বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে মেধাবী গবেষকদের প্রধান গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। উন্নত গবেষণার পরিবেশ, বিপুল অর্থায়ন, স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রই ছিল উচ্চাভিলাষী বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে স্বাভাবিক পছন্দ। কিন্তু সেই চিত্রে এখন ধীরে ধীরে পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। অর্থায়ন কমে যাওয়া, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং চীনা বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানীদের নিয়ে বাড়তে থাকা সন্দেহ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সুবিধাকে দুর্বল করছে। একই সময়ে চীনও বিদেশি বিজ্ঞানীদের জন্য ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
চীনে ফিরছেন গবেষক, বাড়ছে নতুন সম্ভাবনা
এই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ঝিলিন ইয়াং। কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে পিএইচডি করার পর যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ তাঁর সামনে ছিল। কিন্তু তিনি চীনে ফিরে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মুনশট এআই গড়ে তোলেন।
জুলাইয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠান কিমি কে৩ নামের একটি উন্মুক্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল প্রকাশ করে। কম খরচে তৈরি এই মডেলের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সেরা মডেলগুলোর কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঝিলিন ইয়াংয়ের এই সিদ্ধান্তকে ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কমছে। চীন এখন বিদেশে থাকা বিজ্ঞানীদের ফিরিয়ে আনতে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারছে। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইউরোপের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বেতন দেওয়ার পাশাপাশি স্থানান্তর ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও দিচ্ছে।
দুই দশক আগে বিদেশফেরত চীনা বিজ্ঞানীদের অনেক ক্ষেত্রেই দেশের জন্য ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা বিসর্জন দিতে হতো। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে।
নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরও চীনে পাড়ি
চীনের পরিবর্তিত আকর্ষণের আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত ওমর ইয়াগি। গত বছর রসায়নে নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নেওয়া এই বিজ্ঞানী ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলি ছেড়ে বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিচ্ছেন। সেখানে তিনি এমন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেবেন, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নতুন উপাদান আবিষ্কারের কাজ দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ছাড়া গত এক বছরে চীনের মূল ভূখণ্ড ও হংকংয়ের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত আটজন খ্যাতিমান গণিতবিদকে নিয়োগ দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে নানকাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছেন জোশুয়া জালও।
চীনের জন্য এসব নিয়োগ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার পাওয়া চীনের মূল ভূখণ্ডে কর্মরত একমাত্র বিজ্ঞানী ছিলেন তু ইউইউ।
গণিতে চীনের অগ্রগতি, তবু প্রশ্ন স্বাধীনতা নিয়ে
চীনা গণিতের অগ্রগতিও এখন স্পষ্ট। ২০২৬ সালের ফিল্ডস পদকজয়ীদের চারজনের মধ্যে দুইজন চীনে জন্মগ্রহণকারী গবেষক। তাঁরা উন্নত শিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই নিজেদের প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন।
তাঁদের একজন ইউ দেং। ২০০৭ সালে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি পরে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে যান, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন এবং শেষ পর্যন্ত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন।

অন্যজন হং ওয়াং। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রথমে পৃথিবী ও মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়লেও এক বছর পর গণিতে চলে যান। পরে তিনি ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট দে ওত জেতুদ সায়েন্সিফিকের অধ্যাপক।
হং ওয়াংয়ের অভিজ্ঞতা চীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কও তৈরি করেছে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর পিএইচডির সময় মতের ভিন্নতা প্রকাশ করলেও তাঁর উপদেষ্টা ধৈর্য ধরে তা শুনতেন। এতে নিজের ওপর তাঁর আস্থা বেড়েছিল।
চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর এই মন্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই এটিকে দেশটির অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার চাপের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি তরুণ গবেষকদের ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার স্বাধীনতা এবং নতুন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজনীয় সহনশীলতা দিতে পারবে?
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তিই এখন ঝুঁকিতে
অর্থ ও গবেষণার অবকাঠামোর ক্ষেত্রে চীন দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবধান কমিয়ে আনছে। কিন্তু স্বাধীনতা, পারস্পরিক আস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বড় শক্তি।
ফিল্ডস পদকজয়ী টেরেন্স তাও বলেছেন, একসময় যুক্তরাষ্ট্র ছিল মেধাবী গবেষকদের কাছে প্রায় স্বতঃসিদ্ধ গন্তব্য। কিন্তু সেই নিশ্চয়তা আর আগের মতো নেই।
গত বছর ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থায়ন স্থগিতের সিদ্ধান্ত ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসে তাওয়ের ব্যক্তিগত গবেষণা অনুদান এবং তাঁর নেতৃত্বে থাকা একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকেও প্রভাবিত করেছিল। পরে আদালতের মাধ্যমে অর্থায়ন পুনর্বহাল হয়। তবে এমন আকস্মিক অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং গবেষকদের প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমিয়ে দিতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের ওপরও প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে যে পিএইচডিগুলো দেওয়া হয়েছিল, তার প্রায় ৪৪ শতাংশ পেয়েছিলেন বিদেশি শিক্ষার্থীরা।
চীনা শিক্ষার্থীরাও এই ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রেখেছেন। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে দেওয়া মোট পিএইচডির প্রায় ১৭ শতাংশ পেয়েছিলেন চীনা শিক্ষার্থীরা। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করা চীনা শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮৭ শতাংশ সেখানে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু এখন সেই ধারাবাহিকতাই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ২০২৫ সালে বিদেশি শিক্ষার্থীদের দেওয়া ভিসার সংখ্যা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে যায়। গত মাসে ট্রাম্প প্রশাসন বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনুমোদিত সময়সীমা নিয়েও নতুন বিধিনিষেধ চূড়ান্ত করেছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে মেধাবী বিদেশি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বদলে অন্য গন্তব্য বেছে নিতে পারেন—এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তরুণ প্রতিভার ভবিষ্যৎ কোথায়?
ইউ দেংকে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। তিনি আপাতত শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়েই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গবেষণার সুযোগ, সহকর্মী, জীবনযাত্রার মানসহ নানা বিষয় বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
তাঁকে যখন প্রশ্ন করা হয়, আজ যদি তিনি ২০ বছর বয়সী হতেন, তাহলে চীনের বাইরে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতেন কি না, তাঁর উত্তর ছিল আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক।
গবেষণা অর্থায়ন কমে যাওয়া এবং ভিসা সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজ চীনে বসে সিদ্ধান্ত নিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার বিষয়টি তিনি অনেক বেশি ভেবে দেখতেন।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় তাই শুধু অর্থ বা গবেষণাগারের আধুনিকতা দিয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে না। প্রতিভাবান তরুণদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ, ব্যর্থতা থেকে শেখার পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র যদি তার দীর্ঘদিনের এই সুবিধাগুলো ধরে রাখতে না পারে, আর চীন যদি সেগুলোর কিছুটা হলেও তৈরি করতে পারে, তাহলে বিশ্বের মেধাবী বিজ্ঞানীদের আকর্ষণের মানচিত্র আগামী বছরগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















