১৯৮১ সালের সেই রক্তাক্ত দিনটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এখনো এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালানো জন হিঙ্কলি জুনিয়র চার দশকের বেশি সময় পর আবারও জনসমক্ষে এসে নিজের অতীতকে নতুনভাবে তুলে ধরছেন। আর বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না রিগ্যানের মেয়ে প্যাটি ডেভিস।
ডেভিসের অভিযোগ, হিঙ্কলি এখন নিজের অতীতের ভয়াবহতাকে আড়াল করে নিজেকে বদলে যাওয়া একজন মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তাঁর সাম্প্রতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে উপস্থিতিকে তিনি অনুতাপের প্রকাশ নয়, বরং আত্মপ্রচারের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
আবারও আলোচনার কেন্দ্রে হিঙ্কলি
১৯৮১ সালের মার্চে ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন জন হিঙ্কলি জুনিয়র। সেই হামলায় রিগ্যান গুরুতর আহত হন। তাঁর পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব জেমস ব্র্যাডি, পুলিশ কর্মকর্তা থমাস ডেলাহ্যান্টি এবং গোপন সেবা সংস্থার কর্মকর্তা টিমোথি ম্যাকার্থিও গুলিবিদ্ধ হন।
হামলার পর হিঙ্কলিকে মানসিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। দীর্ঘ কয়েক দশক চিকিৎসা ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর ২০১৬ সালে তিনি হাসপাতাল থেকে পুরোপুরি মুক্ত জীবনে ফিরে আসেন।
এরপর বিভিন্ন সময়ে তাঁর ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল হয়েছে। আর প্রতিবারই রিগ্যানের পরিবারের পক্ষ থেকে সেই ১৯৮১ সালের ঘটনার ভয়াবহতা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের ওপর হামলার পরও প্রকাশ্যে এসেছিলেন
দুই বছর আগে নির্বাচনী প্রচারের সময় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলার পর হিঙ্কলি একটি সাক্ষাৎকারে নিজের অতীত নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, তিনি বদলে গেছেন এবং ১৯৮১ সালের ঘটনার জন্য অনুতপ্ত।
সম্প্রতি আবারও তিনি একটি আলোচনামূলক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসে বিশেষ করে রোনাল্ড রিগ্যান ও তৎকালীন সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভের ১৯৮৬ সালের রেইকিয়াভিক বৈঠক নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র মুক্তির প্রাক্কালে।
হিঙ্কলি সেই সময়ের অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। এমনকি অভিনেত্রী জোডি ফস্টারের প্রতিও শুভকামনা জানিয়েছেন তিনি। অথচ ১৯৮১ সালের হামলার পেছনে ফস্টারকে প্রভাবিত করার আকাঙ্ক্ষা ছিল বলে হিঙ্কলি নিজেই জানিয়েছিলেন।
এই আচরণই রিগ্যানের মেয়ে প্যাটি ডেভিসের কাছে বিশেষভাবে অস্বস্তিকর বলে মনে হয়েছে।
‘অনুতাপ নয়, আত্মপ্রচার’
ডেভিসের মতে, সময় পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের ভয়াবহ ঘটনাগুলো মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে পারে। কিন্তু একটি হামলার কারণে যে মানুষগুলোর জীবন চিরতরে বদলে গেছে, তাঁদের কথা ভুলে গেলে সেই ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তাঁর বাবা রোনাল্ড রিগ্যান সেই হামলার পর হিঙ্কলিকে একজন ‘বিভ্রান্ত তরুণ’ হিসেবে দেখেছিলেন এবং তাঁকে ক্ষমা করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছিলেন। রিগ্যান বিশ্বাস করতেন, বেঁচে থাকার পেছনে তাঁর একটি উদ্দেশ্য রয়েছে—বিশ্বকে আরও নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করে তোলা।
কিন্তু মেয়ের অবস্থান ভিন্ন। ডেভিস মনে করেন, ক্ষমা করা সম্ভব হলেও তার অর্থ এই নয় যে অপরাধের ভয়াবহতা ভুলে যেতে হবে।
তিনি বিশ্বাস করেন মানুষ বদলাতে পারে। তবে হিঙ্কলির ক্ষেত্রে সেই পরিবর্তন নিয়ে তাঁর গভীর সন্দেহ রয়েছে।
একটি গুলির ক্ষত, আজীবনের যন্ত্রণা
হিঙ্কলির গুলিটি রোনাল্ড রিগ্যানের হৃদপিণ্ড থেকে মাত্র এক ইঞ্চি দূরে গিয়ে থেমেছিল। প্রেসিডেন্ট বেঁচে গেলেও হামলার অন্য শিকারদের জীবন আর কখনো আগের মতো হয়নি।
জেমস ব্র্যাডির মাথায় গুলি লেগেছিল। গুরুতর সেই আঘাতের পর তিনি আর আগের মানুষটি ছিলেন না। তাঁর পরিবারও হারিয়েছিল বহু বছরের স্বাভাবিক জীবন।
পুলিশ কর্মকর্তা থমাস ডেলাহ্যান্টির ঘাড়ে গুলি লাগে। পরে তাঁকে পুলিশ বাহিনী থেকে অবসর নিতে হয়। গোপন সেবা সংস্থার কর্মকর্তা টিমোথি ম্যাকার্থির বুকেও গুলি লাগে এবং সেই দিনের ক্ষতচিহ্ন তিনি সারা জীবন বহন করেছেন।
ডেভিস মনে করিয়ে দিয়েছেন, হিঙ্কলি একটি নিখুঁত সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন না। তিনি বারবার গুলি চালিয়েছিলেন। সেই গুলিতে শুধু তাঁর বাবা নন, আরও তিনজন আহত হন।
ইতিহাস বদলে ফেলার সুযোগ নয়
ডেভিসের সবচেয়ে বড় আপত্তি এখানেই—১৯৮১ সালের ঘটনাকে কেবল একজন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তরুণের ব্যক্তিগত সংকট হিসেবে দেখানো হলে সেই হামলার প্রকৃত চরিত্র আড়াল হয়ে যায়।
তাঁর মতে, সেটি ছিল একজন প্রেসিডেন্টকে হত্যা করার ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা। সেই হামলার শিকারদের পরিবার আজও তার ফল বয়ে চলেছে।
হিঙ্কলি এখন স্বাধীন মানুষ। কিন্তু জেমস ব্র্যাডির সন্তানরা তাঁদের বাবার সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার স্মৃতি থেকে কখনো মুক্ত হতে পারবেন না। একইভাবে সেই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের কাছেও ১৯৮১ সালের দিনটি অতীতের কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
স্মৃতি মুছে গেলে ইতিহাসও বদলে যায়
চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো সেই দিনের কথা মনে রাখে না, কেউ কেউ তখন জন্মই নেয়নি। কিন্তু ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো কেবল পুরোনো হয়ে যাওয়ার কারণে তাদের গুরুত্ব হারায় না।
রোনাল্ড রিগ্যানের ওপর হামলা শুধু একজন প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টা ছিল না; এটি ছিল এমন একটি ঘটনা, যার অভিঘাত বহু মানুষের জীবনকে স্থায়ীভাবে বদলে দিয়েছিল।
তাই হিঙ্কলি যদি নিজের বর্তমান পরিচয়কে সামনে এনে অতীতের দায়কে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন, সেটিকে সহজে গ্রহণ করতে রাজি নন রিগ্যানের মেয়ে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর স্পষ্ট—ক্ষমা করা যেতে পারে, কিন্তু ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না।
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
জন হিঙ্কলি জুনিয়র ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি চালিয়ে তাঁকে এবং আরও তিনজনকে আহত করেছিলেন। দীর্ঘ মানসিক চিকিৎসা ও আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০১৬ সালে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন জীবন ফিরে পান। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর জনসমক্ষে উপস্থিতি সেই পুরোনো ঘটনার স্মৃতি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















