প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন একের পর এক ধাপ পেরিয়ে বাড়তে থাকে, তখন সংকটের অভিঘাত শুধু হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পৌঁছে যায় পরিবারের খাবারের টেবিলে, সন্তানের পড়াশোনার খরচে, যাতায়াতের সিদ্ধান্তে এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের সক্ষমতায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার অর্থ কেবল বাজারে বেশি টাকা খরচ করা নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসা।
সাম্প্রতিক সময়ে চাল, ভোজ্যতেল, দুধজাত পণ্য, শাকসবজি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। ফলমূল, যা একসময় বহু পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ছিল, এখন অনেকের কাছে বিলাসিতায় পরিণত হচ্ছে। একই সঙ্গে যাতায়াত ব্যয়ও বেড়েছে, আর রান্নার গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এর সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার, যাদের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের বৃদ্ধি অনেক বেশি।
দাম বাড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে ব্যবসায়ীদের যুক্তির অভাব নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, মৌসুমি সরবরাহ সংকট কিংবা উৎসবের আগে চাহিদা বেড়ে যাওয়া—এসবই বাস্তব কারণ। কিন্তু সমস্যার সবটুকু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বাজারে এমন এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীও রয়েছে, যারা সুযোগ পেলেই কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিংবা অযৌক্তিকভাবে মূল্য বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা আদায়ের চেষ্টা করে। ফলে প্রকৃত বাজার বাস্তবতার সঙ্গে ভোক্তার পরিশোধ করা দামের ফারাক ক্রমেই বাড়তে থাকে।
এখানেই রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে। প্রতিবছরই বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বলা হয়, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, কালোবাজারি বন্ধ হবে, নজরদারি বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে বছরের পর বছর একই অভিযোগ, একই বিশৃঙ্খলা এবং একই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয়, বাজার তদারকির বিদ্যমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়।
ভোক্তা অধিকারকর্মীদের বক্তব্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তাদের মতে, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অনেক ক্ষেত্রেই শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তার অনেকটাই এখন প্রশমিত হয়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। এমনকি গণপরিবহনের ভাড়া কমানোর সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পরও বহু মানুষ আগের বাড়তি ভাড়াই পরিশোধ করছেন। অর্থাৎ, বাজারে মূল্য সমন্বয়ের পরিবর্তে একবার বাড়ানো দাম দীর্ঘ সময় ধরে বহাল থাকছে। এর পেছনে দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারির ঘাটতি স্পষ্ট।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব কেবল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা নয়; দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। এমন কিছু নীতিও পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যা সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে নিয়মিত বাজার তদারকি, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং বিভ্রান্তিকর সংকটের গুজব দমনে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুম ঘনিয়ে এলে বাজারে অতিরিক্ত সতর্কতা অপরিহার্য।
তবে শুধু তাৎক্ষণিক অভিযান দিয়ে মূল্যস্ফীতির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী কৃষি ব্যবস্থাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, সেচব্যবস্থা উন্নত করা, সংরক্ষণাগার ও কোল্ড-চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলা, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাকে আধুনিক করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বাজারও তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকবে।
বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কখনোই পুরোপুরি এড়ানো যায় না। কিন্তু সেটি যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে তা শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, সামাজিক আস্থার সংকটও সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস তখনই দৃঢ় হয়, যখন তারা অনুভব করে যে সরকার বাজারের ভারসাম্য রক্ষা, ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত এবং নাগরিকের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা রক্ষায় আন্তরিক ও সক্ষম। মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ তাই শুধু অর্থনৈতিক প্রয়োজন নয়, সুশাসনেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
সম্পাদকীয়ঃ দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট 


















