ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের বৈদেশিক ঋণ মে ২০২৬-এ নতুন উচ্চতায় পৌঁছে প্রায় ৮ কোয়াড্রিলিয়ন রুপিয়াহ বা ৪৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ব্যাংকগুলো যে বিপুল পরিমাণ ঋণ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রেখেছে, তার বড় অংশই ব্যবসা ও বিনিয়োগে প্রবাহিত হচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন উঠছে—দেশের অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়লেও সেই অর্থ কি বাস্তবে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তরিত হচ্ছে?
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, বৈদেশিক ঋণের বৃদ্ধি মূলত সরকারি খাতের প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে। মে মাসে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মিলিত বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪৮.৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট বৈদেশিক ঋণের ৫৫.৯ শতাংশ। এক বছরে এই অংশ বেড়েছে ৩.৮৯ শতাংশ।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ০.১২ শতাংশ কমে ১৯৫.৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির ঋণনির্ভরতা বাড়লেও উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের প্রবণতা একই হারে বাড়ছে না। এই পার্থক্যটি অর্থনীতির অন্তর্নিহিত আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
সরকারের বাড়তি অর্থায়নের প্রয়োজন
সরকারের বৈদেশিক ঋণ এক বছরে ৩.৬৭ শতাংশ বেড়ে ২১৭.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচিতে এর ২২ শতাংশ ব্যবহৃত হয়েছে। এরপর রয়েছে জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও বাধ্যতামূলক সামাজিক নিরাপত্তা খাত, শিক্ষাসেবা, নির্মাণ এবং পরিবহন ও গুদামজাতকরণ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক ঋণও ৫.৪৪ শতাংশ বেড়ে ৩১.১ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। এর অন্যতম কারণ ছিল ব্যাংক ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াহ সিকিউরিটিজে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। মুদ্রাবাজারে রুপিয়াহর স্থিতিশীলতা ধরে রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও এই প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে।
সরকারের অর্থায়ন প্রয়োজনীয় হতে পারে, বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো খাতে। কিন্তু ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থের উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ঋণ নিজে প্রবৃদ্ধি সৃষ্টি করে না; ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপরই ভবিষ্যৎ আয়ের সক্ষমতা নির্ভর করে।
স্বল্পমেয়াদি ঋণে বাড়ছে সতর্কতার প্রয়োজন
ইন্দোনেশিয়ার সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। বৈদেশিক ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে ৩০.৫৯ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের একই সময়ে ২৯.৫৫ শতাংশে নেমেছে। অর্থনীতির আকার এবং বিনিময় হারের পরিবর্তন এতে সহায়তা করেছে।
তবে স্বল্পমেয়াদি ঋণের চিত্র কিছুটা বেশি সতর্কতার দাবি রাখে। এক বছরের মধ্যে পরিশোধযোগ্য বেসরকারি বৈদেশিক ঋণ ৯.৩৭ শতাংশ বেড়ে ৪৯.২ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। মোট স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণও ৮.৪ শতাংশ বেড়ে ৭১.৫৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের তুলনায় স্বল্পমেয়াদি ঋণের অনুপাত ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকের ৩৯.৯২ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ৪২.৭৬ শতাংশে উঠেছে। এটি এখনই সংকটের ইঙ্গিত নয়, কিন্তু বৈশ্বিক সুদের হার, পুঁজির প্রবাহ বা মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে স্বল্পমেয়াদি দায় দ্রুত চাপ তৈরি করতে পারে।

ঋণ নেওয়ার ক্ষমতা আছে, কিন্তু ব্যবহার হচ্ছে না
ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই। জুন ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর অনুমোদিত কিন্তু বিতরণ না হওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২.৪৯ কোয়াড্রিলিয়ন রুপিয়াহ, যা মোট ঋণসীমার ২১.৫২ শতাংশ।
ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত এই অঙ্ক ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে এবং জুনে কিছুটা কমেছে। মে মাসে অব্যবহৃত ঋণের সবচেয়ে বড় অংশ ছিল কার্যকরী মূলধন ঋণ, যার পরিমাণ প্রায় ১.৩৯ কোয়াড্রিলিয়ন রুপিয়াহ।
এর অর্থ ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে অনাগ্রহী—এমন নয়। বরং বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা আছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা তা পুরোপুরি গ্রহণ করছেন না। নির্মাণ ও উৎপাদনশিল্পের মতো খাতে প্রকল্পের অগ্রগতির সঙ্গে ধাপে ধাপে ঋণ ছাড় হওয়ার কারণে কিছু অব্যবহৃত ঋণ স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী ওঠানামা বৃহত্তর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কথাও বলে।
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, অর্থায়নের তুলনামূলক উচ্চ ব্যয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সুদের হারের প্রভাব ব্যবসায়িক ঋণে পুরোপুরি না পৌঁছানো এবং দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অপেক্ষা করার কৌশল নিতে পারেন।
ব্যবসায়িক আস্থা এখনো ভঙ্গুর
ব্যাংক ঋণের চাহিদার এই দুর্বলতা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের জরিপেও প্রতিফলিত হচ্ছে। ৩ হাজার ৩০০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জরিপে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের নিট ভারসাম্য প্রথম প্রান্তিকের ১০.১১ শতাংশ থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১২.৯৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় প্রান্তিকে তা ১১.৭৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ব্যবসাগুলো প্রত্যাশা করছে।
তার সঙ্গে ব্যবসায়িক তারল্যের সূচকও প্রথম প্রান্তিকের ১৭.০৫ শতাংশ থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১৫.০৩ শতাংশে নেমেছে। ঋণপ্রাপ্তির নিট ভারসাম্যও ৪.৮৪ শতাংশ থেকে কমে ২.৪৫ শতাংশ হয়েছে।
এখানেই ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যার গভীরতা নিহিত। অর্থনীতিতে অর্থের অভাব নেই, কিন্তু সেই অর্থের কার্যকর চাহিদা দুর্বল। সরকার ঋণ নিচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় অর্থায়নের কাঠামো ব্যবহার করছে, ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার প্রস্তুতি রাখছে—তবু বেসরকারি বিনিয়োগের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।
ঋণের পরিমাণ নয়, অর্থের উৎপাদনশীল ব্যবহারই আসল
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে সরকারের নিট ঋণ অর্থায়ন ছিল ৪৭৭.৪৩ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ। বছরের দ্বিতীয়ার্ধে আরও ৩৯০.৬৯ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ প্রয়োজন হতে পারে। ফলে পুরো বছরে নিট ঋণ অর্থায়ন প্রায় ৮৬৮.১২ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ হতে পারে, যা বাজেটে ধরা ৮৩২.২১ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহর চেয়ে বেশি।
মূল ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ৯৩০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ হওয়ায় নতুন মোট ঋণ ইস্যুর পরিমাণ ২০২৬ সালে প্রায় ১.৮ কোয়াড্রিলিয়ন রুপিয়াহর কাছাকাছি যেতে পারে।
এত বড় অর্থায়নের প্রয়োজনের মধ্যেও ইন্দোনেশিয়ার সার্বভৌম ঋণমান নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ তৈরি হয়নি। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস দেশটির বিবিবি রেটিং অপরিবর্তিত রেখে স্থিতিশীল পূর্বাভাস দিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে ২০২৬ সালের বাজেটে প্রায় ২৫৫.৫ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ অব্যবহৃত অর্থ পড়ে থাকার বিষয়টি দেখায়, সরকারও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও রাজস্ব ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক।
এই বাস্তবতায় ইন্দোনেশিয়ার জন্য মূল চ্যালেঞ্জ শুধু ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা নয়। বরং ধার করা অর্থ কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে পৌঁছায়, সেটিই নির্ধারণ করবে ঋণ ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হবে, নাকি কেবল বর্তমানের অর্থায়ন ঘাটতি পূরণের উপায় হয়ে থাকবে।
একটি অর্থনীতিতে ঋণ বাড়তে পারে, অথচ একই সঙ্গে বিনিয়োগ দুর্বল হতে পারে। ব্যাংকে অর্থ থাকতে পারে, কিন্তু উদ্যোক্তা সেই অর্থ নিতে দ্বিধা করতে পারেন। রাষ্ট্র বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে পারে, কিন্তু অর্থনীতির বেসরকারি অংশ যদি ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে অনিশ্চিত থাকে, তাহলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতি সীমিতই থাকবে।
ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান অবস্থান তাই নিছক ঋণের সংকট নয়; এটি অর্থায়ন ও অর্থনৈতিক আস্থার মধ্যকার ব্যবধানের সংকেত। বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা, ব্যবসায়িক তারল্য এবং ঋণ চাহিদা—এই চারটি ক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয় না ঘটলে অর্থের জোগান বাড়লেও তার প্রবৃদ্ধি সৃষ্টির ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত একটি দেশের আর্থিক শক্তি কত টাকা ধার করতে পারে, তা দিয়ে মাপা যায় না। আসল পরীক্ষা হলো সেই অর্থ কতটা উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপ নেয়, কতটা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং ভবিষ্যৎ আয় বাড়ানোর সক্ষমতা তৈরি করে। ইন্দোনেশিয়ার সামনে এখন সেই পরীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তেংগারা স্ট্র্যাটেজিকস 



















