দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার পরও অনেক তরুণ-তরুণী কাঙ্ক্ষিত চাকরি খুঁজে পাচ্ছেন না। বিশেষ করে বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন স্নাতকদের বদলে অভিজ্ঞ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় কর্মজীবনের শুরুতেই অনেকেই হতাশার মুখে পড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে ক্রমেই বেশি সংখ্যক দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণ কর্মসংস্থানের জন্য জাপানের দিকে ঝুঁকছেন।
জাপানি উদ্যোক্তা মোয়ে কাসুগাই সিউলের ইয়নসেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় কাছ থেকে দেখেছিলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীরাও স্নাতক শেষ করার পর চাকরি পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি ২০১৯ সালে এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা দক্ষিণ কোরিয়ার চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে জাপানের নিয়োগদাতাদের সংযুক্ত করে।
সম্প্রতি সিউলে অনুষ্ঠিত দুই দিনের একটি চাকরি মেলায় তিনি বলেন, এত মেধাবী শিক্ষার্থীদের চাকরি না পাওয়া তাঁকে বিস্মিত করেছিল। তাই দুই দেশের মধ্যে কর্মসংস্থানের একটি কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরির উদ্যোগ নেন।
দুই দেশের ভিন্ন বাস্তবতা
দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই মানসম্মত প্রবেশস্তরের চাকরির সংকট রয়েছে। অনেক বড় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে শীর্ষ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো, নতুন স্নাতকদের বদলে অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগে বেশি আগ্রহী। পাশাপাশি অনেক বয়স্ক কর্মী দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে থেকে যাওয়ায় নতুনদের জন্য সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যার দেশে পরিণত হওয়া জাপানে নতুন কর্মী পাওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন স্নাতকদের জন্য প্রশিক্ষণভিত্তিক নিয়োগ কর্মসূচি চালু রেখেও পর্যাপ্ত আবেদনকারী পাচ্ছে না। ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণদের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ছে।

প্রযুক্তি খাতেও বাড়ছে চাহিদা
দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের প্রযুক্তি খাতের কর্মী নিয়োগকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এই প্রবণতার সুযোগ নিতে শুরু করেছে। দক্ষ প্রযুক্তি কর্মী খুঁজে দিতে বিশেষায়িত একাধিক প্রতিষ্ঠান এ বছর দক্ষিণ কোরিয়ার চাকরিপ্রার্থীদের জন্য জাপানে কর্মসংস্থানের নতুন সেবা চালু করেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে দক্ষিণ কোরিয়ায় তরুণদের বেকারত্বের হার ছিল ৭ শতাংশ। বিপরীতে জাপানে সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
বর্তমানে জাপানে কর্মরত ৮০ হাজারেরও বেশি দক্ষিণ কোরিয়ান বিভিন্ন পেশাদার খাতে কাজ করছেন। তাঁদের অনেকেই খুচরা বিক্রয়, তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও গেম উন্নয়নসহ বিভিন্ন দক্ষতাভিত্তিক পেশায় যুক্ত।
জাপান এখন প্রধান গন্তব্য
সরকার-সমর্থিত কর্মসূচির মাধ্যমে ২০২৫ সালে ২ হাজার ২৫৭ জন তরুণ দক্ষিণ কোরিয়ান জাপানে চাকরি পেয়েছেন। আগের বছরের তুলনায় এটি ৪৭ শতাংশ বেশি। এর ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জাপান এখন দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণদের সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
প্রশিক্ষণের সুযোগ বড় আকর্ষণ
চাকরিপ্রার্থীদের অনেকেই বলছেন, জাপানি প্রতিষ্ঠানে নতুন স্নাতকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এমন সুযোগ তুলনামূলক কম।
জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে পড়াশোনা করা এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি তথ্যপ্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে কাজ করতে চান। তাঁর মতে, জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন স্নাতকদের কর্মজীবনের শুরু থেকেই প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় সুবিধা।
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মীদের বাড়তি সুবিধা
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাষা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মীরা জাপানি প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়। অনেক বিদেশি আবেদনকারীর তুলনায় তাঁরা জাপানি ভাষায় দক্ষ হওয়ায় দ্রুত কর্মপরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন।
জাপানের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগ্যতা। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রার্থীদের প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা, দ্রুত কাজ করার সক্ষমতা এবং পরিশ্রমী মনোভাব তাঁদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
কর্মী ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ
তবে বিদেশি কর্মী নিয়োগের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক তরুণ ভালো বেতন ও উন্নত ক্যারিয়ারের আশায় তুলনামূলক দ্রুত চাকরি পরিবর্তন করেন। কিন্তু জাপানের অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, সীমিত দায়িত্ব এবং ধীরগতির পদোন্নতি থাকলে বিদেশি কর্মীদের অন্যত্র চলে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সম্পর্কের নতুন সেতুবন্ধন
উদ্যোক্তা মোয়ে কাসুগাই মনে করেন, এই উদ্যোগ শুধু চাকরি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বিশ্বাস, দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণরা জাপানে গিয়ে কাজ করলে দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয়, বোঝাপড়া এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও গভীর হবে। অনেক জাপানি সহকর্মী প্রথমবারের মতো কোনো দক্ষিণ কোরিয়ানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পাবেন, যা ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ইতিবাচক করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কঠিন চাকরির বাজার এবং জাপানের জনবল সংকট—এই দুই বাস্তবতা মিলিয়ে এখন দুই দেশের শ্রমবাজারে একটি নতুন সহযোগিতার ধারা তৈরি হচ্ছে, যা আগামী বছরগুলোতে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















