ইরান যুদ্ধ বিশ্বকে আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছে, জ্বালানি শুধু অর্থনীতির বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, বৈদেশিক নীতি এবং শিল্প প্রতিযোগিতারও অন্যতম ভিত্তি। কয়েক বছর আগেও অনেক দেশ মনে করেছিল বিশ্বায়িত জ্বালানি বাজারে নির্ভরতা বড় কোনো ঝুঁকি নয়। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কার পর ইরানকে ঘিরে সংঘাত সেই ধারণাকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন আর শুধু তেলের দাম কত বাড়বে, তা নয়; বরং সংকটের সময় আদৌ জ্বালানি পাওয়া যাবে কি না।
এই বাস্তবতা এমন এক বিতর্ককে সামনে এনেছে, যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শের চেয়ে কার্যকর নীতির গুরুত্ব অনেক বেশি। একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক পরিবহনের গতি বাড়ানোর দাবি, অন্যদিকে নতুন তেল ও গ্যাস উৎপাদনের পক্ষে যুক্তি। কিন্তু বাস্তবে এই দুই অবস্থানের কোনোটিই এককভাবে পূর্ণ সমাধান দিতে পারে না। বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে একাধিক পথকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
ইরান যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালীর কার্যকারিতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এই জলপথ দিয়ে একসময় বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবাহিত হতো। বাজার এখনও ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ধরে মূল্য নির্ধারণ করছে, কিন্তু বাস্তব ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অর্থাৎ, শুধু উৎপাদন থাকলেই হবে না; সেই জ্বালানি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবে কি না, সেটিও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এর আগে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণও একই ধরনের শিক্ষা দিয়েছিল। তখন বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত তেল, গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে দুটি বড় ভূরাজনৈতিক সংকট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এখন আর নিরাপদ কৌশল নয়।
এই প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটি নিজস্ব জ্বালানি সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও তরল জ্বালানির বড় অংশ আমদানিনির্ভর। একসময়ের আটটি তেল শোধনাগারের পরিবর্তে এখন কার্যকর রয়েছে মাত্র দুটি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নতুন করে একটি বড় শোধনাগার নির্মাণ করা হবে, নাকি আমদানিকৃত জ্বালানির প্রয়োজন কমাতে দ্রুত বিদ্যুতায়নের পথে এগোনো হবে?
প্রথম দৃষ্টিতে নতুন শোধনাগার নির্মাণ আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। এতে অন্তত পরিশোধিত জ্বালানির জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমবে। কিন্তু বাস্তব হিসাব এত সহজ নয়। আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক একটি শোধনাগার নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু স্থাপনা নির্মাণই নয়, অপরিশোধিত তেল আমদানির অবকাঠামো, সংরক্ষণাগার এবং কৌশলগত মজুতের ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। তাছাড়া পরিশোধিত জ্বালানির বদলে তখন নির্ভরতা স্থানান্তরিত হবে অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর। অর্থাৎ ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হবে না, কেবল তার ধরন বদলাবে।
অন্যদিকে বিদ্যুতায়নের পথও সব ক্ষেত্রে সমান সহজ নয়। খনি, কৃষি, ভারী শিল্প কিংবা দূরবর্তী অঞ্চলের পরিবহন ব্যবস্থাকে রাতারাতি বিদ্যুৎনির্ভর করা সম্ভব নয়। তবু প্রযুক্তির অগ্রগতি দেখাচ্ছে, যেখানে এটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, সেখানে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। অস্ট্রেলিয়ার বড় খনি কোম্পানিগুলো বৈদ্যুতিক যান ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারেও বৈদ্যুতিক ও বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড যানবাহনের বিক্রি দ্রুত বাড়ছে। এটি শুধু পরিবেশগত সচেতনতার ফল নয়; জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তাও ভোক্তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
এখানেই মূল শিক্ষা নিহিত। জ্বালানি রূপান্তরকে আদর্শিক লড়াই হিসেবে দেখলে বাস্তব সমাধান মিলবে না। বরং এমন একটি মধ্যবর্তী কৌশল প্রয়োজন, যেখানে সীমিত পরিসরে পরিশোধন সক্ষমতা বজায় রাখা হবে, পাশাপাশি বিদ্যুতায়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হবে। এতে একদিকে তাৎক্ষণিক সরবরাহ ঝুঁকি কিছুটা কমবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতাও ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে।
এই ধরনের বাস্তববাদী পরিবর্তনের লক্ষণ ইতোমধ্যেই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে। ভিয়েতনাম বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়াতে নীতিগত উদ্যোগ নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া গণপরিবহনকে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎনির্ভর করার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে এবং ব্যক্তিগত পরিবহনেও একই পরিবর্তন উৎসাহিত করছে। থাইল্যান্ড ভর্তুকি ও চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ করছে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য কেবল কার্বন নিঃসরণ কমানো নয়; আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকিও হ্রাস করা।
অবশ্য প্রতিটি দেশের বাস্তবতা আলাদা। যে কৌশল অস্ট্রেলিয়ার জন্য কার্যকর, সেটি হয়তো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বা ইউরোপের জন্য পুরোপুরি প্রযোজ্য হবে না। দেশভেদে জ্বালানির উৎস, শিল্প কাঠামো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। তাই একক কোনো নীতি সবার জন্য কার্যকর হতে পারে না।
তবে একটি বিষয় ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে। ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো একক জ্বালানি, একক প্রযুক্তি কিংবা একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। প্রকৃত নিরাপত্তা আসবে বৈচিত্র্য থেকে—জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিতে বৈচিত্র্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য। জীবাশ্ম জ্বালানি হয়তো আরও কিছু দশক বৈশ্বিক অর্থনীতির অংশ থাকবে, কিন্তু একই সঙ্গে বিকল্প শক্তির প্রসারও অব্যাহত রাখতে হবে।
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার সম্ভবত এটিই—জ্বালানি নিরাপত্তা আর কেবল উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি স্থিতিস্থাপকতা, বিকল্প ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার প্রশ্ন। যে দেশগুলো এই বাস্তবতা দ্রুত উপলব্ধি করে বহুমুখী নীতি গ্রহণ করবে, ভবিষ্যতের অনিশ্চিত বিশ্বে তারাই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে থাকবে।
ক্লাইড রাসেল 


















