মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়তে থাকায় বিশ্বের অতি ধনীদের বিলাসবহুল ইয়টের নতুন নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের দিকে এখন ঝুঁকছেন ইয়ট মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দুবাই থেকে অন্তত তিনটি বিশাল ইয়ট থাইল্যান্ডের পর্যটন দ্বীপ ফুকেটে তাদের নোঙর করার ঘাঁটি পরিবর্তন করেছে বলে জানিয়েছেন থাই বিলাসবহুল নৌযানসেবা প্রতিষ্ঠান ফ্লো ইয়ট ক্লাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা জিরাতিত থিনাকর্ন।
তিনি বলেন, ইয়ট মালিকেরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে তুলনামূলক নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করছেন। বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ায় নিরাপত্তার জন্য তারা প্রয়োজন হলে নিজেদের সম্পদ ও ব্যবসার অবস্থানও দ্রুত পরিবর্তন করতে পারছেন।
এশিয়ায় বাড়ছে অতি বিলাসবহুল ইয়ট
অন্তত ৩০ মিটার দীর্ঘ মোটরচালিত বা পালতোলা বড় ইয়টকে সাধারণত সুপারইয়ট বলা হয়। এসব নৌযানের একেকটির মূল্য কয়েক কোটি থেকে কয়েকশ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সক্রিয় সুপারইয়টের সংখ্যা ২০২৩ সালের ৪৪৫টি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫৮৬টিতে পৌঁছেছে। যদিও বিশ্বজুড়ে সক্রিয় ৬ হাজার ২৫১টি সুপারইয়টের তুলনায় এই সংখ্যা এখনো ১০ শতাংশের কম, তবু শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতি আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডকে আঞ্চলিক যাত্রাবিরতি ও দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুদ্ধের কারণে বাড়ছে বিমার খরচ
মধ্যপ্রাচ্যে ইয়ট পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে যুদ্ধঝুঁকির বিমা। পারস্য উপসাগরে সুপারইয়টের যুদ্ধঝুঁকি বিমার প্রিমিয়াম এখন কোনো কোনো ক্ষেত্রে জাহাজের মূল্যের ২ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। শান্তিকালীন সময়ে এই হার ছিল প্রায় শূন্য দশমিক ১২৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, ১০ কোটি ডলার মূল্যের একটি সুপারইয়ট পারস্য উপসাগরে একটি যাত্রা করলেই যুদ্ধঝুঁকির বিমা বাবদ প্রায় ২০ লাখ থেকে ৬০ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
বিমা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজের সাধারণ ক্ষয়ক্ষতির বিমা এবং যুদ্ধঝুঁকির বিমা আলাদা। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকির বিমা আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। ফলে অনেক ইয়ট মালিক ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে যাতায়াত কমিয়ে দিচ্ছেন।
দুবাইয়ের বদলে নজর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়
বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দুবাই ছিল সম্পদ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের অন্যতম আকর্ষণীয় কেন্দ্র। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত সেই নিরাপত্তাবোধে পরিবর্তন এনেছে।
সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ওকোরিয়ানের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তা রবিন হ্যারিস বলেন, মধ্যপ্রাচ্যকে যখন আর নিরপেক্ষ ও নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে মনে হয় না, তখন ইয়ট মালিকেরা স্বাভাবিকভাবেই পূর্ব দিকে তাকাতে শুরু করেন।
সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার কয়েকটি বন্দর এখন দুবাইয়ের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি ও নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরে ইয়ট ব্যবসার জমজমাট আয়োজন
এপ্রিল মাসে সিঙ্গাপুরের সেন্টোসা দ্বীপে অনুষ্ঠিত বার্ষিক ইয়ট উৎসবে বিলাসবহুল নৌযান শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাবনাময় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে নানা আয়োজন করে।
কেউ সংগীত পরিবেশনের ব্যবস্থা করেছে, কেউ খাবার ও আড্ডার আয়োজন করেছে। ইতালির বিখ্যাত ইয়ট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বেনেত্তি সরাসরি নৌযান প্রদর্শন না করেও নিজেদের কর্মকর্তাদের পাঠায় এবং বিভিন্ন মডেলের নকশা প্রদর্শন করে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।
আরেক ইতালীয় প্রতিষ্ঠান আজিমুট সিঙ্গাপুরের ওই প্রদর্শনীতে তিনটি মডেল উপস্থাপন করে। প্রদর্শনীর পর প্রতিষ্ঠানটি কয়েকটি নতুন ব্যবসায়িক আলোচনাতেও যায়।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সিঙ্গাপুর শুধু ইয়ট রাখার জায়গা নয়; এটি এশিয়ার ধনী ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। উন্নত নৌবন্দর, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, কারিগরি সহায়তা এবং সহজ মালিকানা ব্যবস্থার কারণে দেশটির আকর্ষণ বাড়ছে।
ইয়টের বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ
সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বিলাসবহুল নৌযান নির্মাতা গ্র্যান্ড ব্যাংকস ইয়টসের শেয়ারের দাম বছরের প্রথম দিকে কমে গেলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়।
আগস্টের শুরু পর্যন্ত এক বছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে প্রতিষ্ঠানটি ১২টি নতুন নৌযানের অর্ডার পেয়েছে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে অর্ডার ছিল ১১টি।
এতে বোঝা যাচ্ছে, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও নিরাপদ অঞ্চলে বিলাসবহুল ইয়টের বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ায় সবচেয়ে বেশি সুপারইয়ট
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সুপারইয়টের ঘাঁটি হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বেশি ১২৭টি সুপারইয়ট রয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়। মালয়েশিয়ায় রয়েছে ৯০টি, থাইল্যান্ডে ৮৭টি, সিঙ্গাপুরে ৬৫টি এবং ফিলিপাইনে ৩৭টি।
সিঙ্গাপুরের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা দেশটির আইনের প্রতি আস্থা, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং উন্নত অবকাঠামোর কথা বলছেন।
বাড়ছে অর্থপাচারের ঝুঁকিও
তবে বিলাসবহুল ইয়টের বাজার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে অর্থপাচারের ঝুঁকি। বিপুল মূল্যের সম্পদ হওয়ায় ইয়টকে অবৈধ অর্থ গোপন বা বৈধ করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
সিঙ্গাপুরেও এর নজির রয়েছে। দেশটির সবচেয়ে বড় অর্থপাচার মামলার সঙ্গে যুক্ত একটি ইয়ট সেন্টোসায় নোঙর করেছিল। গত বছরের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরের কর্তৃপক্ষ কম্বোডিয়ার ব্যবসায়ী চেন ঝি ও তার প্রিন্স গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৫ কোটি সিঙ্গাপুর ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ জব্দ বা হিমায়িত করে। ওই সম্পদের মধ্যে একটি ইয়টও ছিল।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, ইয়ট ব্যবসায় কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বাজারের দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি অবৈধ অর্থের ঝুঁকি বাড়লে পুরো শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে নিরাপদ নোঙর, তুলনামূলক কম যুদ্ধঝুঁকি এবং উন্নত সামুদ্রিক অবকাঠামোর কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইয়ট বাজার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















