কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে নতুন ধারণা যাচাই—প্রায় সব ক্ষেত্রেই মানুষের সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, এই সহায়তা সবসময় মানুষের সিদ্ধান্তকে উন্নত করছে না। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো সিদ্ধান্তের কারণ সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে দিলে মানুষ অনেক সময় নিজের বিচার-বিশ্লেষণ বাদ দিয়ে সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছে।
হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত গবেষণায় এমনই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানুষের একমত হওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়, বিশেষ করে যখন সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় এমন ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়।
ব্যাখ্যা থাকলেই সিদ্ধান্ত ভালো হয় না
গবেষণায় ২২৮ জন অভিজ্ঞ মূল্যায়নকারীকে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একটি উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় জমা দেওয়া প্রায় ৫০টি প্রস্তাব মূল্যায়ন করতে দেওয়া হয়। তাঁদের তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছিল।
এক ক্ষেত্রে তাঁরা কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা ছাড়াই প্রস্তাব মূল্যায়ন করেন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি প্রস্তাব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত দেওয়ার পাশাপাশি সেই সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে। তৃতীয় ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত জানায়, কোনো ব্যাখ্যা দেয় না।
এরপর মূল্যায়নকারীদের সিদ্ধান্ত চারজন মানব বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তুলনা করা হয়। বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্তকে সঠিকতার মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছিল।
মানুষের বিচারকে প্রভাবিত করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
গবেষণায় দেখা যায়, মূল্যায়নকারীরা প্রায় ৬৭ শতাংশ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুপারিশ মেনে নিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তখনও প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষেত্রে মানুষ তার সঙ্গে একমত হয়েছে। ব্যাখ্যাসহ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও সম্মতির হার ছিল প্রায় একই।
অন্যদিকে, কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা ছাড়া মূল্যায়নকারীরা মানব বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মাত্র ৫৪ শতাংশ ক্ষেত্রে একমত হয়েছেন।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাখ্যাহীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুপারিশ অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সিদ্ধান্তকে বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্তের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। কিন্তু ব্যাখ্যাসহ সুপারিশ সেই সুবিধা দেয়নি।
বিশেষ করে কোনো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন একটি যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা দিয়েছে, তখন মূল্যায়নকারীরা সেটি মেনে নেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখিয়েছেন। এর ফলে কিছু ভুলভাবে গ্রহণের সিদ্ধান্ত কমলেও এমন অনেক সম্ভাবনাময় প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, যেগুলো মানব বিশেষজ্ঞরা এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন।
বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যার ফাঁদ
গবেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাখ্যা মানুষের স্বাধীনভাবে যাচাই করার প্রবণতা কমিয়ে দিতে পারে। একটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে যদি সাবলীল, সুসংগঠিত এবং আত্মবিশ্বাসী ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, তাহলে সেটিকে সত্য বলে গ্রহণ করা মানুষের জন্য সহজ হয়ে যায়।
মানুষ সাধারণত এমন তথ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয় যা নেতিবাচক ফলাফল বা ঝুঁকির কথা বলে। কোনো নতুন প্রকল্প প্রত্যাখ্যান করার ক্ষেত্রে তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দেওয়া নেতিবাচক যুক্তি সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
কারণ কোনো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে অতিরিক্ত অর্থ, সময় বা জনবল বিনিয়োগের ঝুঁকি থাকে না। বিদ্যমান অবস্থাও বজায় থাকে। ফলে প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে তুলনামূলক নিরাপদ বলে মনে হয়।
এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ব্যাখ্যা মানুষের কাছে একটি প্রস্তুত যুক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। তখন নিজের মতো করে তথ্য যাচাই করার বদলে মানুষ যন্ত্রের যুক্তির ওপর নির্ভর করতে শুরু করে।
মানুষের নিজের বিচারবুদ্ধিই হয়ে উঠতে পারে দুর্বল
গবেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভাষা সাধারণত অত্যন্ত সাবলীল ও আত্মবিশ্বাসী হওয়ায় মানুষের মধ্যে তার দক্ষতা সম্পর্কে অতিরিক্ত আস্থা তৈরি হতে পারে। একটি ব্যাখ্যা যত সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়, মানুষ তত বেশি মনে করতে পারে যে সে সিদ্ধান্তটির কারণ বুঝে ফেলেছে।
কিন্তু বাস্তবে সেই ব্যাখ্যার পেছনে থাকা তথ্য বা যুক্তি কতটা সঠিক, তা যাচাই না করলে এই বোঝাপড়া অনেক সময় ভ্রান্ত হতে পারে।
অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চিন্তাকে সহায়তা করার বদলে মানুষের হয়ে চিন্তা করার জায়গা দখল করে নিতে পারে। বিশেষ করে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে যেখানে স্বাধীন বিচার এবং বিকল্প মত যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই প্রবণতা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সব ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি কার্যকর নয়
গবেষকরা অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পরামর্শ দেননি। তাঁদের মতে, কোন কাজে কী ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর এর প্রভাব নির্ভর করে।
মান নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম মেনে চলা যাচাই বা প্রতারণা শনাক্ত করার মতো ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাখ্যা মানুষের সতর্কতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু নতুন উদ্ভাবন বা প্রাথমিক পর্যায়ের কোনো ধারণা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যাখ্যা মানুষের স্বাধীন বিচারকে দুর্বল করতে পারে।
এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্ত সরাসরি গ্রহণ না করে তা যাচাই করার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এমন ব্যবস্থাও তৈরি করা যেতে পারে যেখানে মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণের সুযোগ দেওয়া হবে।
সামনে যে নকশা দরকার
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা শুধু একটি সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখানোর পরিবর্তে বিপরীত দিকের যুক্তিও তুলে ধরতে পারে। যেমন কোনো ধারণা প্রত্যাখ্যান করার কারণের পাশাপাশি সেটি গ্রহণ করার সম্ভাব্য কারণও দেখানো যেতে পারে।
এ ছাড়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে অনিশ্চয়তার মাত্রা জানানো এবং মানুষকে স্বাধীনভাবে যাচাই করতে উৎসাহিত করার ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।
মূল কথা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাখ্যাকে সবসময় স্বচ্ছতা বা সহায়তার প্রতীক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা কখনো কখনো মানুষের স্বাধীন চিন্তাকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
প্রযুক্তির লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানো, মানুষের জায়গায় সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হয়তো যন্ত্রের উত্তর জানা নয়, বরং সেই উত্তরকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা ধরে রাখা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত বেশি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ হয়ে উঠবে, ততই প্রয়োজন হবে একটি বিষয় মনে রাখা—সুন্দর ব্যাখ্যা মানেই সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















