০৬:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
মক্কা চুক্তিতে মিসরকে সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে চান এরদোয়ান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস বাংলাদেশের, ৯ উইকেটের অবিশ্বাস্য জয় পেনাল্টি মিসের হ্যাটট্রিক, মেসির মায়ামির টানা তৃতীয় হার ফিলিস্তিনিদের পানিতে বসতি স্থাপনকারীদের সুইমিংপুল, পশ্চিম তীরে নতুন ‘পানিযুদ্ধ’ ল্যাম্বরগিনির সবচেয়ে শক্তিশালী উৎপাদন গাড়ি, নতুন রেভুয়েলতো এসভি-তে গতি ও প্রযুক্তির বিস্ময় কাতারের হাতে ইরানি যুদ্ধবিমান চালকদের আটকের দাবি, সরাসরি অস্বীকার দোহার কূটনীতি নয়, রাজনৈতিক উসকানি তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা আপাতত বাতিল করলো ঢাকা আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন মানচিত্র সীমান্তে ফের পুশইনের চেষ্টা, চারজনকে ঠেকিয়ে দিল বিজিবি

কূটনীতি নয়, রাজনৈতিক উসকানি

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই ব্রাজিলের সাও পাওলোতে গিয়ে এমনভাবে কথা বললেন, যেন তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে নয়, নিজের নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন। ২৫ জুলাই ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সূচনাপর্বে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি ব্রাজিলের সরকারকে ‘চোর সমাজতন্ত্রীদের’ সমষ্টি হিসেবে আখ্যায়িত করেন, প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে চোর ও দণ্ডিত ব্যক্তি বলে আক্রমণ করেন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েসকেও লক্ষ্য করেন।

ব্রাজিলের প্রতিক্রিয়াও দ্রুত আসে। দেশটি আর্জেন্টিনা থেকে রাষ্ট্রদূতকে পরামর্শের জন্য ডেকে নেয় এবং ব্রাসিলিয়ায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে।

পরদিন মাইলেই আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেন, বিশ্বকাপ চলাকালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে অনলাইন প্রচারণায় ব্রাজিল, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টি অর্থায়ন করেছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এর ২৫ শতাংশ অর্থ এসেছে ব্রাজিল থেকে। কিন্তু এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।

ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি পরিচিত রাজনৈতিক কৌশল স্পষ্ট। প্রথমে উসকানি, তারপর প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ, এরপর সেই প্রতিবাদকেই নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে হাজির করা। ফলে বিরোধিতা হয়ে ওঠে নিপীড়নের গল্প, আর নিজের তৈরি সংকটই ফিরে আসে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘আক্রমণের শিকার’ প্রেসিডেন্টের প্রমাণ হিসেবে।

নির্বাচনী রাজনীতির ভাষা যখন রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে ঢোকে

মাইলেইর রাজনৈতিক সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি এমন একটি ভাষা ব্যবহার করেন, যা প্রচলিত রাজনীতিতে উপেক্ষিত বা অপমানিত বোধ করা মানুষের ক্ষোভকে সরাসরি প্রকাশ করে। তাঁর আক্রমণাত্মক বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের কাছে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শ্রেণির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।

এই কৌশলের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধরনটির সঙ্গেও মিল আছে। যত বেশি বিরোধিতা, তত বেশি সেই বিরোধিতাকে নিজের অবস্থানের সঠিকতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। প্রচলিত রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভাঙা তখন দুর্বলতা নয়, বরং ‘এলিট’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিচয় হয়ে ওঠে।

কিন্তু নির্বাচনী মঞ্চে যে কৌশল কার্যকর, রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে সেটি বিপজ্জনক হতে পারে।

ব্রাজিলের কোনো মন্ত্রী কেবল সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বক্তব্যের কারণে বাণিজ্যনীতি বদলাবেন না। লুলাও মাইলেইর সমর্থকদের আনন্দ দেওয়ার মতো অপমান শুনে আর্জেন্টিনার জন্য ছাড় দেবেন না। দেশের অভ্যন্তরে এমন বক্তব্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ দিতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ফল হতে পারে সম্পূর্ণ বিপরীত।

সাও পাওলোর বক্তব্য তাই কোনো সুপরিকল্পিত দর-কষাকষির অংশের চেয়ে বরং আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি সম্প্রসারিত পর্ব বলেই বেশি মনে হয়।

রাষ্ট্রগুলো প্রচারণার পোস্টার নয়

মাইলেইর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে জটিল রাষ্ট্রীয় বাস্তবতাকে সহজ রাজনৈতিক উদাহরণে পরিণত করার প্রবণতা রয়েছে। ভেনেজুয়েলা ও কিউবা তাঁর কাছে বাম রাজনীতির পরিণতির উদাহরণ, আর সুইজারল্যান্ড মুক্তবাজার অর্থনীতির সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু কোনো দেশের অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামোকে একটি মাত্র রাজনৈতিক লেবেলে আটকে দিলে বাস্তবতার বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।

সুইজারল্যান্ডের সমৃদ্ধিকে কেবল কম কর বা বাজারের স্বাধীনতার ফল হিসেবে দেখানো যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি দেশটির শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিমা, বিস্তৃত অবকাঠামো এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করাও বাস্তবতাকে সরলীকরণ।

পেরুর অভিজ্ঞতাও একই প্রশ্ন তোলে। দেশটি দীর্ঘদিন বাজারমুখী নীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা অনুসরণ করেছে। তবু ব্যাপক অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের দুর্বল উপস্থিতি রয়ে গেছে। বাজারমুখী সংস্কার পেরুর সব সমস্যার কারণ নয়, কিন্তু সেগুলোও এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেনি, যা সুইজারল্যান্ডের সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনীয়।

জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকের শীর্ষে থাকা নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডস আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে। এসব দেশ পুঁজিবাদী অর্থনীতি পরিচালনা করলেও তাদের বড় কল্যাণমূলক রাষ্ট্র, শক্তিশালী সরকারি সেবা ও ব্যাপক সামাজিক সুরক্ষা রয়েছে। তারা সমাজতান্ত্রিক কমান্ড অর্থনীতি নয়, আবার রাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়ার পরীক্ষাও নয়।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের সাফল্যকে একটি রাজনৈতিক স্লোগানে ব্যাখ্যা করা যায় না। ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি—সবকিছুর সমন্বয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়।

প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত পছন্দ আর জাতীয় স্বার্থ এক নয়

একজন আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট লুলার সমালোচনা করতেই পারেন। ব্রাজিলের সঙ্গে বাণিজ্য, আঞ্চলিক নীতি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে তাঁর আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানের সমালোচনার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।

সাও পাওলোর ঘটনায় সেই সম্পর্কটি স্পষ্ট নয়। মাইলেই ব্রাজিলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার বাণিজ্য বিরোধ মেটাতে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান তুলে ধরেননি, কিংবা মারকোসুর নিয়ে চলমান সমস্যার সমাধানে কোনো নতুন পথ দেখাননি। বরং তিনি ব্রাজিলের নির্বাচনে নিজের পছন্দের রাজনৈতিক মিত্র ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন।

এখানেই মূল সমস্যা। কোনো বিদেশি নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত বা আদর্শিক সম্পর্ক থাকা এক বিষয়; সেই সম্পর্ককে জাতীয় স্বার্থের সমার্থক ধরে নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

আর্জেন্টিনার সংবিধানের ৯৯ নম্বর অনুচ্ছেদের ১১ নম্বর ধারায় প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনা ও চুক্তির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিদেশে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে থাকে না। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর কথার সঙ্গে আর্জেন্টিনা রাষ্ট্রের অবস্থানের ছাপ যুক্ত হয়।

ব্রাজিলের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও বড়। দেশটি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অংশীদার। শুধু জুন মাসেই দুই দেশের সম্মিলিত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সীমান্ত পেরিয়ে অটো পার্টস, শস্য ও জ্বালানি যায়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য ব্যবসা, শ্রমিক এবং প্রাদেশিক অর্থনীতি।

এই সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আঞ্চলিক জোট মারকোসুরের কাঠামোর মধ্যেও দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর্জেন্টিনার পৃথক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ব্রাজিলের উদ্বেগ রয়েছে, কারণ সেটি জোটের বিদ্যমান নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে বুয়েনস আয়ার্স ও ব্রাসিলিয়ার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ আরও বেশি প্রয়োজন।

রাজনৈতিক উত্তেজনা সেই যোগাযোগকে সহজ করে না।

আর্জেন্টিনা কী পেল?

মাইলেইর সমর্থকেরা বলতে পারেন, প্রচলিত কূটনৈতিক ভদ্রতা অনেক সময় ভণ্ডামিতে পরিণত হয়। আগের নেতারা হয়তো প্রকাশ্যে হাসিমুখে ছবি তুলেছেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে একে অন্যকে অপছন্দ করেছেন। মাইলেই অন্তত নিজের কথা সরাসরি বলেন।

এই যুক্তির একটি ভিত্তি আছে। রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে অতিরিক্ত সৌজন্য কখনো কখনো বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করতে পারে। কিন্তু খোলামেলা কথা বলা আর কার্যকর কূটনৈতিক কৌশল এক জিনিস নয়।

প্রশ্ন হলো—কঠোর ভাষা ব্যবহার করে আর্জেন্টিনা কী অর্জন করল?

মাইলেই কি কোনো বাণিজ্যিক ছাড় পেলেন? মারকোসুরের বিরোধে আর্জেন্টিনার অবস্থান কি শক্তিশালী হলো? ব্রাজিলের সঙ্গে নতুন কোনো আলোচনার দরজা খুলল? নাকি কেবল এমন একটি বিরোধ তৈরি হলো, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করল?

যদি উদ্দেশ্য জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হয়, তাহলে কূটনীতির সাফল্য মাপতে হবে ফল দিয়ে। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা জোরালোভাবে প্রকাশ করা গেল, সেটি দিয়ে নয়।

মাইলেইর জন্য সমস্যা হলো, সংঘাতের রাজনীতি দেশের ভেতরে এখনও লাভজনক। ব্রাজিলের প্রতিবাদকে তিনি চাইলে নিজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বামপন্থী ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারকেও তিনি এমন একটি গল্পে পরিণত করতে পারেন, যেখানে তিনি একজন সাহসী নেতা এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলো তাঁর বিরুদ্ধে।

এই গল্পটি রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে।

কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থের বিচারে হিসাবটি ভিন্ন।

সাও পাওলোর মঞ্চে হয়তো মাইলেই তাঁর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস পেয়েছেন। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস আর্জেন্টিনার জন্য কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা, কূটনৈতিক প্রভাব বা আঞ্চলিক সমঝোতায় রূপ নেয়নি। বরং দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে একটি নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি মাইলেই কী বললেন, তা নয়; বরং তাঁর বক্তব্যের বিনিময়ে আর্জেন্টিনা কী পেল।

রাজনৈতিক মঞ্চে করতালির মালিক হতে পারেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সেই করতালির পর যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হয়, তার দায় বহন করে পুরো দেশ।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

মক্কা চুক্তিতে মিসরকে সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে চান এরদোয়ান

কূটনীতি নয়, রাজনৈতিক উসকানি

০৫:০৫:৩৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই ব্রাজিলের সাও পাওলোতে গিয়ে এমনভাবে কথা বললেন, যেন তিনি কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে নয়, নিজের নির্বাচনী প্রচারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন। ২৫ জুলাই ফ্লাভিও বলসোনারোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সূচনাপর্বে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি ব্রাজিলের সরকারকে ‘চোর সমাজতন্ত্রীদের’ সমষ্টি হিসেবে আখ্যায়িত করেন, প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে চোর ও দণ্ডিত ব্যক্তি বলে আক্রমণ করেন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আলেকজান্দ্রে দে মোরায়েসকেও লক্ষ্য করেন।

ব্রাজিলের প্রতিক্রিয়াও দ্রুত আসে। দেশটি আর্জেন্টিনা থেকে রাষ্ট্রদূতকে পরামর্শের জন্য ডেকে নেয় এবং ব্রাসিলিয়ায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে।

পরদিন মাইলেই আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেন, বিশ্বকাপ চলাকালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে অনলাইন প্রচারণায় ব্রাজিল, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টি অর্থায়ন করেছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এর ২৫ শতাংশ অর্থ এসেছে ব্রাজিল থেকে। কিন্তু এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।

ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি পরিচিত রাজনৈতিক কৌশল স্পষ্ট। প্রথমে উসকানি, তারপর প্রতিপক্ষের প্রতিবাদ, এরপর সেই প্রতিবাদকেই নিজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে হাজির করা। ফলে বিরোধিতা হয়ে ওঠে নিপীড়নের গল্প, আর নিজের তৈরি সংকটই ফিরে আসে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘আক্রমণের শিকার’ প্রেসিডেন্টের প্রমাণ হিসেবে।

নির্বাচনী রাজনীতির ভাষা যখন রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে ঢোকে

মাইলেইর রাজনৈতিক সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি এমন একটি ভাষা ব্যবহার করেন, যা প্রচলিত রাজনীতিতে উপেক্ষিত বা অপমানিত বোধ করা মানুষের ক্ষোভকে সরাসরি প্রকাশ করে। তাঁর আক্রমণাত্মক বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের কাছে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শ্রেণির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক।

এই কৌশলের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধরনটির সঙ্গেও মিল আছে। যত বেশি বিরোধিতা, তত বেশি সেই বিরোধিতাকে নিজের অবস্থানের সঠিকতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। প্রচলিত রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভাঙা তখন দুর্বলতা নয়, বরং ‘এলিট’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিচয় হয়ে ওঠে।

কিন্তু নির্বাচনী মঞ্চে যে কৌশল কার্যকর, রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে সেটি বিপজ্জনক হতে পারে।

ব্রাজিলের কোনো মন্ত্রী কেবল সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বক্তব্যের কারণে বাণিজ্যনীতি বদলাবেন না। লুলাও মাইলেইর সমর্থকদের আনন্দ দেওয়ার মতো অপমান শুনে আর্জেন্টিনার জন্য ছাড় দেবেন না। দেশের অভ্যন্তরে এমন বক্তব্য তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভ দিতে পারে, কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার ফল হতে পারে সম্পূর্ণ বিপরীত।

সাও পাওলোর বক্তব্য তাই কোনো সুপরিকল্পিত দর-কষাকষির অংশের চেয়ে বরং আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি সম্প্রসারিত পর্ব বলেই বেশি মনে হয়।

রাষ্ট্রগুলো প্রচারণার পোস্টার নয়

মাইলেইর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে জটিল রাষ্ট্রীয় বাস্তবতাকে সহজ রাজনৈতিক উদাহরণে পরিণত করার প্রবণতা রয়েছে। ভেনেজুয়েলা ও কিউবা তাঁর কাছে বাম রাজনীতির পরিণতির উদাহরণ, আর সুইজারল্যান্ড মুক্তবাজার অর্থনীতির সাফল্যের প্রতীক। কিন্তু কোনো দেশের অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামোকে একটি মাত্র রাজনৈতিক লেবেলে আটকে দিলে বাস্তবতার বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।

সুইজারল্যান্ডের সমৃদ্ধিকে কেবল কম কর বা বাজারের স্বাধীনতার ফল হিসেবে দেখানো যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি দেশটির শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিমা, বিস্তৃত অবকাঠামো এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করাও বাস্তবতাকে সরলীকরণ।

পেরুর অভিজ্ঞতাও একই প্রশ্ন তোলে। দেশটি দীর্ঘদিন বাজারমুখী নীতি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা অনুসরণ করেছে। তবু ব্যাপক অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের দুর্বল উপস্থিতি রয়ে গেছে। বাজারমুখী সংস্কার পেরুর সব সমস্যার কারণ নয়, কিন্তু সেগুলোও এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেনি, যা সুইজারল্যান্ডের সাফল্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনীয়।

জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচকের শীর্ষে থাকা নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন ও নেদারল্যান্ডস আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে। এসব দেশ পুঁজিবাদী অর্থনীতি পরিচালনা করলেও তাদের বড় কল্যাণমূলক রাষ্ট্র, শক্তিশালী সরকারি সেবা ও ব্যাপক সামাজিক সুরক্ষা রয়েছে। তারা সমাজতান্ত্রিক কমান্ড অর্থনীতি নয়, আবার রাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়ার পরীক্ষাও নয়।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের সাফল্যকে একটি রাজনৈতিক স্লোগানে ব্যাখ্যা করা যায় না। ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি—সবকিছুর সমন্বয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়।

প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত পছন্দ আর জাতীয় স্বার্থ এক নয়

একজন আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট লুলার সমালোচনা করতেই পারেন। ব্রাজিলের সঙ্গে বাণিজ্য, আঞ্চলিক নীতি কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে তাঁর আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্রপ্রধানের সমালোচনার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থের একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।

সাও পাওলোর ঘটনায় সেই সম্পর্কটি স্পষ্ট নয়। মাইলেই ব্রাজিলের সঙ্গে আর্জেন্টিনার বাণিজ্য বিরোধ মেটাতে কোনো নির্দিষ্ট অবস্থান তুলে ধরেননি, কিংবা মারকোসুর নিয়ে চলমান সমস্যার সমাধানে কোনো নতুন পথ দেখাননি। বরং তিনি ব্রাজিলের নির্বাচনে নিজের পছন্দের রাজনৈতিক মিত্র ফ্লাভিও বলসোনারোর পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন।

এখানেই মূল সমস্যা। কোনো বিদেশি নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত বা আদর্শিক সম্পর্ক থাকা এক বিষয়; সেই সম্পর্ককে জাতীয় স্বার্থের সমার্থক ধরে নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

আর্জেন্টিনার সংবিধানের ৯৯ নম্বর অনুচ্ছেদের ১১ নম্বর ধারায় প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় আলোচনা ও চুক্তির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বিদেশে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য কেবল ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে থাকে না। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর কথার সঙ্গে আর্জেন্টিনা রাষ্ট্রের অবস্থানের ছাপ যুক্ত হয়।

ব্রাজিলের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা আরও বড়। দেশটি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অংশীদার। শুধু জুন মাসেই দুই দেশের সম্মিলিত বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সীমান্ত পেরিয়ে অটো পার্টস, শস্য ও জ্বালানি যায়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য ব্যবসা, শ্রমিক এবং প্রাদেশিক অর্থনীতি।

এই সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আঞ্চলিক জোট মারকোসুরের কাঠামোর মধ্যেও দুই দেশ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আর্জেন্টিনার পৃথক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ব্রাজিলের উদ্বেগ রয়েছে, কারণ সেটি জোটের বিদ্যমান নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে বুয়েনস আয়ার্স ও ব্রাসিলিয়ার মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ আরও বেশি প্রয়োজন।

রাজনৈতিক উত্তেজনা সেই যোগাযোগকে সহজ করে না।

আর্জেন্টিনা কী পেল?

মাইলেইর সমর্থকেরা বলতে পারেন, প্রচলিত কূটনৈতিক ভদ্রতা অনেক সময় ভণ্ডামিতে পরিণত হয়। আগের নেতারা হয়তো প্রকাশ্যে হাসিমুখে ছবি তুলেছেন, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে একে অন্যকে অপছন্দ করেছেন। মাইলেই অন্তত নিজের কথা সরাসরি বলেন।

এই যুক্তির একটি ভিত্তি আছে। রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে অতিরিক্ত সৌজন্য কখনো কখনো বাস্তব সমস্যাকে আড়াল করতে পারে। কিন্তু খোলামেলা কথা বলা আর কার্যকর কূটনৈতিক কৌশল এক জিনিস নয়।

প্রশ্ন হলো—কঠোর ভাষা ব্যবহার করে আর্জেন্টিনা কী অর্জন করল?

মাইলেই কি কোনো বাণিজ্যিক ছাড় পেলেন? মারকোসুরের বিরোধে আর্জেন্টিনার অবস্থান কি শক্তিশালী হলো? ব্রাজিলের সঙ্গে নতুন কোনো আলোচনার দরজা খুলল? নাকি কেবল এমন একটি বিরোধ তৈরি হলো, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করল?

যদি উদ্দেশ্য জাতীয় স্বার্থ রক্ষা হয়, তাহলে কূটনীতির সাফল্য মাপতে হবে ফল দিয়ে। নিজের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা জোরালোভাবে প্রকাশ করা গেল, সেটি দিয়ে নয়।

মাইলেইর জন্য সমস্যা হলো, সংঘাতের রাজনীতি দেশের ভেতরে এখনও লাভজনক। ব্রাজিলের প্রতিবাদকে তিনি চাইলে নিজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বামপন্থী ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারকেও তিনি এমন একটি গল্পে পরিণত করতে পারেন, যেখানে তিনি একজন সাহসী নেতা এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলো তাঁর বিরুদ্ধে।

এই গল্পটি রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে।

কিন্তু রাষ্ট্রের স্বার্থের বিচারে হিসাবটি ভিন্ন।

সাও পাওলোর মঞ্চে হয়তো মাইলেই তাঁর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস পেয়েছেন। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস আর্জেন্টিনার জন্য কোনো বাণিজ্যিক সুবিধা, কূটনৈতিক প্রভাব বা আঞ্চলিক সমঝোতায় রূপ নেয়নি। বরং দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে একটি নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি মাইলেই কী বললেন, তা নয়; বরং তাঁর বক্তব্যের বিনিময়ে আর্জেন্টিনা কী পেল।

রাজনৈতিক মঞ্চে করতালির মালিক হতে পারেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সেই করতালির পর যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হয়, তার দায় বহন করে পুরো দেশ।