যুক্তরাষ্ট্রের ইডাহো অঙ্গরাজ্যের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পরিত্যক্ত একটি পুরোনো খনি আবারও সচল হচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সেই খনি থেকে এবার সোনার পাশাপাশি উত্তোলন করা হবে অ্যান্টিমনি—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, যা সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ ও আগুন প্রতিরোধী উপকরণ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তবে খনি পুনরায় চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে শুরু হয়েছে পরিবেশ, আদিবাসী অধিকার ও বন্যপ্রাণী রক্ষার প্রশ্নে তীব্র বিরোধ।
মধ্য ইডাহোর ভ্যালি কাউন্টিতে অবস্থিত এই খনি প্রকল্পকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, দেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা চাহিদা মেটাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিমনি উৎপাদনের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রকল্পেরই রয়েছে। গোলাবারুদ থেকে শুরু করে তাপ শনাক্তকারী সামরিক যন্ত্র—বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে এই খনিজের ব্যবহার রয়েছে।
কিন্তু প্রকল্পটির গুরুত্ব যতটা কৌশলগত, বিতর্কও ততটাই গভীর।
অ্যান্টিমনির জন্য বড় বিনিয়োগ, কিন্তু আসল আয় সোনা থেকে
খনি প্রকল্পটির পেছনে মূল আকর্ষণ শুধু অ্যান্টিমনি নয়, বরং বিপুল পরিমাণ সোনা। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, খনিটি থেকে যে রাজস্ব আসবে তার বড় অংশই সোনা বিক্রি থেকে পাওয়ার কথা।
এখানেই সমালোচকদের প্রশ্ন—যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা প্রয়োজন মেটানোই প্রকল্পটির প্রধান যুক্তি হয়, তাহলে অ্যান্টিমনির মজুত আসলে কতটা? সমালোচকদের দাবি, কোম্পানির নিজস্ব নথিতেই এমন তথ্য রয়েছে যে, খনিতে থাকা অ্যান্টিমনি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন মেটানো যাবে আনুমানিক দুই বছর।
অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনের কথা সামনে এনে যে প্রকল্পকে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তার অ্যান্টিমনি সরবরাহের সক্ষমতা হয়তো খুব দীর্ঘস্থায়ী নয়।
নয় বছরের অনুমোদন প্রক্রিয়ার পর শুরু হয়েছে কাজ
খনিটি পুনরায় চালুর অনুমোদন পেতে প্রায় নয় বছর সময় লেগেছে। অবশেষে ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায় এবং একই বছরের অক্টোবরে সেখানে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
তবে অনুমোদন মিললেও বিতর্ক থামেনি। প্রকল্পটির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা এখনো চলমান। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীও এর বিরোধিতা করছে।
বিশেষ করে নেজ পার্স গোত্র পুরো প্রকল্পের বিরোধিতা করছে। তাদের অভিযোগ, খনির অনুমোদন তাদের ঐতিহাসিক চুক্তির অধিকার এবং পরিবেশ সংরক্ষণসংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করেছে।
কয়েক দশকের পুরোনো ক্ষত আবারও খুলে যাওয়ার আশঙ্কা
এই বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় নদী ও স্যামন মাছের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
খনি এলাকায় অতীতের খনন কার্যক্রমের কারণে স্থানীয় পরিবেশ ও স্যামন মাছের আবাসস্থল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে নেজ পার্স গোত্র বহু বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয় করে স্যামন পুনরুদ্ধারের কর্মসূচি চালিয়ে আসছে।
স্থানীয় মাছের প্রজনন ও সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে পরিচালিত এসব উদ্যোগের পর এখন নতুন করে খনন শুরু হলে সেই পুনরুদ্ধার কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে গোত্রটি।
ইডাহোর ম্যাককল এলাকার মাছের প্রজননকেন্দ্রে গ্রীষ্মকালীন চিনুক স্যামনের উপস্থিতি এই অঞ্চলের পরিবেশগত গুরুত্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়। নদী, মাছ ও বন্যপ্রাণীর সঙ্গে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্কও এই প্রকল্পকে শুধু একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না।

পরিবেশবাদীদেরও আপত্তি
নেজ পার্স গোত্র একা নয়, পরিবেশ সংরক্ষণকারী সংগঠনগুলোরও খনি প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, নতুন করে খনন ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে স্থানীয় বন্যপ্রাণী এবং সংবেদনশীল প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এক লেনের সরু স্টিবনাইট সড়কটি বর্তমানে খনি ও স্থানীয় যানবাহন—দুই ধরনের চলাচলেই ব্যবহৃত হয়। প্রকল্পের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকায় যানবাহন ও মানুষের চলাচলও বাড়বে। ফলে পাহাড়ি পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশবাদীদের করা মামলাগুলোর মূল প্রশ্নও তাই—অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লাভের জন্য স্থানীয় পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কতটা গ্রহণযোগ্য?
কোম্পানির দাবি, খনি উল্টো পরিবেশ পুনরুদ্ধার করবে
প্রকল্পের উদ্যোক্তারা অবশ্য এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, খনিটি যে এলাকায় তৈরি হচ্ছে সেটি বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল এবং আগের খনন কার্যক্রমের কারণে সেখানে পরিবেশগত ক্ষত তৈরি হয়েছে।
তাদের দাবি, নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে ওই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিষ্কার ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ নতুন খনন শুধু সম্পদ আহরণের প্রকল্প নয়, বরং দীর্ঘদিনের পরিবেশগত সমস্যা সমাধানেরও একটি সুযোগ—এমনটাই তাদের যুক্তি।
তবে এই যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ পরিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও নতুন করে ব্যাপক খনন কার্যক্রম শুরু হলে তার বাস্তব প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
সোনা, অ্যান্টিমনি নাকি পরিবেশ—কোনটির মূল্য বেশি?
স্টিবনাইট খনি প্রকল্পের বিতর্ক আসলে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর একটি প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশটি কতটা পরিবেশগত ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?
বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। সামরিক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসব খনিজের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দেশের ভেতরে অ্যান্টিমনির মতো কৌশলগত খনিজের উৎস তৈরি করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু একটি খনি যদি অল্প সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহ করতে পারে, অথচ তার কারণে কয়েক দশক ধরে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলা পরিবেশ আবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য কত—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইডাহোর পাহাড়ে তাই শুধু সোনা বা অ্যান্টিমনির খোঁজ চলছে না। সেখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক লাভ, জাতীয় নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার। এই চারটি স্বার্থের মধ্যে কোনটি শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে, তা নির্ধারণ করবে স্টিবনাইট খনির ভবিষ্যৎ এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















