২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে আবারও সামনে এসেছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রশ্ন। প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্পষ্ট করে বলেছেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। আর্টিকেল ৭০ অপরিবর্তিত থাকায় কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে। এই বক্তব্য শুধু আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নয়, সংসদ সদস্যদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রকৃতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
দলীয় সিদ্ধান্ত বনাম ব্যক্তিগত ভোটাধিকার
সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ কক্ষেই ব্যালটের মাধ্যমে ভোট হবে এবং সদস্যরা তাদের বিভাজন ও আসন নম্বর অনুযায়ী ভোট দেবেন।
কিন্তু ভোটের প্রক্রিয়া যতটা আনুষ্ঠানিক, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জায়গাটি ততটাই দলনির্ভর। প্রধান হুইপের বক্তব্য অনুযায়ী, ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় সংসদ সদস্যদের সামনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নিজস্ব অবস্থান জানানোর সুযোগ নেই। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সাংবিধানিক অধিকার থাকলেও সেই ভোটের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কার্যত দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
এই বাস্তবতাই নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে। একটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যদি সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দের পরিবর্তে দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ভোটের প্রকৃত রাজনৈতিক পরিসর কতটা বিস্তৃত—সেটি নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি
সংসদে অনুষ্ঠিত প্রস্তুতি বৈঠকে নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লজিস্টিক ব্যবস্থা, সংসদ কক্ষ ব্যবহারের প্রস্তুতি এবং সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয় আলোচনা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের ঐতিহাসিক মুহূর্তে ২০২৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
প্রধান হুইপ জানিয়েছেন, বিএনপির প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দলটি প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছে এবং তিনিই প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবেন। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ ইতোমধ্যে প্রার্থী মনোনীত করেছে।

বিরোধীদের অবস্থান
বিরোধী প্রধান হুইপ নাহিদ ইসলাম মনে করেন, ‘জুলাই সনদ’-এর আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা আরও বাড়ত। তবে নির্বাচন যেহেতু অনুষ্ঠিত হচ্ছেই, বিরোধীরা এটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন রাখতে চাননি।
বিরোধী জোট কর্নেল (অব.) অলি আহমেদকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। নাহিদ ইসলামের দাবি, বর্তমান সময়ে তাদের প্রার্থীই বাংলাদেশের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অভিভাবক হতে পারেন।
এখানেই আর্টিকেল ৭০ নিয়ে বিতর্কটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আলোচ্য ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়িত হলে অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ তৈরির কথা রয়েছে। তবে বিএনপি প্রস্তাবিত ব্যতিক্রমের তালিকায় সাংবিধানিক সংশোধন এবং যুদ্ধকালীন জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়ও যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
ভোটের ফলও হবে নজরকাড়া
প্রধান হুইপ জানিয়েছেন, মোট ৩৪৯টি ভোট প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই দেওয়া হয়ে গেলে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফল ঘোষণা করা হতে পারে। তবে একটি ভোটও বাকি থাকলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে। ভোট শেষ হওয়ার পর গণনা এবং ফল ঘোষণার প্রক্রিয়াও সরাসরি সম্প্রচারের সম্ভাবনা রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা ও ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের ভোট সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
সব মিলিয়ে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর মধ্য দিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে দলীয় সিদ্ধান্ত, এমপিদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক চরিত্র—এই তিনটি বিষয়ই নতুন করে আলোচনায় আসছে। আর্টিকেল ৭০ অপরিবর্তিত থাকায় এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটের স্বাধীনতার সীমারেখাটিও স্পষ্ট হয়ে গেছে।
২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে আর্টিকেল ৭০-এর অধীনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে এমপিদের ভোট দেওয়ার সুযোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















