০৭:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬
জ্বালানির দাম বাড়ার জন্য তেল কোম্পানি নয়, নীতিনির্ধারণের মূল্যই দিচ্ছে বিশ্ব সংসদ অচলাবস্থা কাটাতে রাহুলের সঙ্গে বৈঠক, বিরোধীদের শর্তে চাপে সরকার তসলিমা নাসরিনের কলকাতা প্রত্যাবর্তন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ইমেশা দুলানি সপ্তাহের সেরা ক্রিকেটার: অপরাজিত শতকে পাকিস্তানকে হারিয়ে শ্রীলঙ্কার দাপুটে জয় যৌন সহিংসতা, উপনিবেশবাদ ও ফিলিস্তিন: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এক অন্ধকার ইতিহাস পশ্চিম আফ্রিকার কাদামাটি কচ্ছপ: কাদার আড়ালে টিকে থাকার এক বিস্ময় উচ্চশিক্ষায় নতুন সমীকরণ, বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়া চীনের পাল্টা পদক্ষেপে স্পষ্ট বাণিজ্যযুদ্ধের নতুন কৌশল চীন-রাশিয়ার যৌথ নৌ টহল ঘিরে জাপানের উদ্বেগ, কী বার্তা দিচ্ছে দুই দেশ? যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা আরও সহজ, দুই লাখ ডলার আয় পর্যন্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি মওকুফ

চীনের কূটনীতিতে ইউক্রেন শান্তি

ইউক্রেন যুদ্ধ চতুর্থ বছরে প্রবেশ করার পর একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—শুধু সামরিক লড়াইয়ের মাধ্যমে এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা যেমন অচলাবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনি একের পর এক কূটনৈতিক উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি আনতে ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন শান্তি উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সমর্থন পেলেও সেগুলো রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বৃহত্তর বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে গ্রহণযোগ্য কোনো অভিন্ন ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।

এই প্রেক্ষাপটে চীন এক ভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক ধারণা সামনে এনেছে। বেইজিং কখনোই দাবি করেনি যে তারা একাই এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারবে। বরং তাদের বক্তব্য, এমন একটি শান্তি প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে যেখানে শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেন নয়, পশ্চিমা শক্তি এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকেও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। চীনের মতে, স্থায়ী শান্তির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনীতির বিকল্প নেই।

নীতিগত অবস্থান থেকে কূটনৈতিক রূপরেখা

২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই চীন ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিকে বেইজিং চারটি মৌলিক নীতির কথা তুলে ধরে। পরে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত “ইউক্রেন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে চীনের অবস্থান” শীর্ষক দলিলে সেই ধারণাগুলো আরও সুসংগঠিত রূপ পায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি “১২ দফা শান্তি পরিকল্পনা” নামে পরিচিতি লাভ করে।

এই দলিলে কোনো চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির খসড়া ছিল না। বরং ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা ছিল। চীনের দৃষ্টিতে, যুদ্ধ শেষ করার নির্দিষ্ট সূত্র দেওয়ার চেয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই অবস্থানই পরবর্তী সময়ে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

শান্তি আলোচনার টেবিলকে আরও বিস্তৃত করার প্রচেষ্টা

চীন খুব দ্রুত বুঝতে পারে যে শুধু নীতিগত বিবৃতি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই তারা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আলোচনার জন্য একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করে।

২০২৪ সালে বেইজিং একটি আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনের জন্য তিনটি মৌলিক শর্ত প্রস্তাব করে। প্রথমত, সম্মেলনটি রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সমান মর্যাদায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাবকে নিরপেক্ষভাবে আলোচনার সুযোগ থাকতে হবে।

একই বছরের মে মাসে চীন ও ব্রাজিল যৌথভাবে ইউক্রেন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে একটি ঐকমত্যপত্র প্রকাশ করে। এটি শুধু দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ ছিল না; বরং প্রথমবারের মতো গ্লোবাল সাউথের একটি বড় দেশ চীনের সঙ্গে মিলে ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য লিখিত নীতিগত প্রস্তাব সামনে আনে।

China's 'Peace Plan' for Ukraine Has Ulterior Motives

পরে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তও এই নীতির ধারাবাহিকতা ছিল। বেইজিংয়ের মূল্যায়ন ছিল, সম্মেলনটি তাদের প্রস্তাবিত অন্তর্ভুক্তিমূলক মানদণ্ড পূরণ করেনি।

এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে “ফ্রেন্ডস অব পিস” নামে একটি নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলা হয়। গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে এই প্ল্যাটফর্ম গঠিত হলেও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার কাঠামো নয়। তবে এটি পশ্চিমা উদ্যোগের বাইরে আরেকটি কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে চীনের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—শান্তি প্রক্রিয়াকে এমনভাবে বিস্তৃত করা যাতে ভবিষ্যতের আলোচনায় আরও বেশি আন্তর্জাতিক পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।

কূটনীতির পেছনে বাস্তব অর্থনৈতিক হিসাব

চীনের শান্তি উদ্যোগকে কেবল আদর্শিক বা নৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর পেছনে শক্তিশালী অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে।

রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন পক্ষই চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।

দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায়, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়। ফলে সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, চীনের অর্থনীতির ওপর চাপও তত বাড়ে।

অর্থাৎ বেইজিংয়ের কাছে শান্তি শুধু একটি নীতিগত লক্ষ্য নয়; এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও অপরিহার্য শর্ত।

ধারাবাহিক কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা

চীনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা কখনো দ্রুত ফল পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

বেইজিং নিজেকে এমন কোনো মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেনি, যে অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারবে। বরং তারা দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা, যোগাযোগ বজায় রাখা এবং ধাপে ধাপে আস্থা তৈরির ওপর জোর দিয়েছে।

এই সংযত কৌশল চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে। আলোচনার পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে না নিয়ে তারা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

তাদের মূল লক্ষ্য যুদ্ধের তাৎক্ষণিক অবসান ঘটানো নয়; বরং এমন একটি কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তি উদ্যোগে চীনকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

মধ্যস্থতাকারী নয়, আলোচনার সহায়ক

চীন এখনও স্পষ্টভাবে বলে আসছে যে তারা এই সংঘাতের কোনো পক্ষ নয়।

বেইজিংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করতে চায় না; বরং আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে চায়। এই অবস্থান তাদের জন্য কৌশলগতভাবেও সুবিধাজনক।

কারণ আলোচনার ব্যর্থতার দায় তাদের ওপর বর্তাবে না। একই সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগও তারা ধরে রাখতে পারবে।

অর্থাৎ চীনের লক্ষ্য সমাধানের মালিক হওয়া নয়; বরং সমাধানের প্রক্রিয়ার অন্যতম স্থপতি হয়ে ওঠা।

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক—সুবিধা নাকি সীমাবদ্ধতা?

চীনের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে উপেক্ষা করা যায় না।

অনেকের কাছে এই সম্পর্ক চীনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আবার অন্যদিকে, এই সম্পর্কই বেইজিংকে রুশ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ দিয়েছে, যা খুব কম দেশেরই রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চীন-রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদারিত্ব ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গড়ে ওঠেনি। বহু দশকের ধারাবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এই সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ফলে ভবিষ্যতে যদি বাস্তব আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে মস্কোর সঙ্গে চীনের এই যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।

Explaining China's Diplomatic Strategy on Ukraine – The Diplomat

আগে আলোচনা, পরে সমাধান

চীনের কূটনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।

বেইজিংয়ের মতে, আলোচনার আগেই একটি চূড়ান্ত সমাধান নির্ধারণের চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। তারা একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান এবং প্রত্যেক দেশের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে।

কূটনৈতিক ভাষা সরিয়ে সহজভাবে বললে, চীনের বার্তা হলো—”আগে সবাইকে একই টেবিলে বসতে দিন, তারপর সমাধান খোঁজা যাবে।”

তাদের বিশ্বাস, সরাসরি আলোচনার আগে কোনো পক্ষের জন্যই গ্রহণযোগ্য সমাধান তৈরি করা সম্ভব নয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনীতি কি যথেষ্ট?

এ পর্যন্ত চীন কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তি পরিকল্পনা দেয়নি। তাদের উদ্যোগগুলোও এখনো স্থায়ী আলোচনার কাঠামোতে রূপ নেয়নি।

এটি অবশ্যই একটি সীমাবদ্ধতা।

কারণ শুধু অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ালেই মতপার্থক্য দূর হয় না। ভূখণ্ড, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থের মতো মৌলিক বিরোধ কেবল বৃহত্তর বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা যায় না।

তবে বিপরীত যুক্তিটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রধান অংশীদারদের কেউ আলোচনার বাইরে থাকে, তাহলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও কমে যায়।

এই কারণেই চীন বারবার বলছে, স্থায়ী শান্তি চাইলে রাশিয়া, ইউক্রেন, পশ্চিমা শক্তি এবং গ্লোবাল সাউথ—সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

চীনের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, চীন কি তাদের ঘোষিত নীতিগুলোকে কার্যকর কূটনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দিতে পারবে?

গত কয়েক বছরে বেইজিং ধারাবাহিকতা, ধৈর্য এবং বহুপক্ষীয় যোগাযোগ বজায় রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু একটি কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী আলোচনা কাঠামো গড়ে তোলাই হবে তাদের প্রকৃত পরীক্ষা।

শেষ পর্যন্ত চীনের আন্তর্জাতিক ভূমিকা নির্ধারিত হবে তারা কতগুলো নীতিগত বিবৃতি দিয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনীতিকে বাস্তব আলোচনার একটি কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ দিতে পারে কি না, তার ওপর।

স্থায়ী শান্তি কখনোই শুধু একটি চুক্তির মাধ্যমে আসে না। সেটি গড়ে ওঠে এমন একটি আলোচনার পরিবেশের ওপর, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ নিজেদের কথা বলার সুযোগ পায়। চীনের কূটনৈতিক কৌশল মূলত সেই পরিসর তৈরির দিকেই নিবদ্ধ। ভবিষ্যতে এই কৌশল কতটা সফল হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ইউক্রেন সংকট সমাধানে বেইজিংয়ের প্রকৃত ঐতিহাসিক ভূমিকা।

জনপ্রিয় সংবাদ

জ্বালানির দাম বাড়ার জন্য তেল কোম্পানি নয়, নীতিনির্ধারণের মূল্যই দিচ্ছে বিশ্ব

চীনের কূটনীতিতে ইউক্রেন শান্তি

০৫:১৮:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

ইউক্রেন যুদ্ধ চতুর্থ বছরে প্রবেশ করার পর একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—শুধু সামরিক লড়াইয়ের মাধ্যমে এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা যেমন অচলাবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনি একের পর এক কূটনৈতিক উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি আনতে ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন শান্তি উদ্যোগ আন্তর্জাতিক সমর্থন পেলেও সেগুলো রাশিয়া, ইউক্রেন এবং বৃহত্তর বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে গ্রহণযোগ্য কোনো অভিন্ন ভিত্তি তৈরি করতে পারেনি।

এই প্রেক্ষাপটে চীন এক ভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক ধারণা সামনে এনেছে। বেইজিং কখনোই দাবি করেনি যে তারা একাই এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারবে। বরং তাদের বক্তব্য, এমন একটি শান্তি প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে যেখানে শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেন নয়, পশ্চিমা শক্তি এবং গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকেও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। চীনের মতে, স্থায়ী শান্তির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনীতির বিকল্প নেই।

নীতিগত অবস্থান থেকে কূটনৈতিক রূপরেখা

২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই চীন ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিকে বেইজিং চারটি মৌলিক নীতির কথা তুলে ধরে। পরে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত “ইউক্রেন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে চীনের অবস্থান” শীর্ষক দলিলে সেই ধারণাগুলো আরও সুসংগঠিত রূপ পায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এটি “১২ দফা শান্তি পরিকল্পনা” নামে পরিচিতি লাভ করে।

এই দলিলে কোনো চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির খসড়া ছিল না। বরং ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা ছিল। চীনের দৃষ্টিতে, যুদ্ধ শেষ করার নির্দিষ্ট সূত্র দেওয়ার চেয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই অবস্থানই পরবর্তী সময়ে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

শান্তি আলোচনার টেবিলকে আরও বিস্তৃত করার প্রচেষ্টা

চীন খুব দ্রুত বুঝতে পারে যে শুধু নীতিগত বিবৃতি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাই তারা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আলোচনার জন্য একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু করে।

২০২৪ সালে বেইজিং একটি আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনের জন্য তিনটি মৌলিক শর্ত প্রস্তাব করে। প্রথমত, সম্মেলনটি রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। দ্বিতীয়ত, সব সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সমান মর্যাদায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, বিভিন্ন পক্ষের প্রস্তাবকে নিরপেক্ষভাবে আলোচনার সুযোগ থাকতে হবে।

একই বছরের মে মাসে চীন ও ব্রাজিল যৌথভাবে ইউক্রেন সংকটের রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে একটি ঐকমত্যপত্র প্রকাশ করে। এটি শুধু দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ ছিল না; বরং প্রথমবারের মতো গ্লোবাল সাউথের একটি বড় দেশ চীনের সঙ্গে মিলে ভবিষ্যৎ শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য লিখিত নীতিগত প্রস্তাব সামনে আনে।

China's 'Peace Plan' for Ukraine Has Ulterior Motives

পরে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তও এই নীতির ধারাবাহিকতা ছিল। বেইজিংয়ের মূল্যায়ন ছিল, সম্মেলনটি তাদের প্রস্তাবিত অন্তর্ভুক্তিমূলক মানদণ্ড পূরণ করেনি।

এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে “ফ্রেন্ডস অব পিস” নামে একটি নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলা হয়। গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণে এই প্ল্যাটফর্ম গঠিত হলেও এটি কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনার কাঠামো নয়। তবে এটি পশ্চিমা উদ্যোগের বাইরে আরেকটি কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

সব মিলিয়ে চীনের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—শান্তি প্রক্রিয়াকে এমনভাবে বিস্তৃত করা যাতে ভবিষ্যতের আলোচনায় আরও বেশি আন্তর্জাতিক পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।

কূটনীতির পেছনে বাস্তব অর্থনৈতিক হিসাব

চীনের শান্তি উদ্যোগকে কেবল আদর্শিক বা নৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর পেছনে শক্তিশালী অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে।

রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন পক্ষই চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি।

দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায়, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি সৃষ্টি করে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দেয়। ফলে সংঘাত যত দীর্ঘ হয়, চীনের অর্থনীতির ওপর চাপও তত বাড়ে।

অর্থাৎ বেইজিংয়ের কাছে শান্তি শুধু একটি নীতিগত লক্ষ্য নয়; এটি তাদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও অপরিহার্য শর্ত।

ধারাবাহিক কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা

চীনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা কখনো দ্রুত ফল পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

বেইজিং নিজেকে এমন কোনো মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করেনি, যে অল্প সময়ের মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধ করে দিতে পারবে। বরং তারা দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা, যোগাযোগ বজায় রাখা এবং ধাপে ধাপে আস্থা তৈরির ওপর জোর দিয়েছে।

এই সংযত কৌশল চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সুবিধা তৈরি করেছে। আলোচনার পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে না নিয়ে তারা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।

তাদের মূল লক্ষ্য যুদ্ধের তাৎক্ষণিক অবসান ঘটানো নয়; বরং এমন একটি কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে ভবিষ্যতের যেকোনো শান্তি উদ্যোগে চীনকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

মধ্যস্থতাকারী নয়, আলোচনার সহায়ক

চীন এখনও স্পষ্টভাবে বলে আসছে যে তারা এই সংঘাতের কোনো পক্ষ নয়।

বেইজিংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করতে চায় না; বরং আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে চায়। এই অবস্থান তাদের জন্য কৌশলগতভাবেও সুবিধাজনক।

কারণ আলোচনার ব্যর্থতার দায় তাদের ওপর বর্তাবে না। একই সঙ্গে শান্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগও তারা ধরে রাখতে পারবে।

অর্থাৎ চীনের লক্ষ্য সমাধানের মালিক হওয়া নয়; বরং সমাধানের প্রক্রিয়ার অন্যতম স্থপতি হয়ে ওঠা।

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক—সুবিধা নাকি সীমাবদ্ধতা?

চীনের ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে উপেক্ষা করা যায় না।

অনেকের কাছে এই সম্পর্ক চীনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আবার অন্যদিকে, এই সম্পর্কই বেইজিংকে রুশ নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ দিয়েছে, যা খুব কম দেশেরই রয়েছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চীন-রাশিয়ার কৌশলগত অংশীদারিত্ব ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গড়ে ওঠেনি। বহু দশকের ধারাবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এই সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ফলে ভবিষ্যতে যদি বাস্তব আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে মস্কোর সঙ্গে চীনের এই যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।

Explaining China's Diplomatic Strategy on Ukraine – The Diplomat

আগে আলোচনা, পরে সমাধান

চীনের কূটনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।

বেইজিংয়ের মতে, আলোচনার আগেই একটি চূড়ান্ত সমাধান নির্ধারণের চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। তারা একই সঙ্গে রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান এবং প্রত্যেক দেশের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলে।

কূটনৈতিক ভাষা সরিয়ে সহজভাবে বললে, চীনের বার্তা হলো—”আগে সবাইকে একই টেবিলে বসতে দিন, তারপর সমাধান খোঁজা যাবে।”

তাদের বিশ্বাস, সরাসরি আলোচনার আগে কোনো পক্ষের জন্যই গ্রহণযোগ্য সমাধান তৈরি করা সম্ভব নয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনীতি কি যথেষ্ট?

এ পর্যন্ত চীন কোনো পূর্ণাঙ্গ শান্তি পরিকল্পনা দেয়নি। তাদের উদ্যোগগুলোও এখনো স্থায়ী আলোচনার কাঠামোতে রূপ নেয়নি।

এটি অবশ্যই একটি সীমাবদ্ধতা।

কারণ শুধু অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়ালেই মতপার্থক্য দূর হয় না। ভূখণ্ড, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থের মতো মৌলিক বিরোধ কেবল বৃহত্তর বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা যায় না।

তবে বিপরীত যুক্তিটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি প্রধান অংশীদারদের কেউ আলোচনার বাইরে থাকে, তাহলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও কমে যায়।

এই কারণেই চীন বারবার বলছে, স্থায়ী শান্তি চাইলে রাশিয়া, ইউক্রেন, পশ্চিমা শক্তি এবং গ্লোবাল সাউথ—সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

চীনের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, চীন কি তাদের ঘোষিত নীতিগুলোকে কার্যকর কূটনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ দিতে পারবে?

গত কয়েক বছরে বেইজিং ধারাবাহিকতা, ধৈর্য এবং বহুপক্ষীয় যোগাযোগ বজায় রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে। কিন্তু একটি কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী আলোচনা কাঠামো গড়ে তোলাই হবে তাদের প্রকৃত পরীক্ষা।

শেষ পর্যন্ত চীনের আন্তর্জাতিক ভূমিকা নির্ধারিত হবে তারা কতগুলো নীতিগত বিবৃতি দিয়েছে, তা দিয়ে নয়; বরং তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনীতিকে বাস্তব আলোচনার একটি কার্যকর ব্যবস্থায় রূপ দিতে পারে কি না, তার ওপর।

স্থায়ী শান্তি কখনোই শুধু একটি চুক্তির মাধ্যমে আসে না। সেটি গড়ে ওঠে এমন একটি আলোচনার পরিবেশের ওপর, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ নিজেদের কথা বলার সুযোগ পায়। চীনের কূটনৈতিক কৌশল মূলত সেই পরিসর তৈরির দিকেই নিবদ্ধ। ভবিষ্যতে এই কৌশল কতটা সফল হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ইউক্রেন সংকট সমাধানে বেইজিংয়ের প্রকৃত ঐতিহাসিক ভূমিকা।