০৯:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
দ্বিতীয় টেস্টের আগে স্বস্তি, নেটে ফিরেছেন তানজিদ-মুশফিক পুরুষের সাজে নতুন ঝলক, কানে দুলের দাপট চীনে মার্কিন শিক্ষাবিদের আটক নিয়ে রুবিওর অভিযোগ প্রত্যাখ্যান বেইজিংয়ের দিনাজপুরে ট্রাকের ধাক্কায় মা-মেয়ের মৃত্যু, বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়া হলো না হামসদৃশ উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, দেশে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যু ৯২৮ তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, দিল্লির জবাবের অপেক্ষায় ঢাকা জারদারির অভিনন্দন মির্জা ফখরুলকে, বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যাশা বিচার কি কেবল অতীতের পুনরাবৃত্তি, নাকি যুক্তির স্বাধীন প্রয়োগ? খ্যাতি কি সত্যিই সুখ আনে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ‘দ্য কিলার্স’ তারকা ব্র্যান্ডন ফ্লাওয়ার্স মক্কা নিরাপত্তা চুক্তি: ভারত কি নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত?

বিশ্বের সামুদ্রিক সংকটপথের নিরাপত্তা: একক শক্তির পাহারা নয়, দরকার নতুন বৈশ্বিক কাঠামো

আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো অবাধ সমুদ্রপথ। তেল, গ্যাস, খাদ্য, শিল্পপণ্য থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিশাল অংশ নির্ভর করে কয়েকটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর। তাই দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত চিন্তার কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন—এই পথগুলো খোলা রাখবে কে?

কিন্তু হরমুজ প্রণালি থেকে বাব আল-মান্দেব পর্যন্ত বারবার তৈরি হওয়া অস্থিরতা দেখিয়ে দিচ্ছে, সমস্যাটি শুধু কোনো একটি জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নয়। আসল সংকট আরও গভীরে। বৈশ্বিক বাণিজ্য যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আগামী দশকের বড় প্রশ্ন তাই শুধু কে এসব জলপথ রক্ষা করবে, তা নয়। বরং নিরাপত্তা পরিচালনার অধিকার কার, কোন নিয়মে তা পরিচালিত হবে এবং সেই ব্যবস্থার বৈধতা কোথা থেকে আসবে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

দীর্ঘ সময় ধরে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক ধরনের অলিখিত দায়িত্ববণ্টন কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন নৌযান চলাচলের স্বাধীনতার নীতি নির্ধারণ করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নৌবাহিনী সেই স্বাধীনতা রক্ষার সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ সরবরাহ করেছে। এই ব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত ছিল না, কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এটি মোটামুটি কার্যকর ছিল।

এখন সেই কাঠামোর দুর্বলতা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

সমুদ্রপথে বাণিজ্য ব্যাহত করতে আর সমুদ্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয় না। তুলনামূলক কম খরচে ড্রোন, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন, সাইবার হামলা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা ব্যবহার করেই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করা সম্ভব। ফলে একটি বিপজ্জনক অসমতা তৈরি হয়েছে—একটি সামুদ্রিক পথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা যত সহজ হচ্ছে, সেটিকে নিরাপদ রাখা তত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

আর কোনো প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করাও জরুরি নয়। কয়েকটি হামলা, কিংবা হামলার বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কাই যথেষ্ট। এতে বীমা ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, জাহাজকে দীর্ঘতর বিকল্প পথে পাঠাতে হতে পারে, পণ্য পৌঁছাতে দেরি হতে পারে এবং পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও সরবরাহব্যবস্থা অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

অর্থাৎ কোনো জলপথকে অকার্যকর করে দেওয়ার ক্ষমতা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের হাতে নেই। ঝুঁকি বেড়ে গেলে যে বীমা প্রতিষ্ঠান কোনো জাহাজের যাত্রাকে আর অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করে না, তার সিদ্ধান্তও কার্যত একই ফল তৈরি করতে পারে।

শুধু যুদ্ধজাহাজ দিয়ে সমাধান হবে না

সংকট দেখা দিলে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সামরিক শক্তি দিয়ে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ এখানে ঘাটতি শুধু শক্তির নয়; প্রয়োজন নিয়ম, প্রতিষ্ঠান এবং বৈধতার।

এই সংকটের মূল দ্বন্দ্বটি হলো—কৌশলগত জলপথ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান স্থানীয়। হরমুজ, বাব আল-মান্দেব কিংবা এ ধরনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সীমানা ও আশপাশের সামুদ্রিক অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সেই রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকার যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি এসব জলপথে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাবও কেবল তাদের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না।

একটি আঞ্চলিক সংঘাত মুহূর্তেই জ্বালানি মূল্য, খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় আঘাত করতে পারে।

তাই উপকূলীয় রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সীমাহীন অধিকার দিতে পারে না। আবার নৌ চলাচলের স্বাধীনতার নামেও বাইরের শক্তিগুলো কোনো রাষ্ট্রের উপকূলের কাছে সীমাহীন সামরিক উপস্থিতির অধিকার দাবি করতে পারে না।

দায়িত্বশীল সামুদ্রিক সার্বভৌমত্বের প্রয়োজন

এই দ্বন্দ্বের একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে দায়িত্বশীল সামুদ্রিক সার্বভৌমত্বের ধারণা। কৌশলগত জলপথের আশপাশের নিরাপত্তায় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর অগ্রাধিকার থাকবে। তবে সেই অগ্রাধিকারের সঙ্গে কিছু বাধ্যবাধকতাও থাকতে হবে।

তাদের দায়িত্ব হবে বৈধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা, নিজেদের ভূখণ্ডকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে হামলার ঘাঁটি হতে না দেওয়া এবং সংকটের সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতায় অংশ নেওয়া।

সমস্যা আরও জটিল হয় যখন কোনো রাষ্ট্র নিজেই এসব দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়ে, অথবা তার ভূখণ্ডে সক্রিয় কোনো অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।

এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দায়িত্ব একটি স্তরভিত্তিক কাঠামোয় সাজানো যেতে পারে। প্রথমে জাতীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা, প্রয়োজন হলে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং উভয় পর্যায় ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক সহায়তা বা হস্তক্ষেপ। তবে আন্তর্জাতিক ভূমিকা হতে হবে আইন, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও বৈধতার সুস্পষ্ট সীমার মধ্যে।

Safe Passage Strait Hormuz: Maritime Security Risks

নতুন যুগে সামুদ্রিক সংকটপথ শুধু পানি নয়

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, একটি সামুদ্রিক করিডরকে এখন আর শুধু নৌযান চলাচলের পানিপথ হিসেবে দেখা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামো, সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল, উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা, লজিস্টিক অবকাঠামো এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক।

ফলে কোনো বন্দরে সাইবার হামলা, নেভিগেশন ব্যবস্থায় বিঘ্ন, জ্বালানি অবকাঠামোয় নাশকতা কিংবা সমুদ্রতলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করেও একটি দেশের নৌবাহিনীকে সরাসরি মোকাবিলা না করে বড় কৌশলগত ক্ষতি করা সম্ভব।

তাই ভবিষ্যতের সামুদ্রিক নিরাপত্তার লক্ষ্য শুধু সংকীর্ণ জলপথ পাহারা দেওয়া হতে পারে না। লক্ষ্য হতে হবে পুরো সামুদ্রিক করিডরকে আঘাত সহনশীল করে তোলা।

হরমুজ থেকে সুয়েজ—একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা করিডর

হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব এবং সুয়েজ খালকে তিনটি বিচ্ছিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্রটি ধরা পড়বে না। এগুলো আসলে উপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে বাব আল-মান্দেব, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগর এবং ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বৃহত্তর সামুদ্রিক ব্যবস্থার অংশ।

এমনকি  শুধু সুয়েজ খালের নিরাপত্তা নয়, সুয়েজমুখী পুরো সামুদ্রিক করিডরের নিরাপত্তা গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এই বাস্তবতা আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বিশ্বের সমুদ্রপথের নিরাপত্তা কোনো একক বৈশ্বিক শক্তির হাতে দীর্ঘমেয়াদে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ নৌশক্তি হিসেবে অবশ্যই অপরিহার্য থাকবে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরে ভারতের ভূমিকা বাড়ছে, চীনের সামুদ্রিক সক্ষমতা বিস্তৃত হচ্ছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ চাইছে।

কিন্তু একটি আমেরিকান সমুদ্র-পুলিশের জায়গায় চীনা সমুদ্র-পুলিশ বসানো কোনো টেকসই সমাধান নয়। এতে মূল সমস্যার কাঠামো বদলাবে না। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে উপকূলীয় রাষ্ট্রের মালিকানা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা একসঙ্গে কাজ করবে।

লাল সাগর হতে পারে পরীক্ষাক্ষেত্র

লাল সাগর এই নতুন ব্যবস্থার বাস্তব পরীক্ষা চালানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। মিসর এখানে বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে। সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে কায়রো সামুদ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা, সংকটকালে যোগাযোগ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনাকারীদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নিতে পারে।

এমনকি একটি সামুদ্রিক সংকটপথ শাসন ফোরাম গঠনের প্রস্তাবও বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি বড় বাণিজ্যিক ও নৌশক্তি, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিপিং কোম্পানি, বন্দর পরিচালনাকারী, জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এবং বীমা খাতকে যুক্ত করা সম্ভব।

এর উদ্দেশ্য নতুন কোনো সামরিক জোট তৈরি করা হওয়া উচিত নয়। বরং এমন কিছু নীতিগত কাঠামো তৈরি করা, যা সামরিক শক্তি একা দিতে পারে না।

সেই নীতির মধ্যে থাকতে পারে দায়িত্বশীল সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব, নৌ চলাচলের নিশ্চয়তা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় উপকূলীয় রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক চাপ তৈরিতে কৌশলগত জলপথ ব্যবহারের বিরোধিতা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক সুবিধা তৈরি করা জলপথের নিরাপত্তার বোঝা ন্যায্যভাবে ভাগ করে নেওয়া।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শক্তির নয়, দায়িত্বের

কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করার অধিকার দিতে পারে না। একইভাবে কোনো বৃহৎ শক্তির নৌ শ্রেষ্ঠত্বও তাকে বিশ্বের আন্তর্জাতিক জলপথ নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনার অধিকার দেয় না।

সামুদ্রিক সংকটপথের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা তাই আরও বেশি যুদ্ধজাহাজের প্রতিযোগিতায় নয়, বরং একটি গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা তৈরির ওপর নির্ভর করছে। যেখানে উপকূলীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব; আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিরাপত্তার অংশীদার হবে; আর বৈশ্বিক শক্তিগুলো প্রয়োজনের সময়ে সহায়তা করবে—কোনো একক অভিভাবকের ভূমিকায় নয়।

বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলো শেষ পর্যন্ত কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এগুলো এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অবকাঠামো, যার সুফল ভোগ করে প্রায় পুরো বিশ্ব। তাই এগুলোর নিরাপত্তাও হতে হবে যৌথ দায়িত্বের ভিত্তিতে, কিন্তু স্পষ্ট নিয়ম ও বৈধতার কাঠামোর মধ্যে।

জনপ্রিয় সংবাদ

দ্বিতীয় টেস্টের আগে স্বস্তি, নেটে ফিরেছেন তানজিদ-মুশফিক

বিশ্বের সামুদ্রিক সংকটপথের নিরাপত্তা: একক শক্তির পাহারা নয়, দরকার নতুন বৈশ্বিক কাঠামো

০৭:৪১:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো অবাধ সমুদ্রপথ। তেল, গ্যাস, খাদ্য, শিল্পপণ্য থেকে শুরু করে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিশাল অংশ নির্ভর করে কয়েকটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর। তাই দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগত চিন্তার কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন—এই পথগুলো খোলা রাখবে কে?

কিন্তু হরমুজ প্রণালি থেকে বাব আল-মান্দেব পর্যন্ত বারবার তৈরি হওয়া অস্থিরতা দেখিয়ে দিচ্ছে, সমস্যাটি শুধু কোনো একটি জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নয়। আসল সংকট আরও গভীরে। বৈশ্বিক বাণিজ্য যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আগামী দশকের বড় প্রশ্ন তাই শুধু কে এসব জলপথ রক্ষা করবে, তা নয়। বরং নিরাপত্তা পরিচালনার অধিকার কার, কোন নিয়মে তা পরিচালিত হবে এবং সেই ব্যবস্থার বৈধতা কোথা থেকে আসবে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

পুরোনো ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা

দীর্ঘ সময় ধরে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক ধরনের অলিখিত দায়িত্ববণ্টন কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন নৌযান চলাচলের স্বাধীনতার নীতি নির্ধারণ করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নৌবাহিনী সেই স্বাধীনতা রক্ষার সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ সরবরাহ করেছে। এই ব্যবস্থা কখনোই পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত ছিল না, কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য এটি মোটামুটি কার্যকর ছিল।

এখন সেই কাঠামোর দুর্বলতা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

সমুদ্রপথে বাণিজ্য ব্যাহত করতে আর সমুদ্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয় না। তুলনামূলক কম খরচে ড্রোন, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন, সাইবার হামলা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সক্ষমতা ব্যবহার করেই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করা সম্ভব। ফলে একটি বিপজ্জনক অসমতা তৈরি হয়েছে—একটি সামুদ্রিক পথকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা যত সহজ হচ্ছে, সেটিকে নিরাপদ রাখা তত ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

আর কোনো প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করাও জরুরি নয়। কয়েকটি হামলা, কিংবা হামলার বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কাই যথেষ্ট। এতে বীমা ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, জাহাজকে দীর্ঘতর বিকল্প পথে পাঠাতে হতে পারে, পণ্য পৌঁছাতে দেরি হতে পারে এবং পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও সরবরাহব্যবস্থা অস্থির হয়ে উঠতে পারে।

অর্থাৎ কোনো জলপথকে অকার্যকর করে দেওয়ার ক্ষমতা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের হাতে নেই। ঝুঁকি বেড়ে গেলে যে বীমা প্রতিষ্ঠান কোনো জাহাজের যাত্রাকে আর অর্থনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মনে করে না, তার সিদ্ধান্তও কার্যত একই ফল তৈরি করতে পারে।

শুধু যুদ্ধজাহাজ দিয়ে সমাধান হবে না

সংকট দেখা দিলে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সামরিক শক্তি দিয়ে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কারণ এখানে ঘাটতি শুধু শক্তির নয়; প্রয়োজন নিয়ম, প্রতিষ্ঠান এবং বৈধতার।

এই সংকটের মূল দ্বন্দ্বটি হলো—কৌশলগত জলপথ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান স্থানীয়। হরমুজ, বাব আল-মান্দেব কিংবা এ ধরনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর সীমানা ও আশপাশের সামুদ্রিক অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সেই রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম অধিকার যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি এসব জলপথে নেওয়া সিদ্ধান্তের প্রভাবও কেবল তাদের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না।

একটি আঞ্চলিক সংঘাত মুহূর্তেই জ্বালানি মূল্য, খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় আঘাত করতে পারে।

তাই উপকূলীয় রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সীমাহীন অধিকার দিতে পারে না। আবার নৌ চলাচলের স্বাধীনতার নামেও বাইরের শক্তিগুলো কোনো রাষ্ট্রের উপকূলের কাছে সীমাহীন সামরিক উপস্থিতির অধিকার দাবি করতে পারে না।

দায়িত্বশীল সামুদ্রিক সার্বভৌমত্বের প্রয়োজন

এই দ্বন্দ্বের একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে দায়িত্বশীল সামুদ্রিক সার্বভৌমত্বের ধারণা। কৌশলগত জলপথের আশপাশের নিরাপত্তায় উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর অগ্রাধিকার থাকবে। তবে সেই অগ্রাধিকারের সঙ্গে কিছু বাধ্যবাধকতাও থাকতে হবে।

তাদের দায়িত্ব হবে বৈধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা, নিজেদের ভূখণ্ডকে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে হামলার ঘাঁটি হতে না দেওয়া এবং সংকটের সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতায় অংশ নেওয়া।

সমস্যা আরও জটিল হয় যখন কোনো রাষ্ট্র নিজেই এসব দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়ে, অথবা তার ভূখণ্ডে সক্রিয় কোনো অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।

এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তার দায়িত্ব একটি স্তরভিত্তিক কাঠামোয় সাজানো যেতে পারে। প্রথমে জাতীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা, প্রয়োজন হলে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং উভয় পর্যায় ব্যর্থ হলে আন্তর্জাতিক সহায়তা বা হস্তক্ষেপ। তবে আন্তর্জাতিক ভূমিকা হতে হবে আইন, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও বৈধতার সুস্পষ্ট সীমার মধ্যে।

Safe Passage Strait Hormuz: Maritime Security Risks

নতুন যুগে সামুদ্রিক সংকটপথ শুধু পানি নয়

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, একটি সামুদ্রিক করিডরকে এখন আর শুধু নৌযান চলাচলের পানিপথ হিসেবে দেখা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বন্দর, তেল ও গ্যাস পাইপলাইন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামো, সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবল, উপগ্রহভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা, লজিস্টিক অবকাঠামো এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক।

ফলে কোনো বন্দরে সাইবার হামলা, নেভিগেশন ব্যবস্থায় বিঘ্ন, জ্বালানি অবকাঠামোয় নাশকতা কিংবা সমুদ্রতলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করেও একটি দেশের নৌবাহিনীকে সরাসরি মোকাবিলা না করে বড় কৌশলগত ক্ষতি করা সম্ভব।

তাই ভবিষ্যতের সামুদ্রিক নিরাপত্তার লক্ষ্য শুধু সংকীর্ণ জলপথ পাহারা দেওয়া হতে পারে না। লক্ষ্য হতে হবে পুরো সামুদ্রিক করিডরকে আঘাত সহনশীল করে তোলা।

হরমুজ থেকে সুয়েজ—একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা করিডর

হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব এবং সুয়েজ খালকে তিনটি বিচ্ছিন্ন কৌশলগত ক্ষেত্র হিসেবে দেখলে বাস্তব চিত্রটি ধরা পড়বে না। এগুলো আসলে উপসাগর ও ভারত মহাসাগর থেকে বাব আল-মান্দেব, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগর এবং ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বৃহত্তর সামুদ্রিক ব্যবস্থার অংশ।

এমনকি  শুধু সুয়েজ খালের নিরাপত্তা নয়, সুয়েজমুখী পুরো সামুদ্রিক করিডরের নিরাপত্তা গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

এই বাস্তবতা আরও একটি বিষয় স্পষ্ট করে—বিশ্বের সমুদ্রপথের নিরাপত্তা কোনো একক বৈশ্বিক শক্তির হাতে দীর্ঘমেয়াদে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ নৌশক্তি হিসেবে অবশ্যই অপরিহার্য থাকবে। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরে ভারতের ভূমিকা বাড়ছে, চীনের সামুদ্রিক সক্ষমতা বিস্তৃত হচ্ছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর অধিকতর নিয়ন্ত্রণ চাইছে।

কিন্তু একটি আমেরিকান সমুদ্র-পুলিশের জায়গায় চীনা সমুদ্র-পুলিশ বসানো কোনো টেকসই সমাধান নয়। এতে মূল সমস্যার কাঠামো বদলাবে না। প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে উপকূলীয় রাষ্ট্রের মালিকানা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা একসঙ্গে কাজ করবে।

লাল সাগর হতে পারে পরীক্ষাক্ষেত্র

লাল সাগর এই নতুন ব্যবস্থার বাস্তব পরীক্ষা চালানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। মিসর এখানে বিশেষ ভূমিকা নিতে পারে। সৌদি আরবসহ অন্যান্য উপকূলীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে কায়রো সামুদ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা, সংকটকালে যোগাযোগ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষা এবং বাণিজ্যিক জাহাজ পরিচালনাকারীদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নিতে পারে।

এমনকি একটি সামুদ্রিক সংকটপথ শাসন ফোরাম গঠনের প্রস্তাবও বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি বড় বাণিজ্যিক ও নৌশক্তি, আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিপিং কোম্পানি, বন্দর পরিচালনাকারী, জ্বালানি প্রতিষ্ঠান এবং বীমা খাতকে যুক্ত করা সম্ভব।

এর উদ্দেশ্য নতুন কোনো সামরিক জোট তৈরি করা হওয়া উচিত নয়। বরং এমন কিছু নীতিগত কাঠামো তৈরি করা, যা সামরিক শক্তি একা দিতে পারে না।

সেই নীতির মধ্যে থাকতে পারে দায়িত্বশীল সামুদ্রিক সার্বভৌমত্ব, নৌ চলাচলের নিশ্চয়তা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় উপকূলীয় রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক চাপ তৈরিতে কৌশলগত জলপথ ব্যবহারের বিরোধিতা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং বৈশ্বিক সুবিধা তৈরি করা জলপথের নিরাপত্তার বোঝা ন্যায্যভাবে ভাগ করে নেওয়া।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শক্তির নয়, দায়িত্বের

কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে জিম্মি করার অধিকার দিতে পারে না। একইভাবে কোনো বৃহৎ শক্তির নৌ শ্রেষ্ঠত্বও তাকে বিশ্বের আন্তর্জাতিক জলপথ নিজের ইচ্ছামতো পরিচালনার অধিকার দেয় না।

সামুদ্রিক সংকটপথের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা তাই আরও বেশি যুদ্ধজাহাজের প্রতিযোগিতায় নয়, বরং একটি গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা তৈরির ওপর নির্ভর করছে। যেখানে উপকূলীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে আন্তর্জাতিক দায়িত্ব; আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিরাপত্তার অংশীদার হবে; আর বৈশ্বিক শক্তিগুলো প্রয়োজনের সময়ে সহায়তা করবে—কোনো একক অভিভাবকের ভূমিকায় নয়।

বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলো শেষ পর্যন্ত কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এগুলো এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অবকাঠামো, যার সুফল ভোগ করে প্রায় পুরো বিশ্ব। তাই এগুলোর নিরাপত্তাও হতে হবে যৌথ দায়িত্বের ভিত্তিতে, কিন্তু স্পষ্ট নিয়ম ও বৈধতার কাঠামোর মধ্যে।