সেরেনা উইলিয়ামসের মতো বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াবিদ যখন ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারের কথা প্রকাশ্যে জানান, তখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এই ওষুধ কি শুধু শরীরের ওজন কমায়, নাকি খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সেও বাড়তি সুবিধা দিতে পারে?
বর্তমানে ওজন কমানোর জন্য ব্যবহৃত জিএলপি-১ শ্রেণির ওষুধ পেশাদার খেলাধুলায় নিষিদ্ধ নয়। তবে এসব ওষুধ শরীরের ওজন কমানোর পাশাপাশি প্রদাহ কমানো, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করা এবং বিপাকীয় কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার মতো প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ফলে ক্রীড়াঙ্গনে এগুলোকে কার্যক্ষমতা-বর্ধক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে।
সেরেনা উইলিয়ামসকে ঘিরে নতুন আলোচনা
চার বছর পর পেশাদার টেনিসে ফেরার আগে সেরেনা উইলিয়ামস জানিয়েছিলেন, সন্তান জন্মের পর অতিরিক্ত ওজন কমাতে তিনি জিএলপি-১ শ্রেণির একটি ওষুধ ব্যবহার করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়মিত দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করেও তিনি প্রত্যাশিতভাবে ওজন কমাতে পারছিলেন না।
তিনি যে ওষুধটির কথা বলেছেন, সেটি তিরজেপাটাইড। এটি ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে এবং শরীরকে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি দেয়। এর ফলে অনেকের শরীরের ওজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
সেরেনা জানিয়েছেন, ওষুধ ব্যবহারের পর তার হৃদ্যন্ত্রের ঝুঁকি কমেছে, জয়েন্টের সমস্যা উন্নত হয়েছে এবং কোলেস্টেরলের মাত্রাতেও পরিবর্তন এসেছে। তার দাবি, এমন কিছু শারীরিক নড়াচড়া এখন তিনি করতে পারছেন, যা আগে সম্ভব ছিল না।
এখানেই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন—শরীর সুস্থ ও হালকা হওয়ার কারণে একজন ক্রীড়াবিদ যদি দ্রুত চলতে পারেন বা বেশি সময় খেলতে পারেন, তাহলে সেটিকে কি ওষুধের মাধ্যমে পাওয়া বাড়তি সুবিধা হিসেবে ধরা হবে?
জিএলপি-১ ওষুধ কীভাবে কাজ করে
জিএলপি-১ হলো শরীরে স্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়া একটি হরমোন, যা ক্ষুধা ও খাবার গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। এই হরমোনের অনুকরণ করে তৈরি ওষুধ মস্তিষ্কে ক্ষুধার অনুভূতি কমাতে পারে।
তিরজেপাটাইড একই সঙ্গে জিআইপি নামের আরেকটি হরমোনের ওপরও কাজ করে। ফলে ক্ষুধা কমে এবং খাবার গ্রহণের পর দীর্ঘ সময় তৃপ্তি অনুভূত হতে পারে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে পারছেন, এসব ওষুধের প্রভাব শুধু ওজন কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
গবেষণায় প্রদাহ কমানো, বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর মতো সম্ভাব্য উপকারও দেখা গেছে। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, হৃদ্যন্ত্রের ওপর এসব উপকারের পুরোটা কেবল ওজন কমার কারণে হয় না।

ক্রীড়াবিদদের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
খেলাধুলায় সামান্য শারীরিক সুবিধাও অনেক সময় জয়-পরাজয়ের পার্থক্য তৈরি করে। বিশেষ করে দৌড়, টেনিস, সাইক্লিং কিংবা ওজনভিত্তিক প্রতিযোগিতায় শরীরের ওজন ও শক্তির অনুপাত গুরুত্বপূর্ণ।
বক্সিং ও কুস্তির মতো খেলায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট। সেখানে নির্দিষ্ট ওজনসীমার মধ্যে থেকেই প্রতিযোগিতা করতে হয়। কোনো ওষুধ ব্যবহার করে দ্রুত ওজন কমিয়ে সেই সীমার মধ্যে ঢুকে পড়া অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
এ কারণেই খেলাধুলায় মূত্রবর্ধক কিছু ওষুধ নিষিদ্ধ। এসব ওষুধ শরীর থেকে পানি বের করে দ্রুত ওজন কমাতে পারে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ কোনো পদার্থ শরীর থেকে দ্রুত বের করে ফেলার উদ্দেশ্যেও এগুলো অপব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে জিএলপি-১ ওষুধের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এখনো ভিন্ন। বিশ্ব ক্রীড়া নিষেধাজ্ঞা সংস্থা এগুলোকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং পর্যবেক্ষণ করছে।
এখনো কার্যক্ষমতা-বর্ধক হিসেবে স্বীকৃত নয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো পদার্থকে ক্রীড়ায় নিষিদ্ধ করতে হলে সেটি কার্যক্ষমতা বাড়াতে পারে কি না, খেলোয়াড়ের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কি না অথবা খেলাধুলার মৌলিক নীতির পরিপন্থী কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা হয়।
জিএলপি-১ ওষুধ এখনো এসব মানদণ্ডে নিষিদ্ধ তালিকায় পড়েনি। কারণ উচ্চপর্যায়ের ক্রীড়াবিদদের ওপর এর কার্যকারিতা নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি।
মিলানের এক হৃদ্রোগ ও ব্যায়ামবিষয়ক বিশেষজ্ঞের মতে, বিষয়টি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এত দিন যা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়েছে, নতুন গবেষণার কারণে সেটি নিয়ে আবার প্রশ্ন উঠছে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যানিয়েল ড্রাকারও মনে করেন, জিএলপি-১ ওষুধ ক্রীড়াবিদদের কার্যক্ষমতা বাড়ায়—এমন সরাসরি প্রমাণ এখনো নেই। তবে প্রমাণ না থাকা মানেই যে এমন কোনো প্রভাব নেই, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ওজন কমলেও কমতে পারে পেশি
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে বড় একটি উদ্বেগ হলো পেশির পরিমাণ কমে যাওয়া।
শরীরকে দ্রুত চালানো, দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করা এবং আঘাতের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে পেশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু ওজন কমলেই একজন খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, জিএলপি-১ শ্রেণির বিভিন্ন ওষুধে কমে যাওয়া ওজনের একটি অংশ হতে পারে চর্বিবিহীন দেহভর। এর মধ্যে পেশি, পানি এবং অন্যান্য টিস্যুও রয়েছে।
তবে পর্যাপ্ত আমিষ গ্রহণ, শক্তিবর্ধক ব্যায়াম এবং নিয়মিত শরীরের গঠন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পেশি ধরে রাখার সুযোগ থাকতে পারে।
ক্রীড়াবিদরা যেহেতু সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি প্রশিক্ষণ নেন, তাই ওষুধের কারণে পেশি কমার প্রভাব কিছু ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সামাল দেওয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো গবেষণা এখনো নেই।
ক্ষুধা কমে গেলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে
ওজন কমানোর ওষুধের আরেকটি বড় সমস্যা হতে পারে পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণে অসুবিধা।
উচ্চপর্যায়ের খেলোয়াড়দের প্রতিদিনের কঠোর প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়। অথচ জিএলপি-১ ওষুধ ক্ষুধা কমিয়ে দেয়। ফলে একজন খেলোয়াড় প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার গ্রহণ করতে পারেন।
ব্যায়ামবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, পর্যাপ্ত শক্তি না পেলে প্রশিক্ষণ থেকে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি, পুনরুদ্ধার এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এমনকি শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় দীর্ঘ সময় কম শক্তি গ্রহণ করলে খেলোয়াড়দের মধ্যে আপেক্ষিক শক্তিঘাটতিজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে হাড়ের স্বাস্থ্য, মানসিক সুস্থতা এবং খেলাধুলার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাহলে কি এটি অন্যায় সুবিধা?
এখানেই বিতর্কের সবচেয়ে কঠিন জায়গা।
একজন অতিরিক্ত ওজনের ক্রীড়াবিদ যদি চিকিৎসকের পরামর্শে ওজন কমানোর জন্য এই ওষুধ ব্যবহার করেন এবং এর ফলে তার স্বাস্থ্য ও চলাফেরার সক্ষমতা উন্নত হয়, তাহলে সেটিকে সরাসরি প্রতারণা বলা কঠিন।
অন্যদিকে, একজন স্বাভাবিক ওজনের খেলোয়াড় যদি কেবল প্রতিযোগিতায় সামান্য বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য ওষুধটি ব্যবহার করেন, তাহলে নৈতিক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জনপ্রিয় ক্রীড়াবিদদের ওষুধ ব্যবহারের ঘটনা তরুণ খেলোয়াড়দের মধ্যেও এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে সুস্থ শরীরের জন্যও ওজন কমানোর ওষুধ প্রয়োজন।
বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। একজন বিশ্বখ্যাত খেলোয়াড়ের ব্যবহার তাদের কাছে ওষুধকে স্বাভাবিক বা প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে।
বিজ্ঞান এখনো চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি
বর্তমান প্রমাণের ভিত্তিতে জিএলপি-১ ওষুধকে কার্যক্ষমতা-বর্ধক ওষুধ বলা যায় না। আবার এর সম্ভাব্য পরোক্ষ প্রভাব পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার মতো তথ্যও নেই।
ওজন কমার পাশাপাশি প্রদাহ কমানো, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করা এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রমে ইতিবাচক প্রভাব পড়লে একজন ক্রীড়াবিদের প্রশিক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে কিছু সুবিধা তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা এখনো মূলত তাত্ত্বিক।
উল্টো দিকে পেশি কমে যাওয়া, হজমের সমস্যা এবং পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণে ব্যর্থতার কারণে পারফরম্যান্স কমেও যেতে পারে।
তাই আপাতত সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হলো—জিএলপি-১ ওষুধকে ক্রীড়ায় নিষিদ্ধ করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনো নেই। তবে ক্রীড়াবিদদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়তে থাকলে ন্যায্য প্রতিযোগিতা, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং খেলাধুলার নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















