শিশুরা শব্দ পড়তে পারছে, বাক্য উচ্চারণ করতে পারছে, পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তরও দিচ্ছে। কিন্তু তারা কি সত্যিই পড়া বিষয়টি বুঝতে পারছে? একটি গল্পের অন্তর্নিহিত অর্থ, একটি দীর্ঘ লেখার মূল বক্তব্য, লেখকের উদ্দেশ্য কিংবা দুটি ভিন্ন তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক তারা কতটা ধরতে পারছে—এই প্রশ্নই এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের একটি দরিদ্র স্কুলকে ঘিরে করা পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, পরীক্ষায় ভালো করার জন্য শিশুদের পড়ানো হচ্ছে নানা কৌশল ও অনুশীলন। কিন্তু পরীক্ষার বাইরের বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় গভীর পাঠবোধ, দীর্ঘ লেখা পড়ার ধৈর্য এবং নিজের চিন্তা দিয়ে অর্থ বের করার ক্ষমতা গড়ে উঠছে কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরীক্ষার চাপেই আটকে যাচ্ছে পড়াশোনা
মিসিসিপির জেফারসন কাউন্টি মিডল স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ইংরেজি পড়ান ক্যান্ডেস হ্যামবারলিন। দীর্ঘ ২৫ বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর তিনি অষ্টম শ্রেণিতে এসেছেন। তাঁর কাছে পড়া মানে শুধু শব্দ বা বাক্য বোঝা নয়; বরং লেখক কী বলতে চেয়েছেন, কেন বলেছেন এবং কীভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন—সেটি খুঁজে বের করাই আসল আনন্দ।
কিন্তু শ্রেণিকক্ষে সেই আনন্দের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের সামনে বারবার পরীক্ষার প্রস্তুতি, অনুশীলনী, নির্দিষ্ট দক্ষতা যাচাই এবং নম্বর বাড়ানোর চাপ। সপ্তাহের একটি বড় অংশ কাটছে কম্পিউটারভিত্তিক পাঠ ও অনুশীলনে। প্রতি সপ্তাহেই রয়েছে পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অপরিচিত শব্দের অর্থ বের করা, লেখার মূল বক্তব্য শনাক্ত করা, অনুমানভিত্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাষার ধরন বিশ্লেষণ করার মতো দক্ষতা অর্জন করতে হয়। কিন্তু নিয়মিত পরীক্ষার চাপের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই পড়া হয়ে উঠেছে একটি ক্লান্তিকর কাজ।
দরিদ্র এলাকার স্কুলে বড় লড়াই
জেফারসন কাউন্টি মিসিসিপির সবচেয়ে ছোট ও দরিদ্র এলাকাগুলোর একটি। প্রায় ৬ হাজার ৮০০ মানুষের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কাউন্টির একমাত্র শহর ফায়েতে রয়েছে মাত্র কয়েকটি গির্জা; এমনকি একটি ট্রাফিক বাতিও নেই।
স্কুলটির শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের সন্তান। অনেক পরিবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করছে।
এমন বাস্তবতায় বিদ্যালয়ের ফলাফল হয়ে উঠেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কম নম্বর পেলে স্কুলকে নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে, প্রশাসনের ওপর বাড়তে পারে নজরদারি এবং অর্থায়নের ক্ষেত্রেও তৈরি হতে পারে নানা জটিলতা। ফলে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক ও জেলা প্রশাসন—সবার ওপরই পরীক্ষার ফল উন্নত করার চাপ থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে পড়ার দক্ষতা কমছে
সমস্যাটি শুধু মিসিসিপির নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দেড় দশক ধরে শিশু-কিশোরদের পড়ার দক্ষতা কমছে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এই পতন আরও স্পষ্ট।
জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষায় ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতার যে উন্নতি একসময় দেখা গিয়েছিল, পরে তা আবার কমতে শুরু করে। মহামারির সময় পতন আরও তীব্র হয়। ২০২৫ সালে ১৩ বছর বয়সীদের গড় ফল এমন পর্যায়ে নেমে যায়, যা কয়েক দশক আগের অবস্থার কাছাকাছি।
প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ১৩ বছর বয়সী শিক্ষার্থী এমন পর্যায়ে রয়েছে, যাদের একটি লেখার মূল বক্তব্য শনাক্ত করতেও সমস্যা হয়।
এই পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ দায় দিচ্ছেন স্মার্টফোনকে, কেউ শিক্ষাপদ্ধতিকে, কেউ পাঠ্যবইকে, আবার কেউ শিক্ষার্থীদের মনোযোগের ঘাটতিকে।
মিসিসিপির সাফল্য থেকে কী শেখা যায়?
অদ্ভুতভাবে, জাতীয় পর্যায়ে যখন পড়ার দক্ষতা কমছে, তখন মিসিসিপি প্রাথমিক পর্যায়ে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের উদাহরণ তৈরি করেছে। একসময় রাজ্যটি জাতীয় শিক্ষামূল্যায়নে প্রায় তলানিতে ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের পর প্রাথমিক স্তরের পড়ার ফলাফল ধারাবাহিকভাবে উন্নত হতে থাকে।
২০২৪ সালে চতুর্থ শ্রেণির পড়ার দক্ষতায় মিসিসিপি জাতীয়ভাবে নবম অবস্থানে উঠে আসে। এই পরিবর্তনকে অনেকেই ‘মিসিসিপি মিরাকল’ বা মিসিসিপির বিস্ময়কর সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেন।
জেফারসন কাউন্টির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ছিল উল্লেখযোগ্য। কয়েক বছর আগে যেখানে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার হার ছিল ৪৩ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮ শতাংশে।
কীভাবে এল এই পরিবর্তন?
বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এর পেছনে রয়েছে শিশুদের পড়ার মৌলিক ভিত্তি শক্ত করার উদ্যোগ। বিশেষ করে ধ্বনি ও অক্ষরের সম্পর্ক, শব্দ ভেঙে পড়া এবং উচ্চারণভিত্তিক পাঠ শেখানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণিতে পরীক্ষার ফলাফলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হলে শিক্ষার্থীকে একই শ্রেণিতে পুনরায় পড়ার নিয়ম রয়েছে। ফলে পরিবার, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—সবার মধ্যেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার তীব্র চাপ তৈরি হয়।
তবে শুধু চাপই এই সাফল্যের কারণ নয়।
মিসিসিপি বিপুল অর্থ ব্যয় করছে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পাঠদানে সহায়তার জন্য। বিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের পরামর্শক নিয়োগ করা হচ্ছে, যারা সরাসরি শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করেন, শ্রেণিকক্ষে সহায়তা করেন এবং শিক্ষার্থীদের পড়ার দুর্বলতা শনাক্ত করতে সাহায্য করেন।
জেফারসন কাউন্টির প্রাথমিক বিদ্যালয়েও এমন একজন প্রশিক্ষক শিক্ষকদের সঙ্গে কাজ করেন। প্রয়োজন হলে তিনি শ্রেণিকক্ষে দ্বিতীয় শিক্ষকের মতো ভূমিকা পালন করেন। ফলে ছোট ছোট দলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা সহজ হয় এবং দুর্বল শিক্ষার্থীরা বাড়তি সহায়তা পায়।
শ্রেণিকক্ষে প্রাণ আছে, কিন্তু বড়দের পড়াশোনায় কেন নেই?
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষক লাতাশা গ্লাসের শ্রেণিকক্ষের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে শিক্ষার্থীরা হাত তুলে উত্তর দেয়, শিক্ষক ছন্দ মিলিয়ে তাদের মনোযোগ ফিরিয়ে আনেন, বোর্ডে শব্দ লেখে, শব্দের ধ্বনি আলাদা করে এবং দলবদ্ধভাবে অনুশীলন করে।
ভুল করলেও শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা হয় না। বরং ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
একটি শব্দের বানান ভুল হলেও শিক্ষক প্রথমেই সেটি ঠিক করে দেন না। আগে শিক্ষার্থীদের শব্দটির ধ্বনি বিশ্লেষণ করতে দেন। তারা নিজেরাই উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। ফলে শেখার মধ্যে থাকে অনুসন্ধান, অংশগ্রহণ ও আনন্দ।
এই পদ্ধতির ফলও দেখা যাচ্ছে। জেফারসন কাউন্টির তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফল প্রাথমিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে এসে সেই সাফল্য কোথায় হারিয়ে যায়?
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় ধাঁধা।
যে শিশুরা তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার পরীক্ষায় ভালো করছে, তাদের একটি অংশ অষ্টম শ্রেণিতে এসে দীর্ঘ লেখা পড়তে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। শব্দ পড়তে পারলেও দীর্ঘ অনুচ্ছেদ থেকে অর্থ বের করা, মূল বক্তব্য শনাক্ত করা কিংবা কয়েকটি তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করার সময় তারা সমস্যায় পড়ছে।
অর্থাৎ শব্দ পড়ার দক্ষতা তৈরি হয়েছে, কিন্তু গভীরভাবে বোঝার দক্ষতা একই গতিতে এগোয়নি।
শিক্ষাবিদদের মতে, পড়ার দুটি স্তর রয়েছে। প্রথমটি হলো শব্দ ও বাক্য পড়তে পারা। দ্বিতীয়টি হলো পড়া বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা, বিশ্লেষণ করা, প্রশ্ন তোলা এবং নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
মিসিসিপির প্রাথমিক শিক্ষায় প্রথম স্তরে বড় সাফল্য দেখা গেলেও দ্বিতীয় স্তরে এসে সেই অগ্রগতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার আনন্দ কমে যাচ্ছে।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষক হ্যামবারলিনের মতে, তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন একটি শ্রেণি তিনি আগে দেখেননি, যেখানে প্রায় কেউই আনন্দের জন্য বই পড়ে না।
শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত লেখা পড়ে। কিন্তু নিজের আগ্রহে কোনো বই হাতে নেওয়ার প্রবণতা প্রায় নেই।
শিক্ষার্থীদের একজন সরাসরি শিক্ষককে জানায়, পড়ার ক্লাস তার কাছে বিরক্তিকর।
এই একটি মন্তব্যই যেন পুরো সমস্যাটিকে সামনে নিয়ে আসে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীকে পড়ানো সম্ভব, কিন্তু পড়াকে ভালোবাসতে শেখানো অনেক কঠিন।
স্মার্টফোন কি মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে?
শিক্ষাবিদদের আলোচনায় স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বারবার উঠে আসছে।
স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিওর অভ্যাস শিশু-কিশোরদের দ্রুত বদলে যাওয়া তথ্যের সঙ্গে অভ্যস্ত করে তুলছে। কোনো ভিডিও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আকর্ষণ হারালে তারা সঙ্গে সঙ্গে পরের ভিডিওতে চলে যায়।
কিন্তু বই বা দীর্ঘ প্রবন্ধ এমন নয়। সেখানে একটি কঠিন শব্দের মুখোমুখি হতে হয়, কোনো অংশ বুঝতে সময় দিতে হয়, কখনো একই বাক্য আবার পড়তে হয়। অর্থাৎ দীর্ঘ লেখা পড়ার জন্য ধৈর্য ও মনোযোগ দরকার।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, দীর্ঘ লেখা পড়ার সক্ষমতাও একটি পেশির মতো। নিয়মিত ব্যবহার না করলে সেটি দুর্বল হয়ে যায়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি সমস্যাকে আরও বাড়াবে?
সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি নতুন উদ্বেগও তৈরি করেছে।
কোনো জটিল বিষয় বুঝতে নিজে চেষ্টা করার বদলে যদি শিক্ষার্থী সরাসরি যন্ত্রের কাছে উত্তর চায়, তাহলে তার চিন্তা করার প্রয়োজন কমে যায়। ফলে শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—নিজে সমস্যার সঙ্গে লড়াই করা—দুর্বল হতে পারে।
পরীক্ষার হলে অবশ্য কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার্থীর হয়ে উত্তর লিখবে না। সেখানে অপরিচিত বিষয়, দীর্ঘ অনুচ্ছেদ ও জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে শিক্ষার্থীকে নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তাই প্রযুক্তির যুগে পড়ার দক্ষতা বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে কি পড়াশোনার সাফল্য মাপা যায়?
মিসিসিপির অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নটিও সামনে নিয়ে এসেছে।
উচ্চমাত্রার পরীক্ষার চাপ শিক্ষার্থীদের ফলাফল বাড়াতে পারে। শিক্ষকরা আরও নিয়মিত অনুশীলন করাতে পারেন। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া যায়। কিন্তু পরীক্ষায় ভালো করা আর একজন চিন্তাশীল পাঠক হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়।
একজন শিক্ষার্থী একটি ছোট অনুচ্ছেদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেই যে সে একটি বই পড়ে তার বক্তব্য বিশ্লেষণ করতে পারবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
একইভাবে, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া মানেই যে বাস্তব জীবনে জটিল নির্দেশনা বোঝা, দুটি ভিন্ন তথ্যের তুলনা করা বা কোনো বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ শনাক্ত করা—তাও নয়।
বড়দের মধ্যেও সংকটের ছাপ
সমস্যার প্রভাব শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও পড়ার দক্ষতার অবনতি দেখা যাচ্ছে।
একটি মূল্যায়নে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নির্ভরযোগ্যভাবে তথ্যের তুলনা করতে, কোনো লেখা নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে কিংবা সহজ অনুমান করতে সমস্যায় পড়েন।
অন্যদিকে, আনন্দের জন্য বই পড়ার হারও বহু বছর ধরে কমেছে। অর্থাৎ শিশুকালে যে পাঠাভ্যাস তৈরি হওয়ার কথা, সেটি বড় হওয়ার পরও অনেকের জীবনে স্থায়ী হচ্ছে না।

তাহলে সমাধান কোথায়?
শিক্ষাবিদদের মতে, সমাধান শুধু আরও কঠিন পরীক্ষা নয়। আবার শুধু প্রযুক্তি বন্ধ করেও সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রথমত, শিশুদের পড়ার মৌলিক ভিত্তি শক্ত করতে হবে। শব্দ, ধ্বনি, বাক্য এবং ভাষার কাঠামো বোঝাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ধীরে ধীরে তাদের দীর্ঘ লেখা পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। শুধু পরীক্ষার অনুচ্ছেদ নয়, গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, বিজ্ঞান, মহাকাশ, খেলাধুলা কিংবা শিক্ষার্থীদের আগ্রহের যেকোনো বিষয় নিয়ে লেখা পড়ার সুযোগ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, পড়াকে শুধুই পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত না করে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একটি লেখা পড়ে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে নিজের মত গঠন করতে হয়, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়—এসবও শেখাতে হবে।
চতুর্থত, শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিতে হবে। মিসিসিপির প্রাথমিক পর্যায়ের সাফল্য দেখিয়েছে, মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষিত পাঠ-সহায়কদের নিয়মিত উপস্থিতি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত পাঠক তৈরি করা
মিসিসিপির এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। একটি শিশু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে—এটি অবশ্যই সাফল্য। কিন্তু সেটিই শিক্ষার শেষ লক্ষ্য হতে পারে না।
শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন একজন শিশু বড় হয়ে জটিল নির্দেশনা বুঝতে পারে, দীর্ঘ লেখা পড়তে পারে, অপরিচিত শব্দের অর্থ নিজে খুঁজে নিতে পারে, বিভিন্ন তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে এবং কোনো বক্তব্যকে অন্ধভাবে গ্রহণ না করে প্রশ্ন করতে পারে।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সে যখন নিজের আনন্দের জন্য একটি বই হাতে তুলে নেয়—তখনই হয়তো বোঝা যায় পড়ার শিক্ষা সত্যিকার অর্থে তার জীবনে পৌঁছেছে।
মিসিসিপি প্রাথমিক স্তরে শিশুদের পড়ার ভিত্তি শক্ত করার একটি কার্যকর পথ দেখিয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো সেই ভিত্তিকে কৈশোর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। কারণ শব্দ পড়তে পারা যদি চিন্তা করার ক্ষমতায় রূপ না নেয়, তাহলে পরীক্ষার নম্বর বাড়লেও সমাজে তৈরি হবে না প্রকৃত পাঠক।
একজন শিক্ষক যেমন বলছেন, পড়ার দক্ষতা শুধু শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়—এটি জীবনের প্রতিটি কথোপকথন, সিদ্ধান্ত ও বোঝাপড়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো আর শুধু ‘শিশুরা পড়তে পারে কি না’ নয়; বরং ‘তারা যা পড়ছে, তা সত্যিই বুঝতে পারছে কি না।’
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















