কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা এবার আরও স্পষ্ট ভূরাজনৈতিক রূপ নিতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোকে কার্যত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে—চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতার প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো উদ্যোগে যোগ দিলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বাদ পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তার বক্তব্য এবং অভ্যন্তরীণ একটি খসড়া নথির ভিত্তিতে এ তথ্য জানা গেছে। খসড়াটি পর্যালোচনা করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
৩৫ দেশকে পাঠানো হতে পারে সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তৈরি খসড়া চিঠিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ওয়াশিংটনের ‘সুযোগের ঘোষণা’তে স্বাক্ষর করা ৩৫টি দেশের উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছে। এই দেশগুলোর অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা’ কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত।
প্যাক্স সিলিকার লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অর্ধপরিবাহী চিপ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ করা। ইতোমধ্যে প্রায় দুই ডজন দেশ এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্রও রয়েছে।
তবে কাজাখস্তান নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে ওয়াশিংটনে। দেশটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নেতৃত্বাধীন দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্যোগে যুক্ত হওয়া একমাত্র পরিচিত দেশ।
‘দুই দিকেই থাকা যাবে না’
খসড়া চিঠিতে দেশগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে অবস্থান বেছে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্যাক্স সিলিকায় স্বাক্ষর শুধু একটি জোটে যোগ দেওয়া নয়; এর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট অঙ্গীকারও যুক্ত রয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রত্যাশা তৈরি করে এমন প্রতিদ্বন্দ্বী উদ্যোগের সদস্যপদ একই সঙ্গে রাখা সম্ভব নয়।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, কোনো দেশ একই সঙ্গে একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে অবস্থান করবে এবং চীনের তৈরি প্রতিদ্বন্দ্বী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাঠামোতেও যোগ দেবে—এটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে দেখানো কঠিন।

চীনের পাল্টা উদ্যোগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় চীনও নিজস্ব আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তুলছে। জুলাইয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ‘বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা’ চালুর উদ্যোগ নেন।
চীন বিশেষভাবে উন্মুক্ত-ওজনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিকে সামনে আনছে। এসব প্রযুক্তি গবেষক ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনভাবে ব্যবহার ও পরিবর্তনের সুযোগ দেয়।
এদিকে চীনের বিভিন্ন উন্মুক্ত-ওজনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিকভাবে নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে। ফলে প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের লড়াইটি এখন গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়েও টানাপোড়েন
এই প্রতিযোগিতা শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। অর্ধপরিবাহী চিপ ও উন্নত প্রযুক্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।
কাজাখস্তানকে জুনে প্যাক্স সিলিয়ায় মধ্য এশিয়ার প্রথম সদস্য হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কাছে উন্নত প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে।
চীন বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বাজারে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা শুল্কযুদ্ধের সময় বেইজিং এসব খনিজকে পাল্টা চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছে।
বিশ্ব প্রযুক্তি ব্যবস্থায় নতুন মেরুকরণের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান বাস্তবায়িত হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী সহযোগিতা আরও দুই মেরুতে বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
ওয়াশিংটন চাইছে মিত্র ও অংশীদারদের নিয়ে এমন একটি প্রযুক্তি ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যেখানে চীনের ওপর নির্ভরতা কম থাকবে। অন্যদিকে বেইজিং নিজস্ব প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছে।
চীনের ওয়াশিংটন দূতাবাস এই ধরনের প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক বিষয়কে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার বিরোধিতা করেছে। তাদের বক্তব্য, এমন পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং এতে কারও স্বার্থ রক্ষা হবে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এই খসড়া চিঠি এখনো চূড়ান্ত নয়। কখন এটি সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে পাঠানো হবে, কিংবা পাঠানোর আগে এর ভাষায় পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















