রাষ্ট্রীয় সহিংসতা নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত বোমা, বন্দুক, অবরোধ কিংবা গণগ্রেপ্তারের মতো দৃশ্যমান বিষয়গুলোই সামনে আসে। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি কম আলোচিত অধ্যায় হলো যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা—যা বহু উপনিবেশবাদী প্রকল্পে কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, জনগোষ্ঠীকে ভীত করা এবং সামাজিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফিলিস্তিনকে ঘিরে সাম্প্রতিক মানবাধিকার বিতর্কে এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা জশ পল প্রকাশ্যে বলেন, দায়িত্ব পালনকালে তিনি ইসরায়েলি হেফাজতে এক কিশোর ফিলিস্তিনির ধর্ষণের অভিযোগ সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর, অধিকৃত ফিলিস্তিন বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন এবং ইসরায়েলভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন বি’ৎসেলেমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অসংখ্য সাক্ষ্য ও অভিযোগ উঠে আসে।
এই অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল স্দে তেইমান কারাগারে এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগসংবলিত একটি ভিডিও। ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও বিতর্ক আরও গভীর হয় যখন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জবাবদিহির প্রশ্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। একই সময়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো জোর দিয়ে বলতে থাকে, বিষয়টি কেবল কয়েকজন সদস্যের বিচ্ছিন্ন আচরণ হিসেবে দেখলে বৃহত্তর বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ৩০ জুন প্যালেস্টিনিয়ান ফেমিনিস্ট কালেকটিভ প্রকাশ করে ২০০ পৃষ্ঠার গবেষণা প্রতিবেদন A Predatory State: Israeli Systemic Sexualized and Gendered Violence against Palestinians। প্রতিবেদনের মূল দাবি হলো, ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা দীর্ঘ সময় ধরে একটি ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিবেদনের মতে, বর্তমান সংঘাতকে কেবল সাম্প্রতিক যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করলে এই দীর্ঘ ইতিহাস অনালোচিত থেকে যায়।
গবেষণাটি ১৯৪৮ সালের নাকবা থেকে শুরু করে বর্তমান গাজা যুদ্ধ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের নথি, সাক্ষ্য এবং ঐতিহাসিক দলিল বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের ভূমি ছাড়তে বাধ্য করা, আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং সামাজিক সংহতি ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যেই বহু ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতা ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে এর রূপ ও মাত্রা পরিবর্তিত হলেও উদ্দেশ্যের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
এই ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে ১৯৪৯ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, যা ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের ব্যক্তিগত ডায়েরিতেও নথিভুক্ত রয়েছে বলে লেখকদের দাবি। সেখানে বর্ণিত হয়েছে, এক কিশোরী বেদুইন মেয়েকে অপহরণের পর ইসরায়েলি সেনাদের একটি দল তাকে যৌনদাসী হিসেবে ব্যবহার করে এবং পরে হত্যা করে। প্রতিবেদনের মতে, এই ধরনের নথি দেখায় যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব বহু অভিযোগ সম্পর্কে অবগত ছিল।
লেখকদের যুক্তি, এই ধরনের সহিংসতা ইসরায়েলের ক্ষেত্রেই একমাত্র নয়। ইতিহাসে বিভিন্ন উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রে যৌন সহিংসতা ভূমি দখল ও জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসী নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা এবং ‘মিসিং অ্যান্ড মার্ডার্ড ইন্ডিজেনাস উইমেন’ আন্দোলনের উদাহরণ তুলে ধরে তারা দেখিয়েছেন, উপনিবেশবাদী কাঠামোতে বিচারহীনতা প্রায়ই একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও তাদের বিশ্লেষণ একই দিকে ইঙ্গিত করে। লেখকদের মতে, ভূমি দখল, জনগোষ্ঠীর স্থানচ্যুতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অস্বীকারের বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে যৌন সহিংসতা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এর মাধ্যমে কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ বেনি মরিসও ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় সংঘটিত একাধিক ধর্ষণের ঘটনার উল্লেখ করেছেন। যদিও তিনি বলেছেন, নথিভুক্ত ঘটনাগুলো সম্ভবত প্রকৃত ঘটনার খুবই সামান্য অংশ, কারণ ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষই অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ঘটনা প্রকাশ করেনি। ফলে গবেষকদের মতে, বিদ্যমান তথ্যের বাইরে আরও বহু ঘটনা অপ্রকাশিত থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্যালেস্টিনিয়ান ফেমিনিস্ট কালেকটিভের প্রতিবেদনটি আরও দাবি করে, ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর প্রশাসনিক আটক শিবির, প্রথম ও দ্বিতীয় ইন্তিফাদা এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগের সময়েও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের ধারাবাহিক অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তারা হামাসের বিরুদ্ধে প্রচারিত কিছু বহুল আলোচিত গণধর্ষণের অভিযোগও বিশ্লেষণ করে বলেছে, যেসব অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেগুলো ফিলিস্তিনিদের অমানবিক ও অসভ্য হিসেবে উপস্থাপনের রাজনৈতিক বর্ণনাকে শক্তিশালী করেছে।
এই বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় বক্তব্য হলো, যৌন সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা, দখল এবং উপনিবেশিক শাসনের একটি রাজনৈতিক প্রযুক্তি হিসেবে বোঝা জরুরি। কারণ এমন সহিংসতা কেবল শারীরিক ক্ষতি করে না; এটি একটি জনগোষ্ঠীর সামাজিক বন্ধন, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রতিরোধের সক্ষমতাকেও আঘাত করে।
এই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রও নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না। কারণ বহু বছর ধরে ওয়াশিংটন এসব অভিযোগ সম্পর্কে অবগত থেকেও ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে এসেছে। তাদের যুক্তি, প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে কেবল পৃথক অভিযুক্তদের বিচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং সেই রাজনৈতিক, সামরিক ও আইনি কাঠামোকেও পর্যালোচনার আওতায় আনতে হবে, যার ভেতরে এসব অভিযোগের জন্ম ও পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে মতভেদ যতই থাকুক, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় যৌন সহিংসতার অভিযোগকে নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা অপরিহার্য। কারণ কোনো সংঘাতেই ভুক্তভোগীর মর্যাদা রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করতে পারে না। এই কারণেই দীর্ঘদিনের নথি, সাক্ষ্য ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিয়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার দাবি আজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনার একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
নাদা এলিয়া ও নুরা এরাকাত 



















