১০:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
ঋষভ পন্তের বিশ্বরেকর্ড, টেস্টে দ্রুততম ১০০ ছক্কার মাইলফলক খরা মোকাবিলার জরুরি পরিকল্পনা প্রকাশে ব্রিটিশ সরকারের ‘নিরাপত্তা’ যুক্তি, বাড়ছে উদ্বেগ ইউরোভিশন ২০২৭: রাজধানী সোফিয়াকে হারিয়ে আয়োজক হচ্ছে কৃষ্ণসাগরের শহর বুর্গাস পরমাণু বোমার আগের হিরোশিমা-নাগাসাকি ফিরিয়ে আনছে মাইনক্রাফটের কর্মশালা সাইনসবুরির দোকানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভুল শনাক্তকরণ, বন্ধ হলো মুখ স্ক্যান ব্যবস্থা ‘হিরোস’ ও ‘ন্যাশভিল’-খ্যাত অভিনেত্রী হেইডেন প্যানেটিয়েরে ৩৬ বছর বয়সে মারা গেছেন ভ্রমণে হালকা ব্যাগ? না, বরং বেশি করে সঙ্গে নিন! আফগান নারীদের পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু অধিকার রক্ষা নয়, ভবিষ্যৎ আফগানিস্তানকে বাঁচিয়ে রাখা হোয়াইট হাউসের বিশাল বলরুম নির্মাণে সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি চাইলেন ট্রাম্প ইরান চুক্তির পথে বাধা দিলে ওমানে বোমা হামলার হুমকি ট্রাম্পের

হারিয়ে যাওয়া ইনকা নগরীর খোঁজে ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’, ৫৩ বছর পর মিলল সত্যের সন্ধান

১৯১১ সালে মার্কিন অধ্যাপক হিরাম বিংহাম দাবি করেছিলেন, তিনি আন্দিজ পর্বতমালার গভীরে খুঁজে পেয়েছেন ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ রাজার হারিয়ে যাওয়া রাজধানী। তাঁর সেই দাবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুললেও পরে দেখা যায়, তিনি ভুল জায়গাকে সেই কিংবদন্তির নগরী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। প্রায় ৫৩ বছর পর আরেক মার্কিন অভিযাত্রী জিন স্যাভয় সেই হারানো নগরীর সন্ধানে গিয়ে ইতিহাসের বড় একটি রহস্যের সমাধানের পথ খুলে দেন।

 

Image

Image

যে নগরী হারিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলে

ষোড়শ শতকে স্পেনীয় দখলদারদের হাতে ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী কুসকো পতনের পর রাজা মানকো তাঁর অনুসারীদের নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নেন। সেখানে গড়ে ওঠে নতুন এক রাজধানী—ভিলকাবাম্বা।

কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেখানে ইনকারা প্রাসাদ, মন্দির ও নানা স্থাপনা নির্মাণ করেছিল। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল বিপুল সম্পদ, সোনার অলংকার, ধর্মীয় প্রতীক এবং পূর্বপুরুষদের মমি।

ভিলকাবাম্বা শুধু নির্বাসিত ইনকা শাসকদের আশ্রয়স্থল ছিল না। এখান থেকেই স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও গেরিলা যুদ্ধ পরিচালিত হতো। শেষ পর্যন্ত ১৫৭২ সালে স্পেনীয় বাহিনীর আক্রমণের মুখে ইনকারা নগরীতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর ঘন জঙ্গল ধীরে ধীরে পুরো নগরীকে গ্রাস করে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হারিয়ে যায় এর অবস্থানের কোনো নিশ্চিত চিহ্ন।

বিংহামের ভুল অনুসন্ধান

১৯০৯ সালে হিরাম বিংহামকে পেরুর স্থানীয় জমির মালিকেরা একটি প্রাচীন স্থাপনা খুঁজে দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৪ বছর। তিনি লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নন।

পরবর্তীতে ইনকা ইতিহাসের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়ে এবং ১৯১১ সালে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ আশ্রয়স্থল খুঁজে বের করা।

বিঘ্নিত আবহাওয়া, খাবারের সংকট ও অভিযানের লোকজনের চলে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি দ্রুত একটি এলাকা ছেড়ে দেন। অথচ কয়েক দশক পরে দেখা যায়, তিনি যে অঞ্চলের কাছাকাছি গিয়েছিলেন, সেটিই ছিল প্রকৃত ভিলকাবাম্বার অবস্থান।

এরপর তিনি মাচু পিচুকে সেই কিংবদন্তির হারানো নগরী হিসেবে দাবি করেন। তাঁর এই ভুল ধারণাই বহু বছর ইতিহাসচর্চায় প্রভাব ফেলেছিল।

Image

‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’-এর অভিযান

১৯৬৪ সালে ৩৭ বছর বয়সী অভিযাত্রী জিন স্যাভয় পেরুর অভিযাত্রী আন্তোনিও সান্তান্দের কাসেল্লির সঙ্গে দুর্গম এসপিরিতু পাম্পা অঞ্চলে পৌঁছান।

স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে তাঁদের পথ দেখাতে রাজি হননি। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, যে ব্যক্তি এই গোপন নগরীর অবস্থান প্রকাশ করবে, দেবতারা তাকে শাস্তি দেবেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক অনুরোধের পর স্থানীয়রা তাঁদের শ্যাওলায় ঢাকা ধ্বংসাবশেষের কাছে নিয়ে যান।

নগরীর ধ্বংসাবশেষ দেখে স্যাভয় ও তাঁর সহযাত্রীরা বিস্মিত হয়ে পড়েন। পাহাড়ের তিনটি মালভূমিজুড়ে ছড়িয়ে ছিল বিভিন্ন স্থাপনা। সেখানে পাওয়া যায় প্রাসাদ, গ্রানাইট ও চুনাপাথরের ভবন এবং ঝরনার মতো নির্মাণ। প্রথম মালভূমিটির আয়তনই মাচু পিচুর প্রায় চার গুণ বলে ধারণা করা হয়।

স্যাভয়ের বিশ্বাস জন্মায়, এটাই ছিল স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে শেষ লড়াইয়ের সময় ইনকা শাসকদের আশ্রয়স্থল।

ছয় সপ্তাহ পর সেখানে পৌঁছায় বিবিসি

স্যাভয়ের অভিযান শেষ হওয়ার মাত্র ছয় সপ্তাহ পর একটি ব্রিটিশ সম্প্রচার দল একই পথে যাত্রা করে।

তাদের পথ ছিল অত্যন্ত দুর্গম। কখনো রাবারের নৌকায় নদীর খরস্রোতা পাড়ি দিতে হয়েছে, কখনো খাড়া গিরিখাত বেয়ে উঠতে হয়েছে। মালবাহী খচ্চর নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে।

দীর্ঘ হাঁটা ও বৃষ্টিভেজা পাহাড়ি বন পেরিয়ে দলটি অবশেষে ইনকা বসতির ধ্বংসাবশেষে পৌঁছায়।

শত শত বছর ধরে জঙ্গল নগরীটিকে প্রায় অক্ষত রেখেছিল। বিশাল গাছের শিকড় প্রাচীন দেয়াল ও সোপানের চারপাশে এমনভাবে জড়িয়ে ছিল যে, পথ তৈরি করতে গাছপালা, লতা ও ফার্ন কেটে এগোতে হয়েছে।

স্যাভয় নিজেও জঙ্গলকে ভয়ংকর বলে মনে করতেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর কাছে এই জঙ্গল ছিল অজানা ইতিহাসের দরজা।

Image

একটি ছাদের টালিই বদলে দিল ইতিহাস

স্যাভয় ও সান্তান্দেরের আবিষ্কার তখনই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেনি যে এসপিরিতু পাম্পাই ছিল ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ রাজধানী। কিন্তু সেখানে পাওয়া একটি বিশেষ নিদর্শন পরে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে—ছাদের টালি।

ইনকারা সাধারণত ছাদ তৈরিতে খড় ব্যবহার করত। অথচ এসপিরিতু পাম্পায় পাওয়া টালিগুলো ছিল স্পেনীয় নকশার, তবে তাতে ইনকা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রং ও চিহ্ন ছিল।

এই আবিষ্কার ইতিহাসবিদদের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

পরে ইনকা বিশেষজ্ঞ জন হেমিং ভিলকাবাম্বা সম্পর্কে ষোড়শ শতকের বিভিন্ন প্রত্যক্ষ বর্ণনার সঙ্গে এসপিরিতু পাম্পার স্থাপনাগুলোর মিল খুঁজে পান। বিশেষ করে ধর্মযাজক মার্তিন দে মুরুয়ার বিবরণে ইনকা নির্বাসিত রাজধানীর একটি প্রাসাদের কথা বলা হয়েছিল, যার বিভিন্ন স্তরের ওপর টালির ছাদ ছিল।

এই বিবরণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মিল ভিলকাবাম্বার অবস্থান সম্পর্কে ধারণাকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে।

বিংহাম যে নগরীর এত কাছে গিয়েও চিনতে পারেননি

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ১৯১১ সালে বিংহাম যে হারানো নগরীর সন্ধান করছিলেন, তার কাছাকাছি তিনি গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দ্রুত সরে যাওয়ায় তিনি সেই স্থানে পৌঁছাতে পারেননি।

পরে মাচু পিচুকে হারানো ইনকা রাজধানী হিসেবে দাবি করলেও তাঁর সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।

স্যাভয়ের অভিযান তাই শুধু নতুন একটি প্রত্নস্থল আবিষ্কারের ঘটনা ছিল না; এটি বহু দশকের একটি ঐতিহাসিক ভুল ধারণা সংশোধনের পথও তৈরি করে।

Image

সোনার ভাণ্ডারের রহস্য এখনো অমীমাংসিত

তবে ভিলকাবাম্বার গল্প এখানেই শেষ হয়নি।

স্যাভয়ের ধারণা ছিল, স্পেনীয়দের হাতে পড়ার আগে ইনকারা তাদের বিপুল সোনা ও মূল্যবান সম্পদের বড় অংশ লুকিয়ে ফেলেছিল। তাঁর দাবি ছিল, কিছু সম্পদ হয়তো হ্রদ, গুহা কিংবা মানচিত্রে না থাকা ভূগর্ভস্থ পথে গোপন করা হয়েছিল।

আজও সেই কথিত ‘হারানো ইনকা ধনভাণ্ডার’-এর কোনো নিশ্চিত সন্ধান পাওয়া যায়নি।

বরং প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে ভিলকাবাম্বার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর ইতিহাস ও এখনও তুলনামূলকভাবে অক্ষত প্রত্নস্থল। ঘন জঙ্গলের কারণে বহু স্থাপনা দীর্ঘদিন মানুষের হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা পেয়েছে।

একসময় যে নগরী ইতিহাস থেকে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিল, অভিযাত্রীদের সেই দীর্ঘ অনুসন্ধান তাকে আবার ইতিহাসের পাতায় ফিরিয়ে এনেছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ঋষভ পন্তের বিশ্বরেকর্ড, টেস্টে দ্রুততম ১০০ ছক্কার মাইলফলক

হারিয়ে যাওয়া ইনকা নগরীর খোঁজে ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’, ৫৩ বছর পর মিলল সত্যের সন্ধান

০৭:৫০:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

১৯১১ সালে মার্কিন অধ্যাপক হিরাম বিংহাম দাবি করেছিলেন, তিনি আন্দিজ পর্বতমালার গভীরে খুঁজে পেয়েছেন ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ রাজার হারিয়ে যাওয়া রাজধানী। তাঁর সেই দাবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুললেও পরে দেখা যায়, তিনি ভুল জায়গাকে সেই কিংবদন্তির নগরী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। প্রায় ৫৩ বছর পর আরেক মার্কিন অভিযাত্রী জিন স্যাভয় সেই হারানো নগরীর সন্ধানে গিয়ে ইতিহাসের বড় একটি রহস্যের সমাধানের পথ খুলে দেন।

 

Image

Image

যে নগরী হারিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলে

ষোড়শ শতকে স্পেনীয় দখলদারদের হাতে ইনকা সাম্রাজ্যের রাজধানী কুসকো পতনের পর রাজা মানকো তাঁর অনুসারীদের নিয়ে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে আশ্রয় নেন। সেখানে গড়ে ওঠে নতুন এক রাজধানী—ভিলকাবাম্বা।

কিংবদন্তি অনুযায়ী, সেখানে ইনকারা প্রাসাদ, মন্দির ও নানা স্থাপনা নির্মাণ করেছিল। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল বিপুল সম্পদ, সোনার অলংকার, ধর্মীয় প্রতীক এবং পূর্বপুরুষদের মমি।

ভিলকাবাম্বা শুধু নির্বাসিত ইনকা শাসকদের আশ্রয়স্থল ছিল না। এখান থেকেই স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও গেরিলা যুদ্ধ পরিচালিত হতো। শেষ পর্যন্ত ১৫৭২ সালে স্পেনীয় বাহিনীর আক্রমণের মুখে ইনকারা নগরীতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়। এরপর ঘন জঙ্গল ধীরে ধীরে পুরো নগরীকে গ্রাস করে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হারিয়ে যায় এর অবস্থানের কোনো নিশ্চিত চিহ্ন।

বিংহামের ভুল অনুসন্ধান

১৯০৯ সালে হিরাম বিংহামকে পেরুর স্থানীয় জমির মালিকেরা একটি প্রাচীন স্থাপনা খুঁজে দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৪ বছর। তিনি লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নন।

পরবর্তীতে ইনকা ইতিহাসের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়ে এবং ১৯১১ সালে তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অভিযানের নেতৃত্ব দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ আশ্রয়স্থল খুঁজে বের করা।

বিঘ্নিত আবহাওয়া, খাবারের সংকট ও অভিযানের লোকজনের চলে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি দ্রুত একটি এলাকা ছেড়ে দেন। অথচ কয়েক দশক পরে দেখা যায়, তিনি যে অঞ্চলের কাছাকাছি গিয়েছিলেন, সেটিই ছিল প্রকৃত ভিলকাবাম্বার অবস্থান।

এরপর তিনি মাচু পিচুকে সেই কিংবদন্তির হারানো নগরী হিসেবে দাবি করেন। তাঁর এই ভুল ধারণাই বহু বছর ইতিহাসচর্চায় প্রভাব ফেলেছিল।

Image

‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’-এর অভিযান

১৯৬৪ সালে ৩৭ বছর বয়সী অভিযাত্রী জিন স্যাভয় পেরুর অভিযাত্রী আন্তোনিও সান্তান্দের কাসেল্লির সঙ্গে দুর্গম এসপিরিতু পাম্পা অঞ্চলে পৌঁছান।

স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে তাঁদের পথ দেখাতে রাজি হননি। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, যে ব্যক্তি এই গোপন নগরীর অবস্থান প্রকাশ করবে, দেবতারা তাকে শাস্তি দেবেন।

শেষ পর্যন্ত অনেক অনুরোধের পর স্থানীয়রা তাঁদের শ্যাওলায় ঢাকা ধ্বংসাবশেষের কাছে নিয়ে যান।

নগরীর ধ্বংসাবশেষ দেখে স্যাভয় ও তাঁর সহযাত্রীরা বিস্মিত হয়ে পড়েন। পাহাড়ের তিনটি মালভূমিজুড়ে ছড়িয়ে ছিল বিভিন্ন স্থাপনা। সেখানে পাওয়া যায় প্রাসাদ, গ্রানাইট ও চুনাপাথরের ভবন এবং ঝরনার মতো নির্মাণ। প্রথম মালভূমিটির আয়তনই মাচু পিচুর প্রায় চার গুণ বলে ধারণা করা হয়।

স্যাভয়ের বিশ্বাস জন্মায়, এটাই ছিল স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে শেষ লড়াইয়ের সময় ইনকা শাসকদের আশ্রয়স্থল।

ছয় সপ্তাহ পর সেখানে পৌঁছায় বিবিসি

স্যাভয়ের অভিযান শেষ হওয়ার মাত্র ছয় সপ্তাহ পর একটি ব্রিটিশ সম্প্রচার দল একই পথে যাত্রা করে।

তাদের পথ ছিল অত্যন্ত দুর্গম। কখনো রাবারের নৌকায় নদীর খরস্রোতা পাড়ি দিতে হয়েছে, কখনো খাড়া গিরিখাত বেয়ে উঠতে হয়েছে। মালবাহী খচ্চর নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়েছে ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে।

দীর্ঘ হাঁটা ও বৃষ্টিভেজা পাহাড়ি বন পেরিয়ে দলটি অবশেষে ইনকা বসতির ধ্বংসাবশেষে পৌঁছায়।

শত শত বছর ধরে জঙ্গল নগরীটিকে প্রায় অক্ষত রেখেছিল। বিশাল গাছের শিকড় প্রাচীন দেয়াল ও সোপানের চারপাশে এমনভাবে জড়িয়ে ছিল যে, পথ তৈরি করতে গাছপালা, লতা ও ফার্ন কেটে এগোতে হয়েছে।

স্যাভয় নিজেও জঙ্গলকে ভয়ংকর বলে মনে করতেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর কাছে এই জঙ্গল ছিল অজানা ইতিহাসের দরজা।

Image

একটি ছাদের টালিই বদলে দিল ইতিহাস

স্যাভয় ও সান্তান্দেরের আবিষ্কার তখনই নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করেনি যে এসপিরিতু পাম্পাই ছিল ইনকা সাম্রাজ্যের শেষ রাজধানী। কিন্তু সেখানে পাওয়া একটি বিশেষ নিদর্শন পরে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে—ছাদের টালি।

ইনকারা সাধারণত ছাদ তৈরিতে খড় ব্যবহার করত। অথচ এসপিরিতু পাম্পায় পাওয়া টালিগুলো ছিল স্পেনীয় নকশার, তবে তাতে ইনকা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রং ও চিহ্ন ছিল।

এই আবিষ্কার ইতিহাসবিদদের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

পরে ইনকা বিশেষজ্ঞ জন হেমিং ভিলকাবাম্বা সম্পর্কে ষোড়শ শতকের বিভিন্ন প্রত্যক্ষ বর্ণনার সঙ্গে এসপিরিতু পাম্পার স্থাপনাগুলোর মিল খুঁজে পান। বিশেষ করে ধর্মযাজক মার্তিন দে মুরুয়ার বিবরণে ইনকা নির্বাসিত রাজধানীর একটি প্রাসাদের কথা বলা হয়েছিল, যার বিভিন্ন স্তরের ওপর টালির ছাদ ছিল।

এই বিবরণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মিল ভিলকাবাম্বার অবস্থান সম্পর্কে ধারণাকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে।

বিংহাম যে নগরীর এত কাছে গিয়েও চিনতে পারেননি

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ১৯১১ সালে বিংহাম যে হারানো নগরীর সন্ধান করছিলেন, তার কাছাকাছি তিনি গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দ্রুত সরে যাওয়ায় তিনি সেই স্থানে পৌঁছাতে পারেননি।

পরে মাচু পিচুকে হারানো ইনকা রাজধানী হিসেবে দাবি করলেও তাঁর সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।

স্যাভয়ের অভিযান তাই শুধু নতুন একটি প্রত্নস্থল আবিষ্কারের ঘটনা ছিল না; এটি বহু দশকের একটি ঐতিহাসিক ভুল ধারণা সংশোধনের পথও তৈরি করে।

Image

সোনার ভাণ্ডারের রহস্য এখনো অমীমাংসিত

তবে ভিলকাবাম্বার গল্প এখানেই শেষ হয়নি।

স্যাভয়ের ধারণা ছিল, স্পেনীয়দের হাতে পড়ার আগে ইনকারা তাদের বিপুল সোনা ও মূল্যবান সম্পদের বড় অংশ লুকিয়ে ফেলেছিল। তাঁর দাবি ছিল, কিছু সম্পদ হয়তো হ্রদ, গুহা কিংবা মানচিত্রে না থাকা ভূগর্ভস্থ পথে গোপন করা হয়েছিল।

আজও সেই কথিত ‘হারানো ইনকা ধনভাণ্ডার’-এর কোনো নিশ্চিত সন্ধান পাওয়া যায়নি।

বরং প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে ভিলকাবাম্বার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এর ইতিহাস ও এখনও তুলনামূলকভাবে অক্ষত প্রত্নস্থল। ঘন জঙ্গলের কারণে বহু স্থাপনা দীর্ঘদিন মানুষের হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা পেয়েছে।

একসময় যে নগরী ইতিহাস থেকে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিল, অভিযাত্রীদের সেই দীর্ঘ অনুসন্ধান তাকে আবার ইতিহাসের পাতায় ফিরিয়ে এনেছে।