০৮:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
মধ্যম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দৌড়েও অবিশ্বাস্য গতি, রেকর্ড ভাঙল একের পর এক স্বাধীন ভারতের প্রথম জাতিভিত্তিক জনগণনায় নেতৃত্ব দেবে লাদাখ বিহারের ধাক্কার পর উত্তরপ্রদেশে উচ্চবর্ণের ক্ষোভ কি চাপে ফেলবে বিজেপিকে? দিল্লির অভিজাতদের স্বপ্নের বাড়ি দেখিয়ে ২০০ কোটি টাকার প্রতারণা! সন্তানদের ভবিষ্যৎ বোঝার ক্ষমতা অভিভাবকদের চেয়েও এগিয়ে অর্থনৈতিক সংকটে বদলে যাচ্ছে প্রেমের হিসাব, ‘রেড ফ্ল্যাগ’ও কি শ্রেণির পরিচয়? কৃষ্ণসাগরের বন্দর ঘিরে রাশিয়ার নতুন চাপ, শস্য রপ্তানি থমকে গেলে বিশ্বজুড়ে বাড়বে খাদ্যঝুঁকি ‘দ্য অডিসি’তে ওডিসিউসের অপরাধবোধ, যুদ্ধের নৃশংসতা ও সভ্যতার পুনর্জন্ম: ক্রিস্টোফার নোলানের ব্যাখ্যা মাদুরো পতনের পর ওয়াশিংটনের ছায়ায় ভেনেজুয়েলা, ক্ষমতার কেন্দ্রে দেলসি রদ্রিগেজ পাইথনের সহজতা আর সি-এর গতি—দুই জগতকে এক করতে পারে জুলিয়া?

মাদুরো পতনের পর ওয়াশিংটনের ছায়ায় ভেনেজুয়েলা, ক্ষমতার কেন্দ্রে দেলসি রদ্রিগেজ

ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে যেন রাতারাতি বদলে গেছে বহু বছরের সমীকরণ। যে দেশটি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করে সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পথে এগিয়েছে, সেই দেশই এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে নজিরবিহীন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ—একসময় নিকোলাস মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী, আর এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের প্রধান কারিগর।

কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে বসে রদ্রিগেজ এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। প্রাসাদের অলংকৃত দেয়ালে সিমন বলিভার ও হুগো চাভেজের প্রতিকৃতি। অথচ সেই চাভেজপন্থী রাজনৈতিক ধারারই একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা আজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন এক সমঝোতা বাস্তবায়ন করছেন, যার ফলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, তেল সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ওয়াশিংটনের প্রভাব অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছে।

মাদুরোর পতন বদলে দিল সব হিসাব

রদ্রিগেজের ক্ষমতায় আসার পেছনে রয়েছে এক নাটকীয় ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। মাদুরো এখন নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল কারাগারে রয়েছেন।

মাদুরোর পতনের আগে ভেনেজুয়েলা ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ছিল। দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে দেশটির অর্থনীতি কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। মানুষের সঞ্চয়ের মূল্য মুছে যায়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পানির সংকট, ভেঙে পড়া হাসপাতাল এবং খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়।

দেশটির প্রায় ৮০ লাখ মানুষ বিভিন্ন সময়ে ভেনেজুয়েলা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এতে পশ্চিম গোলার্ধের ইতিহাসে অন্যতম বড় অভিবাসন সংকট তৈরি হয়।

মাদুরোর পতনের পর অবশ্য পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কারাকাসে নতুন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, দোকানে পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে এবং দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কিছু তেলক্ষেত্রে আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

তেলের বিনিময়ে নতুন সম্পর্ক

ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার দেশটির বিশাল তেলসম্পদ। আর এই তেলই ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন সমঝোতার অন্যতম মূল ভিত্তি।

যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় জ্বালানি কোম্পানি ভেনেজুয়েলায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলও আবার শুরু হয়েছে। দেশটির অর্থনীতিতে মার্কিন মুদ্রার ব্যবহার এখন প্রকাশ্য।

নতুন ব্যবস্থায় ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওয়াশিংটন অর্থের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করবে এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সেই অর্থ ভেনেজুয়েলার ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ছাড় করা হবে।

এর ফলে দুর্নীতি কমানো এবং বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব সীমিত করার সুযোগ তৈরি হলেও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্নও উঠছে।

রদ্রিগেজের সঙ্গে রুবিওর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে রদ্রিগেজের প্রায় প্রতিদিন যোগাযোগ হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফোনকল ও বার্তায় দুই দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

এমনকি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ নিয়েও রদ্রিগেজ রুবিওর সঙ্গে পরামর্শ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস স্টোরির ভাষায়, ভেনেজুয়েলায় এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে যেখানে রদ্রিগেজের সরকার ক্ষমতায় থাকছে, কিন্তু একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন করছে।

এই বাস্তবতাই ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যত নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

মাদুরোর সহযোগী থেকে ওয়াশিংটনের অংশীদার

দেলসি রদ্রিগেজের রাজনৈতিক পরিচয় এই পরিবর্তনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

তিনি হুগো চাভেজের রাজনৈতিক বলয়ের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন এবং দীর্ঘদিন মাদুরোর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং রাশিয়া, চীন, ইরান ও কিউবার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক শক্তিশালী করেছেন।

২০১৮ সালে মাদুরো তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করেন।

কিন্তু রদ্রিগেজকে অনেক আন্তর্জাতিক কূটনীতিক বরাবরই কট্টর মতাদর্শী নেতার চেয়ে বাস্তববাদী ও অর্থনীতি বোঝেন এমন একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে দেখেছেন। তেল খাত ও বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভেনেজুয়েলা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির তেল উৎপাদন বাড়লে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়তে পারে এবং জ্বালানির দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে রুবিও ভেনেজুয়েলাকে দেখেছেন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। চীন, রাশিয়া, কিউবা ও ইরানের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ওয়াশিংটনের কাছে উদ্বেগের কারণ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য ছিল ভেনেজুয়েলাকে ওই বলয় থেকে বের করে এনে আবার মার্কিন প্রভাবের আওতায় নিয়ে আসা। মাদুরো সেই পথে যেতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার ক্ষমতাচ্যুতি ঘটে।

মাদকবিরোধী অভিযানেও সহযোগিতা

কারাকাস ও ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্ক শুধু অর্থনীতি বা তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুই দেশ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং মাদকবিরোধী অভিযানেও সহযোগিতা করছে।

জুনে আন্তঃদেশীয় অপরাধী সংগঠন ট্রেন দে আরাগুয়ার নেতা নিনো গুয়েরেরো ভেনেজুয়েলার একটি স্থাপনায় নিহত হন। রদ্রিগেজের দাবি, তার সরকার গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ওই ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করে এবং ভেনেজুয়েলার বাহিনীও অভিযানে ভূমিকা রাখে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী সামরিক অভিযানের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়েছে। সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে মার্কিন হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতার সীমার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন।

গণতন্ত্র কোথায়?

অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—ভেনেজুয়েলা কি সত্যিই গণতন্ত্রের পথে ফিরছে?

রদ্রিগেজের সরকার রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে সাধারণ ক্ষমা আইন করেছে। সরকারি হিসাবে প্রায় ৯ হাজার বন্দি মুক্তি পেয়েছেন। রদ্রিগেজ জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরকে এসব মুক্তির প্রক্রিয়া পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলেছেন।

কিন্তু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সময়সূচি নেই।

রদ্রিগেজ বলেছেন, ভেনেজুয়েলা প্রস্তুত হলে নির্বাচন হবে। রাজনৈতিক পক্ষগুলো যখন সহাবস্থান ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পৌঁছাতে পারবে, তখনই সেই সময় আসবে বলে তার বক্তব্য।

এই অবস্থান নিয়ে বিরোধী নেতারা সন্তুষ্ট নন।

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো মনে করেন, শুধু স্থিতিশীলতা দিয়ে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও বৈধতা প্রতিষ্ঠা না হলে নতুন ব্যবস্থাও টেকসই হবে না।

রদ্রিগেজ কি নিজেই প্রেসিডেন্ট হতে চান?

রদ্রিগেজের নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তিনি ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।

বিরোধী নেতা মাচাদো দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, সেটিও তিনি স্পষ্ট করেননি।

তার বক্তব্য, ভেনেজুয়েলাকে একটি নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করতে হবে এবং এমন একটি সময় আসবে যখন রাজনৈতিক সহাবস্থান ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা সম্ভব হবে।

তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, গণতান্ত্রিক সংস্কারের পরিবর্তে রদ্রিগেজ মূলত নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং চাভেজপন্থী রাজনৈতিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চাইছেন।

Who is Delcy Rodriguez, Venezuela's new leader after Maduro's capture? | AP  News

ভূমিকম্পে নতুন সম্পর্কের পরীক্ষা

জুনে কারাকাসে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬৭০ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই দুর্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ৩০ কোটি ডলারের পুনর্গঠন সহায়তা দেয় এবং সামরিক সহায়তাও পাঠায়।

রদ্রিগেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের বাস্তব সুফল হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে ভূমিকম্পের পর দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে না আসায় রদ্রিগেজ নিজেও সমালোচনার মুখে পড়েন।

এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কি সাধারণ ভেনেজুয়েলাবাসীর জীবন বদলাবে, নাকি কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী একটি শ্রেণি আরও শক্তিশালী হবে?

চাভেজের উত্তরাধিকার বনাম নতুন বাস্তবতা

রদ্রিগেজের জীবনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তার বাবা হোর্হে আন্তোনিও রদ্রিগেজ ছিলেন বিপ্লবী বামপন্থী আন্দোলনের ছাত্রনেতা। ১৯৭৬ সালে সরকারি বাহিনীর হাতে তিনি গ্রেপ্তার, নির্যাতিত ও নিহত হন।

মাত্র সাত বছর বয়সে বাবাকে হারানো সেই মেয়েই পরে চাভেজ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হন এবং মাদুরোর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন হিসেবে পরিচিতি পান।

আজ সেই রদ্রিগেজই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন।

এই পরিবর্তন তাই শুধু একজন নেতার রাজনৈতিক রূপান্তর নয়; এটি ভেনেজুয়েলার গত দুই দশকের রাজনৈতিক দর্শনেরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুই সরকারের ওপর

রদ্রিগেজের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভারসাম্য রক্ষা করা। তাকে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দাবি মেনে চলতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের দেশের জনগণের কাছে সার্বভৌমত্ব রক্ষার বার্তা দিতে হচ্ছে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ শেষ হলে এই সম্পর্ক কতটা টিকে থাকবে।

বর্তমান মার্কিন নীতি অর্থনৈতিক প্রণোদনা, চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসার ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রশাসন একই নীতি অনুসরণ করবে কি না, তার ওপর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।

রদ্রিগেজ এখন দাবি করছেন, তার লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করা, দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আনা এবং তেলের ওপর দেশের অতিনির্ভরতা কমানো।

কিন্তু এর বিনিময়ে যদি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ওয়াশিংটনের প্রভাব স্থায়ী হয়ে যায়, তাহলে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের সঙ্গে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিও সমানভাবে সামনে থাকবে।

কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে রদ্রিগেজের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিদায়ের সময় একটি প্রতীকী মন্তব্য করেছিলেন তিনি। নতুন করে চালু হওয়া বিমানপথে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেনেজুয়েলায় যেতে এখনো মাঝপথে বিমান বদলাতে হয়। রদ্রিগেজ হাসতে হাসতে ইঙ্গিত দিয়েছেন—ভবিষ্যতে হয়তো সরাসরি ওয়াশিংটন থেকে কারাকাসে যাওয়া সম্ভব হবে।

এই কথার মধ্যেই যেন ভেনেজুয়েলার নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি—একসময় যে দেশ ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, আজ তার ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ নির্ধারিত হচ্ছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই।

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দৌড়েও অবিশ্বাস্য গতি, রেকর্ড ভাঙল একের পর এক

মাদুরো পতনের পর ওয়াশিংটনের ছায়ায় ভেনেজুয়েলা, ক্ষমতার কেন্দ্রে দেলসি রদ্রিগেজ

০৭:৪৩:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে যেন রাতারাতি বদলে গেছে বহু বছরের সমীকরণ। যে দেশটি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা করে সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পথে এগিয়েছে, সেই দেশই এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে নজিরবিহীন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছেন দেশটির ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ—একসময় নিকোলাস মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী, আর এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের প্রধান কারিগর।

কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে বসে রদ্রিগেজ এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। প্রাসাদের অলংকৃত দেয়ালে সিমন বলিভার ও হুগো চাভেজের প্রতিকৃতি। অথচ সেই চাভেজপন্থী রাজনৈতিক ধারারই একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা আজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন এক সমঝোতা বাস্তবায়ন করছেন, যার ফলে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, তেল সম্পদ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ওয়াশিংটনের প্রভাব অভূতপূর্ব মাত্রায় পৌঁছেছে।

মাদুরোর পতন বদলে দিল সব হিসাব

রদ্রিগেজের ক্ষমতায় আসার পেছনে রয়েছে এক নাটকীয় ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যায়। মাদুরো এখন নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল কারাগারে রয়েছেন।

মাদুরোর পতনের আগে ভেনেজুয়েলা ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে ছিল। দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে দেশটির অর্থনীতি কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। মানুষের সঞ্চয়ের মূল্য মুছে যায়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট, পানির সংকট, ভেঙে পড়া হাসপাতাল এবং খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়।

দেশটির প্রায় ৮০ লাখ মানুষ বিভিন্ন সময়ে ভেনেজুয়েলা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এতে পশ্চিম গোলার্ধের ইতিহাসে অন্যতম বড় অভিবাসন সংকট তৈরি হয়।

মাদুরোর পতনের পর অবশ্য পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। কারাকাসে নতুন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, দোকানে পণ্যের সরবরাহ বেড়েছে এবং দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কিছু তেলক্ষেত্রে আবার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

তেলের বিনিময়ে নতুন সম্পর্ক

ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার দেশটির বিশাল তেলসম্পদ। আর এই তেলই ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন সমঝোতার অন্যতম মূল ভিত্তি।

যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় জ্বালানি কোম্পানি ভেনেজুয়েলায় ফিরে আসতে শুরু করেছে। নতুন বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে বাণিজ্যিক বিমান চলাচলও আবার শুরু হয়েছে। দেশটির অর্থনীতিতে মার্কিন মুদ্রার ব্যবহার এখন প্রকাশ্য।

নতুন ব্যবস্থায় ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি থেকে পাওয়া অর্থের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওয়াশিংটন অর্থের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করবে এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে সেই অর্থ ভেনেজুয়েলার ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ছাড় করা হবে।

এর ফলে দুর্নীতি কমানো এবং বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব সীমিত করার সুযোগ তৈরি হলেও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্নও উঠছে।

রদ্রিগেজের সঙ্গে রুবিওর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে রদ্রিগেজের প্রায় প্রতিদিন যোগাযোগ হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফোনকল ও বার্তায় দুই দেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

এমনকি ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ নিয়েও রদ্রিগেজ রুবিওর সঙ্গে পরামর্শ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস স্টোরির ভাষায়, ভেনেজুয়েলায় এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে যেখানে রদ্রিগেজের সরকার ক্ষমতায় থাকছে, কিন্তু একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন করছে।

এই বাস্তবতাই ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যত নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত করছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

মাদুরোর সহযোগী থেকে ওয়াশিংটনের অংশীদার

দেলসি রদ্রিগেজের রাজনৈতিক পরিচয় এই পরিবর্তনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।

তিনি হুগো চাভেজের রাজনৈতিক বলয়ের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন এবং দীর্ঘদিন মাদুরোর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং রাশিয়া, চীন, ইরান ও কিউবার সঙ্গে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক শক্তিশালী করেছেন।

২০১৮ সালে মাদুরো তাকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করেন।

কিন্তু রদ্রিগেজকে অনেক আন্তর্জাতিক কূটনীতিক বরাবরই কট্টর মতাদর্শী নেতার চেয়ে বাস্তববাদী ও অর্থনীতি বোঝেন এমন একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে দেখেছেন। তেল খাত ও বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভেনেজুয়েলা কেন গুরুত্বপূর্ণ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির তেল উৎপাদন বাড়লে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়তে পারে এবং জ্বালানির দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে রুবিও ভেনেজুয়েলাকে দেখেছেন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। চীন, রাশিয়া, কিউবা ও ইরানের সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ওয়াশিংটনের কাছে উদ্বেগের কারণ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের লক্ষ্য ছিল ভেনেজুয়েলাকে ওই বলয় থেকে বের করে এনে আবার মার্কিন প্রভাবের আওতায় নিয়ে আসা। মাদুরো সেই পথে যেতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তার ক্ষমতাচ্যুতি ঘটে।

মাদকবিরোধী অভিযানেও সহযোগিতা

কারাকাস ও ওয়াশিংটনের নতুন সম্পর্ক শুধু অর্থনীতি বা তেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুই দেশ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং মাদকবিরোধী অভিযানেও সহযোগিতা করছে।

জুনে আন্তঃদেশীয় অপরাধী সংগঠন ট্রেন দে আরাগুয়ার নেতা নিনো গুয়েরেরো ভেনেজুয়েলার একটি স্থাপনায় নিহত হন। রদ্রিগেজের দাবি, তার সরকার গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ওই ব্যক্তির অবস্থান শনাক্ত করতে সহায়তা করে এবং ভেনেজুয়েলার বাহিনীও অভিযানে ভূমিকা রাখে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী সামরিক অভিযানের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়েছে। সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌযানে মার্কিন হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধক্ষমতার সীমার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন।

গণতন্ত্র কোথায়?

অর্থনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—ভেনেজুয়েলা কি সত্যিই গণতন্ত্রের পথে ফিরছে?

রদ্রিগেজের সরকার রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে সাধারণ ক্ষমা আইন করেছে। সরকারি হিসাবে প্রায় ৯ হাজার বন্দি মুক্তি পেয়েছেন। রদ্রিগেজ জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরকে এসব মুক্তির প্রক্রিয়া পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়ার কথাও বলেছেন।

কিন্তু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সময়সূচি নেই।

রদ্রিগেজ বলেছেন, ভেনেজুয়েলা প্রস্তুত হলে নির্বাচন হবে। রাজনৈতিক পক্ষগুলো যখন সহাবস্থান ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পৌঁছাতে পারবে, তখনই সেই সময় আসবে বলে তার বক্তব্য।

এই অবস্থান নিয়ে বিরোধী নেতারা সন্তুষ্ট নন।

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো মনে করেন, শুধু স্থিতিশীলতা দিয়ে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও বৈধতা প্রতিষ্ঠা না হলে নতুন ব্যবস্থাও টেকসই হবে না।

রদ্রিগেজ কি নিজেই প্রেসিডেন্ট হতে চান?

রদ্রিগেজের নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তিনি ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।

বিরোধী নেতা মাচাদো দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, সেটিও তিনি স্পষ্ট করেননি।

তার বক্তব্য, ভেনেজুয়েলাকে একটি নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করতে হবে এবং এমন একটি সময় আসবে যখন রাজনৈতিক সহাবস্থান ও শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা সম্ভব হবে।

তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, গণতান্ত্রিক সংস্কারের পরিবর্তে রদ্রিগেজ মূলত নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং চাভেজপন্থী রাজনৈতিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চাইছেন।

Who is Delcy Rodriguez, Venezuela's new leader after Maduro's capture? | AP  News

ভূমিকম্পে নতুন সম্পর্কের পরীক্ষা

জুনে কারাকাসে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৬৭০ কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই দুর্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ৩০ কোটি ডলারের পুনর্গঠন সহায়তা দেয় এবং সামরিক সহায়তাও পাঠায়।

রদ্রিগেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের বাস্তব সুফল হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে ভূমিকম্পের পর দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে না আসায় রদ্রিগেজ নিজেও সমালোচনার মুখে পড়েন।

এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কি সাধারণ ভেনেজুয়েলাবাসীর জীবন বদলাবে, নাকি কেবল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী একটি শ্রেণি আরও শক্তিশালী হবে?

চাভেজের উত্তরাধিকার বনাম নতুন বাস্তবতা

রদ্রিগেজের জীবনের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তার বাবা হোর্হে আন্তোনিও রদ্রিগেজ ছিলেন বিপ্লবী বামপন্থী আন্দোলনের ছাত্রনেতা। ১৯৭৬ সালে সরকারি বাহিনীর হাতে তিনি গ্রেপ্তার, নির্যাতিত ও নিহত হন।

মাত্র সাত বছর বয়সে বাবাকে হারানো সেই মেয়েই পরে চাভেজ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হন এবং মাদুরোর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন হিসেবে পরিচিতি পান।

আজ সেই রদ্রিগেজই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন।

এই পরিবর্তন তাই শুধু একজন নেতার রাজনৈতিক রূপান্তর নয়; এটি ভেনেজুয়েলার গত দুই দশকের রাজনৈতিক দর্শনেরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দুই সরকারের ওপর

রদ্রিগেজের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভারসাম্য রক্ষা করা। তাকে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দাবি মেনে চলতে হচ্ছে, অন্যদিকে নিজের দেশের জনগণের কাছে সার্বভৌমত্ব রক্ষার বার্তা দিতে হচ্ছে।

আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট পদ শেষ হলে এই সম্পর্ক কতটা টিকে থাকবে।

বর্তমান মার্কিন নীতি অর্থনৈতিক প্রণোদনা, চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং কৌশলগত সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসার ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রশাসন একই নীতি অনুসরণ করবে কি না, তার ওপর ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।

রদ্রিগেজ এখন দাবি করছেন, তার লক্ষ্য ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করা, দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ আনা এবং তেলের ওপর দেশের অতিনির্ভরতা কমানো।

কিন্তু এর বিনিময়ে যদি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ওয়াশিংটনের প্রভাব স্থায়ী হয়ে যায়, তাহলে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের সঙ্গে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটিও সমানভাবে সামনে থাকবে।

কারাকাসের মিরাফ্লোরেস প্রাসাদে রদ্রিগেজের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিদায়ের সময় একটি প্রতীকী মন্তব্য করেছিলেন তিনি। নতুন করে চালু হওয়া বিমানপথে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভেনেজুয়েলায় যেতে এখনো মাঝপথে বিমান বদলাতে হয়। রদ্রিগেজ হাসতে হাসতে ইঙ্গিত দিয়েছেন—ভবিষ্যতে হয়তো সরাসরি ওয়াশিংটন থেকে কারাকাসে যাওয়া সম্ভব হবে।

এই কথার মধ্যেই যেন ভেনেজুয়েলার নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি—একসময় যে দেশ ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, আজ তার ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ নির্ধারিত হচ্ছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়েই।