কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এখন আর শুধু প্রযুক্তি উন্নয়নের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কূটনীতি, চিপ, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, প্রযুক্তি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাজার নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দেশগুলোকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে।
মিত্রদের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের কঠিন বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ৩৫টি দেশের উদ্দেশে একটি চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে। এসব দেশ আগে যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত একটি যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে। তালিকায় জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ঘনিষ্ঠ মিত্রও রয়েছে।
প্রস্তাবিত বার্তায় বলা হচ্ছে, কোনো দেশ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রযুক্তি জোট এবং চীনের বিকল্প কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবে না। যারা দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে চলতে চাইবে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বাদ পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো, সব পক্ষের সঙ্গে একসঙ্গে থাকার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষের সঙ্গেই কার্যকরভাবে থাকা নয়। চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতকে প্রয়োজনীয় চিপ, প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ থেকে দূরে রাখাও এই কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।
আলিবাবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বড় উত্থান
অন্যদিকে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আলিবাবা উন্মুক্তভাবে ব্যবহারযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলের ক্ষেত্রে বড় সাফল্য দেখিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কিউওয়েন মডেলগুলো মাত্র ছয় মাসে ৩০০ কোটি বারের বেশি ডাউনলোড হয়েছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সময়ে মেটার মডেল ডাউনলোড হয়েছে প্রায় ২২ কোটি ৭০ লাখ বার এবং গুগলের মডেল প্রায় ৪১ কোটি ৮০ লাখ বার ডাউনলোড হয়েছে।
আলিবাবার কিউওয়েন পরিবারের ৪৬০টিরও বেশি মডেল উন্মুক্ত করা হয়েছে। এসব মডেলকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে ৩ লাখের বেশি পরিবর্তিত সংস্করণ।
এর ফলে বৈশ্বিক উন্নয়নকারীদের মধ্যে উন্মুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র চিপ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করলেও চীনের তৈরি উন্মুক্ত মডেলগুলো বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের আগ্রহ তৈরি করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আস্থার সংকট
এদিকে অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে মানুষের নেতিবাচক মনোভাবের জন্য ব্যক্তিগতভাবে তাকে দায়ী করার ধারণার বিরোধিতা করেছেন।
তিনি মনে করেন, সমস্যাটি মূলত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বৃহত্তর আস্থার সংকট। প্রচার বা বিপণনের মাধ্যমে এই আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়; বাস্তবে মানুষের উপকারে আসে এমন ফলাফল দেখাতে হবে।
তিনি চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞানে অ্যানথ্রপিকের কাজের কথা তুলে ধরে বলেছেন, কেবল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব সমস্যার সমাধানই মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
প্রযুক্তি দুনিয়ায় আরও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে প্রবেশের আগে এই আস্থার প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই সময়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ, অধিগ্রহণ ও কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হচ্ছে।
এনভিডিয়া স্পেসএক্সে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি ডলার এবং ইন্টেলে ৩ হাজার কোটি ডলারের অংশীদারিত্ব প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে স্ট্রাইপ ৭০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল পরিচালনা করা একটি প্রতিষ্ঠানে অধিগ্রহণের চুক্তি করেছে বলে খবর এসেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ব্যাপক কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হতে পারে—এমন সতর্কতাও দিয়েছেন প্রযুক্তি জগতের অন্যতম পথিকৃৎ জিওফ্রি হিন্টন। তাঁর আশঙ্কা, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের কাজের জায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বসিয়ে দিলে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়তে পারেন, অথচ এর সুফল সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হাতেই কেন্দ্রীভূত হবে।
সব মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ এখন প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য, অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মিত্রদের স্পষ্টভাবে পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করে, আর চীন যদি উন্মুক্ত মডেলের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারীদের কাছে আরও বেশি পৌঁছে যায়, তাহলে আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















