০৮:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬
বিশ্ব ব্যাডমিন্টনে ভারতের বড় আশা, শুরুতেই সহজ ম্যাচ সিন্ধু-লক্ষ্যের, কঠিন পরীক্ষায় আয়ুষ ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক শেষে জ্বালানিমন্ত্রী: পাইপলাইনে আরও বেশি ডিজেল চেয়েছে বাংলাদেশ বৃষ্টি সবার জন্য সমান নয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই দলবিরোধী সিদ্ধান্ত বৈধ নয়: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কেরালায় বন্যায় নিহতদের পরিবারকে ৮ লাখ রুপি সহায়তা, মৃত বেড়ে ২৬ স্বর্ণ খাতকে আইনি কাঠামোয় আনছে সরকার, গয়না রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়াতে আসছে নতুন নীতি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে বেসরকারি যুদ্ধজাহাজের অজানা ইতিহাস দ্য হিন্দু রিপোর্ট: দুই বছর পরও অস্থির বাংলাদেশ — জুলাই-পরবর্তী মিত্ররাই এখন মুখোমুখি সংঘাতে, জুলাইয়ে নিহত ২৩ বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮ মাসের কর্মপরিকল্পনা: খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর পদক্ষেপ, আসছে ৬০ হাজার কোটি টাকার নতুন ঋণ প্যাকেজ চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রেনের ধাক্কায় ট্রলি চালক নিহত, ঘটনাস্থলেই মৃত্যু

জ্বালানির দাম বাড়ার জন্য তেল কোম্পানি নয়, নীতিনির্ধারণের মূল্যই দিচ্ছে বিশ্ব

পেট্রোল বা জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে সবচেয়ে সহজ রাজনৈতিক কৌশল হলো বড় তেল কোম্পানিগুলোর দিকে আঙুল তোলা। জনরোষের মুহূর্তে এই ব্যাখ্যা জনপ্রিয় শোনায়, কিন্তু অর্থনীতির মৌলিক বাস্তবতা এত সরল নয়। বাজারে মূল্য নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক এখনও চাহিদা ও জোগানের সম্পর্ক। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংকট কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সেই ভারসাম্য বদলে যায়, আর তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেটেই পড়ে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেভরন ও এক্সনমোবিলের বিপুল মুনাফাকে লক্ষ্য করে অভিযোগ তুলেছেন যে, সংকটের সুযোগ নিয়ে তারা অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করছে। এমনকি তিনি খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম কমানোরও আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো কোম্পানির লাভ বেড়েছে বলেই যে বাজারদর বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তেলের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির। সামান্য সরবরাহ ঘাটতি বা চাহিদার পরিবর্তনও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। আর যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকটের মতো ঘটনা এ প্রভাবকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসও সেটিই দেখায়। মহামারির সময় যখন জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ কমে গিয়েছিল, তখন একই তেল কোম্পানিগুলো বিশাল লোকসানের মুখে পড়েছিল। অর্থাৎ লাভ ও ক্ষতি—দুটিই বাজারের একই নিয়মে পরিচালিত হয়।

Oil Price Spike: What Countries Are Telling People to Do - Business Insider

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। সেখানে চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়বে—এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পাম্পে জ্বালানির মূল্য যে বেড়েছে, তার পেছনে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটই বড় কারণ।

এখানেই রাজনৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন সামনে আসে। যদি সামরিক পদক্ষেপ এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক প্রভাবও স্বীকার করতে হবে। পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি কখনও কখনও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রত্যক্ষ মূল্যচাপ সৃষ্টি করে। তাই যুদ্ধ-পরবর্তী মূল্যবৃদ্ধির পুরো দায় বেসরকারি কোম্পানির ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত কারণ আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আরেকটি বিষয়ও বিবেচনা করা জরুরি। জ্বালানি খাতে লাভজনক ব্যবসা শুধু শেয়ারহোল্ডারদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সরকারি রাজস্বের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তেল ও গ্যাস উৎপাদন থেকে সরকারের উল্লেখযোগ্য আয় আসে। ফলে এই শিল্পকে রাজনৈতিক চাপে ফেলে অতিরিক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে।

Trump's tariff retreat: Stock market rally rests on one big assumption | Vox

যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। অতিরিক্ত মুনাফার ওপর উচ্চ কর আরোপের পর উত্তর সাগরে কয়েকটি বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার মুখে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থ হতে পারে কম উৎপাদন, কম বিনিয়োগ এবং শেষ পর্যন্ত আরও সীমিত সরবরাহ।

অন্যদিকে, মুক্তবাজারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার দাবি করলেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অবস্থান নানা ক্ষেত্রে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। উচ্চ শুল্ক আরোপ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারি অংশীদারিত্ব এবং বাজারে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মতো পদক্ষেপ তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ফলে একদিকে বাজার অর্থনীতির কথা বলা, অন্যদিকে বাজারের স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের আহ্বান—এই দ্বৈত অবস্থান সহজে উপেক্ষা করা যায় না।

ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা একটি বড় শিক্ষা সামনে নিয়ে এসেছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময় একটি দেশের জন্য নির্ভরযোগ্য ও বৈচিত্র্যময় জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় উৎপাদন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ এবং বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি উৎস—সব মিলিয়েই একটি স্থিতিশীল বাজার গড়ে ওঠে। সরবরাহ যত শক্তিশালী হবে, মূল্যচাপও তত নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

জ্বালানির দাম কমানোর কার্যকর পথ তাই রাজনৈতিক দোষারোপে নয়; বরং সরবরাহ বাড়ানো, উৎপাদনে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং এমন নীতি গ্রহণে, যা বাজারকে আরও স্থিতিশীল করে। অর্থনীতির মৌলিক নিয়মকে উপেক্ষা করে সাময়িক রাজনৈতিক লাভ হয়তো অর্জন করা যায়, কিন্তু তাতে ভোক্তার দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি নিশ্চিত হয় না।

( সম্পাদকীয়র মূল চিন্তাকে বাংলায় রূপান্তারিত করা হয়েছে) 

জনপ্রিয় সংবাদ

বিশ্ব ব্যাডমিন্টনে ভারতের বড় আশা, শুরুতেই সহজ ম্যাচ সিন্ধু-লক্ষ্যের, কঠিন পরীক্ষায় আয়ুষ

জ্বালানির দাম বাড়ার জন্য তেল কোম্পানি নয়, নীতিনির্ধারণের মূল্যই দিচ্ছে বিশ্ব

০৭:০০:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

পেট্রোল বা জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে সবচেয়ে সহজ রাজনৈতিক কৌশল হলো বড় তেল কোম্পানিগুলোর দিকে আঙুল তোলা। জনরোষের মুহূর্তে এই ব্যাখ্যা জনপ্রিয় শোনায়, কিন্তু অর্থনীতির মৌলিক বাস্তবতা এত সরল নয়। বাজারে মূল্য নির্ধারণের প্রধান নিয়ামক এখনও চাহিদা ও জোগানের সম্পর্ক। যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক সংকট কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে সেই ভারসাম্য বদলে যায়, আর তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেটেই পড়ে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেভরন ও এক্সনমোবিলের বিপুল মুনাফাকে লক্ষ্য করে অভিযোগ তুলেছেন যে, সংকটের সুযোগ নিয়ে তারা অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করছে। এমনকি তিনি খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম কমানোরও আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু কোনো কোম্পানির লাভ বেড়েছে বলেই যে বাজারদর বেড়েছে, এমন সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তেলের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই অস্থির। সামান্য সরবরাহ ঘাটতি বা চাহিদার পরিবর্তনও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় মূল্যবৃদ্ধির কারণ হতে পারে। আর যুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংকটের মতো ঘটনা এ প্রভাবকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসও সেটিই দেখায়। মহামারির সময় যখন জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ কমে গিয়েছিল, তখন একই তেল কোম্পানিগুলো বিশাল লোকসানের মুখে পড়েছিল। অর্থাৎ লাভ ও ক্ষতি—দুটিই বাজারের একই নিয়মে পরিচালিত হয়।

Oil Price Spike: What Countries Are Telling People to Do - Business Insider

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিচালিত হয়। সেখানে চলাচল ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়বে—এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পাম্পে জ্বালানির মূল্য যে বেড়েছে, তার পেছনে বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটই বড় কারণ।

এখানেই রাজনৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন সামনে আসে। যদি সামরিক পদক্ষেপ এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যার ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক প্রভাবও স্বীকার করতে হবে। পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি কখনও কখনও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রত্যক্ষ মূল্যচাপ সৃষ্টি করে। তাই যুদ্ধ-পরবর্তী মূল্যবৃদ্ধির পুরো দায় বেসরকারি কোম্পানির ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত কারণ আড়াল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

আরেকটি বিষয়ও বিবেচনা করা জরুরি। জ্বালানি খাতে লাভজনক ব্যবসা শুধু শেয়ারহোল্ডারদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সরকারি রাজস্বের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তেল ও গ্যাস উৎপাদন থেকে সরকারের উল্লেখযোগ্য আয় আসে। ফলে এই শিল্পকে রাজনৈতিক চাপে ফেলে অতিরিক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হতে পারে।

Trump's tariff retreat: Stock market rally rests on one big assumption | Vox

যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে। অতিরিক্ত মুনাফার ওপর উচ্চ কর আরোপের পর উত্তর সাগরে কয়েকটি বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনার মুখে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর অর্থ হতে পারে কম উৎপাদন, কম বিনিয়োগ এবং শেষ পর্যন্ত আরও সীমিত সরবরাহ।

অন্যদিকে, মুক্তবাজারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার দাবি করলেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অবস্থান নানা ক্ষেত্রে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। উচ্চ শুল্ক আরোপ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারি অংশীদারিত্ব এবং বাজারে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মতো পদক্ষেপ তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ফলে একদিকে বাজার অর্থনীতির কথা বলা, অন্যদিকে বাজারের স্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের আহ্বান—এই দ্বৈত অবস্থান সহজে উপেক্ষা করা যায় না।

ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা একটি বড় শিক্ষা সামনে নিয়ে এসেছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময় একটি দেশের জন্য নির্ভরযোগ্য ও বৈচিত্র্যময় জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় উৎপাদন, আন্তর্জাতিক সরবরাহ এবং বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি উৎস—সব মিলিয়েই একটি স্থিতিশীল বাজার গড়ে ওঠে। সরবরাহ যত শক্তিশালী হবে, মূল্যচাপও তত নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

জ্বালানির দাম কমানোর কার্যকর পথ তাই রাজনৈতিক দোষারোপে নয়; বরং সরবরাহ বাড়ানো, উৎপাদনে বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং এমন নীতি গ্রহণে, যা বাজারকে আরও স্থিতিশীল করে। অর্থনীতির মৌলিক নিয়মকে উপেক্ষা করে সাময়িক রাজনৈতিক লাভ হয়তো অর্জন করা যায়, কিন্তু তাতে ভোক্তার দীর্ঘমেয়াদি স্বস্তি নিশ্চিত হয় না।

( সম্পাদকীয়র মূল চিন্তাকে বাংলায় রূপান্তারিত করা হয়েছে)