বিশ্ব এখন ক্রমেই আরও অস্থির ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিত্র দেশগুলোর মধ্যে আস্থা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আরও গভীর করা জরুরি বলে মনে করেন ব্রিটেনের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান রিচার্ড মুর। বিশেষ করে জাপান ও যুক্তরাজ্যকে তিনি এমন দুই দেশ হিসেবে দেখছেন, যাদের মধ্যে মূল্যবোধ, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
২০২০ সালের অক্টোবরে ব্রিটেনের গোপন গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর প্রধানের দায়িত্ব নেন রিচার্ড মুর। দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণা তিনি প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতার বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা ও একটি ইমোজির মাধ্যমে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এটি ছিল নজিরবিহীন ঘটনা।
তার পাঁচ বছরের দায়িত্বকালে বিশ্ব বড় ধরনের কয়েকটি সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে। করোনাভাইরাস মহামারি, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন, যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদের প্রেসিডেন্ট থাকা ও তার মাঝের পরিবর্তন এবং একই সময়ে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
জুনের শুরুতে নিক্কেই এশিয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মুরকে তার প্রথম দিকের সেই স্বচ্ছন্দ ও রসিক ব্যক্তিত্বের মতোই দেখা গেছে। তবে তার ৩৮ বছরের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার অত্যন্ত কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত।
অস্থির বিশ্বে গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্ব

মুর বলেন, বর্তমান বিশ্ব এখনো অত্যন্ত অস্থির এবং অনেকটাই বিশৃঙ্খল। এ অবস্থায় জাপান, যুক্তরাজ্য এবং তাদের অন্যান্য মিত্র দেশকে নিজেদের চারপাশের পরিস্থিতি বোঝার জন্য যত বেশি সম্ভব উপায় ও সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তার মতে, নিরাপদে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হলে ভালো গোয়েন্দা তথ্য অপরিহার্য। আর সেই গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি মিত্রদের মধ্যে তা ভাগ করে নেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
জাপান জুলাই মাসে একটি জাতীয় গোয়েন্দা পরিষদ এবং জাতীয় গোয়েন্দা ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করেছে। এগুলো ব্রিটেনের যৌথ গোয়েন্দা কমিটির মতো বিভিন্ন সরকারি বিভাগের গোয়েন্দা তথ্য মূল্যায়ন ও সমন্বয়ের কাজ করবে।
জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগকে মুর সমর্থন করেন। তার মতে, দেশটির জাতীয় পর্যায়ের গোয়েন্দা কাঠামো গড়ে উঠলে উন্নত গোয়েন্দা ব্যবস্থার অধিকারী মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে জাপানের সহযোগিতা আরও গভীর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে এই সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন একটি বিষয়কে—আস্থা।
জাপানে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগিতে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রয়োজন
মুর মনে করেন, জাপানের গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে দেশটির সমাজে একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জাপানে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের বিষয়টি দীর্ঘদিন সংবেদনশীল ও প্রায় নিষিদ্ধ ধরনের অবস্থানে ছিল। যুদ্ধের সময় ও তার পরবর্তী সময়ে গোপন পুলিশের হাতে তথ্যদাতাদের নির্যাতনের ইতিহাসও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
তবে মুর মনে করেন, সেই সময় অনেক দূরে চলে গেছে। তার ভাষায়, জাপান ও জার্মানি এখন সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক দেশ এবং পশ্চিমা মিত্রজোটের শক্তিশালী সদস্য।
তিনি আশা করেন, সময়ের সঙ্গে জাপানের সাধারণ মানুষ জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে আরও শক্তিশালী গোয়েন্দা কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পারবেন।
জাপান ও ব্রিটেন কেন স্বাভাবিক অংশীদার
মুরের দৃষ্টিতে জাপান ও ব্রিটেনের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মিল রয়েছে। দুই দেশই দ্বীপ রাষ্ট্র, দুই দেশেই সাংবিধানিক রাজতন্ত্র রয়েছে এবং উভয় দেশই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী।
আইনের শাসন, আন্তর্জাতিক আইন এবং সমুদ্রপথের স্বাধীনতার প্রতি দুই দেশের বিশ্বাসও তাদের ঘনিষ্ঠ করে।
মুর বলেন, জাপান ও ব্রিটেনের স্বার্থ এবং বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সামঞ্জস্য রয়েছে। পাশাপাশি বহু সমুদ্র পেরিয়েও দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সংযোগ রয়েছে।
এই কারণে বর্তমান অস্থির বিশ্বে দুই দেশের আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
চীনকে বুঝতে এমআই৬-এর বড় বিনিয়োগ
মুরের এমআই৬ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় চীন ছিল গোয়েন্দা সংস্থাটির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি জানান, তার সময়ে এমআই৬ অন্য যেকোনো বিষয়ের তুলনায় চীন সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে বেশি সম্পদ ও জনবল ব্যয় করেছে।
এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। একই সঙ্গে দেশটিকে বোঝা কঠিন এবং এর রাষ্ট্রীয় কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের মূল্যবোধ পশ্চিমা দেশগুলোর মূল্যবোধের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়।
মুর আরও বলেন, চীন ও রাশিয়ায় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর মতো একইভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হয় না। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুই দেশকে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
রাশিয়াকে তিনি একটি আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করেন, যে বিদেশে অত্যন্ত ভয়াবহ কর্মকাণ্ড চালাতে প্রস্তুত। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিকে যথাযথ সম্মান দেখানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
তবে সেই সম্মানের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও থাকতে হবে।
তার মতে, কোনো বিষয়ে ব্রিটেন ও জাপানের স্বার্থ যদি এক হয়, তাহলে চীনের সঙ্গে সেই বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও দুই দেশ নিজেদের মধ্যে তথ্য ও মতামত বিনিময় এবং সহযোগিতা করতে পারে।
জাপানের ফাইভ আইজে যোগ দেওয়া নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা নয়
জাপানের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা প্রতিষ্ঠাকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও মুর মনে করেন, জাপানকে সবসময় ফাইভ আইজ গোয়েন্দা জোটে জায়গা পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করা উচিত নয়।
ফাইভ আইজ হলো যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের একটি ঘনিষ্ঠ কাঠামো।
মুরের পরামর্শ, জাপানের উচিত নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়ানো। সেই মিত্রদের মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশ থাকতে পারে।
অর্থাৎ জাপানের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জোটের সদস্য হওয়াই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে কার্যকর গোয়েন্দা সহযোগিতা গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইউক্রেন যুদ্ধের আগেই রাশিয়ার হামলার সতর্কতা
রিচার্ড মুর ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তুরস্কে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তায় অবদানের জন্য তিন বছর আগে তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার হামলা চালানোর আগে তিনি এবং তার মার্কিন গোয়েন্দা সমকক্ষ রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন নিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এমআই৬ প্রধানের পদ থেকে গত সেপ্টেম্বর মাসে সরে যাওয়ার পর মুর বিভিন্ন দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে কেনেডি মেমোরিয়াল ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও রয়েছে। তিনি নিজেও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনার জন্য মর্যাদাপূর্ণ কেনেডি বৃত্তি পেয়েছিলেন।

যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাব ব্যবসায়
বর্তমানে মুর বৈশ্বিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান সিক্সথ স্ট্রিটে কৌশলগত দায়িত্ব পালন করছেন। তার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এমন একটি বিশ্বে প্রতিষ্ঠানটিকে কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করা, যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
একই সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ ও বাড়তে থাকা সুরক্ষাবাদী নীতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও নানা ধরনের বাধা তৈরি হচ্ছে।
মুরের মতে, অনেক দেশ এখন নিজেদের ঝুঁকি কমাতে এক ধরনের ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করছে। তারা ভাবছে, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কীভাবে নিজেদের অবস্থান ঠিক করবে এবং কোন সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর কতটা নির্ভরশীল থাকবে।
একসময় এমআই৬-এর প্রধান হিসেবে তিনি যেমন বিশ্বের জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেশের জন্য সঠিক পথ খুঁজতেন, এখন ব্যবসায়িক জগতেও অনেকটা একই ধরনের কাজ করছেন। তবে এবার তার লক্ষ্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থাকে নয়, বরং একটি বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানকে পরিবর্তিত বিশ্বের মধ্য দিয়ে নিরাপদে এগিয়ে নিতে সহায়তা করা।
মুর বলেন, বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত জটিল। নতুন দায়িত্বে তার কাজ হলো এই জটিলতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাগুলোকে সঠিক পথ খুঁজে নিতে সহায়তা করা।
বিশ্ব রাজনীতির দ্রুত পরিবর্তন, শক্তিধর দেশগুলোর প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার এই সময়ে তার বক্তব্যের কেন্দ্রীয় বার্তাটি স্পষ্ট—মিত্রদের মধ্যে আস্থা ছাড়া গোয়েন্দা সহযোগিতা কার্যকর হতে পারে না, আর আস্থাভিত্তিক সহযোগিতা ছাড়া অস্থির বিশ্বে নিরাপদে পথ চলাও কঠিন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















