সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিপাইনের সশস্ত্র বাহিনীতে কয়েকজন জেনারেল ও নৌবাহিনীর পতাকা কর্মকর্তার অন্তর্বর্তী নিয়োগ অনুমোদনের খবরের পাশাপাশি একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবিতে নবনিযুক্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিলেন রিজার্ভ বাহিনীর এক জেনারেল, যার ইউনিফর্মে অসংখ্য পদক, ব্যাজ ও ফিতা চোখে পড়ার মতোভাবে সাজানো ছিল।
ছবিটি দেখেই প্রশ্ন উঠেছে—একজন রিজার্ভ কর্মকর্তার পোশাকে এত সামরিক সম্মাননা কেন, যখন আরও দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক ক্যারিয়ারের অধিকারী অনেক কর্মকর্তার ইউনিফর্মেও তুলনামূলকভাবে কম পদক দেখা যায়?
এই প্রশ্নকে নিছক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। সামরিক বাহিনীতে পদক কেবল ধাতব প্রতীক নয়। এগুলো দায়িত্ব, সাহস, ত্যাগ এবং কর্তব্য পালনের স্বীকৃতি। তাই কোনো পদক প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ে সামান্য সংশয়ও বাহিনীর ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
পদক পাওয়ার পেছনে থাকে কঠোর প্রক্রিয়া
সামরিক বাহিনীর প্রতিটি পদক ও ব্যাজ নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় দেওয়া হয়। কোনো কর্মকর্তাকে সম্মাননা দেওয়ার আগে তার কৃতিত্ব বা কাজের বিস্তারিত বিবরণ লিখিতভাবে উপস্থাপন করতে হয়। সংশ্লিষ্ট কমান্ডিং কর্মকর্তা সেই বিবরণ যাচাই ও প্রত্যয়ন করেন। এরপর বিভিন্ন স্তরের পুরস্কার ও সম্মাননা বোর্ড সুপারিশটি পর্যালোচনা করে। পদকের ধরন অনুযায়ী শেষ অনুমোদনের ক্ষমতাও নির্ধারিত থাকে।

বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ সাহসিকতার জন্য দেওয়া উচ্চ মর্যাদার পদকের ক্ষেত্রে যাচাই আরও কঠোর হওয়ার কথা। শুধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সুপারিশ যথেষ্ট নয়; ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করা সহকর্মীদের সাক্ষ্য, সংঘর্ষের স্থান ও পরিস্থিতির বিবরণসহ বিভিন্ন প্রমাণ বিবেচনায় নেওয়া হয়।
কারণ একটি যুদ্ধপদক আসলে একজন সামরিক সদস্যের জীবনের কোনো অসাধারণ মুহূর্তকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়। সেই স্বীকৃতির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হলে পদকের মর্যাদাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ব্যাজ আর পদক এক জিনিস নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন। সামরিক ব্যাজের নিয়ম অনেক ক্ষেত্রে পদকের চেয়ে আলাদা। কোনো ইউনিটের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা অথবা প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য পূরণে অবদানের মতো বিষয় বিবেচনায় নির্দিষ্ট ব্যাজ দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
এ কারণে কোনো ব্যক্তির ইউনিফর্মে বিশেষ বাহিনীর ব্যাজ থাকলেই ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে তিনি ওই বাহিনীর পূর্ণ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতেও কিছু ব্যাজ প্রদান করা হতে পারে।
রিজার্ভ বাহিনীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একইভাবে তাদের সামরিক অবদান ও দায়িত্ব বিবেচনায় সম্মাননা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আলোচিত কর্মকর্তার ক্ষেত্রে দেশটির বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন, পরিবহন বিমান সংগ্রহ এবং রিজার্ভ বাহিনীকে শক্তিশালী করার কাজে তার ভূমিকার কথা সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তার ইউনিফর্মে থাকা সব সম্মাননাকে সরাসরি অযোগ্য বা অবৈধ বলে ধরে নেওয়া সঠিক হবে না।
তবু প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ
সমস্যা হলো, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীদের মধ্যে নয়; অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সামরিক সদস্যদের মধ্যেও। এ কারণেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একজন রিজার্ভ কর্মকর্তা কোনো সম্মাননা পেয়েছেন কি না—এটি একা মূল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, যে প্রক্রিয়ায় তিনি সেটি পেয়েছেন, সেই প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, কঠোর ও সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।
সামরিক বাহিনীতে এমন অনেক সদস্য আছেন যারা যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হয়েছেন, জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছেন, কঠিন দায়িত্ব পালন করেছেন, কিন্তু যথাযথ স্বীকৃতি পাননি—এমন অভিযোগ যদি বাহিনীর ভেতরে থাকে, তাহলে একই সময়ে কোনো কর্মকর্তার ইউনিফর্মে বিপুলসংখ্যক পদক ও ব্যাজ দেখা গেলে স্বাভাবিকভাবেই তুলনা তৈরি হবে।
এখানেই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
নিয়ম হালনাগাদ ও প্রয়োগে কঠোরতা দরকার
এই বিতর্ককে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে না দেখে সামরিক বাহিনীর পুরস্কার ব্যবস্থাকে পুনরায় পর্যালোচনার সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ফিলিপাইনের সশস্ত্র বাহিনীর পুরস্কার ও সম্মাননা-সংক্রান্ত নির্দেশিকা সর্বশেষ ২০১৪ সালে হালনাগাদ হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে এসব নিয়ম পর্যালোচনা করা অস্বাভাবিক নয়।
পুরস্কার প্রদানকারী বোর্ডগুলোর সদস্যদের আরও সতর্ক ও নিরপেক্ষ হতে হবে। প্রতিটি সুপারিশের পেছনে কী ধরনের অবদান রয়েছে, তা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত বাহিনী, রিজার্ভ বাহিনী, অবসরপ্রাপ্ত সদস্য—সবার জন্য সম্মাননার মানদণ্ডের প্রতি আস্থা বজায় রাখতে হবে।
কারণ সামরিক পদকের মূল্য তার সংখ্যায় নয়, তার অর্থে।
একজন সৈনিকের বুকের ওপর থাকা একটি পদক হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন একটি দিনের স্মৃতি বহন করে। সেখানে সাহস, দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ কিংবা সহযোদ্ধার জীবন রক্ষার মতো ঘটনা জড়িয়ে থাকতে পারে। তাই পদক যত বেশি বিতরণ করা হবে, তার মর্যাদা তত বেশি সতর্কতার সঙ্গে রক্ষা করা প্রয়োজন।
একইভাবে যারা সত্যিকার অর্থে অসাধারণ দায়িত্ব পালন করেছেন কিন্তু স্বীকৃতি পাননি, তাদের প্রতিও প্রতিষ্ঠানকে ন্যায়বিচার করতে হবে।
সামরিক সম্মাননা কোনো ব্যক্তিগত অলংকার নয়। এটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একজন সদস্যের ত্যাগের প্রতি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। তাই সেটি প্রদানের ক্ষেত্রে সামান্য অস্পষ্টতাও বড় প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে বেশি পদক পরানো হয়েছে কি না—এত সরল নয়। বিষয়টি হলো, সামরিক বাহিনীর পদকব্যবস্থার প্রতি সদস্যদের আস্থা কতটা অটুট আছে।
পদক পাওয়া যদি সত্যিকারের অর্জনের প্রতিফলন হয়, তাহলে তা সম্মানের। কিন্তু সেই সম্মাননা যদি প্রক্রিয়ার কঠোরতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে, তাহলে প্রতিষ্ঠানকেই সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
সামরিক পদক অর্জন করতে হয়। তা কেবল দেওয়া যায় না।
এডগার এ. আরেভালো 


















