চীনে ফেং শুইকে ঘিরে বিশ্বাসের প্রচলন বহু পুরোনো। ধারণাটি মূলত বাতাস ও পানির সঙ্গে মানুষের চারপাশের পরিবেশের সম্পর্ক নিয়ে তৈরি। বিশ্বাস করা হয়, বাড়ি, ভবন, কক্ষ কিংবা আশপাশের বিভিন্ন বস্তু কীভাবে সাজানো হয়েছে, তার ওপর মানুষের ভাগ্য ও জীবনের ভালো-মন্দ নির্ভর করতে পারে।
যেমন, ফেং শুই অনুসারে বিছানার দিকে আয়না রাখা উচিত নয়। কারণ আয়নায় অশুভ শক্তি প্রতিফলিত হয়ে ঘুমন্ত মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হয়। একইভাবে বাড়ির প্রধান প্রবেশপথের সঙ্গে শোবার ঘরের দরজা সরাসরি মুখোমুখি থাকাও অশুভ বলে বিবেচিত হয়। এতে জীবনীশক্তি দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যায় বলে বিশ্বাস রয়েছে।
চীনের প্রায় অর্ধেক মানুষ কোনো না কোনোভাবে ফেং শুইয়ে বিশ্বাস করেন। তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই বিশ্বাস সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ছাড়িয়ে সরকারি প্রশাসনের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
সরকারি সিদ্ধান্তেও ফেং শুইয়ের ছায়া
চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ধর্ম ও কুসংস্কারের বিরোধিতা করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের প্রভাবের নজির রয়েছে।
২০১৪ সালে আনহুই প্রদেশের হুয়াইনান শহরে নির্মাণাধীন একটি পাঁচতারা হোটেল ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন স্থানীয় দলের এক শীর্ষ কর্মকর্তা। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, ভবনটি ওই এলাকার ফেং শুইয়ের জন্য ক্ষতিকর।
এর এক বছর পর, ২০১৫ সালে গুয়াংডং প্রদেশের এক কর্মকর্তা নিজের ও পরিবারের জন্য অনুকূল বলে মনে করা একটি সমাধিস্থল তৈরির উদ্দেশ্যে স্থানীয় গ্রামবাসীদের কাছ থেকে জমি নেওয়ার উদ্যোগ নেন।
চীনের দুর্নীতি দমন ও শৃঙ্খলা তদারকি সংস্থাও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছে, কিছু কর্মকর্তা সরকারি অর্থ ব্যবহার করে কার্যালয়ের ভবনের দিক পরিবর্তন করেছেন, ফেং শুই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েছেন এবং সৌভাগ্য আনার প্রতীক বা তাবিজ কিনেছেন।
‘অশুভ দিক’ মানেই কম বিনিয়োগ
চীনের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক জাস্টিন জি-হাও হং ও ইউহেং ঝাওয়ের একটি গবেষণাপত্রে এবার এই বিশ্বাসের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো মেয়র যদি ফেং শুইয়ে বেশি বিশ্বাসী হন, তাহলে তার প্রশাসনের অধীন এমন কিছু অঞ্চল সরকারি বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে, যেগুলো মেয়রের বসবাসের স্থান থেকে ‘অশুভ’ দিকের দিকে অবস্থিত বলে মনে করা হয়।
গবেষকেরা ২০০০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চীনে দায়িত্ব পালন করা মেয়রদের নিয়ে বিশ্লেষণ করেন। প্রত্যেক মেয়রের জন্মতারিখের ভিত্তিতে কোন দিককে অশুভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা নির্ধারণে পেশাদার জ্যোতিষীদের সহায়তা নেওয়া হয়। এরপর সেই মেয়রের অধীন বিভিন্ন জেলার অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখা হয়, কোন এলাকাগুলো তার বিশ্বাস অনুযায়ী অনুকূল কিংবা অননুকূল দিকে পড়ছে।
এরপর এসব জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির তথ্য তুলনা করা হয়।
![]()
প্রবৃদ্ধিতে ২ দশমিক ৩ শতাংশ ঘাটতি
গবেষণার ফল বেশ চমকপ্রদ। দেখা গেছে, মেয়রের কাছে ‘অশুভ দিক’ হিসেবে বিবেচিত এলাকায় একই ধরনের অন্য এলাকার তুলনায় গড়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ কম মোট দেশজ উৎপাদন হয়েছে।
এর পেছনে সরকারি নীতির প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব এলাকায় নীতিগত সহায়তা ও সরকারি বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কমেছে। এর প্রভাব আবার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের ওপরও পড়েছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে কম কর্মী নিয়োগ করেছে। অনেক পরিবারও অপেক্ষাকৃত ভালো সুযোগের সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে গেছে। ফলে একটি এলাকার অর্থনৈতিক দুর্বলতা ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়েছে।
তবে এই ক্ষতি স্থায়ী ছিল না। যে মেয়রের বিশ্বাসের কারণে কোনো অঞ্চল পিছিয়ে পড়েছিল, তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার পর সেই এলাকার অর্থনীতি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত প্রায় তিন বছর পর ওই অঞ্চলগুলো অন্য এলাকার সঙ্গে আবার তাল মেলাতে শুরু করেছে।
পুরো চীনের অর্থনীতিতেও প্রভাব
একজন মেয়রের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের কারণে একটি জেলার অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়, তা হয়তো খুব বড় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু একই ধরনের সিদ্ধান্ত যদি দেশের বহু অঞ্চলে বারবার নেওয়া হয়, তাহলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব তৈরি হয়।
গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, এই ধরনের কুসংস্কারনির্ভর সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাব চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের বছরে প্রায় শূন্য দশমিক ১ শতাংশ ক্ষতির সমান।
অর্থাৎ ব্যক্তিগত বিশ্বাস যখন সরকারি নীতি নির্ধারণে ঢুকে পড়ে, তখন তার প্রভাব শুধু একজন কর্মকর্তা বা একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মানুষের স্থানান্তর এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তাহলে মেয়ররা কেন এমন বিশ্বাস করেন?
এখানেই গবেষণাটির সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক। স্বাভাবিকভাবে কোনো মেয়র যদি জানেন যে কুসংস্কারের কারণে একটি এলাকার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে সেটি তার নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও ভালো হওয়ার কথা নয়।
তবু এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরেছেন গবেষক জাস্টিন হং।
তার ধারণা, ফেং শুইয়ের মতো বিশ্বাস হয়তো প্রশাসকদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। একজন মেয়রকে একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নীতির অনিশ্চয়তা, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা ধরনের চাপের মধ্যে থাকতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে কোনো অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস তাকে সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় এক ধরনের মানসিক আশ্রয় দিতে পারে।
কিন্তু ব্যক্তিগত মানসিক স্বস্তির সেই মূল্য যদি সরকারি বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়, ব্যবসাকে নিরুৎসাহিত করে এবং মানুষকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করে, তাহলে তার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় পুরো সমাজকেই।
চীনের এই ঘটনা তাই শুধু ফেং শুইয়ের বিশ্বাসের গল্প নয়। এটি একটি বড় প্রশ্নও সামনে আনে—ব্যক্তিগত বিশ্বাস যখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তখন তার অর্থনৈতিক মূল্য কতটা হতে পারে?
Sarakhon Report 



















