত তথ্য, জীবনযাপন এবং জেনেটিক বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে একই বয়সী নারীদের মধ্যে ভবিষ্যতে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া নারীদের আট গুণ বেশি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে
গবেষণাটি ২০০৪ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে পরিচালিত ব্রেস্ট ক্যানসার নাউ জেনারেশনস স্টাডির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন বহুমাত্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি সব ৫০ বছরের কম বয়সী নারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলে প্রায় ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ নারীকে উচ্চ ঝুঁকির হিসেবে চিহ্নিত করে আরও মূল্যায়নের জন্য পাঠানো হবে। বর্তমানে এই হার মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ।
গবেষকদের ভাষ্য, স্তন ক্যানসারের মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশ রোগীর পরিবারে আগে এই রোগের ইতিহাস থাকে। ফলে শুধুমাত্র পারিবারিক ইতিহাসের ওপর নির্ভর করলে অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ নারী নজরের বাইরে থেকে যান।

গবেষকদের মন্তব্য
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও প্রাইমারি কেয়ার বিভাগের ড. জুলিয়েট উশার-স্মিথ বলেন, সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা নারীদের আরও আগে শনাক্ত করতে হবে, যাতে চিকিৎসা বা রোগ প্রতিরোধের আরও বেশি সুযোগ তৈরি হয়। তার মতে, বর্তমান নির্দেশিকা ৫০ বছরের কম বয়সী যেসব নারী পরে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন, তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশকে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই নতুন গবেষণার আলোকে বিদ্যমান মানদণ্ড পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে।
গবেষণায় সহায়তাকারী সংস্থা ব্রেস্ট ক্যানসার নাউয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সাইমন ভিনসেন্ট বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ নারীদের নতুন উপায়ে শনাক্ত করা গেলে কিছু ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে অথবা রোগটি আরও প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়বে, যখন চিকিৎসার সফলতার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
পরিবর্তনের আগে সতর্কতার আহ্বান
লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব ক্যানসার রিসার্চের অধ্যাপক মনসেরাত গার্সিয়া-ক্লোসাস বলেন, গবেষকদের প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ ঝুঁকি মূল্যায়ন বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই তথ্য সংগ্রহ, ব্যয়, সম্পদ এবং সম্ভাব্য সুফল-ক্ষতির মধ্যে ভারসাম্য বিবেচনা করতে হবে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সেলেন্স (NICE) জানিয়েছে, তারা গবেষণার ফলাফলকে স্বাগত জানায় এবং বহুমাত্রিক ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতির সম্ভাবনা স্বীকার করে। তবে সংস্থাটির মতে, বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে এখনই বিদ্যমান পারিবারিক ইতিহাসভিত্তিক নির্দেশিকা পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ভবিষ্যতে আরও তথ্য ও বাস্তব প্রয়োগের ফলাফল পাওয়া গেলে বিষয়টি পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















