০৮:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের মধ্যে লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ফেরানোর উদ্যোগে অচলাবস্থা আসাম–মেঘালয় উত্তেজনা: হামলায় জড়িত ৫ মুখোশধারী শনাক্ত, গঠিত বিশেষ তদন্ত দল গ্যাসের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কমছে সিএনজি চালকদের আয় মণিপুরে বাড়ছে পাহাড়ি গ্রাম, নেপথ্যে বাস্তুচ্যুতি ও ‘ভূতুড়ে গ্রাম’: বিজেপি বিধায়ক ভারতের পুঁজিবাজারে জেপিমরগানের প্রতিষ্ঠানে নিষেধাজ্ঞা, অভিযোগ কারসাজির মনোহরদীতে বাড়িতে ঢুকে অটোচালককে কুপিয়ে হত্যা, রহস্যে পুলিশ শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ চায় ডিকেসিসিআই, ঋণপ্রবাহে বেসরকারি খাতের সংকট তীব্র গরমে ব্যায়াম করবেন যেভাবে, শরীর থাকবে ঠান্ডা ও নিরাপদ শিশুদের মস্তিষ্কে পর্দার অতিরিক্ত সময়ের আসল প্রভাব কতটা? সামরিক পদক সম্মানের প্রতীক, প্রদর্শনের অলংকার নয়

শিশুদের মস্তিষ্কে পর্দার অতিরিক্ত সময়ের আসল প্রভাব কতটা?

শিশুর হাতে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট কিংবা কম্পিউটার তুলে দিলে তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন ধারণা এখন অনেক অভিভাবকের মধ্যেই গভীরভাবে গেঁথে গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। শুধু শিশু কতক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে, সেই সময় দিয়ে তার মানসিক স্বাস্থ্য বা মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব নির্ধারণ করা যায় না।

গবেষকদের একাংশের মতে, পর্দার ব্যবহার নিয়ে ভয় পাওয়ার আগে দেখতে হবে শিশু কী দেখছে, কীভাবে দেখছে, একা নাকি অন্যদের সঙ্গে দেখছে এবং এর কারণে ঘুম, শারীরিক কর্মকাণ্ড ও বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ কতটা কমছে।

পর্দার সময় নিয়ে এত ভয় কেন

শিশুদের অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের সঙ্গে বিষণ্নতা, আচরণগত সমস্যা ও ঘুমের ঘাটতির মতো নানা সমস্যাকে যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি কিছু বিশেষজ্ঞ দাবি করেছেন, দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট ব্যবহার ও কম্পিউটার গেম কিশোরদের মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে।

তবে পর্দা ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে করা বহু গবেষণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মনোবিজ্ঞানী পিট এচেলস শত শত গবেষণা ও বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে মনে করেন, পর্দার সময়কে সরাসরি মানসিক সমস্যার কারণ হিসেবে দেখানোর মতো শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

২০২১ সালে প্রকাশিত একটি বড় পর্যালোচনাতেও একই ধরনের চিত্র উঠে আসে। বিভিন্ন দেশের গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও গেমের ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় তুলনামূলকভাবে সামান্য ভূমিকা রাখে।

গবেষণার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়

পর্দা ব্যবহারের ওপর গবেষণার একটি বড় সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই তথ্য নেওয়া হয় শিশু-কিশোরদের নিজেদের দেওয়া হিসাব থেকে। অর্থাৎ তারা নিজেরাই জানান দিনে কতক্ষণ পর্দা ব্যবহার করেছেন এবং সেই সময় তাদের কেমন লেগেছে।

কিন্তু মানুষের নিজের স্মৃতির ওপর নির্ভর করা তথ্য সব সময় নির্ভুল নাও হতে পারে। তার ওপর দুটি বিষয় একসঙ্গে ঘটলেই যে একটির কারণে অন্যটি ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না।

গবেষকরা উদাহরণ হিসেবে বলেন, গরমের সময়ে যেমন আইসক্রিম বিক্রি বাড়ে, তেমনি ত্বকের ক্যানসারের কিছু উপসর্গও বাড়তে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আইসক্রিম ক্যানসারের কারণ। উভয়ের পেছনে তাপমাত্রা বা সূর্যের আলোর মতো তৃতীয় কোনো কারণ থাকতে পারে।

শুধু পর্দার সময় নয়, কী করা হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ

‘পর্দার সময়’ আসলে খুব বিস্তৃত একটি ধারণা। একটি শিশু শিক্ষামূলক কিছু দেখছে, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে বা সৃজনশীল কোনো কাজে যুক্ত আছে—এটি আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্বেগজনক বিষয়বস্তু দেখা বা উদ্দেশ্যহীনভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো এক নয়।

একইভাবে, একা পর্দা ব্যবহার করা এবং পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে পর্দার মাধ্যমে যোগাযোগ করাও শিশুর ওপর একই প্রভাব ফেলবে না।

গবেষকদের মতে, তাই শুধু দিনে কত ঘণ্টা পর্দা ব্যবহার করা হচ্ছে তা না দেখে সেই সময়ের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং শিশুর সামগ্রিক জীবনযাত্রার দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মস্তিষ্কের পরিবর্তন মানেই কি ক্ষতি

শিশুদের মস্তিষ্কের ওপর পর্দার প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—পর্দা কি মস্তিষ্কের গঠন বা কার্যক্রম বদলে দেয়?

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গবেষকদের একটি গবেষণায় ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ১১ হাজার ৫০০টি মস্তিষ্কের ছবি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে পর্দা ব্যবহারের ধরন এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের সংযোগের মধ্যে কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, কয়েক ঘণ্টা পর্দা ব্যবহারকারী শিশুদের মানসিক সুস্থতা বা চিন্তাশক্তির সমস্যার সঙ্গে পর্দার ব্যবহারের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

গবেষকদের যুক্তি হলো, মানুষের মস্তিষ্ক পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। শেখা, খেলা, কথা বলা কিংবা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা—সবকিছুই মস্তিষ্ককে বদলায়। তাই মস্তিষ্কে পরিবর্তন ঘটলেই সেটিকে ক্ষতিকর পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক নয়।What screen time does to a child's brain

তবে ঝুঁকি একেবারেই নেই, এমন নয়

পর্দার ব্যবহারকে পুরোপুরি নির্দোষ বলছেন না গবেষকেরা। অনলাইনে শিশুদের হয়রানি, অপরিচিত ব্যক্তির প্রলোভন, ক্ষতিকর বা যৌন বিষয়বস্তুর সংস্পর্শ এবং অন্যান্য অনলাইন ঝুঁকি বাস্তব সমস্যা।

এ ছাড়া অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের কারণে যদি শিশুর ঘুম কমে যায়, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো কমে যায় কিংবা শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নষ্ট হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।

মনোবিজ্ঞানী জিন টোয়েঞ্জের মতে, অনলাইনে বেশি সময় কাটানো, একা থাকা, কম ঘুমানো এবং বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়া—এই সমন্বয়টি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।

অন্যদিকে, শিশুদের ওপর অতিরিক্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও উল্টো সমস্যা তৈরি হতে পারে। কোনো কিছু সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিলে সেটি শিশুর কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে বলে কিছু গবেষকের আশঙ্কা।

ঘুমের ওপর পর্দার আলো কতটা প্রভাব ফেলে

পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো ঘুমের জন্য ক্ষতিকর—এমন ধারণা বেশ প্রচলিত। বলা হয়, এই আলো শরীরে ঘুম-নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে ঘুমাতে অসুবিধা তৈরি করতে পারে।

তবে ২০২৪ সালে ১১টি গবেষণা পর্যালোচনা করে সামগ্রিকভাবে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে ঘুমানোর আগের এক ঘণ্টায় পর্দার আলো দেখলেই ঘুমাতে সমস্যা হবে।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় পর্দা ব্যবহার সব শিশুর জন্য ভালো। বরং শিশুর ঘুমের সময় নষ্ট হচ্ছে কি না এবং পর্দার ব্যবহার তার ঘুমের অভ্যাসকে ব্যাহত করছে কি না—সেদিকে নজর দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অভিভাবকদের অপরাধবোধও বাড়ছে

শিশুদের পর্দা ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে—অভিভাবকদের ওপর সামাজিক চাপ।

শিশু বিশেষজ্ঞ জেনি রাডেস্কির মতে, পর্দা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে এমন এক ধরনের বিচারমূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা অনেক সময় গবেষণা থেকে প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার বদলে অভিভাবকদের অপরাধবোধ বাড়িয়ে দেয়।

বাস্তবে ছোট শিশু পর্দা বন্ধ করতে না চাইলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতেই পারে। একই ধরনের আচরণ সে খেলনা, খেলা কিংবা ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও করতে পারে। তাই শুধু কোনো শিশুর পর্দা বন্ধ করার সময় রাগ বা কান্না দেখালেই তাকে পর্দার আসক্তি কিংবা মস্তিষ্কের ক্ষতির প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়েও মতভেদ

শিশুদের পর্দা ব্যবহারের বিষয়ে বিশ্বজুড়ে একক কোনো নির্দেশনা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের শিশু চিকিৎসা সংস্থা এবং যুক্তরাজ্যের শিশু ও কিশোর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সংগঠন নির্দিষ্ট দৈনিক সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবশ্য এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পর্দা ব্যবহার না করার এবং চার বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার পরামর্শ দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুর শারীরিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা ও সুস্থ বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

তাহলে অভিভাবকদের করণীয় কী

বর্তমান গবেষণা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—শিশুর পর্দা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়। বরং দেখতে হবে সেই ব্যবহার শিশুর ঘুম, খেলাধুলা, পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে সরিয়ে দিচ্ছে কি না।

পর্দার সময় যদি শিশুর জীবনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডকে দখল করে নেয়, তখন সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। আবার শিক্ষামূলক বিষয়, সৃজনশীল কাজ কিংবা বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে অর্থপূর্ণ যোগাযোগের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারকে একইভাবে নেতিবাচক হিসেবে দেখারও কারণ নেই।

সবচেয়ে বড় কথা, শিশুদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তি দ্রুত বদলাচ্ছে। স্মার্ট চশমা, নতুন ধরনের সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী ইতিমধ্যেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়ছে।

তাই শিশুদের শুধু পর্দা থেকে দূরে রাখার বদলে কীভাবে নিরাপদ, ভারসাম্যপূর্ণ ও অর্থবহভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, সেটি শেখানোই সম্ভবত ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর পথ।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধের মধ্যে লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ফেরানোর উদ্যোগে অচলাবস্থা

শিশুদের মস্তিষ্কে পর্দার অতিরিক্ত সময়ের আসল প্রভাব কতটা?

০৭:৩৯:৩০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

শিশুর হাতে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট কিংবা কম্পিউটার তুলে দিলে তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন ধারণা এখন অনেক অভিভাবকের মধ্যেই গভীরভাবে গেঁথে গেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। শুধু শিশু কতক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে আছে, সেই সময় দিয়ে তার মানসিক স্বাস্থ্য বা মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব নির্ধারণ করা যায় না।

গবেষকদের একাংশের মতে, পর্দার ব্যবহার নিয়ে ভয় পাওয়ার আগে দেখতে হবে শিশু কী দেখছে, কীভাবে দেখছে, একা নাকি অন্যদের সঙ্গে দেখছে এবং এর কারণে ঘুম, শারীরিক কর্মকাণ্ড ও বাস্তব জীবনের সামাজিক যোগাযোগ কতটা কমছে।

পর্দার সময় নিয়ে এত ভয় কেন

শিশুদের অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের সঙ্গে বিষণ্নতা, আচরণগত সমস্যা ও ঘুমের ঘাটতির মতো নানা সমস্যাকে যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি কিছু বিশেষজ্ঞ দাবি করেছেন, দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট ব্যবহার ও কম্পিউটার গেম কিশোরদের মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে।

তবে পর্দা ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে করা বহু গবেষণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মনোবিজ্ঞানী পিট এচেলস শত শত গবেষণা ও বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে মনে করেন, পর্দার সময়কে সরাসরি মানসিক সমস্যার কারণ হিসেবে দেখানোর মতো শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

২০২১ সালে প্রকাশিত একটি বড় পর্যালোচনাতেও একই ধরনের চিত্র উঠে আসে। বিভিন্ন দেশের গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও গেমের ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় তুলনামূলকভাবে সামান্য ভূমিকা রাখে।

গবেষণার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়

পর্দা ব্যবহারের ওপর গবেষণার একটি বড় সমস্যা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই তথ্য নেওয়া হয় শিশু-কিশোরদের নিজেদের দেওয়া হিসাব থেকে। অর্থাৎ তারা নিজেরাই জানান দিনে কতক্ষণ পর্দা ব্যবহার করেছেন এবং সেই সময় তাদের কেমন লেগেছে।

কিন্তু মানুষের নিজের স্মৃতির ওপর নির্ভর করা তথ্য সব সময় নির্ভুল নাও হতে পারে। তার ওপর দুটি বিষয় একসঙ্গে ঘটলেই যে একটির কারণে অন্যটি ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না।

গবেষকরা উদাহরণ হিসেবে বলেন, গরমের সময়ে যেমন আইসক্রিম বিক্রি বাড়ে, তেমনি ত্বকের ক্যানসারের কিছু উপসর্গও বাড়তে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আইসক্রিম ক্যানসারের কারণ। উভয়ের পেছনে তাপমাত্রা বা সূর্যের আলোর মতো তৃতীয় কোনো কারণ থাকতে পারে।

শুধু পর্দার সময় নয়, কী করা হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ

‘পর্দার সময়’ আসলে খুব বিস্তৃত একটি ধারণা। একটি শিশু শিক্ষামূলক কিছু দেখছে, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে বা সৃজনশীল কোনো কাজে যুক্ত আছে—এটি আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্বেগজনক বিষয়বস্তু দেখা বা উদ্দেশ্যহীনভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানো এক নয়।

একইভাবে, একা পর্দা ব্যবহার করা এবং পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে পর্দার মাধ্যমে যোগাযোগ করাও শিশুর ওপর একই প্রভাব ফেলবে না।

গবেষকদের মতে, তাই শুধু দিনে কত ঘণ্টা পর্দা ব্যবহার করা হচ্ছে তা না দেখে সেই সময়ের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং শিশুর সামগ্রিক জীবনযাত্রার দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মস্তিষ্কের পরিবর্তন মানেই কি ক্ষতি

শিশুদের মস্তিষ্কের ওপর পর্দার প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—পর্দা কি মস্তিষ্কের গঠন বা কার্যক্রম বদলে দেয়?

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গবেষকদের একটি গবেষণায় ৯ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ১১ হাজার ৫০০টি মস্তিষ্কের ছবি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। সেখানে পর্দা ব্যবহারের ধরন এবং মস্তিষ্কের বিভিন্ন অঞ্চলের সংযোগের মধ্যে কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেলেও, কয়েক ঘণ্টা পর্দা ব্যবহারকারী শিশুদের মানসিক সুস্থতা বা চিন্তাশক্তির সমস্যার সঙ্গে পর্দার ব্যবহারের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

গবেষকদের যুক্তি হলো, মানুষের মস্তিষ্ক পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। শেখা, খেলা, কথা বলা কিংবা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা—সবকিছুই মস্তিষ্ককে বদলায়। তাই মস্তিষ্কে পরিবর্তন ঘটলেই সেটিকে ক্ষতিকর পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক নয়।What screen time does to a child's brain

তবে ঝুঁকি একেবারেই নেই, এমন নয়

পর্দার ব্যবহারকে পুরোপুরি নির্দোষ বলছেন না গবেষকেরা। অনলাইনে শিশুদের হয়রানি, অপরিচিত ব্যক্তির প্রলোভন, ক্ষতিকর বা যৌন বিষয়বস্তুর সংস্পর্শ এবং অন্যান্য অনলাইন ঝুঁকি বাস্তব সমস্যা।

এ ছাড়া অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের কারণে যদি শিশুর ঘুম কমে যায়, বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো কমে যায় কিংবা শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নষ্ট হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।

মনোবিজ্ঞানী জিন টোয়েঞ্জের মতে, অনলাইনে বেশি সময় কাটানো, একা থাকা, কম ঘুমানো এবং বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কমে যাওয়া—এই সমন্বয়টি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।

অন্যদিকে, শিশুদের ওপর অতিরিক্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও উল্টো সমস্যা তৈরি হতে পারে। কোনো কিছু সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দিলে সেটি শিশুর কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে বলে কিছু গবেষকের আশঙ্কা।

ঘুমের ওপর পর্দার আলো কতটা প্রভাব ফেলে

পর্দা থেকে নির্গত নীল আলো ঘুমের জন্য ক্ষতিকর—এমন ধারণা বেশ প্রচলিত। বলা হয়, এই আলো শরীরে ঘুম-নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে ঘুমাতে অসুবিধা তৈরি করতে পারে।

তবে ২০২৪ সালে ১১টি গবেষণা পর্যালোচনা করে সামগ্রিকভাবে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে ঘুমানোর আগের এক ঘণ্টায় পর্দার আলো দেখলেই ঘুমাতে সমস্যা হবে।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় পর্দা ব্যবহার সব শিশুর জন্য ভালো। বরং শিশুর ঘুমের সময় নষ্ট হচ্ছে কি না এবং পর্দার ব্যবহার তার ঘুমের অভ্যাসকে ব্যাহত করছে কি না—সেদিকে নজর দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অভিভাবকদের অপরাধবোধও বাড়ছে

শিশুদের পর্দা ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে—অভিভাবকদের ওপর সামাজিক চাপ।

শিশু বিশেষজ্ঞ জেনি রাডেস্কির মতে, পর্দা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে এমন এক ধরনের বিচারমূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা অনেক সময় গবেষণা থেকে প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার বদলে অভিভাবকদের অপরাধবোধ বাড়িয়ে দেয়।

বাস্তবে ছোট শিশু পর্দা বন্ধ করতে না চাইলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতেই পারে। একই ধরনের আচরণ সে খেলনা, খেলা কিংবা ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও করতে পারে। তাই শুধু কোনো শিশুর পর্দা বন্ধ করার সময় রাগ বা কান্না দেখালেই তাকে পর্দার আসক্তি কিংবা মস্তিষ্কের ক্ষতির প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়েও মতভেদ

শিশুদের পর্দা ব্যবহারের বিষয়ে বিশ্বজুড়ে একক কোনো নির্দেশনা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের শিশু চিকিৎসা সংস্থা এবং যুক্তরাজ্যের শিশু ও কিশোর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সংগঠন নির্দিষ্ট দৈনিক সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবশ্য এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য পর্দা ব্যবহার না করার এবং চার বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার পরামর্শ দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুর শারীরিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা ও সুস্থ বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

তাহলে অভিভাবকদের করণীয় কী

বর্তমান গবেষণা থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—শিশুর পর্দা ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়। বরং দেখতে হবে সেই ব্যবহার শিশুর ঘুম, খেলাধুলা, পড়াশোনা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে সরিয়ে দিচ্ছে কি না।

পর্দার সময় যদি শিশুর জীবনের অন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডকে দখল করে নেয়, তখন সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। আবার শিক্ষামূলক বিষয়, সৃজনশীল কাজ কিংবা বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে অর্থপূর্ণ যোগাযোগের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারকে একইভাবে নেতিবাচক হিসেবে দেখারও কারণ নেই।

সবচেয়ে বড় কথা, শিশুদের প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। প্রযুক্তি দ্রুত বদলাচ্ছে। স্মার্ট চশমা, নতুন ধরনের সামাজিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারী ইতিমধ্যেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ঢুকে পড়ছে।

তাই শিশুদের শুধু পর্দা থেকে দূরে রাখার বদলে কীভাবে নিরাপদ, ভারসাম্যপূর্ণ ও অর্থবহভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, সেটি শেখানোই সম্ভবত ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর পথ।