কম্বোডিয়ার বাত্তামবাং শহর শুধু তার শান্ত নদী, গ্রামীণ পরিবেশ আর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্যই পরিচিত নয়; এই অঞ্চলের বুকে ছড়িয়ে আছে বহু শতাব্দীর পুরোনো স্থাপত্য ও ইতিহাসের নানা নিদর্শন। সাঙ্গকে নদীর তীরে অবস্থিত এক ফনম তেমনই এক ঐতিহাসিক বিস্ময়, যেখানে প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে মিশে আছে শান্ত গ্রামীণ জীবনের আবহ।
নদীর পথ পেরিয়ে প্রাচীন মন্দিরে
সাঙ্গকে নদী বাত্তামবাং শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেষ পর্যন্ত টোনলে সাপ হ্রদের দিকে এগিয়ে গেছে। নদীটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অংশ নয়, কম্বোডিয়ার সাংস্কৃতিক স্মৃতিতেও এর বিশেষ স্থান রয়েছে। দেশটির জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী সিন সিসামুথ ও রস সেরেই সোথিয়ার গানে এই নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
শহরের ব্যস্ততা থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য দূরে যেতে চাইলে বিকেলের দিকে নদীর উত্তর তীর ধরে মোটরসাইকেল বা সাইকেলে যাত্রা হতে পারে দারুণ এক অভিজ্ঞতা। পথের দুই পাশে দেখা যায় শান্ত গ্রাম, সবুজ প্রকৃতি আর গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। এভাবেই একসময় পৌঁছানো যায় এক ফনমে।
গাছের আড়াল থেকে উঠে এসেছে বিশাল বুদ্ধমূর্তি
এক ফনমে পৌঁছানোর আগেই দূর থেকে চোখে পড়ে আধুনিক বৌদ্ধ মন্দিরের বিশাল বুদ্ধমূর্তি। গাছের মাথা ছাড়িয়ে উঠে থাকা এই মূর্তি দর্শনার্থীদের জন্য স্থানটির এক আকর্ষণীয় প্রথম পরিচয় তৈরি করে।
মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে শান্ত পরিবেশ। কর্মীরা মাটিতে ঝরে পড়া পাতা পরিষ্কার করেন, পানীয় বিক্রেতারা দর্শনার্থীদের অপেক্ষায় থাকেন আর সন্ন্যাসীরা পরিখার পাশে বসে বই পড়েন। উঁচু চত্বরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাস পুরো পরিবেশে এনে দেয় প্রশান্তির আবহ।
একাদশ শতাব্দীর প্রাচীন স্থাপত্য
বাত্তামবাং শহরের উত্তরে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে এক ফনম এলাকায় অবস্থিত এই মন্দিরটি একাদশ শতাব্দীর নিদর্শন। উৎসবের সময় স্থানীয় মানুষ এখানে বনভোজন ও অবসর কাটাতে আসেন।
প্রাচীন মন্দিরটি একটি উঁচু ল্যাটেরাইট পাথরের ভিত্তির ওপর নির্মিত এবং চারদিকে রয়েছে প্রশস্ত পরিখা। সাঙ্গকে নদীর বাম তীর থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে এর অবস্থান।
সময়ের আঘাতে মন্দিরের অনেক অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও এখনও এর স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। চতুষ্কোণ বেলেপাথরের মূল মন্দির, একটি গ্রন্থাগার ভবন এবং বাইরের প্রাচীর মিলে গড়ে উঠেছে পুরো স্থাপনাটি। পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে রয়েছে প্রবেশদ্বার।
পাথরে খোদাই করা অপূর্ব শিল্প
এক ফনমের অন্যতম আকর্ষণ এর সূক্ষ্ম পাথরখোদাই। মন্দিরের প্রবেশপথের ওপরের অলংকরণে দেখা যায় তিন মাথাবিশিষ্ট হাতির পিঠে ইন্দ্রের মূর্তি। পূর্বদিকের প্রবেশপথেও রয়েছে হাতির ওপর উপবিষ্ট একটি চিত্র, যার বাঁ হাতে ধরা পদ্মের কুঁড়ি।
মন্দিরের ওপরের অংশে বিভিন্ন অলংকারময় নকশা এবং ভেতরের ক্রুশাকৃতির কক্ষের দেয়ালে রয়েছে বিশেষ স্থাপত্যশৈলীর কারুকাজ। প্রায় চার মিটার উঁচু দুই স্তরের বেলেপাথরের ভিত্তির ওপর মূল স্থাপনাটি দাঁড়িয়ে আছে। পুরো চত্বরটি প্রায় ৩২ মিটার চওড়া।
মন্দিরের চারপাশের পরিখাটিও বেশ বিস্তৃত। এর প্রস্থ প্রায় ৩৫ মিটার। পূর্ব ও পশ্চিম দিকে প্রায় ৩০ মিটার প্রশস্ত পথ দিয়ে মন্দির চত্বরে প্রবেশ করা যায়।
প্রাচীন স্মৃতির আরেক নিদর্শন
মন্দিরের পূর্বদিকে রয়েছে নেক তা নামে পরিচিত একটি বেদি। সেখানে দেখা যায় বেলেপাথরের সিংহ এবং বিভিন্ন ভাস্কর্যের ভগ্নাংশ। এর মধ্যে রয়েছে উঁচু নলাকার চুলের অলংকারে সজ্জিত একটি দেবমূর্তির মাথা। মাথার গোড়ায় মুক্তার মালার মতো অলংকারও রয়েছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফরাসি প্রকৃতিবিদ অঁরি মুয়োও এই মন্দিরের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ১৮৫৮ থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে শ্যাম, কম্বোডিয়া ও লাওস ভ্রমণের সময় তিনি এক ফনম পরিদর্শন করেন। তাঁর বিবরণে মন্দিরটির তুলনামূলকভাবে ভালো সংরক্ষিত অবস্থা, সুন্দর গ্যালারি এবং বিশাল আকৃতির মিনারের প্রশংসা পাওয়া যায়।
ইতিহাস ও গ্রামীণ জীবনের অপূর্ব মেলবন্ধন
এক ফনম শুধু একটি প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ নয়। এটি একই সঙ্গে কম্বোডিয়ার প্রাচীন স্থাপত্য, ভাস্কর্যশিল্প ও গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য মিলনস্থল।
প্রাচীন বেলেপাথরের ধ্বংসাবশেষ, সূক্ষ্ম কারুকাজ, শান্ত মন্দির প্রাঙ্গণ এবং সাঙ্গকে নদীর পাশের ধীরগতির গ্রামীণ জীবন—সব মিলিয়ে এখানে ভ্রমণকারীরা ইতিহাসের পাশাপাশি কম্বোডিয়ার অন্য এক জীবনধারার স্বাদ পান।
বাত্তামবাং ভ্রমণের পরিকল্পনায় তাই এক ফনম যুক্ত করা হতে পারে স্মরণীয় একটি সিদ্ধান্ত। ব্যস্ত শহর থেকে দূরে কয়েক ঘণ্টার এই যাত্রা একই সঙ্গে ইতিহাস, স্থাপত্য, প্রকৃতি ও নিস্তব্ধতার এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা এনে দিতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















