দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ‘লন্ডন ব্লিটজ’-এর সময় জার্মান বিমানবাহিনীর বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে লন্ডনকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন মেজর ফ্র্যাঙ্ক হুইটফোর্ড ‘জেন্টলম্যান’ জ্যাকসন। সেই যুদ্ধস্মৃতি বহনকারী তাঁর পদকসমষ্টি সম্প্রতি নিলামে বিক্রি হয়েছে ১৬ হাজার পাউন্ডে। তাঁর নাতি-নাতনিরা এই বিক্রির অর্থ দমকলকর্মীদের কল্যাণে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জ্যাকসন ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একজন প্রবীণ সেনা কর্মকর্তা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি লন্ডন ফায়ার ব্রিগেডের নেতৃত্ব দেন। জার্মান বিমানবাহিনী যখন ধারাবাহিকভাবে লন্ডনে বোমা ফেলছিল, তখন শহরের হাজার হাজার অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় দমকল বাহিনীর বিশাল কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর।
তাঁর বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ‘কম্প্যানিয়ন অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ বা সিবিই সম্মাননা দেওয়া হয়। সেই সম্মাননার নথিতে জ্যাকসনের দায়িত্বকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধরনের কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, লন্ডনের বড় অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্র থেকে শুরু করে শহরের সবচেয়ে ছোট ইউনিটসহ প্রায় ৩ হাজার অগ্নিনির্বাপক যানের ব্যবহার ও পরিচালনার মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল তাঁর হাতে।
ব্লিটজে আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ
লন্ডন ফায়ার ব্রিগেডের সঙ্গে সহায়ক অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর সদস্যরাও ব্লিটজ চলাকালে জার্মান বোমাবর্ষণে সৃষ্ট আগুন ও ভয়াবহ অগ্নিঝড় মোকাবিলা করতেন। ব্লিটজের প্রথম ২২ দিনেই তারা প্রায় ১০ হাজার অগ্নিকাণ্ডে সাড়া দিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
এই ভয়াবহ অভিযানে লন্ডনের মোট ৩২৭ জন দমকলকর্মী প্রাণ হারান। একক কোনো ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে ১৯৪১ সালের এপ্রিলে। পপলারের ওল্ড প্যালেস স্কুলের একটি দমকল উপকেন্দ্রে ভয়াবহ আগুন মোকাবিলার সময় ৩৪ জন দমকলকর্মী নিহত হন।
তবে জ্যাকসনের নেতৃত্বের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি ছিল ১৯৪০ সালের ২৯ ডিসেম্বরের রাত।
‘লন্ডনের দ্বিতীয় মহাঅগ্নিকাণ্ড’
১৯৪০ সালের ২৯ ডিসেম্বরের রাতটি ইতিহাসে ‘লন্ডনের দ্বিতীয় মহাঅগ্নিকাণ্ড’ নামে পরিচিত হয়ে আছে। ওই রাতে জার্মান বিমানবাহিনী বিপুল পরিমাণ অগ্নিসংযোগকারী বোমা ফেলে। ধারণা করা হয়, সেদিন লন্ডনের ওপর প্রায় ১ লাখ বোমা পড়েছিল।
ভয়াবহ বোমাবর্ষণের মধ্যে একটি অগ্নিসংযোগকারী বোমা সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালের গম্বুজ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঐতিহাসিক এই স্থাপনা আগুনে পুড়ে ধ্বংস হলে মানুষের মনোবল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল ব্রিটিশ নেতৃত্বের।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল জ্যাকসনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেকোনো মূল্যে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালকে রক্ষা করতে হবে।
চারপাশে আগুন, ধ্বংসস্তূপ আর অবিরাম বোমাবর্ষণের মধ্যেও জ্যাকসন ও তাঁর দমকলকর্মীরা ক্যাথেড্রালটির দিকে ছড়িয়ে পড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখেন। শেষ পর্যন্ত সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে সামান্যই ছিল।
তবে সেই রাতের লড়াইয়ের মূল্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। লন্ডন ফায়ার ব্রিগেডের ১৬ জন সদস্য প্রাণ হারান এবং আরও প্রায় ৩৫০ জন গুরুতর আহত হন।
যুদ্ধের পরও থামেনি তাঁর স্মৃতি
জ্যাকসন ১৯৫১ সালে দমকল বাহিনী থেকে অবসর নেন। এর চার বছর পর ১৯৫৫ সালে ৬৮ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তাঁকে হাইগেট কবরস্থানের ‘ফায়ারম্যানস কর্নার’-এ সমাহিত করা হয়। সেখানে সমাহিত হওয়া তিনিই ছিলেন সর্বশেষ দমকলকর্মী।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই ভয়াবহ সময়ের স্মৃতি বহনকারী তাঁর পদকসমষ্টি পরে নিলামে তোলা হয়। লন্ডনের নিলাম প্রতিষ্ঠান নুনানস মেফেয়ারে এটি ১৬ হাজার পাউন্ডে বিক্রি হয়।
এই বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিলেন জ্যাকসনের নাতি-নাতনিরা। তাঁরা চেয়েছিলেন, তাঁর পদকের বিক্রয়লব্ধ অর্থ যেন দমকলকর্মীদের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। পুরো অর্থ দেওয়া হবে ফায়ার ফাইটার্স চ্যারিটিকে। প্রতিষ্ঠানটি গ্রেট ব্রিটেনজুড়ে দমকলকর্মীদের চিকিৎসা, মানসিক সুস্থতা ও কল্যাণমূলক সহায়তা দিয়ে থাকে।
জ্যাকসনের নাতি ফ্র্যাঙ্ক ডব্লিউ গুল্ডিং বলেন, ব্লিটজ শুরু হওয়ার ঠিক আগে যে দাতব্য প্রতিষ্ঠান গঠনে তাঁর দাদা সহায়তা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠানই তাঁর স্মারক পদকের বিক্রির অর্থ পাবে—এর চেয়ে উপযুক্ত বিষয় আর কিছু হতে পারে না।
একটি পদকসমষ্টি তাই শুধু একজন যুদ্ধকালীন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সাহসের স্মারক নয়; এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনের আকাশে আগুন ঝরার মধ্যেও জীবন, শহর এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো রক্ষায় প্রাণপণ লড়াই করা শত শত দমকলকর্মীর আত্মত্যাগেরও প্রতীক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















