১১:৪৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬
ভুল অস্ত্রোপচারে রোগীর জীবন সংকটে, ওল্ডহামের সার্জনকে চিকিৎসা পেশা থেকে বহিষ্কার চাঁদে আছড়ে পড়তে যাচ্ছে স্পেসএক্সের রকেট, তৈরি হতে পারে বিরল মহাজাগতিক দৃশ্য অ্যারন রজার্সের বিস্ফোরক অভিযোগ, ডায়ানা রুসিনি-মাইক ভ্রাবেল কাণ্ডে এনএফএল নীতির প্রশ্ন ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় শেষ, বাড়ছে উদ্বেগ ইবোলা আতঙ্কে হাসপাতালে যাচ্ছেন না গর্ভবতী নারীরা, কঙ্গোতে বাড়ছে মাতৃমৃত্যু গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে নতুন জটিলতা, স্পষ্ট ব্যাখ্যা চায় হামাস ট্রাম্প বলছেন আলোচনা চলছে, ইরানের দাবি—কোনো বৈঠকই হচ্ছে না বছরের পর বছর অপেক্ষার পর ফিরছে টিভি সিরিজ, দর্শকের ধৈর্যের পরীক্ষা অভিনয় থেকে গানে স্টর্ম রিডের নতুন পরিচয়, এবার সামনে আসছে তাঁর অন্য এক রূপ মুখ নয়, এবার হাত! তারুণ্য ধরে রাখতে নতুন সৌন্দর্য প্রবণতায় বাড়ছে হাতের যত্ন

সমুদ্রপথে ডুবে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা, আর আসিয়ান ব্যস্ত ভূরাজনীতির হিসাব-নিকাশে

জুলাই মাসে বঙ্গোপসাগরে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা নিহত হওয়ার আশঙ্কার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কূটনৈতিক পরিসরে তার প্রতিধ্বনি ছিল প্রায় অনুপস্থিত। একই সময়ে তেলের দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা নিয়ে আসিয়ানের বৈঠকে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু যে সংকট এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মানবিক ব্যর্থতার প্রতীক, সেটি আবারও আলোচনার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

এটি কেবল অগ্রাধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক বিবেকেরও প্রশ্ন। কারণ রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ আজ আর শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক মানবিক দায়িত্বের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যতক্ষণ না সংকট বাণিজ্যিক রুট, জ্বালানি সরবরাহ বা কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করছে, ততক্ষণ তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে স্থান পাচ্ছে না।

এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে যখন মালয়েশিয়া ঘোষণা দেয় যে মিয়ানমার পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। ঘোষণাটি প্রথমে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপিত হলেও দ্রুতই জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা সতর্ক করে জানায়, মিয়ানমারে এখনো নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কোনো প্রত্যাবাসনকে স্বেচ্ছাসেবী বলা কঠিন।

অর্থাৎ সমস্যার মূল কারণ অক্ষত রেখেই সমাধানের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে যেসব মানুষ পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার কিংবা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো কোনো কার্যকর নিশ্চয়তা নেই।

রোহিঙ্গাদের নৌযাত্রাকে অনেক সময় মৌসুমি ঝুঁকির সঙ্গে ব্যাখ্যা করা হয়। বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক—এ তথ্য শরণার্থী শিবিরের মানুষও জানে। তবু তারা সেই ঝুঁকি নিচ্ছে। কারণ মৃত্যুর আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রে নামার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে শিবিরে অনিশ্চিত জীবনের চেয়েও কম ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের কক্সবাজারে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বছরের পর বছর ধরে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বসবাস করছে। তাদের কাজের অধিকার নেই, আইনি স্বীকৃতি নেই, ভবিষ্যতের কোনো স্পষ্ট দিগন্তও নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার প্রবণতা। খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় বহু পরিবার ন্যূনতম পুষ্টির নিশ্চয়তাও হারাচ্ছে। যখন প্রতিদিনের খাবার নিশ্চিত থাকে না, তখন অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রাও অনেকের কাছে শেষ আশ্রয়ে পরিণত হয়।

A generation lost at sea': the desperate Rohingya falling prey to  traffickers as they flee Bangladesh | Rohingya | The Guardian

মানবিক সংকটের এই অবনতি হঠাৎ ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকটে সবচেয়ে বড় সহায়তাকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২০২৫ সালে বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর যে অর্থনৈতিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা এখনো পূরণ করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

ক্ষুধা একটি পরিমাপযোগ্য বাস্তবতা। আর ক্ষুধা মানুষের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। যখন বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তাও হারিয়ে যায়, তখন ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকা একটি নৌকাও অনেকের কাছে জীবনের শেষ সুযোগ বলে মনে হয়।

এই কারণেই বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর এখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী শরণার্থী রুটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। গত বছরও শত শত রোহিঙ্গা এই পথে প্রাণ হারিয়েছে বা নিখোঁজ হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিপদে পড়া নৌকাগুলোকে অনেক সময় উপকূলরক্ষী বাহিনী উদ্ধার করার পরিবর্তে ফিরিয়ে দেয় অথবা উপেক্ষা করে। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রতিকূল আবহাওয়া দ্রুতই গণমৃত্যুর ঘটনায় রূপ নেয়।

এই প্রেক্ষাপটে আসিয়ানের ভূমিকা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সংগঠনটির দীর্ঘদিনের “অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার” নীতি কার্যত নিষ্ক্রিয়তার অজুহাতে পরিণত হয়েছে। পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যে শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এদিকে গৃহযুদ্ধ বিস্তৃত হয়েছে, প্রাণহানি বেড়েছে এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়তেই আছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সামরিক জান্তার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে আবারও স্বাভাবিক করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, তবু সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো দেখাচ্ছে যে পূর্বের কঠোর অবস্থান নরম হচ্ছে। এতে এমন একটি বার্তা যাচ্ছে যে আন্তর্জাতিক চাপের কার্যকারিতা কমে এসেছে।

বৃহৎ শক্তিগুলোর আচরণও ভিন্ন নয়। ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের সময় বিভিন্ন দেশ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু সেই সমুদ্রপথে যে মানুষ জীবন বাঁচাতে ভেসে বেড়াচ্ছে, তাদের নিয়ে কার্যত কোনো উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এই বৈপরীত্যের মধ্যেই জাপানের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি মিয়ানমারের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী এবং মানবিক সহায়তাকারী। একই সঙ্গে সামরিক অভ্যুত্থানের পরও সংলাপের সীমিত পথ খোলা রাখার চেষ্টা করেছে। নতুন উন্নয়ন সহায়তা স্থগিত রাখা এবং সামরিক সরকারের পরিকল্পিত নির্বাচনের সমালোচনা—দুটি পদক্ষেপই জাপানের সতর্ক অবস্থানের পরিচয় বহন করে।

Mass Drowning of Rohingya Refugees: A Tragedy Fueled by Arakan Army  Brutality and Global Indifference - Burmese Rohingya Organisation UK (BROUK)

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কেবল যোগাযোগ বজায় রাখলেই কি প্রভাব তৈরি হয়? যদি সেই যোগাযোগ যুদ্ধ বন্ধ করতে, বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করতে বা বাস্তুচ্যুতি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত প্রতীকী উপস্থিতির বেশি কিছু হয়ে ওঠে না।

এই সংকটের সমাধান অসম্ভব নয়। অন্তত মানবিক দিক থেকে প্রথম পদক্ষেপটি স্পষ্ট। পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা পুনর্বহাল করলে হাজার হাজার মানুষকে জীবন বাজি রেখে সমুদ্রে নামার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এর ব্যয়ও সেই অর্থের তুলনায় সামান্য, যা একই দেশগুলো সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যয় করছে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান রাজনৈতিক। যতদিন মিয়ানমারে সহিংসতা অব্যাহত থাকবে এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হবে না, ততদিন এই সংকট থামবে না। আসিয়ানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি বাস্তব পরিবর্তনের জন্য কার্যকর চাপ সৃষ্টি করবে, নাকি অকার্যকর শান্তি পরিকল্পনাকেই সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরবে।

ইতিহাস দেখায়, নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ অবস্থান নয়। ২০১৭ সালে আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণায় “রোহিঙ্গা” শব্দটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ঘোষণাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে অস্পষ্ট ভাষায় “রাখাইনের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের” কথা বলা হলেও, শত শত মানুষের সম্ভাব্য মৃত্যুর ঘটনাকে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।

কিন্তু বাস্তবতা ভাষার চেয়ে শক্তিশালী। বর্ষা শেষ হবে, আবার নৌকা ছাড়বে, আবার মানুষ নিখোঁজ হবে—যতদিন যুদ্ধ চলবে এবং মানবিক সহায়তা কমতে থাকবে। তখন আর কেউ বলতে পারবে না যে তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানত না। তথ্য তাদের সামনে ছিল, সতর্কবার্তাও ছিল। তবু তারা মানুষের জীবন নয়, সমুদ্রপথে চলা পণ্যবাহী জাহাজকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভুল অস্ত্রোপচারে রোগীর জীবন সংকটে, ওল্ডহামের সার্জনকে চিকিৎসা পেশা থেকে বহিষ্কার

সমুদ্রপথে ডুবে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা, আর আসিয়ান ব্যস্ত ভূরাজনীতির হিসাব-নিকাশে

১০:০০:০৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই মাসে বঙ্গোপসাগরে পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা নিখোঁজ বা নিহত হওয়ার আশঙ্কার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কূটনৈতিক পরিসরে তার প্রতিধ্বনি ছিল প্রায় অনুপস্থিত। একই সময়ে তেলের দাম বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা নিয়ে আসিয়ানের বৈঠকে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু যে সংকট এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মানবিক ব্যর্থতার প্রতীক, সেটি আবারও আলোচনার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

এটি কেবল অগ্রাধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক বিবেকেরও প্রশ্ন। কারণ রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ আজ আর শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক মানবিক দায়িত্বের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যতক্ষণ না সংকট বাণিজ্যিক রুট, জ্বালানি সরবরাহ বা কৌশলগত প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করছে, ততক্ষণ তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে স্থান পাচ্ছে না।

এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে যখন মালয়েশিয়া ঘোষণা দেয় যে মিয়ানমার পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। ঘোষণাটি প্রথমে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপিত হলেও দ্রুতই জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা সতর্ক করে জানায়, মিয়ানমারে এখনো নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে কোনো প্রত্যাবাসনকে স্বেচ্ছাসেবী বলা কঠিন।

অর্থাৎ সমস্যার মূল কারণ অক্ষত রেখেই সমাধানের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে যেসব মানুষ পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার কিংবা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো কোনো কার্যকর নিশ্চয়তা নেই।

রোহিঙ্গাদের নৌযাত্রাকে অনেক সময় মৌসুমি ঝুঁকির সঙ্গে ব্যাখ্যা করা হয়। বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক—এ তথ্য শরণার্থী শিবিরের মানুষও জানে। তবু তারা সেই ঝুঁকি নিচ্ছে। কারণ মৃত্যুর আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রে নামার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে শিবিরে অনিশ্চিত জীবনের চেয়েও কম ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের কক্সবাজারে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা বছরের পর বছর ধরে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বসবাস করছে। তাদের কাজের অধিকার নেই, আইনি স্বীকৃতি নেই, ভবিষ্যতের কোনো স্পষ্ট দিগন্তও নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার প্রবণতা। খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় বহু পরিবার ন্যূনতম পুষ্টির নিশ্চয়তাও হারাচ্ছে। যখন প্রতিদিনের খাবার নিশ্চিত থাকে না, তখন অনিশ্চিত সমুদ্রযাত্রাও অনেকের কাছে শেষ আশ্রয়ে পরিণত হয়।

A generation lost at sea': the desperate Rohingya falling prey to  traffickers as they flee Bangladesh | Rohingya | The Guardian

মানবিক সংকটের এই অবনতি হঠাৎ ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকটে সবচেয়ে বড় সহায়তাকারী দেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২০২৫ সালে বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর যে অর্থনৈতিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা এখনো পূরণ করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহের প্রচেষ্টা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

ক্ষুধা একটি পরিমাপযোগ্য বাস্তবতা। আর ক্ষুধা মানুষের সিদ্ধান্ত বদলে দেয়। যখন বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তাও হারিয়ে যায়, তখন ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকা একটি নৌকাও অনেকের কাছে জীবনের শেষ সুযোগ বলে মনে হয়।

এই কারণেই বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর এখন বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী শরণার্থী রুটগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। গত বছরও শত শত রোহিঙ্গা এই পথে প্রাণ হারিয়েছে বা নিখোঁজ হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, বিপদে পড়া নৌকাগুলোকে অনেক সময় উপকূলরক্ষী বাহিনী উদ্ধার করার পরিবর্তে ফিরিয়ে দেয় অথবা উপেক্ষা করে। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রতিকূল আবহাওয়া দ্রুতই গণমৃত্যুর ঘটনায় রূপ নেয়।

এই প্রেক্ষাপটে আসিয়ানের ভূমিকা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সংগঠনটির দীর্ঘদিনের “অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার” নীতি কার্যত নিষ্ক্রিয়তার অজুহাতে পরিণত হয়েছে। পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে যে শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এদিকে গৃহযুদ্ধ বিস্তৃত হয়েছে, প্রাণহানি বেড়েছে এবং নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়তেই আছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সামরিক জান্তার সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ধীরে ধীরে আবারও স্বাভাবিক করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পূর্ণ স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, তবু সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো দেখাচ্ছে যে পূর্বের কঠোর অবস্থান নরম হচ্ছে। এতে এমন একটি বার্তা যাচ্ছে যে আন্তর্জাতিক চাপের কার্যকারিতা কমে এসেছে।

বৃহৎ শক্তিগুলোর আচরণও ভিন্ন নয়। ম্যানিলায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের সময় বিভিন্ন দেশ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু সেই সমুদ্রপথে যে মানুষ জীবন বাঁচাতে ভেসে বেড়াচ্ছে, তাদের নিয়ে কার্যত কোনো উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এই বৈপরীত্যের মধ্যেই জাপানের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি মিয়ানমারের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী এবং মানবিক সহায়তাকারী। একই সঙ্গে সামরিক অভ্যুত্থানের পরও সংলাপের সীমিত পথ খোলা রাখার চেষ্টা করেছে। নতুন উন্নয়ন সহায়তা স্থগিত রাখা এবং সামরিক সরকারের পরিকল্পিত নির্বাচনের সমালোচনা—দুটি পদক্ষেপই জাপানের সতর্ক অবস্থানের পরিচয় বহন করে।

Mass Drowning of Rohingya Refugees: A Tragedy Fueled by Arakan Army  Brutality and Global Indifference - Burmese Rohingya Organisation UK (BROUK)

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, কেবল যোগাযোগ বজায় রাখলেই কি প্রভাব তৈরি হয়? যদি সেই যোগাযোগ যুদ্ধ বন্ধ করতে, বেসামরিক মানুষকে রক্ষা করতে বা বাস্তুচ্যুতি ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা শেষ পর্যন্ত প্রতীকী উপস্থিতির বেশি কিছু হয়ে ওঠে না।

এই সংকটের সমাধান অসম্ভব নয়। অন্তত মানবিক দিক থেকে প্রথম পদক্ষেপটি স্পষ্ট। পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা পুনর্বহাল করলে হাজার হাজার মানুষকে জীবন বাজি রেখে সমুদ্রে নামার সিদ্ধান্ত থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এর ব্যয়ও সেই অর্থের তুলনায় সামান্য, যা একই দেশগুলো সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যয় করছে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান রাজনৈতিক। যতদিন মিয়ানমারে সহিংসতা অব্যাহত থাকবে এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হবে না, ততদিন এই সংকট থামবে না। আসিয়ানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি বাস্তব পরিবর্তনের জন্য কার্যকর চাপ সৃষ্টি করবে, নাকি অকার্যকর শান্তি পরিকল্পনাকেই সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরবে।

ইতিহাস দেখায়, নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ অবস্থান নয়। ২০১৭ সালে আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণায় “রোহিঙ্গা” শব্দটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ঘোষণাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে অস্পষ্ট ভাষায় “রাখাইনের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের” কথা বলা হলেও, শত শত মানুষের সম্ভাব্য মৃত্যুর ঘটনাকে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।

কিন্তু বাস্তবতা ভাষার চেয়ে শক্তিশালী। বর্ষা শেষ হবে, আবার নৌকা ছাড়বে, আবার মানুষ নিখোঁজ হবে—যতদিন যুদ্ধ চলবে এবং মানবিক সহায়তা কমতে থাকবে। তখন আর কেউ বলতে পারবে না যে তারা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানত না। তথ্য তাদের সামনে ছিল, সতর্কবার্তাও ছিল। তবু তারা মানুষের জীবন নয়, সমুদ্রপথে চলা পণ্যবাহী জাহাজকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে।