খাদ্য থেকে জ্বালানি, পরিবহন থেকে ইউটিলিটি—জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ এখন প্রায় সব দিক থেকেই বাড়ছে। আয় একই গতিতে না বাড়ায় বিশেষ করে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও সামগ্রিক ব্যয়ের চাপ থেকে স্বস্তি মিলছে না।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে রান্নাঘর ও মুদি বাজারের অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। কয়েকটি পণ্যের দাম কমেছে, আবার অনেক পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। দেশীয় পণ্যের পাশাপাশি আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের স্বস্তি দেখা যায়নি।
খাদ্যের বাইরে বাড়ছে অন্যান্য ব্যয়
নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যয়ের বড় অংশ খাবারের পেছনে গেলেও চাপ এখন আর শুধু খাদ্যপণ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির তথ্যও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে তা কিছুটা কমেছে। গত মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। তবে বাজারে কেনাকাটার সময় সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা এখনো সরকারি মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না।
টাকার অবমূল্যায়নও বাড়িয়েছে আমদানি ব্যয়। ডলারের দাম এখন প্রায় ১২৩ টাকা, যেখানে বড় ধরনের অবমূল্যায়নের আগে তা ছিল ৮৬ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ডলারে আমদানি ব্যয় প্রায় ৩৭ টাকা বেড়েছে। আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল শিল্পগুলোতে এই বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব আরও বেশি পড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত তার একটি অংশ ভোক্তাদের ওপরও পড়ছে।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বাংলাদেশের প্রধান তেল ও গ্যাস সরবরাহের উৎসে ব্যাঘাত তৈরি হয়েছে এবং দেশকে তুলনামূলক ব্যয়বহুল বিকল্পের দিকে যেতে হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বাড়ায় পরিবহন ভাড়া, ইউটিলিটি বিল এবং শিল্প উৎপাদনের খরচও বেড়েছে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভর্তুকির চাপ সামাল দিতে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। এর ফলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় ধরনের পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।
টিসিবির দৈনিক বাজারতথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মোটা ও সরু চালের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। মাঝারি মানের চালের দাম সামান্য কমেছে। তবে ভোজ্যতেল, লবণ, আটা, ডাল, আলু, রসুন, ডিম ও গুঁড়া দুধসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। শীতকাল পেরিয়ে বর্ষা মৌসুমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব ধরনের তাজা সবজির দামও বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ফেব্রুয়ারির পর এলপিজি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে নিম্ন আয়ের পরিবারের মাসিক বাজেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও ফেব্রুয়ারির তুলনায় অধিকাংশ পণ্য ও সেবার জন্য মানুষকে এখনো বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
রেমিট্যান্স বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এবং বিনিময় হারও তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। তারপরও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি। সাবেক বিশ্বব্যাংক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পাশাপাশি সরকারের সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব ও মুদ্রানীতিও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাধা তৈরি করছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনও মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কার্যকর হচ্ছে না। একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কথা বলছে, অন্যদিকে ঋণের সুদ কমিয়ে বাজারে অর্থের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ কারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল, সম্প্রসারণমূলক বাজেট এবং ব্যাংকে মূলধন জোগানোর মতো উদ্যোগও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা।
দাম কমাতে সময় লাগবে: বাণিজ্যমন্ত্রী
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরও বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় ও পণ্যমূল্যের পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট নন। তিনি বলেছেন, শুধু বাজার তদারকি করে পণ্যের দাম কমানো সম্ভব নয়। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম, ঋণের খরচ, উৎপাদনশীলতা, পরিবহন ও অবকাঠামো—সবকিছুর সঙ্গে পণ্যের দাম সম্পর্কিত।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের লজিস্টিক ব্যয় আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জ্বালানি সক্ষমতা গড়ে তুলতে সময় লাগবে। সরকার নতুন এলএনজি অবকাঠামো, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম নিশ্চিত করার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
টিসিবির ভর্তুকি মূল্যে ট্রাক বিক্রি কিছুটা স্বস্তি দিলেও সীমিত সরবরাহের কারণে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনেক মানুষকে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুটিই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যাপক পরিসরে স্বস্তি দিতে পারেনি।
মূল্যস্ফীতির চাপ কমানোর পাশাপাশি আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং বাজারে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা—এই বিষয়গুলোই এখন সাধারণ পরিবারের বাজেটের ওপর বাড়তে থাকা চাপ কমানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বাড়ছে চাপ। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে স্বস্তি ফেরেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















