০৩:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬
টরন্টোর ফ্যাশন সপ্তাহে নতুন দিগন্ত, কানাডীয় নকশায় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত জাপান-ব্রিটেনের ঘনিষ্ঠতা, চীন ও রাশিয়ার হুমকি এবং বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে কথা বললেন সাবেক এমআই৬ প্রধান রিচার্ড মুর ট্রাম্পের ইয়েন রক্ষার আসল কারণ কী, জাপানকে সহায়তার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সিনেমার পর্দা থেকে রেড কার্পেট—কানাডার ফ্যাশনপ্রেমীদের চোখে নতুন মৌসুমের সাজ শরৎ ফ্যাশনে ফিরছে ‘অপ্রয়োজনীয় বেল্ট’, সাজে বাড়ছে ২০০০-এর দশকের ছোঁয়া লন্ডনের ভয়াবহ ব্লিটজে আগুনের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন যে ফায়ার কমান্ডার, তাঁর পদক বিক্রি হলো ১৬ হাজার পাউন্ডে ঠান্ডা যুদ্ধের অন্ধকার গোপন অভিযান: কমিউনিস্ট আলবেনিয়ায় সিআইএ ও এমআই৬-এর ব্যর্থ লড়াই বর্ণবাদের দেয়াল ভেঙে যুদ্ধের ময়দানে বীরত্ব, ৫০ বছর পর সর্বোচ্চ সম্মান পেলেন ভার্নন বেকার যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে হঠাৎ ধাক্কা, জুলাইয়ে ২৩ হাজার চাকরি  হারিয়েছে ভারতে শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশের দমন: লাঠি, কাঁদানে গ্যাসের পর ছোড়া হয় পেলেট গান

বর্ণবাদের দেয়াল ভেঙে যুদ্ধের ময়দানে বীরত্ব, ৫০ বছর পর সর্বোচ্চ সম্মান পেলেন ভার্নন বেকার

১৯৪৫ সালের ইতালির রণক্ষেত্রে মাত্র ২৫ জন সৈনিকের একটি দল নিয়ে জার্মান দুর্গের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন কর্মকর্তা। ১২ ঘণ্টার ভয়াবহ গোলাগুলির মধ্যে তিনি একের পর এক মেশিনগান ঘাঁটি, পর্যবেক্ষণ পোস্ট ও বাঙ্কার ধ্বংস করেন, নয়জন জার্মান সৈনিককে হত্যা করেন এবং নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরিয়ে আনেন। অথচ তার বীরত্বের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়। তিনি লেফটেন্যান্ট ভার্নন বেকার—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য জীবিত কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন প্রবীণদের মধ্যে ‘মেডেল অব অনার’ পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি।

যুদ্ধ ছিল দুটি ফ্রন্টে

ভার্নন বেকার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সৈনিকের যুদ্ধ ছিল আসলে দুটি ফ্রন্টে। একদিকে তাদের লড়াই করতে হয়েছিল জার্মানি, ইতালি ও জাপানের নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে। অন্যদিকে নিজেদের দেশের সেনাবাহিনীর ভেতরেই তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছিল বর্ণবাদ, বৈষম্য ও অপমানের।

১৯৪৫ সালের ৫ এপ্রিল সকাল ৭টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭০তম পদাতিক রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়নের ‘সি’ কোম্পানির একটি প্লাটুন উত্তর ইতালির ক্যাসল আগিনলফির জার্মান শক্ত ঘাঁটি থেকে মাত্র কয়েকশ ফুট দূরে অবস্থান নিয়েছিল। মিত্রবাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল ইতালি থেকে জার্মান বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে বিতাড়িত করা।

মাত্র ২৫ জনের এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট ভার্নন বেকার। দিনের শেষে তিনি একাই বেশ কয়েকটি জার্মান মেশিনগান ঘাঁটি ও বাঙ্কার ধ্বংস করবেন, শত্রু সৈনিকদের হত্যা করবেন এবং নিজের লোকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য জীবন বাজি রাখবেন।

কিন্তু এই যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পথও বেকারের জন্য সহজ ছিল না।

After 50 years, this WWII soldier finally received his Medal of Honor

সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে গিয়েও প্রত্যাখ্যাত

ভার্নন বেকার ১৯১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের শেয়েনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে উচ্চবিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি রেলওয়ের মালবাহকসহ বিভিন্ন সাধারণ ও স্বল্পমজুরির কাজ করেন। এসব কাজে তিনি খুব একটা আনন্দ খুঁজে পাননি।

সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে মানুষের সেবা করার মাধ্যমে নিজের জীবনে একটি উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়ার আশা করেছিলেন তিনি। সেই উদ্দেশ্যে ১৯৪১ সালের এপ্রিল মাসে মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রথমবারই তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়।

সেনাবাহিনীর একজন নিয়োগকারী তাকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের লোকদের জন্য আমাদের কোনো কোটা নেই।’

কথাটি তাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। একই বছরের জুন মাসে তিনি অন্য একজন নিয়োগকারীর কাছে আবার আবেদন করেন। এবার তাকে গ্রহণ করা হয়।

বেকার চেয়েছিলেন কোয়ার্টারমাস্টার বা সরবরাহ বিভাগে কাজ করতে। কিন্তু তার সেই অনুরোধ উপেক্ষা করা হয় এবং তাকে পদাতিক বাহিনীতে পাঠানো হয়।

টেক্সাসের ক্যাম্প ওয়াল্টার্সে প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করার পর তাকে ২৫তম পদাতিক রেজিমেন্টে নিয়োগ দেওয়া হয়। গৃহযুদ্ধের পর আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে পরিচালিত সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার কারণে এই রেজিমেন্ট ‘বাফেলো সোলজার্স’ নামে পরিচিত ছিল।

কর্মকর্তা হওয়ার সুযোগ

১৯৪২ সালের অক্টোবরে অ্যারিজোনার ফোর্ট হুয়াচুকায় দায়িত্ব পালনের সময় বেকার ইতোমধ্যে একজন সরবরাহ সার্জেন্ট। বন্ধুবৎসল, নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল সৈনিক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন।

তাই তাকে সম্ভাব্য অফিসার প্রার্থী হিসেবে বাছাই করা হয়।

বেকার অবশ্য বিষয়টি নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, নিজের বর্তমান অবস্থানেই তিনি বেশ ভালো আছেন এবং তার ভাষায়, তখন তার মনে হয়েছিল ‘সবকিছুই ঠিকঠাক হয়ে গেছে’।

Review of troops at Fort Benning, Georgia circa 1942-43 | The Digital  Collections of the National WWII Museum : Oral Histories

তারপরও তিনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে যোগ দেন। জর্জিয়ার ফোর্ট বেনিংয়ে ১৩ সপ্তাহের অফিসার প্রশিক্ষণ শেষ করার পর ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন পান।

এরপর তাকে ৩৭০তম পদাতিক রেজিমেন্টের একটি অস্ত্র প্লাটুনের নেতৃত্ব দেওয়া হয়।

তবে তিনি যে রেজিমেন্টেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেগুলো সামরিক আইনের অধীনে বর্ণভিত্তিকভাবে পৃথক রাখা হয়েছিল।

একদিকে দেশ, অন্যদিকে নিজের দেশের বৈষম্য

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১০ লাখেরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও পুরুষ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রতিটি শাখায় কাজ করেছিলেন।

কিন্তু তাদের সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ সৈনিকদের মতো সমান আচরণ করা হতো না।

সেনাবাহিনীতে বর্ণবৈষম্য ছিল সর্বত্র। প্যারেড, গির্জা, খাবারের স্থান, পরিবহন—সব জায়গাতেই কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের আলাদা রাখা হতো।

পরিস্থিতি এতটাই বৈষম্যমূলক ছিল যে জার্মান যুদ্ধবন্দীদের এমন কিছু স্থাপনায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সৈনিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না।

সেন্ট লুইসে একজন শ্বেতাঙ্গ লেফটেন্যান্ট কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সৈনিকদের একটি রেলগাড়ির সামনের আসন ছেড়ে ইতালীয় যুদ্ধবন্দীদের বসার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

বেকার নিজেও সেনাবাহিনীতে প্রবেশের প্রথম দিন থেকেই এই বৈষম্যের শিকার হন। দক্ষিণাঞ্চলে প্রশিক্ষণে পৌঁছানোর সময় তাকে পরিবহনের পেছনের দিকে বসতে বাধ্য করা হয়েছিল।

কৃষ্ণাঙ্গ রেজিমেন্টগুলোকে বিদেশে পাঠানো বা সরাসরি যুদ্ধ করার সুযোগও দেওয়া হতো না। তাদের মূলত সামরিক ঘাঁটির সহায়ক কাজে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।

এই বাস্তবতা কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের মধ্যে এক গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল। তারা যে দেশের জন্য লড়ছিল, সেই দেশই তাদের সমান নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করছিল না।

বেকার পরে এই অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রই ছিল তার একমাত্র দেশ। তিনি এমন মানুষদের রক্ষা করছিলেন যারা তাকে পছন্দ করত না, কিন্তু তার যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গাও ছিল না।

Allied invasion of Sicily | Significance, Summary, & Map | Britannica

ইতালির যুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের প্রয়োজন

১৯৪৩ সালের সেপ্টেম্বরে মিত্রবাহিনী ইতালির মূল ভূখণ্ডে অভিযান শুরু করে। অক্টোবরে নেপলস দখল করা হয় এবং পরের বছরের জুনে রোমও মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।

পিছু হটতে থাকা জার্মান বাহিনী উত্তর ইতালির পাহাড়জুড়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এটি পরিচিত হয় ‘গথিক লাইন’ নামে।

পশ্চিম উপকূলের লা স্পেজিয়া থেকে অ্যাড্রিয়াটিক উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙা মিত্রবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৪৪ সালের আগস্টে বেকার নেপলসে পৌঁছানোর সময় পাহাড়ি অঞ্চল দখলের চেষ্টা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম সেনাবাহিনী প্রায় অর্ধেক শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল।

ফ্রান্স ও ইতালিতে মিত্রবাহিনীর যুদ্ধ যত তীব্র হতে থাকে, সম্মুখসারির পদাতিক ইউনিটগুলোর ক্ষয়ক্ষতিও তত বাড়তে থাকে। নতুন সৈনিকের প্রয়োজন জরুরি হয়ে পড়ে।

তখন মিত্রবাহিনী বুঝতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক ঘাঁটিতে থাকা কয়েক লাখ কৃষ্ণাঙ্গ পদাতিক সৈনিককে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

১৯৪৪ সালের ১৫ জুলাই বেকারসহ প্রায় ৭ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিক ‘এসএস মারিপোসা’ জাহাজে করে ইতালির উদ্দেশে রওনা হন। তাদের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া।

প্রথম বড় লড়াই

১৯৪৪ সালের ৮ অক্টোবর বেকার ও তার কোম্পানিকে সেরাভেজ্জার একটি পাহাড়ের ঢালে থাকা জার্মান-নিয়ন্ত্রিত একটি বাড়িতে আক্রমণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাড়িটির ভেতরে থাকা পাঁচজন জার্মান সৈনিককে বেকার হত্যা করেন। এ সময় তার অন্য সৈনিকেরা কাছের একটি জার্মান মেশিনগান ঘাঁটির দিকে শত্রুর গুলি টেনে নেওয়ার জন্য বিভ্রান্তিমূলক অভিযান চালাচ্ছিলেন।

এই লড়াইয়ে দুইজন মার্কিন সৈনিক নিহত হন।

বেকার নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু সে সময় তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেননি। ঘাঁটিতে ফিরে আসার পর তিনি বুঝতে পারেন যে তার হাতে গুলি লেগেছে।

পরবর্তী দুই মাস তিনি পিসার কাছে একটি সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

Invasion of the Soviet Union – The Holocaust Explained: Designed for schools

সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, জার্মান বাহিনীকে ইতালি থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার জন্য মিত্রবাহিনী একটি বড় ধরনের নতুন অভিযান প্রস্তুত করছে।

এই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সেকেন্ড উইন্ড’।

পরের বসন্তে ৯২তম পদাতিক ডিভিশন, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল বেকারের ৩৭০তম রেজিমেন্ট, মাসার কাছে গথিক লাইন ভেঙে দেওয়ার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

এই অভিযানে কাছাকাছি অবস্থিত শক্তিশালী ক্যাসল আগিনলফি দখল করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যাসল আগিনলফির দিকে অগ্রযাত্রা

১৯৪৫ সালের ৫ এপ্রিল ভোর ৫টায় ক্যাসল আগিনলফির বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়।

বেকারের ‘সি’ কোম্পানির প্রায় ৭০ শতাংশ সৈনিকই ছিলেন নতুন এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতাহীন। তারপরও তারা দ্রুত এগিয়ে যেতে সক্ষম হন।

মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে তারা দুর্গ থেকে প্রায় ৭৫০ ফুট বা ২৩০ মিটার দূরে পৌঁছে যায়।

সেখানে বেকার পাহাড়ের একটি সরু ফাঁক দিয়ে দুটি রাইফেলের নল বেরিয়ে থাকতে দেখেন।

তিনি একাই এগিয়ে গিয়ে নিজের এম-১ রাইফেলটি সেই ফাঁকের ভেতর ঢুকিয়ে গুলি চালান। এতে দুই জার্মান সৈনিক নিহত হয়।

এর কিছুক্ষণ পর তিনি ছদ্মবেশে লুকিয়ে রাখা একটি মেশিনগান ঘাঁটির প্রবেশপথ খুঁজে পান।

ভেতরে থাকা দুই জার্মান সৈনিক তখন সকালের খাবার খাচ্ছিল। বেকারের আকস্মিক উপস্থিতিতে তারা হতভম্ব হয়ে যায়। তিনি দুজনকেই গুলি করে হত্যা করেন।

এরপর ‘সি’ কোম্পানির শ্বেতাঙ্গ কমান্ডার ক্যাপ্টেন জন রানিয়ন সেখানে পৌঁছান।

ঠিক তখনই জার্মান বাহিনী দুই কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে একটি গ্রেনেড ছোড়ে। সৌভাগ্যক্রমে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়নি।

বেকার দুইটি গুলি করে শত্রু সৈনিককে হত্যা করেন।

এরপর তিনি একটি লুকানো বাঙ্কারের আরেকটি প্রবেশপথ খুঁজে পান।

বেকার ভেতরে একটি হাতবোমা ছুড়ে দেন। বিস্ফোরণের পর একজন জার্মান সৈনিক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলে তাকে গুলি করে হত্যা করেন।

তারপর তিনি আরেকটি গ্রেনেড ছুড়ে দেন এবং সাবমেশিনগান থেকে গুলি চালাতে চালাতে নিজেই বাঙ্কারের ভেতরে ঢুকে পড়েন। ভেতরে থাকা সবাইকে তিনি হত্যা করেন।

Ten Days at Aschaffenburg - Warfare History Network

১২ ঘণ্টার ভয়াবহ লড়াই

এতক্ষণে দুর্গের জার্মান সৈনিকেরা বুঝতে পারে যে ‘সি’ কোম্পানির সদস্যরা তাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানের একেবারে কাছে পৌঁছে গেছে।

শুরু হয় প্রচণ্ড মেশিনগানের গুলি ও কামানের গোলাবর্ষণ।

এর ফলে কোম্পানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সৈনিক নিহত অথবা আহত হন।

পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে ক্যাপ্টেন জন রানিয়ন দুই ভাগে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন।

রানিয়ন কোম্পানির অর্ধেক সদস্যকে নিয়ে প্রথমে সরে যান। বেকার ও বাকি অর্ধেক সৈনিকের দায়িত্ব ছিল শত্রুর গুলি নিজেদের দিকে টেনে রেখে প্রথম দলকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়েছিল।

বেকার তখনকার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, তাদের কাছে কোনো নির্দেশ ছিল না, কোনো শক্তিবৃদ্ধি ছিল না, নতুন সরবরাহ ছিল না, কামানের সহায়তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাদের কোনো পর্যবেক্ষক ছিল না, এমনকি কোনো রেডিওও ছিল না।

তার ভাষায়, তারা কার্যত কোনো নির্দেশনা, শক্তিবৃদ্ধি, পুনরায় সরবরাহ, কামানের সহায়তা, পর্যবেক্ষক কিংবা রেডিও যোগাযোগ ছাড়াই লড়াই করছিলেন।

তারপরও বেকার নিজের সৈনিকদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে থাকেন।

ক্যাপ্টেন রানিয়ন ও তার দলের পিছু হটা নিশ্চিত করার পর বেকার নিজের দলের সৈনিকদের পাহাড় থেকে নিচে নামার নির্দেশ দেন।

পিছু হটার সময় তিনি আরও দুটি মেশিনগান অবস্থান গ্রেনেড দিয়ে ধ্বংস করেন।

বারবার তিনি নিজের দিকে শত্রুর গুলি টেনে আনেন, যাতে তার সৈনিকেরা নিরাপদে সরে যেতে পারেন।

পরে বেকার বলেছিলেন, তার লোকেরা সেখানে থেকে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন অন্তত তাদের কিছু মানুষ যেন জীবিত ফিরে যেতে পারে।

১২ ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে ‘সি’ কোম্পানির ২৫ জন সৈনিকের মধ্যে ১৯ জন নিহত হন।

বেকার একাই তিনটি মেশিনগান ঘাঁটি, একটি পর্যবেক্ষণ পোস্ট ও একটি বাঙ্কার ধ্বংস করেছিলেন। তিনি নয়জন জার্মান সৈনিককেও হত্যা করেছিলেন।

দুর্গ দখলে আবার স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব

Black soldier awarded medal of honor decades later

পরের সন্ধ্যায় বেকার আবার স্বেচ্ছায় একটি দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব নেন।

৪৭৩তম পদাতিক রেজিমেন্টের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আবার ক্যাসল আগিনলফির দিকে এগিয়ে যান।

এই আক্রমণ সফল হয় এবং দুর্গটি শেষ পর্যন্ত দখল করা সম্ভব হয়।

বেকার এবং কৃষ্ণাঙ্গ ৯২তম ডিভিশনের অন্যান্য সৈনিকেরা গথিক লাইনে যে ফাঁক তৈরি করেছিলেন, তা জার্মান প্রতিরক্ষাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়।

এরপর ৯২তম ডিভিশনের সৈনিকেরা প্রায় ১০০ মাইল বা ১৬০ কিলোমিটার পথ ধরে পিছু হটতে থাকা জার্মান বাহিনীকে চাপের মধ্যে রাখেন।

শেষ পর্যন্ত জার্মান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

প্রথম স্বীকৃতিও ছিল বৈষম্যে ভরা

ক্যাসল আগিনলফিতে বেকারের বীরত্বের জন্য ক্যাপ্টেন জন রানিয়ন তাকে ‘ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস ক্রস’-এর জন্য সুপারিশ করেন।

১৯৪৫ সালের ৪ জুলাই ইতালির ভিয়ারেজ্জিওতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বেকার এই পদক গ্রহণ করেন।

কিন্তু সেখানেও বর্ণবৈষম্যের চিত্র দেখা যায়।

বেকারের চেয়ে কম মর্যাদার সামরিক পদক পাওয়া শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের সম্মানজনক স্থানে বসানো হয়েছিল।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বেকার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী ছাড়েননি।

তিনি ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইতালিতে দখল-পরবর্তী দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৮ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান নির্বাহী আদেশ ৯৯৮১ জারি করে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে বর্ণভিত্তিক বিভাজনের অবসান ঘটান।

এরপর বেকার কোরিয়ায় দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি একটি আকাশপথে অবতরণকারী ডিভিশনের কোম্পানির নেতৃত্ব দেন।

পরে তিনি আরও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৮ সালে সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেন।

কেন এত বছর ‘মেডেল অব অনার’ দেওয়া হয়নি?

বেকারের বীরত্বের স্বীকৃতি অবশ্য তখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোনো কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিককে কেন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘মেডেল অব অনার’ দেওয়া হয়নি—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ একটি বিশেষ তদন্ত পরিচালনা করে।

তদন্তে সরাসরি বৈষম্যের নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর ভেতরে বিদ্যমান বর্ণবাদী পরিবেশ কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের যথাযথভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল।

ইতিহাসবিদেরা এরপর ১০ জন কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকের নাম সামনে আনেন, যারা ‘মেডেল অব অনার’ পাওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেছিলেন।

মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি বোর্ড তাদের মধ্যে সাতজনকে এই সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানের জন্য যোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

এই সাতজনের মধ্যে ভার্নন বেকারই তখন জীবিত ছিলেন।

৫০ বছরেরও বেশি অপেক্ষার পর সর্বোচ্চ সম্মান

আগিনলফির সেই ভয়াবহ যুদ্ধের ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর অবশেষে বেকারের বীরত্বের যথাযথ স্বীকৃতি আসে।

File:Clinton congratulates Medal of Honor recipient Vernon Baker.jpg -  Wikimedia Commons

১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ভার্নন বেকারের হাতে ‘মেডেল অব অনার’ তুলে দেন।

এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীরত্বের জন্য জীবিত কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন প্রবীণদের মধ্যে তিনি এই সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

তার সম্মাননাপত্রে বলা হয়, লেফটেন্যান্ট বেকার অসাধারণ সাহস ও নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। তার যুদ্ধস্পৃহা ও সাহসী নেতৃত্ব তার সৈনিকদের অনুপ্রাণিত করেছিল এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ ঐতিহ্যের উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু এত বছর পর পাওয়া সর্বোচ্চ সম্মানও বেকার নিজের জন্য পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেননি।

তিনি নিজের বীরত্বের কথা সামনে না এনে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারানো ১৯ সহযোদ্ধার কথা স্মরণ করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, তিনি চান সেই ১৯ জন সৈনিক তার পেছনে বসে থাকুক। কারণ তারাই সেখানে থাকার যোগ্য ছিল।

ভার্নন বেকারের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এখানেই।

যে সেনাবাহিনীতে একসময় তার গায়ের রঙের কারণে তাকে পরিবহনের পেছনের আসনে বসতে বাধ্য করা হয়েছিল, যে সেনাবাহিনীতে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের জার্মান যুদ্ধবন্দীদের চেয়েও কম সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, সেই সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান শেষ পর্যন্ত তার বুকে স্থান পেয়েছিল।

কিন্তু বেকার নিজের সম্মানের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন সেই ১৯ জনকে, যারা ক্যাসল আগিনলফির পাহাড়ে তার সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

তার গল্প তাই শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস নয়। এটি একই সঙ্গে সামরিক সাহস, নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ, সহযোদ্ধাদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ নীরব লড়াইয়ের ইতিহাস।

ভার্নন বেকার দেখিয়ে দিয়েছিলেন, একজন সৈনিকের গায়ের রঙ তার সাহসের সীমা নির্ধারণ করতে পারে না। ইতিহাস হয়তো তার স্বীকৃতি দিতে ৫০ বছরের বেশি সময় নিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার বীরত্বকে মুছে ফেলতে পারেনি।

বেকারের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—যে সম্মান একজন সৈনিক নিজের জন্য অর্জন করেন, সেটি শুধু তার নিজের নয়; অনেক সময় সেই সম্মানের পেছনে থাকে এমন মানুষদের আত্মত্যাগ, যারা আর ফিরে এসে নিজেদের গল্প বলতে পারেননি।

বেকার সেই কারণেই নিজের পদকের দিকে তাকানোর বদলে বারবার ফিরে তাকিয়েছিলেন সেই ১৯ জনের দিকে।

মেডেল অব অনার পাওয়া ভার্নন বেকারের জীবন, ইতালির ক্যাসল আগিনলফির ১২ ঘণ্টার যুদ্ধ, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তার লড়াই এবং ৫০ বছর পর পাওয়া স্বীকৃতির ইতিহাস।

Vernon J. Baker — Badass of the Week

ভার্নন বেকার ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের বীরত্ব

যে সেনাবাহিনীতে গায়ের রঙের কারণে তাকে পেছনের আসনে বসানো হয়েছিল, সেই সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানই শেষ পর্যন্ত উঠেছিল ভার্নন বেকারের বুকে।

১৯৪৫ সালের ইতালিতে মাত্র ২৫ জন সৈনিকের একটি দল নিয়ে ক্যাসল আগিনলফির জার্মান দুর্গের সামনে লড়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট বেকার। ১২ ঘণ্টার যুদ্ধে তিনি একাই তিনটি মেশিনগান ঘাঁটি, একটি পর্যবেক্ষণ পোস্ট ও একটি বাঙ্কার ধ্বংস করেন এবং নয়জন জার্মান সৈনিককে হত্যা করেন। নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরিয়ে দিতে বারবার নিজের দিকে শত্রুর গুলি টেনে নেন।

সেদিন তার ২৫ জনের দলের ১৯ জনই নিহত হন।

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্বের স্বীকৃতি তিনি সঙ্গে সঙ্গে পাননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর, ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাকে ‘মেডেল অব অনার’ প্রদান করেন।

সবচেয়ে আবেগময় বিষয় হলো, সম্মান পাওয়ার পরও বেকার নিজের কথা বলেননি। তিনি চেয়েছিলেন সেই ১৯ জন সহযোদ্ধা তার পেছনে বসে থাকুক—কারণ তারাই সেখানে থাকার যোগ্য ছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

টরন্টোর ফ্যাশন সপ্তাহে নতুন দিগন্ত, কানাডীয় নকশায় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত

বর্ণবাদের দেয়াল ভেঙে যুদ্ধের ময়দানে বীরত্ব, ৫০ বছর পর সর্বোচ্চ সম্মান পেলেন ভার্নন বেকার

০২:১১:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

১৯৪৫ সালের ইতালির রণক্ষেত্রে মাত্র ২৫ জন সৈনিকের একটি দল নিয়ে জার্মান দুর্গের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী এক কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন কর্মকর্তা। ১২ ঘণ্টার ভয়াবহ গোলাগুলির মধ্যে তিনি একের পর এক মেশিনগান ঘাঁটি, পর্যবেক্ষণ পোস্ট ও বাঙ্কার ধ্বংস করেন, নয়জন জার্মান সৈনিককে হত্যা করেন এবং নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরিয়ে আনেন। অথচ তার বীরত্বের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়। তিনি লেফটেন্যান্ট ভার্নন বেকার—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য জীবিত কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন প্রবীণদের মধ্যে ‘মেডেল অব অনার’ পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি।

যুদ্ধ ছিল দুটি ফ্রন্টে

ভার্নন বেকার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেওয়া অন্যান্য কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সৈনিকের যুদ্ধ ছিল আসলে দুটি ফ্রন্টে। একদিকে তাদের লড়াই করতে হয়েছিল জার্মানি, ইতালি ও জাপানের নেতৃত্বাধীন অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে। অন্যদিকে নিজেদের দেশের সেনাবাহিনীর ভেতরেই তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছিল বর্ণবাদ, বৈষম্য ও অপমানের।

১৯৪৫ সালের ৫ এপ্রিল সকাল ৭টার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭০তম পদাতিক রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়নের ‘সি’ কোম্পানির একটি প্লাটুন উত্তর ইতালির ক্যাসল আগিনলফির জার্মান শক্ত ঘাঁটি থেকে মাত্র কয়েকশ ফুট দূরে অবস্থান নিয়েছিল। মিত্রবাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল ইতালি থেকে জার্মান বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে বিতাড়িত করা।

মাত্র ২৫ জনের এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট ভার্নন বেকার। দিনের শেষে তিনি একাই বেশ কয়েকটি জার্মান মেশিনগান ঘাঁটি ও বাঙ্কার ধ্বংস করবেন, শত্রু সৈনিকদের হত্যা করবেন এবং নিজের লোকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য জীবন বাজি রাখবেন।

কিন্তু এই যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পথও বেকারের জন্য সহজ ছিল না।

After 50 years, this WWII soldier finally received his Medal of Honor

সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে গিয়েও প্রত্যাখ্যাত

ভার্নন বেকার ১৯১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যের শেয়েনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে উচ্চবিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি রেলওয়ের মালবাহকসহ বিভিন্ন সাধারণ ও স্বল্পমজুরির কাজ করেন। এসব কাজে তিনি খুব একটা আনন্দ খুঁজে পাননি।

সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে মানুষের সেবা করার মাধ্যমে নিজের জীবনে একটি উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়ার আশা করেছিলেন তিনি। সেই উদ্দেশ্যে ১৯৪১ সালের এপ্রিল মাসে মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রথমবারই তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়।

সেনাবাহিনীর একজন নিয়োগকারী তাকে বলেছিলেন, ‘তোমাদের লোকদের জন্য আমাদের কোনো কোটা নেই।’

কথাটি তাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। একই বছরের জুন মাসে তিনি অন্য একজন নিয়োগকারীর কাছে আবার আবেদন করেন। এবার তাকে গ্রহণ করা হয়।

বেকার চেয়েছিলেন কোয়ার্টারমাস্টার বা সরবরাহ বিভাগে কাজ করতে। কিন্তু তার সেই অনুরোধ উপেক্ষা করা হয় এবং তাকে পদাতিক বাহিনীতে পাঠানো হয়।

টেক্সাসের ক্যাম্প ওয়াল্টার্সে প্রাথমিক সামরিক প্রশিক্ষণ শেষ করার পর তাকে ২৫তম পদাতিক রেজিমেন্টে নিয়োগ দেওয়া হয়। গৃহযুদ্ধের পর আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে পরিচালিত সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার কারণে এই রেজিমেন্ট ‘বাফেলো সোলজার্স’ নামে পরিচিত ছিল।

কর্মকর্তা হওয়ার সুযোগ

১৯৪২ সালের অক্টোবরে অ্যারিজোনার ফোর্ট হুয়াচুকায় দায়িত্ব পালনের সময় বেকার ইতোমধ্যে একজন সরবরাহ সার্জেন্ট। বন্ধুবৎসল, নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল সৈনিক হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেছিলেন।

তাই তাকে সম্ভাব্য অফিসার প্রার্থী হিসেবে বাছাই করা হয়।

বেকার অবশ্য বিষয়টি নিয়ে খুব একটা উচ্ছ্বসিত ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, নিজের বর্তমান অবস্থানেই তিনি বেশ ভালো আছেন এবং তার ভাষায়, তখন তার মনে হয়েছিল ‘সবকিছুই ঠিকঠাক হয়ে গেছে’।

Review of troops at Fort Benning, Georgia circa 1942-43 | The Digital  Collections of the National WWII Museum : Oral Histories

তারপরও তিনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে যোগ দেন। জর্জিয়ার ফোর্ট বেনিংয়ে ১৩ সপ্তাহের অফিসার প্রশিক্ষণ শেষ করার পর ১৯৪৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন পান।

এরপর তাকে ৩৭০তম পদাতিক রেজিমেন্টের একটি অস্ত্র প্লাটুনের নেতৃত্ব দেওয়া হয়।

তবে তিনি যে রেজিমেন্টেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেগুলো সামরিক আইনের অধীনে বর্ণভিত্তিকভাবে পৃথক রাখা হয়েছিল।

একদিকে দেশ, অন্যদিকে নিজের দেশের বৈষম্য

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১০ লাখেরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ নারী ও পুরুষ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রতিটি শাখায় কাজ করেছিলেন।

কিন্তু তাদের সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ সৈনিকদের মতো সমান আচরণ করা হতো না।

সেনাবাহিনীতে বর্ণবৈষম্য ছিল সর্বত্র। প্যারেড, গির্জা, খাবারের স্থান, পরিবহন—সব জায়গাতেই কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের আলাদা রাখা হতো।

পরিস্থিতি এতটাই বৈষম্যমূলক ছিল যে জার্মান যুদ্ধবন্দীদের এমন কিছু স্থাপনায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হতো, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সৈনিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না।

সেন্ট লুইসে একজন শ্বেতাঙ্গ লেফটেন্যান্ট কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন সৈনিকদের একটি রেলগাড়ির সামনের আসন ছেড়ে ইতালীয় যুদ্ধবন্দীদের বসার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

বেকার নিজেও সেনাবাহিনীতে প্রবেশের প্রথম দিন থেকেই এই বৈষম্যের শিকার হন। দক্ষিণাঞ্চলে প্রশিক্ষণে পৌঁছানোর সময় তাকে পরিবহনের পেছনের দিকে বসতে বাধ্য করা হয়েছিল।

কৃষ্ণাঙ্গ রেজিমেন্টগুলোকে বিদেশে পাঠানো বা সরাসরি যুদ্ধ করার সুযোগও দেওয়া হতো না। তাদের মূলত সামরিক ঘাঁটির সহায়ক কাজে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল।

এই বাস্তবতা কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের মধ্যে এক গভীর মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল। তারা যে দেশের জন্য লড়ছিল, সেই দেশই তাদের সমান নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করছিল না।

বেকার পরে এই অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রই ছিল তার একমাত্র দেশ। তিনি এমন মানুষদের রক্ষা করছিলেন যারা তাকে পছন্দ করত না, কিন্তু তার যাওয়ার মতো অন্য কোনো জায়গাও ছিল না।

Allied invasion of Sicily | Significance, Summary, & Map | Britannica

ইতালির যুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের প্রয়োজন

১৯৪৩ সালের সেপ্টেম্বরে মিত্রবাহিনী ইতালির মূল ভূখণ্ডে অভিযান শুরু করে। অক্টোবরে নেপলস দখল করা হয় এবং পরের বছরের জুনে রোমও মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে।

পিছু হটতে থাকা জার্মান বাহিনী উত্তর ইতালির পাহাড়জুড়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এটি পরিচিত হয় ‘গথিক লাইন’ নামে।

পশ্চিম উপকূলের লা স্পেজিয়া থেকে অ্যাড্রিয়াটিক উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙা মিত্রবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৪৪ সালের আগস্টে বেকার নেপলসে পৌঁছানোর সময় পাহাড়ি অঞ্চল দখলের চেষ্টা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম সেনাবাহিনী প্রায় অর্ধেক শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল।

ফ্রান্স ও ইতালিতে মিত্রবাহিনীর যুদ্ধ যত তীব্র হতে থাকে, সম্মুখসারির পদাতিক ইউনিটগুলোর ক্ষয়ক্ষতিও তত বাড়তে থাকে। নতুন সৈনিকের প্রয়োজন জরুরি হয়ে পড়ে।

তখন মিত্রবাহিনী বুঝতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক ঘাঁটিতে থাকা কয়েক লাখ কৃষ্ণাঙ্গ পদাতিক সৈনিককে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

১৯৪৪ সালের ১৫ জুলাই বেকারসহ প্রায় ৭ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিক ‘এসএস মারিপোসা’ জাহাজে করে ইতালির উদ্দেশে রওনা হন। তাদের লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া।

প্রথম বড় লড়াই

১৯৪৪ সালের ৮ অক্টোবর বেকার ও তার কোম্পানিকে সেরাভেজ্জার একটি পাহাড়ের ঢালে থাকা জার্মান-নিয়ন্ত্রিত একটি বাড়িতে আক্রমণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাড়িটির ভেতরে থাকা পাঁচজন জার্মান সৈনিককে বেকার হত্যা করেন। এ সময় তার অন্য সৈনিকেরা কাছের একটি জার্মান মেশিনগান ঘাঁটির দিকে শত্রুর গুলি টেনে নেওয়ার জন্য বিভ্রান্তিমূলক অভিযান চালাচ্ছিলেন।

এই লড়াইয়ে দুইজন মার্কিন সৈনিক নিহত হন।

বেকার নিজেও গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু সে সময় তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেননি। ঘাঁটিতে ফিরে আসার পর তিনি বুঝতে পারেন যে তার হাতে গুলি লেগেছে।

পরবর্তী দুই মাস তিনি পিসার কাছে একটি সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

Invasion of the Soviet Union – The Holocaust Explained: Designed for schools

সুস্থ হয়ে দায়িত্বে ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, জার্মান বাহিনীকে ইতালি থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার জন্য মিত্রবাহিনী একটি বড় ধরনের নতুন অভিযান প্রস্তুত করছে।

এই অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সেকেন্ড উইন্ড’।

পরের বসন্তে ৯২তম পদাতিক ডিভিশন, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল বেকারের ৩৭০তম রেজিমেন্ট, মাসার কাছে গথিক লাইন ভেঙে দেওয়ার অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়।

এই অভিযানে কাছাকাছি অবস্থিত শক্তিশালী ক্যাসল আগিনলফি দখল করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ক্যাসল আগিনলফির দিকে অগ্রযাত্রা

১৯৪৫ সালের ৫ এপ্রিল ভোর ৫টায় ক্যাসল আগিনলফির বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়।

বেকারের ‘সি’ কোম্পানির প্রায় ৭০ শতাংশ সৈনিকই ছিলেন নতুন এবং যুদ্ধের অভিজ্ঞতাহীন। তারপরও তারা দ্রুত এগিয়ে যেতে সক্ষম হন।

মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে তারা দুর্গ থেকে প্রায় ৭৫০ ফুট বা ২৩০ মিটার দূরে পৌঁছে যায়।

সেখানে বেকার পাহাড়ের একটি সরু ফাঁক দিয়ে দুটি রাইফেলের নল বেরিয়ে থাকতে দেখেন।

তিনি একাই এগিয়ে গিয়ে নিজের এম-১ রাইফেলটি সেই ফাঁকের ভেতর ঢুকিয়ে গুলি চালান। এতে দুই জার্মান সৈনিক নিহত হয়।

এর কিছুক্ষণ পর তিনি ছদ্মবেশে লুকিয়ে রাখা একটি মেশিনগান ঘাঁটির প্রবেশপথ খুঁজে পান।

ভেতরে থাকা দুই জার্মান সৈনিক তখন সকালের খাবার খাচ্ছিল। বেকারের আকস্মিক উপস্থিতিতে তারা হতভম্ব হয়ে যায়। তিনি দুজনকেই গুলি করে হত্যা করেন।

এরপর ‘সি’ কোম্পানির শ্বেতাঙ্গ কমান্ডার ক্যাপ্টেন জন রানিয়ন সেখানে পৌঁছান।

ঠিক তখনই জার্মান বাহিনী দুই কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে একটি গ্রেনেড ছোড়ে। সৌভাগ্যক্রমে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়নি।

বেকার দুইটি গুলি করে শত্রু সৈনিককে হত্যা করেন।

এরপর তিনি একটি লুকানো বাঙ্কারের আরেকটি প্রবেশপথ খুঁজে পান।

বেকার ভেতরে একটি হাতবোমা ছুড়ে দেন। বিস্ফোরণের পর একজন জার্মান সৈনিক দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলে তাকে গুলি করে হত্যা করেন।

তারপর তিনি আরেকটি গ্রেনেড ছুড়ে দেন এবং সাবমেশিনগান থেকে গুলি চালাতে চালাতে নিজেই বাঙ্কারের ভেতরে ঢুকে পড়েন। ভেতরে থাকা সবাইকে তিনি হত্যা করেন।

Ten Days at Aschaffenburg - Warfare History Network

১২ ঘণ্টার ভয়াবহ লড়াই

এতক্ষণে দুর্গের জার্মান সৈনিকেরা বুঝতে পারে যে ‘সি’ কোম্পানির সদস্যরা তাদের প্রতিরক্ষা অবস্থানের একেবারে কাছে পৌঁছে গেছে।

শুরু হয় প্রচণ্ড মেশিনগানের গুলি ও কামানের গোলাবর্ষণ।

এর ফলে কোম্পানির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সৈনিক নিহত অথবা আহত হন।

পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে ক্যাপ্টেন জন রানিয়ন দুই ভাগে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন।

রানিয়ন কোম্পানির অর্ধেক সদস্যকে নিয়ে প্রথমে সরে যান। বেকার ও বাকি অর্ধেক সৈনিকের দায়িত্ব ছিল শত্রুর গুলি নিজেদের দিকে টেনে রেখে প্রথম দলকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।

পরবর্তীতে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা হয়েছিল।

বেকার তখনকার পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, তাদের কাছে কোনো নির্দেশ ছিল না, কোনো শক্তিবৃদ্ধি ছিল না, নতুন সরবরাহ ছিল না, কামানের সহায়তাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাদের কোনো পর্যবেক্ষক ছিল না, এমনকি কোনো রেডিওও ছিল না।

তার ভাষায়, তারা কার্যত কোনো নির্দেশনা, শক্তিবৃদ্ধি, পুনরায় সরবরাহ, কামানের সহায়তা, পর্যবেক্ষক কিংবা রেডিও যোগাযোগ ছাড়াই লড়াই করছিলেন।

তারপরও বেকার নিজের সৈনিকদের সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে থাকেন।

ক্যাপ্টেন রানিয়ন ও তার দলের পিছু হটা নিশ্চিত করার পর বেকার নিজের দলের সৈনিকদের পাহাড় থেকে নিচে নামার নির্দেশ দেন।

পিছু হটার সময় তিনি আরও দুটি মেশিনগান অবস্থান গ্রেনেড দিয়ে ধ্বংস করেন।

বারবার তিনি নিজের দিকে শত্রুর গুলি টেনে আনেন, যাতে তার সৈনিকেরা নিরাপদে সরে যেতে পারেন।

পরে বেকার বলেছিলেন, তার লোকেরা সেখানে থেকে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন অন্তত তাদের কিছু মানুষ যেন জীবিত ফিরে যেতে পারে।

১২ ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে ‘সি’ কোম্পানির ২৫ জন সৈনিকের মধ্যে ১৯ জন নিহত হন।

বেকার একাই তিনটি মেশিনগান ঘাঁটি, একটি পর্যবেক্ষণ পোস্ট ও একটি বাঙ্কার ধ্বংস করেছিলেন। তিনি নয়জন জার্মান সৈনিককেও হত্যা করেছিলেন।

দুর্গ দখলে আবার স্বেচ্ছায় নেতৃত্ব

Black soldier awarded medal of honor decades later

পরের সন্ধ্যায় বেকার আবার স্বেচ্ছায় একটি দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব নেন।

৪৭৩তম পদাতিক রেজিমেন্টের একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে তিনি আবার ক্যাসল আগিনলফির দিকে এগিয়ে যান।

এই আক্রমণ সফল হয় এবং দুর্গটি শেষ পর্যন্ত দখল করা সম্ভব হয়।

বেকার এবং কৃষ্ণাঙ্গ ৯২তম ডিভিশনের অন্যান্য সৈনিকেরা গথিক লাইনে যে ফাঁক তৈরি করেছিলেন, তা জার্মান প্রতিরক্ষাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়।

এরপর ৯২তম ডিভিশনের সৈনিকেরা প্রায় ১০০ মাইল বা ১৬০ কিলোমিটার পথ ধরে পিছু হটতে থাকা জার্মান বাহিনীকে চাপের মধ্যে রাখেন।

শেষ পর্যন্ত জার্মান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।

প্রথম স্বীকৃতিও ছিল বৈষম্যে ভরা

ক্যাসল আগিনলফিতে বেকারের বীরত্বের জন্য ক্যাপ্টেন জন রানিয়ন তাকে ‘ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস ক্রস’-এর জন্য সুপারিশ করেন।

১৯৪৫ সালের ৪ জুলাই ইতালির ভিয়ারেজ্জিওতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বেকার এই পদক গ্রহণ করেন।

কিন্তু সেখানেও বর্ণবৈষম্যের চিত্র দেখা যায়।

বেকারের চেয়ে কম মর্যাদার সামরিক পদক পাওয়া শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাদের সম্মানজনক স্থানে বসানো হয়েছিল।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বেকার সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী ছাড়েননি।

তিনি ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইতালিতে দখল-পরবর্তী দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৮ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান নির্বাহী আদেশ ৯৯৮১ জারি করে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে বর্ণভিত্তিক বিভাজনের অবসান ঘটান।

এরপর বেকার কোরিয়ায় দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি একটি আকাশপথে অবতরণকারী ডিভিশনের কোম্পানির নেতৃত্ব দেন।

পরে তিনি আরও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৬৮ সালে সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেন।

কেন এত বছর ‘মেডেল অব অনার’ দেওয়া হয়নি?

বেকারের বীরত্বের স্বীকৃতি অবশ্য তখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কোনো কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিককে কেন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান ‘মেডেল অব অনার’ দেওয়া হয়নি—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ একটি বিশেষ তদন্ত পরিচালনা করে।

তদন্তে সরাসরি বৈষম্যের নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর ভেতরে বিদ্যমান বর্ণবাদী পরিবেশ কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের যথাযথভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল।

ইতিহাসবিদেরা এরপর ১০ জন কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকের নাম সামনে আনেন, যারা ‘মেডেল অব অনার’ পাওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেছিলেন।

মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি বোর্ড তাদের মধ্যে সাতজনকে এই সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানের জন্য যোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নেয়।

এই সাতজনের মধ্যে ভার্নন বেকারই তখন জীবিত ছিলেন।

৫০ বছরেরও বেশি অপেক্ষার পর সর্বোচ্চ সম্মান

আগিনলফির সেই ভয়াবহ যুদ্ধের ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর অবশেষে বেকারের বীরত্বের যথাযথ স্বীকৃতি আসে।

File:Clinton congratulates Medal of Honor recipient Vernon Baker.jpg -  Wikimedia Commons

১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ভার্নন বেকারের হাতে ‘মেডেল অব অনার’ তুলে দেন।

এর মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীরত্বের জন্য জীবিত কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন প্রবীণদের মধ্যে তিনি এই সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান পাওয়া একমাত্র ব্যক্তি হয়ে ওঠেন।

তার সম্মাননাপত্রে বলা হয়, লেফটেন্যান্ট বেকার অসাধারণ সাহস ও নেতৃত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। তার যুদ্ধস্পৃহা ও সাহসী নেতৃত্ব তার সৈনিকদের অনুপ্রাণিত করেছিল এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ ঐতিহ্যের উদাহরণ হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু এত বছর পর পাওয়া সর্বোচ্চ সম্মানও বেকার নিজের জন্য পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেননি।

তিনি নিজের বীরত্বের কথা সামনে না এনে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ হারানো ১৯ সহযোদ্ধার কথা স্মরণ করেছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, তিনি চান সেই ১৯ জন সৈনিক তার পেছনে বসে থাকুক। কারণ তারাই সেখানে থাকার যোগ্য ছিল।

ভার্নন বেকারের জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এখানেই।

যে সেনাবাহিনীতে একসময় তার গায়ের রঙের কারণে তাকে পরিবহনের পেছনের আসনে বসতে বাধ্য করা হয়েছিল, যে সেনাবাহিনীতে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের জার্মান যুদ্ধবন্দীদের চেয়েও কম সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, সেই সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান শেষ পর্যন্ত তার বুকে স্থান পেয়েছিল।

কিন্তু বেকার নিজের সম্মানের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন সেই ১৯ জনকে, যারা ক্যাসল আগিনলফির পাহাড়ে তার সঙ্গে লড়াই করে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

তার গল্প তাই শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ইতিহাস নয়। এটি একই সঙ্গে সামরিক সাহস, নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ, সহযোদ্ধাদের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ নীরব লড়াইয়ের ইতিহাস।

ভার্নন বেকার দেখিয়ে দিয়েছিলেন, একজন সৈনিকের গায়ের রঙ তার সাহসের সীমা নির্ধারণ করতে পারে না। ইতিহাস হয়তো তার স্বীকৃতি দিতে ৫০ বছরের বেশি সময় নিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার বীরত্বকে মুছে ফেলতে পারেনি।

বেকারের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—যে সম্মান একজন সৈনিক নিজের জন্য অর্জন করেন, সেটি শুধু তার নিজের নয়; অনেক সময় সেই সম্মানের পেছনে থাকে এমন মানুষদের আত্মত্যাগ, যারা আর ফিরে এসে নিজেদের গল্প বলতে পারেননি।

বেকার সেই কারণেই নিজের পদকের দিকে তাকানোর বদলে বারবার ফিরে তাকিয়েছিলেন সেই ১৯ জনের দিকে।

মেডেল অব অনার পাওয়া ভার্নন বেকারের জীবন, ইতালির ক্যাসল আগিনলফির ১২ ঘণ্টার যুদ্ধ, বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তার লড়াই এবং ৫০ বছর পর পাওয়া স্বীকৃতির ইতিহাস।

Vernon J. Baker — Badass of the Week

ভার্নন বেকার ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের বীরত্ব

যে সেনাবাহিনীতে গায়ের রঙের কারণে তাকে পেছনের আসনে বসানো হয়েছিল, সেই সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক সম্মানই শেষ পর্যন্ত উঠেছিল ভার্নন বেকারের বুকে।

১৯৪৫ সালের ইতালিতে মাত্র ২৫ জন সৈনিকের একটি দল নিয়ে ক্যাসল আগিনলফির জার্মান দুর্গের সামনে লড়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট বেকার। ১২ ঘণ্টার যুদ্ধে তিনি একাই তিনটি মেশিনগান ঘাঁটি, একটি পর্যবেক্ষণ পোস্ট ও একটি বাঙ্কার ধ্বংস করেন এবং নয়জন জার্মান সৈনিককে হত্যা করেন। নিজের সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরিয়ে দিতে বারবার নিজের দিকে শত্রুর গুলি টেনে নেন।

সেদিন তার ২৫ জনের দলের ১৯ জনই নিহত হন।

কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বীরত্বের স্বীকৃতি তিনি সঙ্গে সঙ্গে পাননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর, ১৯৯৭ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন তাকে ‘মেডেল অব অনার’ প্রদান করেন।

সবচেয়ে আবেগময় বিষয় হলো, সম্মান পাওয়ার পরও বেকার নিজের কথা বলেননি। তিনি চেয়েছিলেন সেই ১৯ জন সহযোদ্ধা তার পেছনে বসে থাকুক—কারণ তারাই সেখানে থাকার যোগ্য ছিল।