মাত্র ১৩ বছর বয়সেই মারা যায় ব্লেক গ্যালিয়ার। প্রাণবন্ত ও হাসিখুশি এই কিশোরী বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসত, স্কুলে ছিল প্রাণচঞ্চল এবং হ্যালোইন ও বড়দিন ঘিরেও ছিল নানা পরিকল্পনা। কিন্তু মৃত্যুর পর তার পরিবার ফোন ঘেঁটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যা-সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট দেখতে পায়। পরিবারের অভিযোগ, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে তাকে বারবার এমন ভিডিও ও পোস্ট দেখানো হচ্ছিল, যা আত্মহত্যার চিন্তাকে উসকে দিতে বা তা মহিমান্বিত করতে পারে।
ব্লেকের মা জেমা বেস্টের দাবি, এসব কনটেন্টই মেয়ের মৃত্যুর প্রধান কারণ। তিনি বলেন, মেয়ের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ তারা দেখেননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্টের বিস্তার
ব্লেক মৃত্যুর কয়েক মাস আগে একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে আত্মহত্যা নিয়ে কিছু পোস্ট করেছিল বলে পরিবার জানিয়েছে। এরপর সে কোনো কনটেন্টে প্রতিক্রিয়া জানানো বা পুনরায় পোস্ট করার পর অ্যালগরিদম একই ধরনের আরও কনটেন্ট তার সামনে হাজির করতে থাকে বলে পরিবারের অভিযোগ।
ব্লেকের মা বলেন, মেয়েটি ফোনে অনেক সময় কাটালেও বাস্তব জীবনেও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত বাইরে যেত। পরিবারের সদস্যরা তার অবস্থান জানার জন্য লোকেশন শেয়ারিং ব্যবস্থাও ব্যবহার করতেন। কিন্তু ফোনের ভেতরের ক্ষতিকর কনটেন্ট সম্পর্কে তারা সচেতন ছিলেন না।
মায়ের ভাষায়, তিনি বাইরের ঝুঁকি থেকে মেয়েকে সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করলেও ফোনের ভেতরেই যে ক্ষতির উপাদান থাকতে পারে, তা বুঝতে পারেননি।
প্রযুক্তি কোম্পানির জবাবদিহি দাবি
ব্লেকের পরিবার এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর ওপর আরও কঠোর জবাবদিহির দাবি তুলেছে। তারা যুক্তরাজ্যে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার দাবিতে পরিচালিত ‘রেইজ দ্য এইজ’ প্রচারণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকার ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার আইন বছরের শেষ নাগাদ পাস করে আগামী বসন্তে কার্যকর করার আশা করছে। তবে এর বাস্তব প্রয়োগ কীভাবে হবে, তা নিয়ে প্রচারণাকারীদের মধ্যে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে ব্লেকের পরিবার আরও কয়েকজন শোকাহত অভিভাবকের সঙ্গে কাজ করছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন এলেন রুম, যিনি তার ১৪ বছর বয়সী ছেলে জুলস সুইনির মৃত্যুর পর প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে শিশুদের ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণে বাধ্য করার প্রচারণায় সফল হন।
মেটার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের করা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার দিকে নজর রাখছে পরিবারগুলো। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিক মেটার বিরুদ্ধে শিশুদের সুরক্ষায় ব্যর্থতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। মেটা এসব অভিযোগের মুখোমুখি হলেও টিকটক এই মামলার আওতায় নেই।
ব্লেকের স্মৃতিতে নতুন উদ্যোগ
মেয়ের মৃত্যুর পর বেস্ট পরিবার ‘ব্লেক’স পিংক প্রমিজ’ নামে একটি উদ্যোগ শুরু করেছে, যা চ্যারিটি কমিশনে নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এরই মধ্যে গ্রেভসেন্ড এলাকার চারটি স্কুলের ৭৬ শিক্ষার্থী এবং দুই প্রাপ্তবয়স্কের কাউন্সেলিংয়ের অর্থায়ন করেছে উদ্যোগটি।
তরুণদের অনলাইনের বাইরে সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যেও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বরে ব্লেকের বড় বোন টেইলা একটি যুব ক্লাব চালু করবেন, যেখানে তার বয়সী তরুণরা সরাসরি একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাবে।
যুক্তরাজ্যের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রক অফকম টিকটকের শিশু সুরক্ষা-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তদন্ত করছে। অনলাইন নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের দায়িত্বও পর্যবেক্ষণ করবে সংস্থাটি। তবে বর্তমানে পৃথক কোনো কনটেন্ট নিয়ে তদন্ত করার ক্ষমতা তাদের নেই।
ব্লেকের মৃত্যুর বিষয়ে এ বছরই তদন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। টিকটক এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মেটা, টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি এখন শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের বিষয় নয়; এটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর নকশা, অ্যালগরিদম এবং শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব নিয়ে বড় বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের আত্মহত্যা-সংক্রান্ত কনটেন্টে বারবার সম্পৃক্ত হওয়ার অভিযোগ এবং এর পরিণতি নিয়ে ব্লেক গ্যালিয়ারের পরিবার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আরও কঠোর জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের সুরক্ষা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের আত্মহত্যা-সংক্রান্ত কনটেন্টে বারবার সম্পৃক্ত হওয়ার অভিযোগ এবং ব্লেক গ্যালিয়ারের মৃত্যুর পর প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহির দাবি জোরালো হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















