মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলোতে গ্রামের সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে ১৯৯০-এর দশকের নাগা-কুকি জাতিগত সংঘাতে বাস্তুচ্যুতি এবং সরকারি প্রকল্পের অর্থ পেতে কথিত ‘ভূতুড়ে গ্রাম’ তৈরির অভিযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজেপির বিধায়ক পাওলিয়েনলাল হাওকিপ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সাইকোটের এই বিধায়ক বলেন, চুরাচাঁদপুর, কাংপোকপি ও অন্যান্য পাহাড়ি জেলায় গ্রামের সংখ্যা বাড়ার পেছনে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের জাতিগত সংঘাতের সময়কার বাস্তুচ্যুতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একই সঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের যোগসাজশে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্পের অর্থ পেতে ‘ভূতুড়ে গ্রাম’ তৈরির অভিযোগও করেন তিনি।
গ্রাম বাড়ার পেছনে বাস্তুচ্যুতি
হাওকিপের বক্তব্য এসেছে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এন বিরেন সিংয়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যের কয়েক দিন পর। নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে বৈঠকের পর বিরেন সিং জানিয়েছিলেন, সরকারি নথিতে মণিপুরে ৯২৬টি অস্বীকৃত গ্রামের অস্তিত্বের তথ্য রয়েছে।
বিধায়ক হাওকিপের দাবি, ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের নাগা-কুকি সংঘাতের সময় পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ব্যাপক স্থানান্তর ঘটে। ওই সংঘাতে এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
সংঘাতের সময় নাগা-অধ্যুষিত এলাকায় বসবাসকারী কুকি জনগোষ্ঠী এবং কুকি-প্রধান এলাকায় থাকা নাগা জনগোষ্ঠীর অনেকে নিজেদের সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকাগুলোতে চলে যান। এর ফলে নতুন বসতি ও গ্রামের সংখ্যা বাড়তে থাকে বলে দাবি করেছেন তিনি।
ছোট ছোট বসতিতে বিভক্তির প্রবণতা
গ্রামের সংখ্যা বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হিসেবে হাওকিপ কুকি সমাজে প্রচলিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রথার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে বড় গ্রামকে ছোট ছোট বসতিতে ভাগ করে দেওয়া হয় এবং উপজাতীয় প্রধানদের ছেলেরা এ ধরনের নতুন বসতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন।
তবে সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে কথিত ‘ভূতুড়ে গ্রাম’ তৈরির অভিযোগটি তিনি আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর দাবি, কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করেছেন।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির হিসাব নিয়েও প্রশ্ন
মণিপুরের কিছু এলাকায় ২০০১ সালের আদমশুমারিতে অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির যে তথ্য উঠে এসেছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন হাওকিপ। বিশেষ করে কিছু উপবিভাগে এক দশকে জনসংখ্যা ১০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ার তথ্যকে তিনি মিয়ানমারের চিন রাজ্য থেকে অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করার বিরোধিতা করেন।
তাঁর দাবি, ওই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে সীমান্তপারের অভিবাসন নয়, বরং ‘জালিয়াতিপূর্ণ আদমশুমারি’ দায়ী। ২০০১ সালের আদমশুমারির প্রাথমিক তথ্যে সেনাপতি জেলার কয়েকটি উপবিভাগে ১০০ শতাংশের বেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
মিয়ানমার থেকে অভিবাসন নিয়ে যুক্তি
হাওকিপ আরও বলেন, মিয়ানমার থেকে ব্যাপক হারে মানুষের মণিপুরে চলে আসার সম্ভাবনা কম। তাঁর যুক্তি, প্রতিবেশী দেশটিতে সামরিক দমন-পীড়নের কারণে অনেকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার আশ্রয় নিয়েছেন এবং পরে বড় সংখ্যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পুনর্বাসিত হয়েছেন।
মণিপুরের সঙ্গে মিয়ানমারের ৩৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। ফলে সীমান্তপারের জনসংখ্যা প্রবাহ ও স্থানীয় জনসংখ্যার হিসাব নিয়ে বিতর্ক রাজ্যটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















