০৬:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
শরৎ ২০২৬-এ চুলের সাজে স্বস্তির ছোঁয়া, জনপ্রিয় হচ্ছে নরম ও সহজ যত্নের ধারা গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট রাতারাতি কাটবে না, সমাধানে সময় লাগবে: অর্থমন্ত্রী খাদ্য-জ্বালানি-পরিবহন ব্যয়ে চাপে জীবনযাত্রা, কমছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা বৌদ্ধ ধর্মীয় সাধনাকেন্দ্রে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলা, নিহত ১৪ উপসাগরীয় যুদ্ধে সমুদ্রশক্তি: নৌবাহিনী ছাড়া যে বিজয় সম্ভব ছিল না সংস্কৃতি যখন অর্থনৈতিক অবকাঠামো প্রবালপ্রাচীর রক্ষায় বিজ্ঞান ও শিল্পকে একসঙ্গে এগোতে হবে অল্প বয়সের খ্যাতি কেন শিশু তারকাদের ঠেলে দেয় আসক্তির ঝুঁকিতে মোদির শক্তিমান ভাবমূর্তির পর এবার ‘জেন জি’ ঘরানায় কেন? বাত্তামবাংয়ের সাঙ্গকে নদীর তীরে এক ফনমের প্রাচীন মন্দিরের মুগ্ধতা

ফিলিস্তিনে এক সপ্তাহ: সৌন্দর্য, আতিথেয়তা আর দখলদারত্বের বাস্তবতা

সেমিস্টার শেষ হওয়ার পর ভ্রমণের জন্য হাতে কিছু অতিরিক্ত সময় ছিল। তাই আমি ও আমার এক বন্ধু ভাবছিলাম কোথায় যাওয়া যায়—শার্ম আল-শেখ, লুক্সর, আলেকজান্দ্রিয়া নাকি আকাবা। শেষ পর্যন্ত আমরা ফিলিস্তিন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেখানে আমরা জেরুজালেম, বেথলেহেম ও হেবরন ঘুরে দেখি।

ফিলিস্তিনে যাওয়ার সিদ্ধান্তে যেমন আনন্দ ছিল, তেমনি উদ্বেগও ছিল। দীর্ঘদিন ধরে যে ভূখণ্ড নিয়ে পড়াশোনা করেছি, সেটি নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাচ্ছিলাম। কিন্তু প্রতিদিনের সংবাদে সহিংসতার খবর এবং মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। জায়গাটি কতটা নিরাপদ, সীমান্তে ও পরে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে এবং এত মানুষের দুর্ভোগের মধ্যে সেখানে পর্যটক হিসেবে যাওয়া নৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য—এসব প্রশ্ন মনে ঘুরছিল।

কায়রো ছাড়ার আগের রাতে ১৪ ঘণ্টার বাসযাত্রায় তাবা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণের কথা বলছিলাম। দিমা নামের এক ফিলিস্তিনি বন্ধু, যিনি ২০২৪ সালে মিসর যাওয়ার আগে পুরো জীবন গাজায় কাটিয়েছেন, সবসময় জেরুজালেম দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু তাকে কখনো সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সে আমার জন্য আনন্দিত ছিল, আল-আকসা মসজিদে যেতে বলেছিল এবং ছবি পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও নিয়েছিল।

আমি তখনও নিরাপত্তার দিক থেকে ভ্রমণটি ঠিক সিদ্ধান্ত কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। তখন দিমা আমার হালকা গায়ের রং, স্বর্ণালি চুল ও মার্কিন পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তোমার জন্য বিষয়টি খুব সহজ হবে।’ পুরো এক সপ্তাহের অভিজ্ঞতায় ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, সে কতটা সঠিক ছিল।

ভূমি ও মানুষের সঙ্গে পরিচয়

আমরা প্রথমে জেরুজালেমের পুরোনো শহরে যাই। জায়গাটি আমার আগে দেখা অন্য যেকোনো শহর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মনে হয়েছিল। দোকান, ক্যাফে ও বাজারে মানুষের ভিড়ে শহরটি প্রাণবন্ত। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস কাটানোর পরও জেরুজালেমে প্রথম সকালে খাওয়া ফালাফেল ও হুমুসের স্বাদ ছিল একেবারেই আলাদা। পুরোনো শহরের সরু পাথুরে রাস্তা ছিল গোলকধাঁধার মতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা সেসব পথে ঘুরে বেড়িয়েছি।

আর্মেনিয়ান কোয়ার্টারে একটি ছোট ক্যাফেতে থামি। ক্যাফেটির মালিক ছিলেন আরব খ্রিস্টান। আমাকে আরবিতে কথা বলতে শুনে মালিক ও তার স্ত্রী অতিথি হিসেবে বসতে দেন এবং কারকাদে পান করান। মালিক এলিয়াস আগে আম্মানে থাকতেন। আমরা দীর্ঘ সময় জর্ডান নিয়ে গল্প করেছি।

পরে জেরুজালেমের পর্যটন গাইড ইমাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে তিনি মাত্র পাঁচটির মতো পর্যটক দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। বিস্মিত হয়ে জানতে পারি, তার একটি মেয়াদোত্তীর্ণ মার্কিন পাসপোর্ট রয়েছে। তবে তিনি সেটি নবায়ন করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে চান না। তার যুক্তি ছিল—তার জন্য জেরুজালেম ছেড়ে আমেরিকায় যাওয়া এবং নাগরিকত্ব পাওয়া খুব সহজ ছিল। কিন্তু সব ফিলিস্তিনি যদি সুযোগ পেয়ে চলে যান, তাহলে একসময় এই ভূখণ্ডে হয়তো কোনো ফিলিস্তিনিই থাকবে না। দখলদারত্বের নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও জেরুজালেমে থেকে যাওয়াকে তিনি এক ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে দেখেন।

পরদিন বাসে জেরুজালেম থেকে বেথলেহেম যাওয়ার পথে জানালা দিয়ে অসংখ্য জলপাইগাছ, সবুজ ঢেউখেলানো পাহাড়, ফুল ও বাগান দেখতে পাই। পশ্চিম তীরে প্রবেশের আগে কী অপেক্ষা করছে জানতাম না। কিন্তু বেথলেহেমে গিয়ে নিজেকে নিরাপদ ও শান্ত মনে হয়। জেরুজালেমের তুলনায় সেখানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও কম চোখে পড়েছিল।

হোটেলে ওঠার পর বশিরের সঙ্গে পরিচয় হয়। নিজের কাজ নিয়ে তার আন্তরিক গর্ব ছিল এবং আমাদের সবকিছু দেখানোর জন্য সে আগ্রহী ছিল। রাতের খাবারের জন্য আমরা পরামর্শ চাইলে সে নিজেই গাড়ি চালিয়ে আমাদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করে।

সেদিন স্থানীয় একটি গয়নার দোকানে বশিরের বন্ধু জর্জ এবং তার বিশের কোঠার শুরুতে থাকা ছেলের সঙ্গে দেখা হয়। রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলে ছেলে জানায়, রাজনীতি নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ নেই। সে শুধু বিয়ে করতে, সন্তান নিতে এবং তাদের ভরণপোষণের মতো অর্থ উপার্জন করতে চায়। তার এই আকাঙ্ক্ষা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। সংঘাতের দৃষ্টিকোণ থেকে ফিলিস্তিনিদের দেখার অভ্যাসের মধ্যে এই সাক্ষাৎ মনে করিয়ে দেয়—এখানকার তরুণদেরও ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মতোই স্বপ্ন ও চিন্তা রয়েছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অনেক সময় হয় ভুক্তভোগী, নয়তো যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনে এক সপ্তাহে এলিয়াস ও তার স্ত্রী, ইমাদ, জর্জ ও তার ছেলে এবং বশিরের মতো বহু মানুষের সঙ্গে দেখা করে বুঝেছি, তারা এই দুই পরিচয়ের কোনোটিতেই পুরোপুরি মেলে না। তারা অসাধারণ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা মানুষ। তাদের আতিথেয়তা ও উষ্ণতায় আমরা অনেক সময় ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমরা কোথায় আছি। বরং একাধিকবার তারা দখলদারত্বের পরিস্থিতি থেকে আমাদের আড়াল করার চেষ্টা করেছে। সম্ভাব্য বিপদ থেকে দূরে রাখতে, আমাদের আশ্বস্ত করতে বা যত্ন নিতে তারা নিজেরাই এগিয়ে এসেছে—যদিও আমাদের তুলনায় তাদের ভয় পাওয়ার কারণ ছিল অনেক বেশি।

পরদিন সকালে হোটেলে নাশতার সময় বশির বলল, দুপুর ২টার দিকে যেন আমরা আশপাশে না থাকি। কারণ জানতে চাইলে সে জানায়, ইসরায়েলি সেনারা আসবে। প্রথমে বিষয়টি শুনে আমি হেসেছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারি, সে মজা করছে না। সেনারা আমাদের হোটেলে ঢুকতে দেখেছিল এবং বশিরকে জানিয়েছিল, পরদিন দুপুর ২টায় তারা আবার আসবে। আমরা তার সঙ্গে বসে অপেক্ষা করতে থাকি। বশিরের মুখে যে ভয় দেখেছিলাম, তখন বুঝলাম—সেনারা সত্যিই আসবে কি না, সেটিই মূল বিষয় নয়। হুমকিটিই ইতোমধ্যে তার প্রভাব সৃষ্টি করেছে।Tourism in Palestine as a Counter-Discourse – This Week in Palestine

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যা দেখেছি

ফিলিস্তিনের সৌন্দর্য, মানুষের উষ্ণতা ও আতিথেয়তার পাশাপাশি প্রতিদিনের জীবনে মিশে থাকা সহিংসতাও উপেক্ষা করা অসম্ভব ছিল।

বেথলেহেমের আইদা শরণার্থী শিবিরে গিয়ে ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কাঁদানে গ্যাস ব্যবহৃত স্থান হিসেবে বর্ণিত এলাকাটি দেখি। সেখানে পড়ে থাকা ব্যবহৃত কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টারে ‘মেড ইন ইউএসএ’ লেখা ছিল। বেথলেহেমের বিভাজন প্রাচীরের পাশে হাঁটার সময় ওপরে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও নজরদারি সরঞ্জাম দেখতে পাই। আশপাশের বাড়িগুলোতেও ছিল অসংখ্য গুলির চিহ্ন।

একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে থাকা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক তরুণী সেনাকে দেখি। বয়স আনুমানিক ১৮ বছর। সে বন্ধুর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা শেষ করে আমাদের রেকর্ড করতে শুরু করে। মাটিতে পড়ে থাকা মূত্রভর্তি বোতলও দেখি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কাছের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে এসব বোতল ফিলিস্তিনি কবরস্থান ও আবাসিক এলাকার দিকে ছোড়া হয়েছিল।

আলাদা সড়ক ও বাস ব্যবস্থাও চোখে পড়ে। গাড়ির নম্বরপ্লেটের মাধ্যমে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি গাড়ি আলাদা করা হয়। স্থানীয়দের মতে, আগের রাতে ইসরায়েলি সেনারা কয়েকটি ফিলিস্তিনি নম্বরপ্লেটের গাড়ি ধ্বংস করেছিল। এক ফিলিস্তিনি বন্ধুর গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে তার কাঁপা হাতে গাড়ি চালানো দেখেছি। সে ফিলিস্তিনি গাড়িতে পাথর নিক্ষেপকারী ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের খুঁজছিল।

নাবলুসে একটি ঘটনার পর ২৪ জুলাই নেতানিয়াহু সামরিক অভিযান ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেওয়ার পর শত শত ইসরায়েলি সামরিক যান পশ্চিম তীরে প্রবেশ করতে দেখি।

আল-আকসা মসজিদে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রত্যক্ষ করি। জাতীয়তা, গায়ের রং কিংবা প্রবেশপথে থাকা ইসরায়েলি সেনাদের ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে অসংখ্য মুসল্লিকে মসজিদে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমাকেও মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়। অথচ পরদিন ইহুদিদের তিশা ব’আভ ধর্মীয় দিবস উপলক্ষে ৪ হাজারের বেশি ইসরায়েলি আল-আকসায় প্রবেশ করে।

জেরুজালেমের রাস্তায় অ্যাসল্ট রাইফেল বহনকারী ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদেরও দেখি। রাতে ইসরায়েলি সেনারা জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের পুরোনো শহরের ফটক দিয়ে প্রবেশে বাধা দিত। এক রাতে আমার মুসলিম বন্ধুকেও হোটেলে ফেরার পথে তারা থামিয়ে দেয়।

সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমাকে আঘাত করেছে, তা হলো এসব ঘটনার অস্বাভাবিক স্বাভাবিকতা। প্রকাশ্য বৈষম্য, প্রতিদিনের সহিংসতা, বিস্তৃত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অবিরাম ভয়-ভীতির মধ্যেও মানুষের জীবন যেন স্বাভাবিক নিয়মেই চলছিল।

নিরাপত্তা ও মার্কিন পাসপোর্টের সুবিধা

দূতাবাসের প্রতিটি সতর্কবার্তা, প্রতিটি চেকপয়েন্ট, প্রতিটি সংবাদ প্রতিবেদন কিংবা হঠাৎ কোনো শব্দ শোনার পর আমার বন্ধু ও আমি একে অপরের দিকে তাকাতাম। কয়েক দিন পর আর কথা বলারও প্রয়োজন হতো না। সেই দৃষ্টির অর্থ ছিল—‘তোমার পাসপোর্ট সঙ্গে আছে তো?’

আমরা ব্যাগ হাতড়ে পাসপোর্ট খুঁজতাম এবং হাতে না পাওয়া পর্যন্ত উদ্বিগ্ন থাকতাম। পাসপোর্ট সঙ্গে থাকার বিষয়টিই আমাদের নিরাপত্তার অনুভূতি দিত। কারণ আমরা জানতাম, যেকোনো সময় দেশটি ছেড়ে যেতে পারব এবং ইসরায়েলি সেনারা থামালে সম্ভবত তুলনামূলক সুবিধাজনক আচরণ পাব।

আমার মার্কিন পাসপোর্ট শুধু দেশটিতে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুবিধাই দেয়নি; স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিধিনিষেধগুলো না বুঝেই সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও দিয়েছে।

এর একটি উদাহরণ হেবরনের পুরোনো শহরের ইব্রাহিমি মসজিদে আমাদের ভ্রমণ। সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি, আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। মসজিদটি অত্যন্ত সামরিকীকৃত এইচ-২ এলাকায় অবস্থিত। ১৯৯৭ সাল থেকে এলাকাটি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে এবং ফিলিস্তিনিদের চলাচল সেখানে সীমিত। পুরো এলাকায় রয়েছে বহু চেকপয়েন্ট। ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ভয়ভীতির ঘটনাও নিয়মিত ঘটে। ১৯৯৪ সালে ইব্রাহিমি মসজিদে ২৯ জন ফিলিস্তিনি মুসল্লিকে হত্যার ঘটনাও এই এলাকার ইতিহাসের অংশ।

ফলে দোকানপাট বন্ধ, রাস্তাঘাট নীরব এবং মসজিদ প্রায় জনশূন্য। পরে স্থানীয়দের যখন বলেছিলাম যে আমরা মসজিদে গিয়েছি, তখন বুঝতে পারি আমাদের অভিজ্ঞতা কতটা অস্বাভাবিক ছিল। একের পর এক মানুষ আমাদের ‘সাহসী’ বলছিলেন।

কিন্তু বাস্তবে আমি বুঝতেই পারিনি যে সেখানে ভয় পাওয়ার মতো কিছু রয়েছে। আমার কাছে মসজিদে যাওয়া ছিল সাধারণ একটি বিকেল কাটানোর মতো। অথচ আশপাশের বহু ফিলিস্তিনির কাছে এমন একটি সফরও প্রায় অসম্ভব।

সেদিন রাতে হেবরন ছাড়ার সময় আমাদের বাস একটি চেকপয়েন্টে থামানো হয়। সবাইকে বাস থেকে নামিয়ে একটি সরু, বেড়াবেষ্টিত জায়গায় দাঁড় করানো হয়। সেনারা যাত্রীদের তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। আমি আমার মার্কিন পাসপোর্টটি তাদের দেখাই এবং কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আমাকে যেতে দেওয়া হয়।

ফিরে আসা

পশ্চিম তীর থেকে জর্ডানে যাওয়ার কিং হুসেইন সীমান্তে সেতু পার হওয়ার সময় জর্ডানের পতাকা চোখে পড়তেই মনে হলো আবার স্বস্তির সঙ্গে শ্বাস নিতে পারছি। তখনই বুঝতে পারলাম, এতদিনের উত্তেজনা ও মানসিক চাপ আমাকে কতটা প্রভাবিত করেছিল। সেদিন আম্মানে পৌঁছে আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করি—এখন আর সবসময় পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতে হবে না, সামনে আর চেকপয়েন্ট থাকবে না, রাতের খাবার খেতে যাওয়ার পথেও আলাদা সড়কের মুখোমুখি হতে হবে না।

ফিলিস্তিনে দেখা মানুষগুলোর কথা এখনো মনে পড়ে—তাদের কেউ হয়তো কোনো দিন এমন স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাবেন না। দিমার মতো কেউ কেউ নিজের ঘর ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন, জেনেও যে চলে গেলে হয়তো আর কখনো ফিরে যেতে পারবেন না।

ফিলিস্তিন সফরের আগে যেভাবে বুঝতে পারিনি, এখন সেভাবে বুঝি—নিজের ইচ্ছায় কোনো জায়গায় যাওয়া এবং সেখান থেকে নিজের ইচ্ছায় ফিরে আসার সুযোগ পাওয়া কত বড় সৌভাগ্য। দিমা ঠিকই বলেছিল—আমার জন্য সবকিছু সত্যিই খুব সহজ ছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

শরৎ ২০২৬-এ চুলের সাজে স্বস্তির ছোঁয়া, জনপ্রিয় হচ্ছে নরম ও সহজ যত্নের ধারা

ফিলিস্তিনে এক সপ্তাহ: সৌন্দর্য, আতিথেয়তা আর দখলদারত্বের বাস্তবতা

০৫:১১:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

সেমিস্টার শেষ হওয়ার পর ভ্রমণের জন্য হাতে কিছু অতিরিক্ত সময় ছিল। তাই আমি ও আমার এক বন্ধু ভাবছিলাম কোথায় যাওয়া যায়—শার্ম আল-শেখ, লুক্সর, আলেকজান্দ্রিয়া নাকি আকাবা। শেষ পর্যন্ত আমরা ফিলিস্তিন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেখানে আমরা জেরুজালেম, বেথলেহেম ও হেবরন ঘুরে দেখি।

ফিলিস্তিনে যাওয়ার সিদ্ধান্তে যেমন আনন্দ ছিল, তেমনি উদ্বেগও ছিল। দীর্ঘদিন ধরে যে ভূখণ্ড নিয়ে পড়াশোনা করেছি, সেটি নিজের চোখে দেখার সুযোগ পাচ্ছিলাম। কিন্তু প্রতিদিনের সংবাদে সহিংসতার খবর এবং মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। জায়গাটি কতটা নিরাপদ, সীমান্তে ও পরে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে এবং এত মানুষের দুর্ভোগের মধ্যে সেখানে পর্যটক হিসেবে যাওয়া নৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য—এসব প্রশ্ন মনে ঘুরছিল।

কায়রো ছাড়ার আগের রাতে ১৪ ঘণ্টার বাসযাত্রায় তাবা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে ভ্রমণের কথা বলছিলাম। দিমা নামের এক ফিলিস্তিনি বন্ধু, যিনি ২০২৪ সালে মিসর যাওয়ার আগে পুরো জীবন গাজায় কাটিয়েছেন, সবসময় জেরুজালেম দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু তাকে কখনো সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সে আমার জন্য আনন্দিত ছিল, আল-আকসা মসজিদে যেতে বলেছিল এবং ছবি পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও নিয়েছিল।

আমি তখনও নিরাপত্তার দিক থেকে ভ্রমণটি ঠিক সিদ্ধান্ত কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। তখন দিমা আমার হালকা গায়ের রং, স্বর্ণালি চুল ও মার্কিন পাসপোর্টের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তোমার জন্য বিষয়টি খুব সহজ হবে।’ পুরো এক সপ্তাহের অভিজ্ঞতায় ধীরে ধীরে বুঝতে পারি, সে কতটা সঠিক ছিল।

ভূমি ও মানুষের সঙ্গে পরিচয়

আমরা প্রথমে জেরুজালেমের পুরোনো শহরে যাই। জায়গাটি আমার আগে দেখা অন্য যেকোনো শহর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা মনে হয়েছিল। দোকান, ক্যাফে ও বাজারে মানুষের ভিড়ে শহরটি প্রাণবন্ত। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস কাটানোর পরও জেরুজালেমে প্রথম সকালে খাওয়া ফালাফেল ও হুমুসের স্বাদ ছিল একেবারেই আলাদা। পুরোনো শহরের সরু পাথুরে রাস্তা ছিল গোলকধাঁধার মতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা সেসব পথে ঘুরে বেড়িয়েছি।

আর্মেনিয়ান কোয়ার্টারে একটি ছোট ক্যাফেতে থামি। ক্যাফেটির মালিক ছিলেন আরব খ্রিস্টান। আমাকে আরবিতে কথা বলতে শুনে মালিক ও তার স্ত্রী অতিথি হিসেবে বসতে দেন এবং কারকাদে পান করান। মালিক এলিয়াস আগে আম্মানে থাকতেন। আমরা দীর্ঘ সময় জর্ডান নিয়ে গল্প করেছি।

পরে জেরুজালেমের পর্যটন গাইড ইমাদের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে তিনি মাত্র পাঁচটির মতো পর্যটক দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। বিস্মিত হয়ে জানতে পারি, তার একটি মেয়াদোত্তীর্ণ মার্কিন পাসপোর্ট রয়েছে। তবে তিনি সেটি নবায়ন করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে চান না। তার যুক্তি ছিল—তার জন্য জেরুজালেম ছেড়ে আমেরিকায় যাওয়া এবং নাগরিকত্ব পাওয়া খুব সহজ ছিল। কিন্তু সব ফিলিস্তিনি যদি সুযোগ পেয়ে চলে যান, তাহলে একসময় এই ভূখণ্ডে হয়তো কোনো ফিলিস্তিনিই থাকবে না। দখলদারত্বের নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও জেরুজালেমে থেকে যাওয়াকে তিনি এক ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে দেখেন।

পরদিন বাসে জেরুজালেম থেকে বেথলেহেম যাওয়ার পথে জানালা দিয়ে অসংখ্য জলপাইগাছ, সবুজ ঢেউখেলানো পাহাড়, ফুল ও বাগান দেখতে পাই। পশ্চিম তীরে প্রবেশের আগে কী অপেক্ষা করছে জানতাম না। কিন্তু বেথলেহেমে গিয়ে নিজেকে নিরাপদ ও শান্ত মনে হয়। জেরুজালেমের তুলনায় সেখানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উপস্থিতিও কম চোখে পড়েছিল।

হোটেলে ওঠার পর বশিরের সঙ্গে পরিচয় হয়। নিজের কাজ নিয়ে তার আন্তরিক গর্ব ছিল এবং আমাদের সবকিছু দেখানোর জন্য সে আগ্রহী ছিল। রাতের খাবারের জন্য আমরা পরামর্শ চাইলে সে নিজেই গাড়ি চালিয়ে আমাদের সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর করে।

সেদিন স্থানীয় একটি গয়নার দোকানে বশিরের বন্ধু জর্জ এবং তার বিশের কোঠার শুরুতে থাকা ছেলের সঙ্গে দেখা হয়। রাজনীতির প্রসঙ্গ উঠলে ছেলে জানায়, রাজনীতি নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ নেই। সে শুধু বিয়ে করতে, সন্তান নিতে এবং তাদের ভরণপোষণের মতো অর্থ উপার্জন করতে চায়। তার এই আকাঙ্ক্ষা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। সংঘাতের দৃষ্টিকোণ থেকে ফিলিস্তিনিদের দেখার অভ্যাসের মধ্যে এই সাক্ষাৎ মনে করিয়ে দেয়—এখানকার তরুণদেরও ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মতোই স্বপ্ন ও চিন্তা রয়েছে।

পশ্চিমা গণমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অনেক সময় হয় ভুক্তভোগী, নয়তো যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনে এক সপ্তাহে এলিয়াস ও তার স্ত্রী, ইমাদ, জর্জ ও তার ছেলে এবং বশিরের মতো বহু মানুষের সঙ্গে দেখা করে বুঝেছি, তারা এই দুই পরিচয়ের কোনোটিতেই পুরোপুরি মেলে না। তারা অসাধারণ কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করা মানুষ। তাদের আতিথেয়তা ও উষ্ণতায় আমরা অনেক সময় ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমরা কোথায় আছি। বরং একাধিকবার তারা দখলদারত্বের পরিস্থিতি থেকে আমাদের আড়াল করার চেষ্টা করেছে। সম্ভাব্য বিপদ থেকে দূরে রাখতে, আমাদের আশ্বস্ত করতে বা যত্ন নিতে তারা নিজেরাই এগিয়ে এসেছে—যদিও আমাদের তুলনায় তাদের ভয় পাওয়ার কারণ ছিল অনেক বেশি।

পরদিন সকালে হোটেলে নাশতার সময় বশির বলল, দুপুর ২টার দিকে যেন আমরা আশপাশে না থাকি। কারণ জানতে চাইলে সে জানায়, ইসরায়েলি সেনারা আসবে। প্রথমে বিষয়টি শুনে আমি হেসেছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারি, সে মজা করছে না। সেনারা আমাদের হোটেলে ঢুকতে দেখেছিল এবং বশিরকে জানিয়েছিল, পরদিন দুপুর ২টায় তারা আবার আসবে। আমরা তার সঙ্গে বসে অপেক্ষা করতে থাকি। বশিরের মুখে যে ভয় দেখেছিলাম, তখন বুঝলাম—সেনারা সত্যিই আসবে কি না, সেটিই মূল বিষয় নয়। হুমকিটিই ইতোমধ্যে তার প্রভাব সৃষ্টি করেছে।Tourism in Palestine as a Counter-Discourse – This Week in Palestine

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যা দেখেছি

ফিলিস্তিনের সৌন্দর্য, মানুষের উষ্ণতা ও আতিথেয়তার পাশাপাশি প্রতিদিনের জীবনে মিশে থাকা সহিংসতাও উপেক্ষা করা অসম্ভব ছিল।

বেথলেহেমের আইদা শরণার্থী শিবিরে গিয়ে ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কাঁদানে গ্যাস ব্যবহৃত স্থান হিসেবে বর্ণিত এলাকাটি দেখি। সেখানে পড়ে থাকা ব্যবহৃত কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টারে ‘মেড ইন ইউএসএ’ লেখা ছিল। বেথলেহেমের বিভাজন প্রাচীরের পাশে হাঁটার সময় ওপরে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও নজরদারি সরঞ্জাম দেখতে পাই। আশপাশের বাড়িগুলোতেও ছিল অসংখ্য গুলির চিহ্ন।

একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে থাকা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর এক তরুণী সেনাকে দেখি। বয়স আনুমানিক ১৮ বছর। সে বন্ধুর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা শেষ করে আমাদের রেকর্ড করতে শুরু করে। মাটিতে পড়ে থাকা মূত্রভর্তি বোতলও দেখি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কাছের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে এসব বোতল ফিলিস্তিনি কবরস্থান ও আবাসিক এলাকার দিকে ছোড়া হয়েছিল।

আলাদা সড়ক ও বাস ব্যবস্থাও চোখে পড়ে। গাড়ির নম্বরপ্লেটের মাধ্যমে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি গাড়ি আলাদা করা হয়। স্থানীয়দের মতে, আগের রাতে ইসরায়েলি সেনারা কয়েকটি ফিলিস্তিনি নম্বরপ্লেটের গাড়ি ধ্বংস করেছিল। এক ফিলিস্তিনি বন্ধুর গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে তার কাঁপা হাতে গাড়ি চালানো দেখেছি। সে ফিলিস্তিনি গাড়িতে পাথর নিক্ষেপকারী ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের খুঁজছিল।

নাবলুসে একটি ঘটনার পর ২৪ জুলাই নেতানিয়াহু সামরিক অভিযান ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেওয়ার পর শত শত ইসরায়েলি সামরিক যান পশ্চিম তীরে প্রবেশ করতে দেখি।

আল-আকসা মসজিদে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বৈষম্য প্রত্যক্ষ করি। জাতীয়তা, গায়ের রং কিংবা প্রবেশপথে থাকা ইসরায়েলি সেনাদের ইচ্ছার ওপর ভিত্তি করে অসংখ্য মুসল্লিকে মসজিদে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। আমাকেও মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়। অথচ পরদিন ইহুদিদের তিশা ব’আভ ধর্মীয় দিবস উপলক্ষে ৪ হাজারের বেশি ইসরায়েলি আল-আকসায় প্রবেশ করে।

জেরুজালেমের রাস্তায় অ্যাসল্ট রাইফেল বহনকারী ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদেরও দেখি। রাতে ইসরায়েলি সেনারা জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের পুরোনো শহরের ফটক দিয়ে প্রবেশে বাধা দিত। এক রাতে আমার মুসলিম বন্ধুকেও হোটেলে ফেরার পথে তারা থামিয়ে দেয়।

সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমাকে আঘাত করেছে, তা হলো এসব ঘটনার অস্বাভাবিক স্বাভাবিকতা। প্রকাশ্য বৈষম্য, প্রতিদিনের সহিংসতা, বিস্তৃত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অবিরাম ভয়-ভীতির মধ্যেও মানুষের জীবন যেন স্বাভাবিক নিয়মেই চলছিল।

নিরাপত্তা ও মার্কিন পাসপোর্টের সুবিধা

দূতাবাসের প্রতিটি সতর্কবার্তা, প্রতিটি চেকপয়েন্ট, প্রতিটি সংবাদ প্রতিবেদন কিংবা হঠাৎ কোনো শব্দ শোনার পর আমার বন্ধু ও আমি একে অপরের দিকে তাকাতাম। কয়েক দিন পর আর কথা বলারও প্রয়োজন হতো না। সেই দৃষ্টির অর্থ ছিল—‘তোমার পাসপোর্ট সঙ্গে আছে তো?’

আমরা ব্যাগ হাতড়ে পাসপোর্ট খুঁজতাম এবং হাতে না পাওয়া পর্যন্ত উদ্বিগ্ন থাকতাম। পাসপোর্ট সঙ্গে থাকার বিষয়টিই আমাদের নিরাপত্তার অনুভূতি দিত। কারণ আমরা জানতাম, যেকোনো সময় দেশটি ছেড়ে যেতে পারব এবং ইসরায়েলি সেনারা থামালে সম্ভবত তুলনামূলক সুবিধাজনক আচরণ পাব।

আমার মার্কিন পাসপোর্ট শুধু দেশটিতে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুবিধাই দেয়নি; স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিধিনিষেধগুলো না বুঝেই সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগও দিয়েছে।

এর একটি উদাহরণ হেবরনের পুরোনো শহরের ইব্রাহিমি মসজিদে আমাদের ভ্রমণ। সেখানে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি, আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। মসজিদটি অত্যন্ত সামরিকীকৃত এইচ-২ এলাকায় অবস্থিত। ১৯৯৭ সাল থেকে এলাকাটি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে এবং ফিলিস্তিনিদের চলাচল সেখানে সীমিত। পুরো এলাকায় রয়েছে বহু চেকপয়েন্ট। ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা ও ভয়ভীতির ঘটনাও নিয়মিত ঘটে। ১৯৯৪ সালে ইব্রাহিমি মসজিদে ২৯ জন ফিলিস্তিনি মুসল্লিকে হত্যার ঘটনাও এই এলাকার ইতিহাসের অংশ।

ফলে দোকানপাট বন্ধ, রাস্তাঘাট নীরব এবং মসজিদ প্রায় জনশূন্য। পরে স্থানীয়দের যখন বলেছিলাম যে আমরা মসজিদে গিয়েছি, তখন বুঝতে পারি আমাদের অভিজ্ঞতা কতটা অস্বাভাবিক ছিল। একের পর এক মানুষ আমাদের ‘সাহসী’ বলছিলেন।

কিন্তু বাস্তবে আমি বুঝতেই পারিনি যে সেখানে ভয় পাওয়ার মতো কিছু রয়েছে। আমার কাছে মসজিদে যাওয়া ছিল সাধারণ একটি বিকেল কাটানোর মতো। অথচ আশপাশের বহু ফিলিস্তিনির কাছে এমন একটি সফরও প্রায় অসম্ভব।

সেদিন রাতে হেবরন ছাড়ার সময় আমাদের বাস একটি চেকপয়েন্টে থামানো হয়। সবাইকে বাস থেকে নামিয়ে একটি সরু, বেড়াবেষ্টিত জায়গায় দাঁড় করানো হয়। সেনারা যাত্রীদের তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে। আমি আমার মার্কিন পাসপোর্টটি তাদের দেখাই এবং কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আমাকে যেতে দেওয়া হয়।

ফিরে আসা

পশ্চিম তীর থেকে জর্ডানে যাওয়ার কিং হুসেইন সীমান্তে সেতু পার হওয়ার সময় জর্ডানের পতাকা চোখে পড়তেই মনে হলো আবার স্বস্তির সঙ্গে শ্বাস নিতে পারছি। তখনই বুঝতে পারলাম, এতদিনের উত্তেজনা ও মানসিক চাপ আমাকে কতটা প্রভাবিত করেছিল। সেদিন আম্মানে পৌঁছে আরও একটি বিষয় উপলব্ধি করি—এখন আর সবসময় পাসপোর্ট সঙ্গে রাখতে হবে না, সামনে আর চেকপয়েন্ট থাকবে না, রাতের খাবার খেতে যাওয়ার পথেও আলাদা সড়কের মুখোমুখি হতে হবে না।

ফিলিস্তিনে দেখা মানুষগুলোর কথা এখনো মনে পড়ে—তাদের কেউ হয়তো কোনো দিন এমন স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাবেন না। দিমার মতো কেউ কেউ নিজের ঘর ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন, জেনেও যে চলে গেলে হয়তো আর কখনো ফিরে যেতে পারবেন না।

ফিলিস্তিন সফরের আগে যেভাবে বুঝতে পারিনি, এখন সেভাবে বুঝি—নিজের ইচ্ছায় কোনো জায়গায় যাওয়া এবং সেখান থেকে নিজের ইচ্ছায় ফিরে আসার সুযোগ পাওয়া কত বড় সৌভাগ্য। দিমা ঠিকই বলেছিল—আমার জন্য সবকিছু সত্যিই খুব সহজ ছিল।