সাইকেলের প্যাডেলে ভর করে আমেরিকার প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর কিছু দৃশ্য দেখার সুযোগ রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্রতীরের বুনো ফুলে ঘেরা পথ থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের গাছের সুড়ঙ্গের মতো রেলপথ—দেশটির নানা প্রান্তে এমন কিছু সাইকেলপথ রয়েছে, যেখানে ভ্রমণ মানেই প্রকৃতির খুব কাছাকাছি চলে যাওয়া।
এমন পাঁচটি পথের কথা বলা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটির দৈর্ঘ্য ২৫ মাইল বা প্রায় ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে। চারটি পথ পাকা এবং একটি নুড়িপাথরের। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব কটি পথেই মোটরগাড়ির চলাচল নেই। এমনকি কয়েকটি পথের শুরুতেই গাড়ি নিয়ে পৌঁছানোর প্রয়োজন হয় না।
এই পথগুলোর অনেকগুলোতেই রয়েছে ক্যাম্পিং, বন্যপ্রাণী দেখা, পাখি দেখা এবং সাঁতার কাটার সুযোগ। ফলে যাঁরা শুধু সাইকেল চালানো নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাতেও চান, তাঁদের জন্য মাঝেমধ্যে থামার পরিকল্পনা করাই ভালো।
ক্যালিফোর্নিয়া: প্যাসিফিক গ্রোভ থেকে ফোর্ট অর্ড ডিউনস স্টেট পার্ক
মনটেরি উপসাগরের উপকূলীয় বিনোদন পথ ধরে প্রায় ২০ মাইলের এই পাকা যাত্রাটি যাওয়া-আসার। পথটি মনটেরি উপদ্বীপের বিখ্যাত স্থান ও খাড়া সমুদ্রতীরের পাশ দিয়ে এগিয়ে যায়।
লাভার্স পয়েন্ট পার্ক থেকে যাত্রা শুরু করলে সামনে পড়বে মনটেরি বে অ্যাকুয়ারিয়াম, ক্যানারি রো—একসময়কার সার্ডিন মাছের ক্যানজাতকরণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা—এবং ওল্ড ফিশারম্যানস ওয়ার্ফ। ক্যানারি রো বিশেষভাবে পরিচিত লেখক জন স্টেইনবেকের ১৯৪৫ সালের একই নামের উপন্যাসের কারণে। ওল্ড ফিশারম্যানস ওয়ার্ফে মাছের গন্ধমাখা বাতাসে সমুদ্রসিংহদের রোদ পোহাতে দেখা যায়।
পথে মনটেরি বে ন্যাশনাল মেরিন স্যাংচুয়ারির দৃশ্যের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে সাইপ্রেস গাছ ও পাখির ডাক। উপসাগর ঘুরে এগিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায় বেগুনি লুপিন, সৈকতের প্রিমরোজ ও ইন্ডিয়ান পেইন্টব্রাশ ফুল। উঁচু সমুদ্রতীর থেকে মনটেরি স্টেট বিচ ও ফোর্ট অর্ড ডিউনস স্টেট পার্কের দৃশ্যও চোখে পড়ে।
ক্যালিফোর্নিয়ার নির্ভার পরিবেশ উপভোগ করতে করতে জন স্টেইনবেকের ‘ক্যানারি রো’ উপন্যাসের একটি কথাও মনে পড়তে পারে—নিজের সঙ্গে স্বচ্ছন্দ থাকা মানুষকে পৃথিবীর সঙ্গেও স্বচ্ছন্দ করে তোলে।

ওয়াইওমিং: মুস থেকে জেনি লেক
কিছু সাইকেলপথে অসাধারণ দৃশ্য পেতে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু এই পথে খুব বেশি খাটুনি ছাড়াই পাওয়া যায় চোখধাঁধানো পাহাড়ি দৃশ্য।
গ্র্যান্ড টেটন ন্যাশনাল পার্কের মূল মুস প্রবেশপথ থেকে আধা মাইল দূরে ক্রেইগ থমাস ডিসকভারি অ্যান্ড ভিজিটর সেন্টার। সেখান থেকে পাকা গ্র্যান্ড টেটন পথ ধরে প্রায় আট মাইল এগোতে হবে।
হিমবাহের ক্ষয়ে তৈরি উপত্যকার মধ্য দিয়ে পথটি চলে গেছে। দুই পাশে রয়েছে আল্পাইন তৃণভূমি ও সেজব্রাশে ভরা সমতলভূমি। আর পুরো পথজুড়েই যেন সঙ্গী হয়ে থাকে খাঁজকাটা টেটন পর্বতমালা।
জেনি লেক ভিজিটর সেন্টারে পৌঁছে সাইকেল রেখে নৌকায় করে হ্রদের ওপারে যাওয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। এতে সাইকেল ভ্রমণের সঙ্গে পাহাড়ি হ্রদের আরেকটি আলাদা অভিজ্ঞতা যোগ হবে।
কলোরাডো: ফ্রিসকো থেকে ভেইল পাস
উচ্চ পার্বত্য এলাকায় স্বপ্নের মতো সাইকেলপথের জন্য কলোরাডোর খ্যাতি রয়েছে। ফ্রিসকো থেকে ভেইল পাস পর্যন্ত ২৪ মাইলের পাকা যাওয়া-আসার এই পথটি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য এবং এতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফুট বা ৪৬০ মিটার উচ্চতা অতিক্রম করতে হয়।
টেন মাইল রিক্রিয়েশনাল পাথওয়ে ধরে ফ্রিসকো থেকে যাত্রা শুরু করে কপার মাউন্টেন পেরিয়ে ভেইল পাসের পূর্ব ঢালে উঠতে হয়। পথে দেখা যায় কাঁপতে থাকা অ্যাসপেন গাছ এবং মৃদু শব্দে বয়ে চলা ঝরনা। তবে সাইকেল চালকদের বৈদ্যুতিক সাইকেল এবং মারমট ও পাহাড়ি ছাগলের মতো বন্যপ্রাণীর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
কপার মাউন্টেনের পর পথটি বেশ খাড়া হয়ে ওঠে। ভেইল পাসের ১০ হাজার ৬৬২ ফুট উচ্চতার চূড়ার দিকে শেষ কয়েকটি আঁকাবাঁকা অংশে গড় ঢাল প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়।
যাঁরা এই কঠিন উতরাই পছন্দ করেন না, তাঁরা ফ্রিসকোর পাইওনিয়ার স্পোর্টস ও রেবেল স্পোর্টসের শাটল সেবা নিতে পারেন। সেখানে সাইকেল ভাড়াও পাওয়া যায়। শাটলে করে পাসের চূড়ায় উঠে সেখান থেকে নেমে আসা যায়।
আর পুরো যাত্রার পর পুরস্কার হিসেবে ফ্রিসকোর আউটার রেঞ্জ ব্রিউইং কোম্পানিতে একটি ‘ফাইনাল সামিট’ সেজন উপভোগ করা যেতে পারে।
নিউইয়র্ক: মিলারটন থেকে কপেক ফলস
মিলারটন গ্রামের উত্তরের দিকে পাকা হারলেম ভ্যালি রেল ট্রেইলের ২৫ মাইলের যাওয়া-আসার এই পথটি দ্রুতই ভ্রমণকারীকে প্রকৃতির গভীরে নিয়ে যায়।
এখানে রয়েছে বেগুনি ফ্লক্স ফুল, জলাভূমি, খামার, বনভূমি এবং ট্যাকনিক পর্বতমালার ঢেউখেলানো রেখা। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পরিত্যক্ত হারলেম রেলপথের ওপর এই পথ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
পথের কিছু অংশ গাছের সুড়ঙ্গের মতো। কোথাও দেখা যায় রোদ পোহানো জলসাপ, কচ্ছপ ও ব্যস্ত বিভার। বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় ক্যাটবার্ড, আমেরিকান রেডস্টার্ট ও ইয়েলো ওয়ার্বলারের মিষ্টি ডাক শোনা যায়।
ট্যাকনিক স্টেট পার্কে গিয়ে পুকুরে সাঁতার কেটে শরীর ঠান্ডা করা যায়। চাইলে ঝরনার দিকেও হাঁটা যায়।
পথের অবস্থা, মানচিত্র, শৌচাগার ও গাড়ি রাখার জায়গার তথ্য এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের পরিচয় জানতে এই পথের জন্য তৈরি বিশেষ মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করা যায়। আর গাড়ি ছাড়াই যেতে চাইলে মেট্রো-নর্থ ট্রেনের মাধ্যমে ওয়াসাইক পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব, যেটি মিলারটনের প্রায় ১১ মাইল দক্ষিণে।
মেইন: জর্ডান পন্ড হাউস থেকে অ্যাকাডিয়া ক্যারেজ রোড লুপ
অ্যাকাডিয়া ন্যাশনাল পার্কের এই ১৩ দশমিক ৫ মাইলের নুড়িপাথরের বৃত্তাকার পথটি মোটরগাড়িমুক্ত পরিবেশে প্রকৃতি দেখার অনন্য সুযোগ দেয়।
পথটি তৈরি করেছিলেন জন ডি. রকফেলার জুনিয়র। মাউন্ট ডেজার্ট দ্বীপে দর্শনার্থীদের জন্য শান্ত, মোটরগাড়িমুক্ত চলাচলের পথ তৈরি করতে তিনি মোট ৪৫ মাইলের ক্যারেজ রোড নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন।
জর্ডান পন্ড হাউস থেকে যাত্রা শুরু করলে প্রথমেই হ্রদের পাশ দিয়ে উঠতে হবে। পুরো পথে প্রায় ১ হাজার ফুট উচ্চতা অতিক্রম করতে হয়, যার বেশিরভাগই যাত্রার শুরুতেই রয়েছে। পথে দেখা যায় হাতে তৈরি পাথরের সেতু ও ঝরনা।
এরপর পথের বড় একটি অংশ ঘন বন ও হ্রদের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। কোথাও হ্রদের জল এতটাই স্বচ্ছ ও কাছাকাছি যে পানির ওপরে মাথা তুলে থাকা একটি স্ন্যাপিং কচ্ছপের নাকও চোখে পড়তে পারে।
যাত্রা শেষে আবার জর্ডান পন্ড হাউসে ফিরে বিখ্যাত পপওভার, ব্লুবেরি লেমোনেড এবং ‘দ্য বাবলস’ নামে পরিচিত পার্কের যমজ শৃঙ্গের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। আলোয় ভেসে থাকা সেই পাহাড়ি দৃশ্য যেন কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবির মতো।
বার হারবার থেকে যাঁরা সাইকেল নিয়ে যেতে চান, তাঁদের জন্য বিনা মূল্যের বাইসাইকেল এক্সপ্রেস শাটল রয়েছে। তবে এই শাটলে বৈদ্যুতিক সাইকেল নেওয়া যায় না। শাটলে করে ঈগল লেক ক্যারেজ রোড ট্রেইলের প্রবেশপথে গিয়ে সেখান থেকেও যাত্রা শুরু করা সম্ভব।
সাইকেল ভ্রমণ তাই শুধু দ্রুত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছানোর উপায় নয়। কখনো এটি সমুদ্রের ঢেউ, কখনো বরফে গড়া পাহাড়, কখনো বনভূমির নিস্তব্ধতা, আবার কখনো হ্রদের স্বচ্ছ জলের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এক ধীর ও সুন্দর পথ। আমেরিকার এই পাঁচটি পথ সেই অভিজ্ঞতাকেই সামনে আনে—যেখানে গন্তব্যের চেয়ে পথটিই হয়ে ওঠে ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















