জাতিসংঘের মানবাধিকার ও সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ দূত বেন সল একটি প্রতিবেদনে বলেছেন, সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে। তার ভাষায়, এসব হামলা “আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী, জীবনের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং সম্ভাব্যভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।” প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জলসীমায় ৬৮টি নৌযানে হামলা চালানো হয়েছে, যাতে অন্তত ২২৩ জন নিহত হয়েছেন। এই অভিযানে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলার।
সলের প্রতিবেদন বলছে, মাদক পাচার আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞায় “সশস্ত্র হামলা” নয়, তাই আত্মরক্ষার যুক্তিতে এসব হামলা ন্যায্য নয়। তার মতে নৌযান আটকের মতো কম প্রাণঘাতী বিকল্প থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ধ্বংসের পথ বেছে নিয়েছে। প্রতিবেদনে এমনও প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, কোকেন জব্দের পরিমাণ প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় এই অভিযান প্রকৃতপক্ষে মাদক পাচার ঠেকাতে কার্যকর হচ্ছে কিনা, বিশেষত যখন যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ফেন্টানিল সাধারণত এই নৌপথে পাচার হয় না।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এই হামলাকে “মাদক-সন্ত্রাসীদের” বিরুদ্ধে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে এবং একে সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতের অংশ বলে দাবি করছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব হত্যাকাণ্ডকে বিচারবহির্ভূত হত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতির স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই বিতর্ক তাৎপর্যপূর্ণ, কেননা সমুদ্রপথে মাদক পাচার ও মানব পাচার নিয়ন্ত্রণে বিশ্বজুড়ে যেসব মানদণ্ড তৈরি হচ্ছে, তার প্রভাব বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের নৌপথেও পড়বে। কোনো রাষ্ট্র সরাসরি প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করবে নাকি আন্তর্জাতিক আইন মেনে নৌযান আটকের পথে হাঁটবে, এই নজির ভবিষ্যতে আঞ্চলিক উপকূলীয় নিরাপত্তা নীতিতেও উদাহরণ হয়ে থাকতে পারে।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পরও ক্যারিবীয় সাগরে অভিযান থেমে নেই, বরং প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, শক্তির মহড়া দিয়ে সমুদ্রে যে যুদ্ধ চলছে, তাতে আসল মাদক পাচারকারীরা আদৌ কতটা কোণঠাসা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহতদের অনেকেই ছিলেন সাধারণ জেলে বা ছোট নৌযানের কর্মী, যাদের মাদক পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্বাধীনভাবে যাচাই করার কোনো সুযোগই রাখা হয়নি হামলার আগে। বেন সল প্রস্তাব দিয়েছেন, এসব ঘটনার আন্তর্জাতিক ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। মার্কিন কংগ্রেসের একাংশ থেকেও অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যদিও প্রশাসন কোনো প্রকার তদন্তে রাজি হয়নি এখনো।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















