ইরানের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করতে নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন মার্কিন মিত্রদের পাশাপাশি চীনকেও তেহরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করার আহ্বান জানিয়েছে। ওয়াশিংটন বলছে, ইরানের ওপর সর্বোচ্চ মাত্রার অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে দেশটির সরকারকে চাপে ফেলাই এখন তাদের প্রধান কৌশল।
ইরানের অর্থনীতি লক্ষ্য করে নতুন চাপ
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, তেহরানের সঙ্গে যেকোনো অব্যাহত অর্থনৈতিক সম্পর্ক সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা কোনো দেশের জন্যই অর্থনৈতিকভাবে গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। তবে নতুন পদক্ষেপগুলোর সুনির্দিষ্ট বিবরণ এখনো প্রকাশ করেনি ট্রাম্প প্রশাসন। বেসেন্ট জানিয়েছেন, সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হচ্ছে অর্থনৈতিক চাপ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তেহরানও পাল্টা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করতে পারে। এ কারণে পরিস্থিতিকে তিনি একটি ‘সূক্ষ্ম ভারসাম্যের’ বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
চীনের ওপরও ওয়াশিংটনের নজর
ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছে। চীনকে এই কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বেসেন্ট। তিনি বলেছেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে অনেক আলোচনা ব্যক্তিগত পর্যায়েই হওয়া ভালো। একই সময়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে সফরের কথা রয়েছে।
ট্রাম্পের এই নতুন উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও চাপ বাড়ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রয়েছে। ট্রাম্প বুধবার ইরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে crushing’ অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর প্রশাসন এটিকে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার একটি নতুন পর্যায় হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের পাল্টা অবস্থান
তেহরান অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং বলেছে, এই কৌশল ব্যর্থ হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি মার্কিন নতুন চাপকে অতীতের ব্যর্থ নীতির পুনরাবৃত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, ২০১০ থেকে ২০১২ সালের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ২০১৮ সালে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়ার পর চালানো ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতিও তেহরানকে কাঙ্ক্ষিতভাবে নতি স্বীকার করাতে পারেনি।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের প্রধান আহমাদ ভাহিদি দাবি করেছেন, দেশটি শত্রুদের হুমকি মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তিনি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেছেন।
আঞ্চলিক বাণিজ্য ও হরমুজ ঘিরে উদ্বেগ
মার্কিন চাপের মধ্যেই ইরান আঞ্চলিক বাণিজ্য জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। ওমানের সঙ্গে একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে তেহরান, যা আগামী মাসে ইরানের পার্লামেন্টে পর্যালোচনা হওয়ার কথা। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে সীমান্ত ও বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের কথাও জানিয়েছে দেশটি।
এদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরেও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। ন্যাটোর শীর্ষ মিত্রবাহিনী কমান্ডার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সুরক্ষায় মিত্র দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে এটি ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক সামরিক মোতায়েন নয়। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে প্রায় ১২টি দেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাণিজ্যিক জাহাজ সুরক্ষায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের বাণিজ্যিক তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
ইরাক ও লেবাননেও যুদ্ধের প্রভাব
আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব ইরাক ও লেবাননেও পড়ছে। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি বলেছেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সামরিক সংঘাতে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই; বরং অস্ত্রকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে সংলাপ চলছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় দেশটির তেল রপ্তানি সংকুচিত হয়ে আগের সক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে তিনি জানান।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামও দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং সেনাবাহিনীর ঐক্য জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি আন্তর্জাতিক ও আরব সমর্থনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার পাশাপাশি সম্পূর্ণ ইসরায়েলি প্রত্যাহার এবং লেবানিজ বন্দীদের নিজ নিজ এলাকায় ফেরানোর লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















