০৫:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে প্রতিকার পেতে সহায়তা করবে ‘স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আন্দোলন’ হামে মৃত্যু ৯৩০ ছাড়াল, ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু ইরানের অর্থনীতি ভেঙে দিতে ট্রাম্পের নতুন চাপ, চীন-সহ মিত্রদের পাশে চায় যুক্তরাষ্ট্র শিশুদের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগে টিকটকের ৪০০ মিলিয়ন ডলারের সমঝোতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যার কনটেন্ট, ১৩ বছরের ব্লেকের মৃত্যু: প্রযুক্তি কোম্পানির জবাবদিহি দাবি বিষখালী নদীর চরে ৫০ হাজার গাছ, ১০ বছরে সবুজ বেষ্টনী গড়ার উদ্যোগ বাগেরহাটে সালথায় আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হামলায় দাঁত হারালেন বিএনপি নেতা কাপ্তাই হ্রদে ৭ দিনে ২২৪ টন মাছ আহরণ, রাজস্ব আয় ৫০ লাখ টাকা হিমাগারে পচছে আলু, লোডশেডিং ও ওভারলোডিংয়ে বাড়ছে ক্ষতির শঙ্কা বাংলাদেশে শিল্পখাতে বড় ধাক্কা, দুই বছরে বন্ধ ৪৫৭ কারখানা; কর্মসংস্থানে বাড়ছে শঙ্কা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেপথ্যে অদৃশ্য দুনিয়া: ডেটা সেন্টার, শ্রম ও ক্ষমতার নতুন স্থাপত্য

  •  জেনি উ
  • ০৪:০০:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
  • 7

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারকে আমরা সাধারণত সফটওয়্যার, অ্যালগরিদম, বিপুল তথ্যভান্ডার কিংবা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা মডেলের গল্প হিসেবে দেখি। কিন্তু এই আপাতদৃষ্টিতে অদৃশ্য ডিজিটাল জগতের পেছনে রয়েছে বিশাল এক বস্তুগত অবকাঠামো। এআই চালাতে প্রয়োজন ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ, পানি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, কেবল, নিরাপত্তা এবং বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোই অনেক সময় সবচেয়ে কম দৃশ্যমান।

ডেটা সেন্টার একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য হয়ে উঠেছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে এগুলো স্থাপত্যের ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করতে চায় না। কোথাও এগুলো গুদামঘরের মতো, কোথাও বিশাল শেড, আবার কোথাও পুরোনো অফিস, টেলিযোগাযোগ ভবন কিংবা সামরিক স্থাপনার ভেতরে গড়ে উঠেছে। তাদের মূল কাজ হলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়, বরং যন্ত্রকে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চালু রাখা।

এই অদৃশ্যতার পেছনে রয়েছে শিল্পায়নের দীর্ঘ ইতিহাস।

কম্পিউটারের শুরুতেই ছিল দৃশ্যমান বিশালত্ব

১৯৪৬ সালে ফিলাডেলফিয়ায় বিশ্বের প্রথম সাধারণ ব্যবহারের কম্পিউটার এনিয়াক উন্মোচনের সময় সেটি ছিল একটি পুরো ঘরজুড়ে বিস্তৃত যন্ত্র। এতে ছিল বিশাল আকারের প্যানেল, হাজার হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব এবং কয়েক মাইল তার। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণ ও বোমাবর্ষণের হিসাব দ্রুত সম্পন্ন করা।

সেই কম্পিউটারকে লুকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ ছিল না। কম্পিউটিংয়ের শক্তি তখন তার ভৌত উপস্থিতির সমানুপাতিকভাবে চোখে পড়ত। আজকের পৃথিবীতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। কম্পিউটিং ক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে, অথচ তার অবকাঠামো ক্রমশ এমন হয়ে উঠেছে, যা দেখেও বোঝা কঠিন যে এর ভেতরে আসলে কী ঘটছে।

India's Data Center Boom: Hidden AI Winners Surge by $48 Billion,  ETEnterpriseai

নগরজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এক ডিজিটাল ভূগোল

নেদারল্যান্ডসের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান এমভিআরডিভি নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এমন এক শহরের কল্পনা করেছিল, যেখানে সবকিছু কেবল তথ্যের ভিত্তিতে সংগঠিত। সেই শহরের কোনো ভূপ্রকৃতি নেই, স্থানীয় প্রেক্ষাপট নেই—আছে শুধু তথ্য।

আজকের ডেটা সেন্টারগুলো যেন সেই কল্পনার বাস্তব রূপ।

ম্যানহাটনের একটি সাবেক ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ভবনে এখন সার্ভারের জায়গা ভাড়া দেওয়া হয়। লস অ্যাঞ্জেলেসে সাবেক একটি আইন কার্যালয় পরিণত হয়েছে ডেটা সেন্টারে। সুইডেনের স্টকহোমে শীতল যুদ্ধের সময়ের একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারও এখন কম্পিউটিং অবকাঠামোর আবাস।

এই রূপান্তরগুলো কেবল জায়গা বাঁচানোর বিষয় নয়। পুরোনো ভবনের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা কাঠামো কিংবা শক্তিশালী দেয়াল নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার জন্যও কার্যকর হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পুরোনো শিল্পযুগের অবকাঠামোই নতুন তথ্যযুগের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

স্থাপত্য সমালোচক নিকলাস মাক একবার ডেটা সেন্টারকে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন স্থাপত্যধারা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এটিকে এমন এক স্থাপনা হিসেবেও দেখেছিলেন, যার উদ্দেশ্য প্রায় স্থাপত্যের বিপরীত—নিজের সম্পর্কে কিছু না বলা।

এই দ্বন্দ্বই ডেটা সেন্টারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অথচ দেখতে প্রায় গুরুত্বহীন।

‘ডিজিটাল গরু’র খামার

গ্রামাঞ্চলে নির্মিত ডেটা সেন্টারগুলো সাধারণত বিশাল গুদাম বা বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গারের মতো দেখতে। ভেতরে থাকতে পারে সরকারি তথ্য, আর্থিক লেনদেনের অবকাঠামো, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের তথ্য কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা।

এমনকি ‘সার্ভার ফার্ম’ নামটিও আমাদের এই বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করে। যেন সার্ভার র্যাক কোনো এক ধরনের ডিজিটাল গবাদিপশু।

এই উপমা আমাদের আরও পুরোনো এক শিল্পব্যবস্থার দিকে নিয়ে যায়—কসাইখানা।

Top 5 challenges when migrating to the cloud | Open Access Government

শহর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া ‘নোংরা’ শ্রম

উনিশ ও বিশ শতকে ইউরোপের বহু শহরে পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত করা হয়। প্যারিসের লা ভিলেত ছিল এর একটি বড় উদাহরণ। সেখানে পশুর বাজার, আস্তাবল, জবাইয়ের জায়গা এবং মাংস প্রক্রিয়াকরণের জন্য আলাদা অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল।

ইতিহাসবিদ দোরোথে ব্রান্টজের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ব্যবস্থা শুধু শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য ছিল না। এর মাধ্যমে এমন এক শ্রমকে নাগরিক জীবনের দৃশ্যমান পরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা মধ্যবিত্ত সমাজের কাছে অস্বস্তিকর ও ‘নোংরা’ বলে বিবেচিত হতো।

শহরের মানুষ মাংস খাবে, কিন্তু সেই মাংস উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রম, রক্ত এবং মৃত্যুকে দেখতে হবে না—শিল্পায়ন এই বিচ্ছিন্নতাকে সম্ভব করেছিল।

ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রেও কিছুটা একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়।

ডিজিটাল অর্থনীতি পরিচ্ছন্ন ও অদৃশ্য বলে মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার। রয়েছে শীতলীকরণ ব্যবস্থা, জ্বালানি, উৎপন্ন তাপ এবং অন্যান্য পরিবেশগত প্রভাব। একই অবকাঠামো এমন সামরিক প্রযুক্তির বিকাশেও ব্যবহৃত হতে পারে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অ্যান্ডুরিল, লকহিড মার্টিন ও পালান্টিরের মতো প্রতিষ্ঠান উন্নত সামরিক প্রযুক্তি তৈরিতে উন্নত কম্পিউটিংয়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার ভৌত ভিত্তি সাধারণত জনজীবনের কেন্দ্র থেকে দূরে থাকে।

স্থাপত্য যেন বলে—এখানে দেখার কিছু নেই

ডেটা সেন্টারের নিরীহ চেহারাটি তাই কেবল নান্দনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর একটি রাজনৈতিক দিকও আছে।

একটি ভবন যদি দেখতে সাধারণ গুদামের মতো হয়, তাহলে মানুষ তার ভেতরের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন করার আগ্রহ কম অনুভব করতে পারে। কোনো স্থাপনা যদি শহরের বাইরে, নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় থাকে, তাহলে সেটি নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক দৃশ্যপটের অংশ হয় না।

ডেটা সেন্টার অনেক সময় যেন এক ধরনের স্থাপত্যগত নীরবতা তৈরি করে।

কিন্তু এই নীরবতার বিপরীত দিকে রয়েছে নজরদারির এক বিশাল ক্ষমতা।

যে অবকাঠামো আমাদের সামনে নিজেকে প্রকাশ করতে চায় না, সেটিই আমাদের সম্পর্কে বিপুল তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে পারে। আমরা কী খুঁজছি, কী কিনছি, কীভাবে অনলাইনে আচরণ করছি—এসব তথ্য বাণিজ্যিকভাবে বিশ্লেষণযোগ্য হয়ে ওঠে।

ফলে সম্পর্কটি একতরফা। আমরা হয়তো জানি না আমাদের তথ্য কোথায় জমা হচ্ছে, কিন্তু সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ব্যবস্থাগুলো আমাদের আচরণ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে।

মানুষ যখন তথ্যে পরিণত হয়

নৃবিজ্ঞানী শ্যানন ম্যাটার্ন আধুনিক শহরকে একটি ‘অ্যালগরিদমিক সমাবেশ’ হিসেবে দেখেছেন—যেখানে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্রমশ নগরজীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে।

এ অবস্থায় মানুষ কেবল শহরের নাগরিক নয়; সে হয়ে উঠতে পারে একটি তথ্যগত বস্তু—যার আচরণ পরিমাপ করা যায়, শ্রেণিবদ্ধ করা যায় এবং ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে অনুমান করা যায়।

শিল্পায়নের ইতিহাসে প্রাণীকে যেমন উৎপাদনের এককে পরিণত করা হয়েছিল, ডিজিটাল অর্থনীতি তেমনি মানুষের কর্মকাণ্ডকে তথ্যের এককে পরিণত করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। দুই প্রক্রিয়া এক নয়, কিন্তু উভয়ের মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে—জটিল জীবন্ত বাস্তবতাকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার জন্য নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় রূপান্তর।

শিল্পব্যবস্থা যত পরিচ্ছন্ন হয়, তার অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া তত সহজে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।

এআই যুগের এই সমস্যাটিও সেখানেই।

ক্লাউড আসলে আকাশে নেই

প্রযুক্তির ভাষা আমাদের এই বাস্তবতা ভুলিয়ে দিতে সাহায্য করে। আমরা বলি ‘ক্লাউড’, যেন তথ্য বাতাসে ভাসছে। কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে আমরা মস্তিষ্ক, স্নায়ু বা শিরার সঙ্গে তুলনা করি। এতে প্রযুক্তি হয়ে ওঠে প্রায় শরীরহীন ও ওজনহীন।

কিন্তু ক্লাউডের একটি বাস্তব শরীর আছে।

তার জন্য জমি দরকার। বিদ্যুৎ দরকার। পানি দরকার। বিশাল ভবন দরকার। তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দরকার। প্রয়োজন প্রকৌশলী, নির্মাণশ্রমিক, বিদ্যুৎকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, যন্ত্র প্রস্তুতকারক এবং দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থা।

প্রতিটি তাৎক্ষণিক ডিজিটাল ফলাফলের পেছনে রয়েছে অসংখ্য ভৌত প্রক্রিয়া।

সার্ভার র্যাকের সারি আর শিল্প খামারের প্রাণী রাখার কাঠামোর মধ্যে যে অস্বস্তিকর সাদৃশ্য দেখা যায়, তা এই শিল্পায়নের যুক্তিকেই সামনে আনে। উভয় ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য হলো বিপুল সংখ্যক ইউনিটকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রেখে সর্বোচ্চ মাত্রায় উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করা।

The Invisible Engine: How Builders Are Architecting the Last Generation of Data  Centers

ডিজিটাল অবকাঠামোর বিরুদ্ধে বাড়ছে প্রশ্ন

তবে এই অদৃশ্যতা চিরস্থায়ী নয়। বিভিন্ন জায়গায় ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হচ্ছে।

পূর্ব লন্ডনে উচ্চগতির আর্থিক লেনদেনের অবকাঠামোকে সহায়তা করার জন্য প্রস্তাবিত একটি ডেটা সেন্টার নিয়ে স্থানীয় ও ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘ সময় প্রতিবাদ করেছে। নিউইয়র্কে হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার নির্মাণে রাজ্যজুড়ে বিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিজেদের আধুনিক লুডাইট হিসেবে পরিচয় দেওয়া কিছু মানুষ অফলাইন জীবনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

এসব ঘটনা দেখায়, ডিজিটাল প্রযুক্তির ভৌত মূল্য নিয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়ছে।

দীর্ঘদিন প্রযুক্তি শিল্প এমন একটি ধারণা তৈরি করতে পেরেছিল যে ডিজিটাল অর্থনীতি আগের শিল্পায়নের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সফটওয়্যারকে কারখানার তুলনায় পরিচ্ছন্ন মনে হয়েছে, তথ্যকে কাঁচামালের তুলনায় হালকা মনে হয়েছে এবং ইন্টারনেটকে মনে হয়েছে একই সঙ্গে সর্বত্র উপস্থিত ও কোথাও অনুপস্থিত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণ সেই ধারণাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

এআই যত বিস্তৃত হবে, তত বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন হবে। আর সেই কম্পিউটিং ক্ষমতার জন্য আরও বেশি অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ এআই যত অদৃশ্য মনে হোক, তার ভৌত উপস্থিতি ততই বড় হবে।

আমাদের চোখ ফেরানো বন্ধ করতে হবে

ডেটা সেন্টারকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত স্থাপনা হিসেবে দেখে বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। কারণ অবকাঠামো যখন অদৃশ্য থাকে, তখন তার পরিবেশগত মূল্য, শ্রমের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়েও জনসাধারণের নজরদারি দুর্বল হয়ে যায়।

স্থাপত্যকে আরও সুন্দর করে তুললেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটি দৃষ্টিনন্দন ডেটা সেন্টারও একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে, একই ধরনের নজরদারি চালাতে পারে কিংবা একই সামরিক প্রযুক্তিকে শক্তিশালী করতে পারে।

প্রয়োজন হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

ডেটা সেন্টারকে ডিজিটাল জগতের কোনো দূরবর্তী ব্যাকস্টেজ হিসেবে না দেখে আমাদের বুঝতে হবে—এগুলো আমাদের শহর, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থারই অংশ।

পুরোনো কসাইখানাগুলোকে যেমন শহরের বাইরে সরিয়ে দিয়ে মানুষ মাংসের উৎপাদন প্রক্রিয়ার অস্বস্তিকর বাস্তবতা থেকে দূরে থাকতে পেরেছিল, আধুনিক ডেটা সেন্টারও তেমনি আমাদের ডিজিটাল জীবনের বস্তুগত মূল্যকে আড়াল করার সুযোগ দিচ্ছে।

কিন্তু আড়ালে রাখলেই কোনো কিছু অদৃশ্য হয়ে যায় না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি শহর, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে নতুনভাবে সাজাতে থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তনের পেছনে থাকা ভবন, শ্রম, শক্তি ও সম্পদের দিকেও তাকাতে হবে। প্রশ্ন শুধু কত বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা আমরা তৈরি করতে পারি তা নয়; সেই ক্ষমতা কী ধরনের পরিবেশ, শ্রমব্যবস্থা এবং ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ক্লাউড আকাশে ভাসে না। তার অবস্থান মাটি, কংক্রিট, ইস্পাত, বিদ্যুৎ ও যন্ত্রের মধ্যে।

আর আমরা যত কম সেই অবকাঠামোর দিকে তাকাব, তত সহজ হবে ভুলে যাওয়া—সেগুলো আসলে কী করছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে প্রতিকার পেতে সহায়তা করবে ‘স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আন্দোলন’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেপথ্যে অদৃশ্য দুনিয়া: ডেটা সেন্টার, শ্রম ও ক্ষমতার নতুন স্থাপত্য

০৪:০০:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারকে আমরা সাধারণত সফটওয়্যার, অ্যালগরিদম, বিপুল তথ্যভান্ডার কিংবা ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা মডেলের গল্প হিসেবে দেখি। কিন্তু এই আপাতদৃষ্টিতে অদৃশ্য ডিজিটাল জগতের পেছনে রয়েছে বিশাল এক বস্তুগত অবকাঠামো। এআই চালাতে প্রয়োজন ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ, পানি, শীতলীকরণ ব্যবস্থা, কেবল, নিরাপত্তা এবং বিপুল পরিমাণ যন্ত্রপাতি। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোই অনেক সময় সবচেয়ে কম দৃশ্যমান।

ডেটা সেন্টার একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য হয়ে উঠেছে, কিন্তু অদ্ভুতভাবে এগুলো স্থাপত্যের ভাষায় নিজেদের প্রকাশ করতে চায় না। কোথাও এগুলো গুদামঘরের মতো, কোথাও বিশাল শেড, আবার কোথাও পুরোনো অফিস, টেলিযোগাযোগ ভবন কিংবা সামরিক স্থাপনার ভেতরে গড়ে উঠেছে। তাদের মূল কাজ হলো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়, বরং যন্ত্রকে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চালু রাখা।

এই অদৃশ্যতার পেছনে রয়েছে শিল্পায়নের দীর্ঘ ইতিহাস।

কম্পিউটারের শুরুতেই ছিল দৃশ্যমান বিশালত্ব

১৯৪৬ সালে ফিলাডেলফিয়ায় বিশ্বের প্রথম সাধারণ ব্যবহারের কম্পিউটার এনিয়াক উন্মোচনের সময় সেটি ছিল একটি পুরো ঘরজুড়ে বিস্তৃত যন্ত্র। এতে ছিল বিশাল আকারের প্যানেল, হাজার হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব এবং কয়েক মাইল তার। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণ ও বোমাবর্ষণের হিসাব দ্রুত সম্পন্ন করা।

সেই কম্পিউটারকে লুকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ ছিল না। কম্পিউটিংয়ের শক্তি তখন তার ভৌত উপস্থিতির সমানুপাতিকভাবে চোখে পড়ত। আজকের পৃথিবীতে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। কম্পিউটিং ক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে, অথচ তার অবকাঠামো ক্রমশ এমন হয়ে উঠেছে, যা দেখেও বোঝা কঠিন যে এর ভেতরে আসলে কী ঘটছে।

India's Data Center Boom: Hidden AI Winners Surge by $48 Billion,  ETEnterpriseai

নগরজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন এক ডিজিটাল ভূগোল

নেদারল্যান্ডসের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান এমভিআরডিভি নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এমন এক শহরের কল্পনা করেছিল, যেখানে সবকিছু কেবল তথ্যের ভিত্তিতে সংগঠিত। সেই শহরের কোনো ভূপ্রকৃতি নেই, স্থানীয় প্রেক্ষাপট নেই—আছে শুধু তথ্য।

আজকের ডেটা সেন্টারগুলো যেন সেই কল্পনার বাস্তব রূপ।

ম্যানহাটনের একটি সাবেক ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ভবনে এখন সার্ভারের জায়গা ভাড়া দেওয়া হয়। লস অ্যাঞ্জেলেসে সাবেক একটি আইন কার্যালয় পরিণত হয়েছে ডেটা সেন্টারে। সুইডেনের স্টকহোমে শীতল যুদ্ধের সময়ের একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারও এখন কম্পিউটিং অবকাঠামোর আবাস।

এই রূপান্তরগুলো কেবল জায়গা বাঁচানোর বিষয় নয়। পুরোনো ভবনের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা কাঠামো কিংবা শক্তিশালী দেয়াল নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার জন্যও কার্যকর হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পুরোনো শিল্পযুগের অবকাঠামোই নতুন তথ্যযুগের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

স্থাপত্য সমালোচক নিকলাস মাক একবার ডেটা সেন্টারকে একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন স্থাপত্যধারা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এটিকে এমন এক স্থাপনা হিসেবেও দেখেছিলেন, যার উদ্দেশ্য প্রায় স্থাপত্যের বিপরীত—নিজের সম্পর্কে কিছু না বলা।

এই দ্বন্দ্বই ডেটা সেন্টারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, অথচ দেখতে প্রায় গুরুত্বহীন।

‘ডিজিটাল গরু’র খামার

গ্রামাঞ্চলে নির্মিত ডেটা সেন্টারগুলো সাধারণত বিশাল গুদাম বা বিমানবন্দরের হ্যাঙ্গারের মতো দেখতে। ভেতরে থাকতে পারে সরকারি তথ্য, আর্থিক লেনদেনের অবকাঠামো, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের তথ্য কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা।

এমনকি ‘সার্ভার ফার্ম’ নামটিও আমাদের এই বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করে। যেন সার্ভার র্যাক কোনো এক ধরনের ডিজিটাল গবাদিপশু।

এই উপমা আমাদের আরও পুরোনো এক শিল্পব্যবস্থার দিকে নিয়ে যায়—কসাইখানা।

Top 5 challenges when migrating to the cloud | Open Access Government

শহর থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া ‘নোংরা’ শ্রম

উনিশ ও বিশ শতকে ইউরোপের বহু শহরে পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র থেকে সরিয়ে নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত করা হয়। প্যারিসের লা ভিলেত ছিল এর একটি বড় উদাহরণ। সেখানে পশুর বাজার, আস্তাবল, জবাইয়ের জায়গা এবং মাংস প্রক্রিয়াকরণের জন্য আলাদা অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল।

ইতিহাসবিদ দোরোথে ব্রান্টজের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ব্যবস্থা শুধু শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য ছিল না। এর মাধ্যমে এমন এক শ্রমকে নাগরিক জীবনের দৃশ্যমান পরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা মধ্যবিত্ত সমাজের কাছে অস্বস্তিকর ও ‘নোংরা’ বলে বিবেচিত হতো।

শহরের মানুষ মাংস খাবে, কিন্তু সেই মাংস উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা শ্রম, রক্ত এবং মৃত্যুকে দেখতে হবে না—শিল্পায়ন এই বিচ্ছিন্নতাকে সম্ভব করেছিল।

ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রেও কিছুটা একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়।

ডিজিটাল অর্থনীতি পরিচ্ছন্ন ও অদৃশ্য বলে মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার। রয়েছে শীতলীকরণ ব্যবস্থা, জ্বালানি, উৎপন্ন তাপ এবং অন্যান্য পরিবেশগত প্রভাব। একই অবকাঠামো এমন সামরিক প্রযুক্তির বিকাশেও ব্যবহৃত হতে পারে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অ্যান্ডুরিল, লকহিড মার্টিন ও পালান্টিরের মতো প্রতিষ্ঠান উন্নত সামরিক প্রযুক্তি তৈরিতে উন্নত কম্পিউটিংয়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার ভৌত ভিত্তি সাধারণত জনজীবনের কেন্দ্র থেকে দূরে থাকে।

স্থাপত্য যেন বলে—এখানে দেখার কিছু নেই

ডেটা সেন্টারের নিরীহ চেহারাটি তাই কেবল নান্দনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর একটি রাজনৈতিক দিকও আছে।

একটি ভবন যদি দেখতে সাধারণ গুদামের মতো হয়, তাহলে মানুষ তার ভেতরের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন করার আগ্রহ কম অনুভব করতে পারে। কোনো স্থাপনা যদি শহরের বাইরে, নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় থাকে, তাহলে সেটি নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক দৃশ্যপটের অংশ হয় না।

ডেটা সেন্টার অনেক সময় যেন এক ধরনের স্থাপত্যগত নীরবতা তৈরি করে।

কিন্তু এই নীরবতার বিপরীত দিকে রয়েছে নজরদারির এক বিশাল ক্ষমতা।

যে অবকাঠামো আমাদের সামনে নিজেকে প্রকাশ করতে চায় না, সেটিই আমাদের সম্পর্কে বিপুল তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে পারে। আমরা কী খুঁজছি, কী কিনছি, কীভাবে অনলাইনে আচরণ করছি—এসব তথ্য বাণিজ্যিকভাবে বিশ্লেষণযোগ্য হয়ে ওঠে।

ফলে সম্পর্কটি একতরফা। আমরা হয়তো জানি না আমাদের তথ্য কোথায় জমা হচ্ছে, কিন্তু সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ব্যবস্থাগুলো আমাদের আচরণ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারে।

মানুষ যখন তথ্যে পরিণত হয়

নৃবিজ্ঞানী শ্যানন ম্যাটার্ন আধুনিক শহরকে একটি ‘অ্যালগরিদমিক সমাবেশ’ হিসেবে দেখেছেন—যেখানে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্রমশ নগরজীবনের ওপর প্রভাব ফেলছে।

এ অবস্থায় মানুষ কেবল শহরের নাগরিক নয়; সে হয়ে উঠতে পারে একটি তথ্যগত বস্তু—যার আচরণ পরিমাপ করা যায়, শ্রেণিবদ্ধ করা যায় এবং ভবিষ্যৎ আচরণ সম্পর্কে অনুমান করা যায়।

শিল্পায়নের ইতিহাসে প্রাণীকে যেমন উৎপাদনের এককে পরিণত করা হয়েছিল, ডিজিটাল অর্থনীতি তেমনি মানুষের কর্মকাণ্ডকে তথ্যের এককে পরিণত করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। দুই প্রক্রিয়া এক নয়, কিন্তু উভয়ের মধ্যে একটি মৌলিক মিল রয়েছে—জটিল জীবন্ত বাস্তবতাকে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতার জন্য নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় রূপান্তর।

শিল্পব্যবস্থা যত পরিচ্ছন্ন হয়, তার অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া তত সহজে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।

এআই যুগের এই সমস্যাটিও সেখানেই।

ক্লাউড আসলে আকাশে নেই

প্রযুক্তির ভাষা আমাদের এই বাস্তবতা ভুলিয়ে দিতে সাহায্য করে। আমরা বলি ‘ক্লাউড’, যেন তথ্য বাতাসে ভাসছে। কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে আমরা মস্তিষ্ক, স্নায়ু বা শিরার সঙ্গে তুলনা করি। এতে প্রযুক্তি হয়ে ওঠে প্রায় শরীরহীন ও ওজনহীন।

কিন্তু ক্লাউডের একটি বাস্তব শরীর আছে।

তার জন্য জমি দরকার। বিদ্যুৎ দরকার। পানি দরকার। বিশাল ভবন দরকার। তাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দরকার। প্রয়োজন প্রকৌশলী, নির্মাণশ্রমিক, বিদ্যুৎকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, যন্ত্র প্রস্তুতকারক এবং দীর্ঘ সরবরাহব্যবস্থা।

প্রতিটি তাৎক্ষণিক ডিজিটাল ফলাফলের পেছনে রয়েছে অসংখ্য ভৌত প্রক্রিয়া।

সার্ভার র্যাকের সারি আর শিল্প খামারের প্রাণী রাখার কাঠামোর মধ্যে যে অস্বস্তিকর সাদৃশ্য দেখা যায়, তা এই শিল্পায়নের যুক্তিকেই সামনে আনে। উভয় ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য হলো বিপুল সংখ্যক ইউনিটকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে রেখে সর্বোচ্চ মাত্রায় উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ নিশ্চিত করা।

The Invisible Engine: How Builders Are Architecting the Last Generation of Data  Centers

ডিজিটাল অবকাঠামোর বিরুদ্ধে বাড়ছে প্রশ্ন

তবে এই অদৃশ্যতা চিরস্থায়ী নয়। বিভিন্ন জায়গায় ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হচ্ছে।

পূর্ব লন্ডনে উচ্চগতির আর্থিক লেনদেনের অবকাঠামোকে সহায়তা করার জন্য প্রস্তাবিত একটি ডেটা সেন্টার নিয়ে স্থানীয় ও ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘ সময় প্রতিবাদ করেছে। নিউইয়র্কে হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার নির্মাণে রাজ্যজুড়ে বিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে নিজেদের আধুনিক লুডাইট হিসেবে পরিচয় দেওয়া কিছু মানুষ অফলাইন জীবনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

এসব ঘটনা দেখায়, ডিজিটাল প্রযুক্তির ভৌত মূল্য নিয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়ছে।

দীর্ঘদিন প্রযুক্তি শিল্প এমন একটি ধারণা তৈরি করতে পেরেছিল যে ডিজিটাল অর্থনীতি আগের শিল্পায়নের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সফটওয়্যারকে কারখানার তুলনায় পরিচ্ছন্ন মনে হয়েছে, তথ্যকে কাঁচামালের তুলনায় হালকা মনে হয়েছে এবং ইন্টারনেটকে মনে হয়েছে একই সঙ্গে সর্বত্র উপস্থিত ও কোথাও অনুপস্থিত।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ফোরণ সেই ধারণাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

এআই যত বিস্তৃত হবে, তত বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন হবে। আর সেই কম্পিউটিং ক্ষমতার জন্য আরও বেশি অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ এআই যত অদৃশ্য মনে হোক, তার ভৌত উপস্থিতি ততই বড় হবে।

আমাদের চোখ ফেরানো বন্ধ করতে হবে

ডেটা সেন্টারকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত স্থাপনা হিসেবে দেখে বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়। কারণ অবকাঠামো যখন অদৃশ্য থাকে, তখন তার পরিবেশগত মূল্য, শ্রমের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়েও জনসাধারণের নজরদারি দুর্বল হয়ে যায়।

স্থাপত্যকে আরও সুন্দর করে তুললেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটি দৃষ্টিনন্দন ডেটা সেন্টারও একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে, একই ধরনের নজরদারি চালাতে পারে কিংবা একই সামরিক প্রযুক্তিকে শক্তিশালী করতে পারে।

প্রয়োজন হলো দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

ডেটা সেন্টারকে ডিজিটাল জগতের কোনো দূরবর্তী ব্যাকস্টেজ হিসেবে না দেখে আমাদের বুঝতে হবে—এগুলো আমাদের শহর, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থারই অংশ।

পুরোনো কসাইখানাগুলোকে যেমন শহরের বাইরে সরিয়ে দিয়ে মানুষ মাংসের উৎপাদন প্রক্রিয়ার অস্বস্তিকর বাস্তবতা থেকে দূরে থাকতে পেরেছিল, আধুনিক ডেটা সেন্টারও তেমনি আমাদের ডিজিটাল জীবনের বস্তুগত মূল্যকে আড়াল করার সুযোগ দিচ্ছে।

কিন্তু আড়ালে রাখলেই কোনো কিছু অদৃশ্য হয়ে যায় না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি শহর, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে নতুনভাবে সাজাতে থাকে, তাহলে সেই পরিবর্তনের পেছনে থাকা ভবন, শ্রম, শক্তি ও সম্পদের দিকেও তাকাতে হবে। প্রশ্ন শুধু কত বেশি কম্পিউটিং ক্ষমতা আমরা তৈরি করতে পারি তা নয়; সেই ক্ষমতা কী ধরনের পরিবেশ, শ্রমব্যবস্থা এবং ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ক্লাউড আকাশে ভাসে না। তার অবস্থান মাটি, কংক্রিট, ইস্পাত, বিদ্যুৎ ও যন্ত্রের মধ্যে।

আর আমরা যত কম সেই অবকাঠামোর দিকে তাকাব, তত সহজ হবে ভুলে যাওয়া—সেগুলো আসলে কী করছে।