০৮:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
ভারতে বিনামূল্যের ডিজিটাল লেনদেনে আসছে খরচ, বদলে যেতে পারে ইউপিআইয়ের সাফল্যের গল্প আইফোনের পর্দায় নাচতে থাকা বিন্দুই হতে পারে গাড়িতে বমিভাবের সমাধান বেইজিংয়ের এআই বারে পিন্টের সঙ্গে মিলছে ডিপসিকের টোকেন হারিয়ে যাওয়া ইনকা নগরীর খোঁজে ‘আসল ইন্ডিয়ানা জোন্স’, ৫৩ বছর পর মিলল সত্যের সন্ধান চীন-যুক্তরাষ্ট্রের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুদ্ধে মিত্রদের ‘পক্ষ বেছে নিতে’ বলবে ওয়াশিংটন ডেমরায় দুটি পাইপবোমা উদ্ধার, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে নিষ্ক্রিয় জাতিসংঘের আল-কায়েদা প্রতিবেদন অনুমাননির্ভর, বললেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রাম্প-সমর্থিত ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানের চীনা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা এআই মডেল নিয়ে ব্যবসা, বাড়ছে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন সৌদি যুবরাজের আমন্ত্রণ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আহ্বান এয়ারটেলের নতুন পরিচয় ‘সার্কেল’, ০১৬ নম্বর ও সেবায় থাকছে না কোনো পরিবর্তন

শিক্ষার কোনো শেষ পরীক্ষা নেই: ফলাফলের পরও শেখার পথ খোলা থাকে

পরীক্ষার ফল প্রকাশের মৌসুমে একটি বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বয়সের প্রকল্প নয়, আর কয়েকটি সংখ্যার মাধ্যমে একজন মানুষের শেখার ক্ষমতা কিংবা ভবিষ্যৎকে চূড়ান্তভাবে মাপা যায় না। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষাগুলোর অনেকটাই আসে শ্রেণিকক্ষের বাইরে, যখন মানুষ নিজে থেকে কোনো কিছু জানতে চায়, ভুল করে, আবার চেষ্টা করে এবং ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা তৈরি করে।

নিজে নিজে শেখার এই প্রবণতাকে আমি বিশেষভাবে সম্মান করি। কারণ এর জন্য শুধু মেধা নয়, প্রয়োজন কৌতূহল, ধৈর্য এবং নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করার সাহস। কেউ বই পড়ে শেখে, কেউ অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে, কেউ হাতে-কলমে কাজ করতে গিয়ে। পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে একটি মৌলিক স্বাধীনতা আছে—জানার জন্য কাউকে অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হয় না।

শৈশবের সেই অদম্য কৌতূহল

শিশুরা জন্ম থেকেই অনুসন্ধানী। তারা কোনো বস্তু হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখে, মাটিতে ফেলে শব্দ শোনে, পানি দিয়ে পরীক্ষা করে, খেলনার অংশ খুলে ফেলে আবার জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে। একজন প্রাপ্তবয়স্কের চোখে এগুলো নিছক খেলা হলেও শিশুর কাছে এগুলোই জগতকে বোঝার প্রাথমিক পরীক্ষা।

Why Sand Play Matters for Kids – Benefits, Activities & Toys - Wee Watch

বালু, একটি বালতি আর কিছু খেলনা দিয়েও একটি শিশু পদার্থবিদ্যা, নির্মাণকৌশল, ভারসাম্য কিংবা উপকরণের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে। গল্প বানালে সেখানে যুক্ত হয় অভিনয় ও ভাষা; গান গাইলে তৈরি হয় ছন্দ ও সৃজনশীলতার আরেক জগৎ।

সমস্যা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসা অনেক সময় পরীক্ষার কাঠামোর মধ্যে আটকে যায়। শেখা তখন হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করা, নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সংখ্যার মাধ্যমে সাফল্য প্রমাণ করা।

অবশ্যই পরীক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর শিক্ষার সম্পূর্ণ অর্থ এক বিষয় নয়।

ফলাফল কি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?

যুক্তরাজ্যে এ-লেভেল, জিসিএসই, বিটেক কিংবা কারিগরি শিক্ষার ফল প্রকাশের সময় কিশোর-কিশোরীদের সামনে একের পর এক সিদ্ধান্ত এসে দাঁড়ায়। কোন বিষয় পড়বে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে কি না, প্রশিক্ষণ নেবে কি না—প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন ভবিষ্যতের দরজা খুলবে অথবা বন্ধ করবে।

এখানেই ফলাফলকে ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়। একটি পরীক্ষায় ভালো করার অর্থ এই নয় যে একজন শিক্ষার্থী জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল হবে। একইভাবে কোনো বিষয়ে প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পাওয়ার অর্থও এই নয় যে তার সেই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ বা সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে।

শিক্ষার্থীদের পছন্দও সব সময় তাদের নিজেদের হয় না। কেউ গণিত ও বিজ্ঞানে ভালো বলে তাকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক পড়াশোনার দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে, যদিও তার প্রকৃত আগ্রহ প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস বা সঙ্গীতে। আবার কোনো শিক্ষার্থী মানবিক বিষয়ে দক্ষ হলেও তাকে এমন পেশার দিকে যেতে বলা হতে পারে, যেটিকে পরিবার বেশি নিরাপদ বা লাভজনক মনে করে।

একটি পরীক্ষার ফল তাই দক্ষতার মানচিত্র নয়; এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে একজন শিক্ষার্থীর পারফরম্যান্সের ছবি।

Is It True That Attending University Is The Only Way To Succeed? - Project  Sprouts

বিশ্ববিদ্যালয়ই কি একমাত্র পথ?

এ-লেভেলের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া এখন অনেক তরুণের কাছে প্রায় স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ। এর সুবিধা আছে। নতুন শহরে যাওয়া, নিজের বয়সী মানুষের সঙ্গে বসবাস, স্বাধীনতা অর্জন এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীরভাবে পড়ার সুযোগ—এসব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়কে সবার জন্য একই রকম অপরিহার্য করে তোলার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন থাকা উচিত। বিশেষ করে এমন কিছু কোর্স রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে সরাসরি কর্মসংস্থানের সম্পর্ক দুর্বল। ফলে কেউ কেউ হয়তো পেশাগত জীবন শুরু করার বদলে আরও কয়েক বছর শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়।

অন্যদিকে ভালো মানের শিক্ষানবিশি বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপ পাওয়া অনেক সময় সহজ নয়। অথচ কারিগরি দক্ষতা অর্জনের এই পথ অনেক তরুণের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। নৌকা নির্মাণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং, পোশাক তৈরি কিংবা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পেশায় সরাসরি প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

সমস্যা হলো সামাজিক মর্যাদার ধারণা। বন্ধুরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, তখন স্থানীয় কলেজে গিয়ে বিদ্যুৎ প্রকৌশল, শিশু পরিচর্যা কিংবা অন্য কোনো কারিগরি বিষয়ে পড়াশোনা করাকে অনেক তরুণ নিজের কাছে দ্বিতীয় সারির পথ মনে করতে পারে। অথচ বাস্তবে একটি দক্ষ পেশাজীবী হওয়ার পথ কোনোভাবেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির চেয়ে কম মূল্যবান নয়।

শেখার দ্বিতীয় জীবন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—১৬ বছর বয়সে কোনো সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত নয়।

এমনকি ৬৫ বছর বয়সেও নয়।

How the internet is fracturing our collective attention | Vox

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের আগ্রহ বদলায়। যে তরুণ একসময় ইতিহাসকে বিরক্তিকর মনে করত, সে হয়তো চল্লিশ বছর বয়সে ইতিহাসের বই পড়তে শুরু করবে। যে ব্যক্তি কর্মজীবনে কখনো কাঠের কাজ করেনি, অবসরে গিয়ে সেটিই হয়তো তার সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে উঠতে পারে। কেউ বাগান করবে, কেউ ছবি আঁকবে, কেউ রান্না শিখবে, কেউ পুরোনো যন্ত্রপাতি খুলে দেখে বোঝার চেষ্টা করবে সেগুলো কীভাবে কাজ করে।

এই ধরনের শিক্ষা অর্থনৈতিক সাফল্য না আনলেও জীবনের মান বদলে দিতে পারে। একটি নতুন দক্ষতা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, একঘেয়েমি ভাঙে এবং মানুষকে নিজের জীবন সম্পর্কে নতুন করে আগ্রহী করে।

ইতিহাসে এমন মানুষের অভাব নেই, যারা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজেদের তৈরি করেছেন। মাইকেল ফ্যারাডে বই বাঁধাইয়ের কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন এবং অবসরে বক্তৃতা শুনে বিজ্ঞান শিখেছিলেন। পরে তিনি রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন। জিমি হেনড্রিক্সও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে নিজের শ্রবণশক্তি ও অনুশীলনের মাধ্যমে সংগীতের অসাধারণ দক্ষতা তৈরি করেছিলেন। জীবনের অনেক পরে নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করা মানুষও কম নেই।

ডিজিটাল যুগের নতুন সুযোগ

ইন্টারনেটকে আমরা প্রায়ই মনোযোগ নষ্ট করার মাধ্যম হিসেবে দেখি। অভিযোগের কারণও আছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি একজন আগ্রহী মানুষকে এমন বিপুল জ্ঞানভাণ্ডারে পৌঁছে দিতে পারে, যা আগের প্রজন্মের কাছে কল্পনাতীত ছিল।

বই, দীর্ঘ প্রবন্ধ, বক্তৃতা, পডকাস্ট, অনলাইন কোর্স, তথ্যচিত্র—সবই এখন হাতের নাগালে। শুধু বিনোদনের জন্য স্ক্রল না করে কেউ চাইলে ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, প্রকৌশল, রান্না কিংবা কারুশিল্প নিয়ে বছরের পর বছর শিখতে পারে।

তবে প্রযুক্তি নিজে কাউকে শিক্ষিত করে না। প্রয়োজন কৌতূহল এবং মনোযোগ। শেখার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়তো তথ্যের অভাব নয়; বরং এমন এক অভ্যাস, যেখানে মানুষ এক মুহূর্তের উত্তেজনার পর আর কোনো বিষয়ে গভীরে যেতে চায় না।

সেখানেই আত্মশিক্ষার গুরুত্ব।

শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব অবশ্যই আছে। ভালো শিক্ষক একটি নিস্তেজ বিষয়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন। একটি বই, একটি বক্তৃতা কিংবা একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎও বহু বছরের সুপ্ত আগ্রহকে জাগিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেখার ইচ্ছাকে নিজের ভেতরেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

Support for young people during exam results season

ফলাফল একটি অধ্যায়, সমাপ্তি নয়

পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন তাই একজন তরুণের জন্য আনন্দেরও হতে পারে, হতাশারও। কেউ কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, কেউ হয়তো অন্য পথ বেছে নেবে। কেউ নিজের স্বপ্নের বিষয় পড়ার সুযোগ পাবে, কেউ নতুন পরিকল্পনা করতে বাধ্য হবে।

কিন্তু কোনো ফলাফলকেই জীবনের চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখা উচিত নয়।

একজন মানুষের ভবিষ্যৎ কেবল তার পরীক্ষার নম্বর দিয়ে তৈরি হয় না। তৈরি হয় তার কৌতূহল, অধ্যবসায়, ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা, নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহস এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার ইচ্ছা দিয়ে।

শিক্ষার প্রকৃত শক্তি এখানেই। এটি কোনো পরীক্ষার হলের দরজায় শেষ হয় না। বরং সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হতে পারে, যখন মানুষ কোনো প্রশ্নের উত্তর না জেনে সেটি জানার জন্য নিজেই পথ খুঁজতে শুরু করে।

জীবন যত দীর্ঘ, শেখার সম্ভাবনাও তত দীর্ঘ। তাই ১৬ বছরের ফলাফল যেমন শেষ কথা নয়, ৬৫ বছরের বয়সও শেখার শেষ বয়স নয়। মানুষের ভেতরের সেই শিশুসুলভ কৌতূহল যদি টিকে থাকে, তবে নতুন করে শেখার দরজা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভারতে বিনামূল্যের ডিজিটাল লেনদেনে আসছে খরচ, বদলে যেতে পারে ইউপিআইয়ের সাফল্যের গল্প

শিক্ষার কোনো শেষ পরীক্ষা নেই: ফলাফলের পরও শেখার পথ খোলা থাকে

০৭:০৬:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

পরীক্ষার ফল প্রকাশের মৌসুমে একটি বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই—শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট বয়সের প্রকল্প নয়, আর কয়েকটি সংখ্যার মাধ্যমে একজন মানুষের শেখার ক্ষমতা কিংবা ভবিষ্যৎকে চূড়ান্তভাবে মাপা যায় না। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষাগুলোর অনেকটাই আসে শ্রেণিকক্ষের বাইরে, যখন মানুষ নিজে থেকে কোনো কিছু জানতে চায়, ভুল করে, আবার চেষ্টা করে এবং ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা তৈরি করে।

নিজে নিজে শেখার এই প্রবণতাকে আমি বিশেষভাবে সম্মান করি। কারণ এর জন্য শুধু মেধা নয়, প্রয়োজন কৌতূহল, ধৈর্য এবং নিজের অজ্ঞতাকে স্বীকার করার সাহস। কেউ বই পড়ে শেখে, কেউ অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে, কেউ হাতে-কলমে কাজ করতে গিয়ে। পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে একটি মৌলিক স্বাধীনতা আছে—জানার জন্য কাউকে অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হয় না।

শৈশবের সেই অদম্য কৌতূহল

শিশুরা জন্ম থেকেই অনুসন্ধানী। তারা কোনো বস্তু হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখে, মাটিতে ফেলে শব্দ শোনে, পানি দিয়ে পরীক্ষা করে, খেলনার অংশ খুলে ফেলে আবার জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে। একজন প্রাপ্তবয়স্কের চোখে এগুলো নিছক খেলা হলেও শিশুর কাছে এগুলোই জগতকে বোঝার প্রাথমিক পরীক্ষা।

Why Sand Play Matters for Kids – Benefits, Activities & Toys - Wee Watch

বালু, একটি বালতি আর কিছু খেলনা দিয়েও একটি শিশু পদার্থবিদ্যা, নির্মাণকৌশল, ভারসাম্য কিংবা উপকরণের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে পারে। গল্প বানালে সেখানে যুক্ত হয় অভিনয় ও ভাষা; গান গাইলে তৈরি হয় ছন্দ ও সৃজনশীলতার আরেক জগৎ।

সমস্যা হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসা অনেক সময় পরীক্ষার কাঠামোর মধ্যে আটকে যায়। শেখা তখন হয়ে ওঠে নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করা, নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষা দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সংখ্যার মাধ্যমে সাফল্য প্রমাণ করা।

অবশ্যই পরীক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা আর শিক্ষার সম্পূর্ণ অর্থ এক বিষয় নয়।

ফলাফল কি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে?

যুক্তরাজ্যে এ-লেভেল, জিসিএসই, বিটেক কিংবা কারিগরি শিক্ষার ফল প্রকাশের সময় কিশোর-কিশোরীদের সামনে একের পর এক সিদ্ধান্ত এসে দাঁড়ায়। কোন বিষয় পড়বে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে কি না, প্রশিক্ষণ নেবে কি না—প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন ভবিষ্যতের দরজা খুলবে অথবা বন্ধ করবে।

এখানেই ফলাফলকে ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়। একটি পরীক্ষায় ভালো করার অর্থ এই নয় যে একজন শিক্ষার্থী জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল হবে। একইভাবে কোনো বিষয়ে প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পাওয়ার অর্থও এই নয় যে তার সেই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ বা সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে।

শিক্ষার্থীদের পছন্দও সব সময় তাদের নিজেদের হয় না। কেউ গণিত ও বিজ্ঞানে ভালো বলে তাকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক পড়াশোনার দিকে ঠেলে দেওয়া হতে পারে, যদিও তার প্রকৃত আগ্রহ প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস বা সঙ্গীতে। আবার কোনো শিক্ষার্থী মানবিক বিষয়ে দক্ষ হলেও তাকে এমন পেশার দিকে যেতে বলা হতে পারে, যেটিকে পরিবার বেশি নিরাপদ বা লাভজনক মনে করে।

একটি পরীক্ষার ফল তাই দক্ষতার মানচিত্র নয়; এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে একজন শিক্ষার্থীর পারফরম্যান্সের ছবি।

Is It True That Attending University Is The Only Way To Succeed? - Project  Sprouts

বিশ্ববিদ্যালয়ই কি একমাত্র পথ?

এ-লেভেলের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া এখন অনেক তরুণের কাছে প্রায় স্বাভাবিক পরবর্তী ধাপ। এর সুবিধা আছে। নতুন শহরে যাওয়া, নিজের বয়সী মানুষের সঙ্গে বসবাস, স্বাধীনতা অর্জন এবং একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীরভাবে পড়ার সুযোগ—এসব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হতে পারে।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়কে সবার জন্য একই রকম অপরিহার্য করে তোলার প্রবণতা নিয়েও প্রশ্ন থাকা উচিত। বিশেষ করে এমন কিছু কোর্স রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে সরাসরি কর্মসংস্থানের সম্পর্ক দুর্বল। ফলে কেউ কেউ হয়তো পেশাগত জীবন শুরু করার বদলে আরও কয়েক বছর শিক্ষাজীবন দীর্ঘায়িত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়।

অন্যদিকে ভালো মানের শিক্ষানবিশি বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপ পাওয়া অনেক সময় সহজ নয়। অথচ কারিগরি দক্ষতা অর্জনের এই পথ অনেক তরুণের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। নৌকা নির্মাণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং, পোশাক তৈরি কিংবা বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পেশায় সরাসরি প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

সমস্যা হলো সামাজিক মর্যাদার ধারণা। বন্ধুরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, তখন স্থানীয় কলেজে গিয়ে বিদ্যুৎ প্রকৌশল, শিশু পরিচর্যা কিংবা অন্য কোনো কারিগরি বিষয়ে পড়াশোনা করাকে অনেক তরুণ নিজের কাছে দ্বিতীয় সারির পথ মনে করতে পারে। অথচ বাস্তবে একটি দক্ষ পেশাজীবী হওয়ার পথ কোনোভাবেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির চেয়ে কম মূল্যবান নয়।

শেখার দ্বিতীয় জীবন

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—১৬ বছর বয়সে কোনো সিদ্ধান্তই শেষ সিদ্ধান্ত নয়।

এমনকি ৬৫ বছর বয়সেও নয়।

How the internet is fracturing our collective attention | Vox

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের আগ্রহ বদলায়। যে তরুণ একসময় ইতিহাসকে বিরক্তিকর মনে করত, সে হয়তো চল্লিশ বছর বয়সে ইতিহাসের বই পড়তে শুরু করবে। যে ব্যক্তি কর্মজীবনে কখনো কাঠের কাজ করেনি, অবসরে গিয়ে সেটিই হয়তো তার সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে উঠতে পারে। কেউ বাগান করবে, কেউ ছবি আঁকবে, কেউ রান্না শিখবে, কেউ পুরোনো যন্ত্রপাতি খুলে দেখে বোঝার চেষ্টা করবে সেগুলো কীভাবে কাজ করে।

এই ধরনের শিক্ষা অর্থনৈতিক সাফল্য না আনলেও জীবনের মান বদলে দিতে পারে। একটি নতুন দক্ষতা আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, একঘেয়েমি ভাঙে এবং মানুষকে নিজের জীবন সম্পর্কে নতুন করে আগ্রহী করে।

ইতিহাসে এমন মানুষের অভাব নেই, যারা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজেদের তৈরি করেছেন। মাইকেল ফ্যারাডে বই বাঁধাইয়ের কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন এবং অবসরে বক্তৃতা শুনে বিজ্ঞান শিখেছিলেন। পরে তিনি রয়্যাল ইনস্টিটিউশনের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞানী হয়ে ওঠেন। জিমি হেনড্রিক্সও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে নিজের শ্রবণশক্তি ও অনুশীলনের মাধ্যমে সংগীতের অসাধারণ দক্ষতা তৈরি করেছিলেন। জীবনের অনেক পরে নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করা মানুষও কম নেই।

ডিজিটাল যুগের নতুন সুযোগ

ইন্টারনেটকে আমরা প্রায়ই মনোযোগ নষ্ট করার মাধ্যম হিসেবে দেখি। অভিযোগের কারণও আছে। কিন্তু একই প্রযুক্তি একজন আগ্রহী মানুষকে এমন বিপুল জ্ঞানভাণ্ডারে পৌঁছে দিতে পারে, যা আগের প্রজন্মের কাছে কল্পনাতীত ছিল।

বই, দীর্ঘ প্রবন্ধ, বক্তৃতা, পডকাস্ট, অনলাইন কোর্স, তথ্যচিত্র—সবই এখন হাতের নাগালে। শুধু বিনোদনের জন্য স্ক্রল না করে কেউ চাইলে ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, প্রকৌশল, রান্না কিংবা কারুশিল্প নিয়ে বছরের পর বছর শিখতে পারে।

তবে প্রযুক্তি নিজে কাউকে শিক্ষিত করে না। প্রয়োজন কৌতূহল এবং মনোযোগ। শেখার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়তো তথ্যের অভাব নয়; বরং এমন এক অভ্যাস, যেখানে মানুষ এক মুহূর্তের উত্তেজনার পর আর কোনো বিষয়ে গভীরে যেতে চায় না।

সেখানেই আত্মশিক্ষার গুরুত্ব।

শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব অবশ্যই আছে। ভালো শিক্ষক একটি নিস্তেজ বিষয়কে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেন। একটি বই, একটি বক্তৃতা কিংবা একজন অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎও বহু বছরের সুপ্ত আগ্রহকে জাগিয়ে দিতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেখার ইচ্ছাকে নিজের ভেতরেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়।

Support for young people during exam results season

ফলাফল একটি অধ্যায়, সমাপ্তি নয়

পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন তাই একজন তরুণের জন্য আনন্দেরও হতে পারে, হতাশারও। কেউ কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, কেউ হয়তো অন্য পথ বেছে নেবে। কেউ নিজের স্বপ্নের বিষয় পড়ার সুযোগ পাবে, কেউ নতুন পরিকল্পনা করতে বাধ্য হবে।

কিন্তু কোনো ফলাফলকেই জীবনের চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখা উচিত নয়।

একজন মানুষের ভবিষ্যৎ কেবল তার পরীক্ষার নম্বর দিয়ে তৈরি হয় না। তৈরি হয় তার কৌতূহল, অধ্যবসায়, ভুল থেকে শেখার ক্ষমতা, নতুন কিছু চেষ্টা করার সাহস এবং সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার ইচ্ছা দিয়ে।

শিক্ষার প্রকৃত শক্তি এখানেই। এটি কোনো পরীক্ষার হলের দরজায় শেষ হয় না। বরং সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হতে পারে, যখন মানুষ কোনো প্রশ্নের উত্তর না জেনে সেটি জানার জন্য নিজেই পথ খুঁজতে শুরু করে।

জীবন যত দীর্ঘ, শেখার সম্ভাবনাও তত দীর্ঘ। তাই ১৬ বছরের ফলাফল যেমন শেষ কথা নয়, ৬৫ বছরের বয়সও শেখার শেষ বয়স নয়। মানুষের ভেতরের সেই শিশুসুলভ কৌতূহল যদি টিকে থাকে, তবে নতুন করে শেখার দরজা কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয় না।