অবকাঠামো বললে আমাদের চোখের সামনে সাধারণত সড়ক, বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, পানি, টেলিযোগাযোগ কিংবা এমন সব ব্যবস্থা ভেসে ওঠে, যা মানুষ, পণ্য, তথ্য ও পুঁজির চলাচলকে সহজ করে। একটি অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা এবং বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা অনেকাংশেই এসব ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
কিন্তু অর্থনীতির আলোচনায় এমন আরেক ধরনের অবকাঠামো রয়েছে, যার গুরুত্ব প্রায়ই যথেষ্টভাবে স্বীকৃত হয় না। এটি এমন এক অবকাঠামো, যা শুধু মানুষের চলাচল সহজ করে না; বরং মানুষকে প্রথমে কোনো একটি জায়গায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই তৈরি করে দেয়।
সেটি হলো সংস্কৃতি।
সংস্কৃতি অবশ্যই রাস্তা, হাসপাতাল, বন্দর বা নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতের বিকল্প নয়। একইভাবে প্রতিটি উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ বলা যায় না। কিন্তু কোনো সংস্কৃতি যদি ধারাবাহিকভাবে মানুষের মনোযোগ, ভ্রমণ, ব্যয়, ধারণা এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডকে একটি নির্দিষ্ট স্থানের দিকে টেনে নিতে পারে, তখন তা চাহিদা তৈরির অবকাঠামো হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।
একটি রাস্তা মানুষকে কুমাসিতে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু কুমাসিতে যাওয়ার ইচ্ছা তৈরি করতে পারে সেখানকার ইতিহাস, সংগীত, উৎসব, খাবার কিংবা সাংস্কৃতিক পরিচয়।
এই পার্থক্যটি ঘানার অর্থনৈতিক নীতিতে আরও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। আমরা প্রায়ই পর্যটনের জন্য পর্যাপ্ত হোটেল, বিমানবন্দর, সড়ক, সম্মেলনকেন্দ্র কিংবা আকর্ষণীয় স্থান আছে কি না—এসব নিয়ে আলোচনা করি। এগুলো অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা আর পর্যাপ্ত চাহিদা তৈরি হওয়া এক বিষয় নয়।
একটি বিমানবন্দর কাউকে ঘানায় যাওয়ার সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু ঘানাকেই কেন বেছে নেবেন—সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে সংস্কৃতি।
সংস্কৃতি দুইভাবে রপ্তানি হতে পারে
সংস্কৃতির অর্থনৈতিক শক্তি বোঝার জন্য রপ্তানির প্রচলিত ধারণাটিকে কিছুটা বিস্তৃত করা দরকার। সাধারণত রপ্তানি বলতে আমরা এমন পণ্য বুঝি, যা একটি দেশ থেকে অন্য দেশে যায়। কোকো, সোনা কিংবা উৎপাদিত পণ্য সীমান্ত অতিক্রম করে এবং বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা আসে।
সাংস্কৃতিক বাণিজ্য ভিন্নভাবে কাজ করতে পারে।
একদিকে ঘানার সংগীত বিদেশে শোনা যেতে পারে, চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হতে পারে, কেংটে বা ঘানার নকশা বিদেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে কোনো মানুষ ঘানায় ভ্রমণ করতে পারেন দেশটির ইতিহাস, উৎসব, খাবার, সংগীত, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান কিংবা আফ্রিকান প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে।
এক ক্ষেত্রে সংস্কৃতি ভোক্তার কাছে যাচ্ছে। অন্য ক্ষেত্রে ভোক্তাই সংস্কৃতির কাছে আসছেন। উভয় ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
এই বাজার যে ছোট নয়, তার প্রমাণ আন্তর্জাতিক পরিসরেই পাওয়া যায়। ইউএনসিটিএডির ক্রিয়েটিভ ইকোনমি আউটলুক অনুযায়ী, ২০২২ সালে বৈশ্বিক সৃজনশীল সেবার রপ্তানি প্রায় ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। ২০১৭ সালের তুলনায় এটি ২৯ শতাংশ বেশি। একই বছরে সৃজনশীল পণ্যের রপ্তানি ছিল প্রায় ৭১৩ বিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ সংস্কৃতি যখন মেধাস্বত্ব, প্রযুক্তি, অর্থপ্রদান এবং আন্তর্জাতিক বিতরণব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেটি জাতীয় পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের অংশ হয়ে ওঠে।

মনোযোগই অর্থনৈতিক মূল্য নয়
তবে সংস্কৃতির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে জনপ্রিয়তাকে সরাসরি আয় হিসেবে ধরে নেওয়া।
কোনো উৎসব অনলাইনে লাখ লাখ মানুষ দেখলেই স্থানীয় সম্প্রদায়ের হাতে সেই অনুপাতে অর্থ পৌঁছায় না। কোনো সাংস্কৃতিক প্রতীক আন্তর্জাতিক ফ্যাশনে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তার মেধাস্বত্ব, উৎপাদন, বিপণন বা বিতরণের ওপর যদি সেই সংস্কৃতির উত্তরাধিকারীদের নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তাহলে জনপ্রিয়তার অর্থনৈতিক সুফল অন্যত্র চলে যেতে পারে।
তাই মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—সংস্কৃতি কতটা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, শুধু তা নয়। বরং সেই মনোযোগকে আমরা কতটা বাস্তব লেনদেনে পরিণত করতে পারছি এবং সেই লেনদেনের কতটা মূল্য স্থানীয় অর্থনীতিতে ধরে রাখতে পারছি।
ঘানার পর্যটন খাত এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
ঘানা স্ট্যাটিস্টিক্যাল সার্ভিসের ২০২৫ সালের ইনবাউন্ড ওভারনাইট ভিজিটরস রিপোর্টে, ২০২২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ বিদেশি রাতযাপনকারী পর্যটকের হিসাব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মোট ব্যয় ছিল আনুমানিক ১৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘানা সেডি। গড় অবস্থানের সময় ছিল ১২ রাত। ওই সময়ে পর্যটকদের ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ আবাসন এবং খাদ্য-পানীয় খাতে গিয়েছিল।
এই ব্যয়কে অবশ্যই পুরোপুরি সাংস্কৃতিক পর্যটনের ফল বলা যাবে না। পর্যটকদের একটি অংশ বন্ধু ও আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে, ব্যবসায়িক কাজে কিংবা পেশাগত কারণে ঘানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতাই আসলে একটি বৃহত্তর বিষয়কে স্পষ্ট করে।
পর্যটন একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
কোনো সাংস্কৃতিক আকর্ষণ যদি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায়, তাঁদের অবস্থানের সময় দীর্ঘ করে অথবা তাঁদের ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ায়, তাহলে তার প্রভাব শুধু উৎসব, জাদুঘর, প্রাসাদ বা সাংস্কৃতিক স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা, টেলিযোগাযোগ, কারুশিল্প, অর্থপ্রদান ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সেবা খাতও সেই চাহিদার অংশীদার হয়।
সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, প্রয়োজন পরিমাপ
এখানেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিতর্কটি নতুনভাবে দেখা দরকার।
একটি পক্ষ মনে করে, সরকার যখন রাস্তা, হাসপাতাল কিংবা বিদ্যালয়ের মতো মৌলিক অবকাঠামোর প্রয়োজন মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন উৎসবে অর্থ ব্যয় করা অপচয়। অন্য পক্ষ মনে করে, সংস্কৃতি ও পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যেকোনো সাংস্কৃতিক আয়োজনে সরকারি সহায়তা স্বাভাবিকভাবেই যৌক্তিক।
কোনোটিই যথেষ্ট নয়।
সঠিক প্রশ্ন হলো—ব্যয়ের বিনিময়ে কী পাওয়া গেল?
সরকারি অর্থে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হলে জানতে হবে, তার কারণে কতজন অতিরিক্ত দর্শনার্থী এসেছে, তারা কতদিন অবস্থান করেছে, হোটেলগুলোর অতিরিক্ত দখল কত ছিল, পরিবহন ও খাদ্য খাতে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং কত স্থানীয় ব্যবসা সেই আয়োজনে যুক্ত হয়েছে।
আরও জানতে হবে, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বা আয়োজক সংস্থার সরবরাহ ব্যবস্থায় কতটা অংশ পেয়েছে, কত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, তার কতটা সাময়িক এবং কতটা স্থায়ী, অতিরিক্ত কর রাজস্ব কত এসেছে এবং মোট ব্যয়ের কত অংশ স্থানীয় অর্থনীতির বাইরে চলে গেছে।
এমনকি আন্তর্জাতিক প্রচার থেকেও বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা এসেছে কি না, প্রথমবার আসা দর্শনার্থীরা ভবিষ্যতে আবার ফিরেছেন কি না—এসবও পরিমাপের আওতায় থাকা উচিত।
ওইসিডি সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও ব্যবসায়িক আয়োজনের স্থানীয় প্রভাব মূল্যায়নে কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসার অংশগ্রহণ, পর্যটন, বিনিয়োগ, দক্ষতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি উত্তরাধিকারের মতো বিষয় বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে।
তাই কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন যদি সরকারি ব্যয়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সুনামগত মূল্য তৈরি করে, তাহলে সেটিকে শুধু ‘অনুষ্ঠানের ভর্তুকি’ হিসেবে দেখা অসম্পূর্ণ। এটি পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা, স্থানভিত্তিক ব্র্যান্ডিং এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের ভিত্তি হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি তথ্য দেখায় যে কোনো আয়োজন বাড়তি চাহিদা বা স্থানীয় সুবিধা তৈরি করতে পারেনি, তাহলে সংস্কৃতির আবেগকে ব্যবহার করে সেই ব্যয়কে সমর্থন করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
বাজার অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের আগেই সম্ভাবনা চিনে ফেলে
সংস্কৃতির অর্থনৈতিক বিকাশে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—বাজার এবং প্রতিষ্ঠান সবসময় একই গতিতে চলে না।
কোনো গান একটি পাড়া বা ছোট সম্প্রদায় থেকে উঠে এসে প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে আন্তর্জাতিক শ্রোতার কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তখনও কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান বা প্রচলিত সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষ হয়তো সেটিকে বৈশ্বিক সম্ভাবনা হিসেবে চিহ্নিত করেনি।
ফ্যাশন, খাবার, চলচ্চিত্র এবং প্রযুক্তিতেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।
এ কারণে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সাংস্কৃতিক প্রবণতা তৈরি করা নয়; বরং যখন কোনো স্বাভাবিক বাজারচাহিদা তৈরি হয়, তখন সেটিকে দ্রুত শনাক্ত করা, সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষা করা, মেধাস্বত্ব সুরক্ষিত করা, অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা।
সরকারকে প্রতিটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে—এমন ধারণা বরং সুযোগ নষ্ট করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর সরকারি ভূমিকা হলো একটি স্বতঃস্ফূর্ত সাফল্যকে অপ্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক বাধার কারণে থেমে যেতে না দেওয়া।
বিতরণই জনপ্রিয়তাকে আয়ে পরিণত করে
সংস্কৃতির অর্থনৈতিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি সম্ভবত এখানেই।
মনোযোগ তৈরি করা এক বিষয়। সেই মনোযোগকে অর্থনৈতিক লেনদেনে রূপান্তর করা আরেক বিষয়।
একজন শিল্পীর প্রয়োজন মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, কার্যকর প্ল্যাটফর্ম এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ। একজন কারুশিল্পীর প্রয়োজন অর্থপ্রদান, সরবরাহব্যবস্থা এবং ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর পথ। একটি উৎসবের প্রয়োজন টিকিটিং, পরিবহন, আবাসন ও প্রচারের সমন্বয়।
একজন চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্য আন্তর্জাতিক বিতরণ ও লাইসেন্সিং অপরিহার্য। একজন সংগীতশিল্পীর জন্য প্রয়োজন স্বত্ব ব্যবস্থাপনা ও স্ট্রিমিং অবকাঠামো। আর একটি ঐতিহ্যবাহী পর্যটনকেন্দ্রের জন্য দরকার রাস্তা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত গাইড এবং বুকিংয়ের কার্যকর ব্যবস্থা।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এই অর্থনীতিকে আরও দ্রুত পরিবর্তন করেছে। সৃজনশীল কাজ এখন ভৌগোলিক সীমা ছাড়াই ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু বিতরণব্যবস্থা দুর্বল হলে দৃশ্যমানতা আয় তৈরি করতে পারে না।
সংক্ষেপে, সাংস্কৃতিক পরিচিতি যদি বিতরণের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তাহলে একটি সমাজ খ্যাতি অর্জন করতে পারে—কিন্তু সমৃদ্ধি নাও পেতে পারে।
আকর্ষণের পাশাপাশি মালিকানাও গুরুত্বপূর্ণ
সংস্কৃতির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা স্বীকার করার অর্থ সবকিছুকে পণ্যে পরিণত করা নয়।
কিছু ঐতিহ্য পবিত্র। কিছু স্থান সংরক্ষণের জন্য। আবার কোনো কোনো অনুষ্ঠান অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের ফলে তার প্রকৃত অর্থ হারাতে পারে। তাই সাংস্কৃতিক সম্পদের অর্থনৈতিক ব্যবহার হতে হবে দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার ভিত্তিতে, নিছক বাণিজ্যিক আহরণের ভিত্তিতে নয়।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সংস্কৃতি থেকে তৈরি হওয়া মূল্য শেষ পর্যন্ত কার হাতে যাচ্ছে?
কে আবাসন দিচ্ছে? কে খাবার সরবরাহ করছে? কে পোশাক তৈরি করছে? কে পর্যটন পরিচালনা করছে? ছবি ও ভিডিও থেকে তৈরি হওয়া আয় কে পাচ্ছে? টিকিট বিক্রি কে নিয়ন্ত্রণ করছে? মেধাস্বত্ব কার? দর্শনার্থীদের তথ্য কার হাতে যাচ্ছে?
কোনো সম্প্রদায় যদি সাংস্কৃতিক চাহিদা তৈরি করে, অথচ সেই চাহিদাকে অর্থে রূপান্তর করার ব্যবসা ও অবকাঠামোর মালিকানা তাদের হাতে না থাকে, তাহলে সংস্কৃতি স্থানীয় থাকলেও অর্থনৈতিক মূল্য অন্যত্র চলে যেতে পারে।
তাই লক্ষ্য শুধু মানুষের আগমন বাড়ানো নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সেই অর্থনৈতিক মূল্যশৃঙ্খলের আরও গভীরে যুক্ত করা—উদ্যোক্তা হিসেবে, দক্ষ কর্মী হিসেবে, সরবরাহকারী হিসেবে এবং সম্ভব হলে মালিক হিসেবেও।
ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন ভূমিকা
আধুনিক অর্থনীতিতে ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। তবে সেই ভূমিকার অর্থ হোটেল ব্যবসা পরিচালনা করা কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হয়ে ওঠা নয়।
ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি হলো ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বৈধতা, সামাজিক সংযোগ, স্থানীয় স্মৃতি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে টিকে থাকা সম্পর্ক।
এই শক্তিগুলোকে পুঁজি, উদ্যোক্তা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, পর্যটন এবং প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
হারিয়ে যাওয়ার আগে মৌখিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা সম্ভব। কারুশিল্পীদের বড় বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মান উন্নত করা সম্ভব। স্থানীয় বিনিয়োগের সুযোগ চিহ্নিত করা সম্ভব। একই সঙ্গে ঐতিহ্য থেকে তৈরি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব।
এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় ঐতিহ্যের মৌলিক চরিত্র যেন নষ্ট না হয়।
ঘানার হাতে ইতোমধ্যেই অনেক সম্পদ রয়েছে
ঘানার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সাংস্কৃতিক সম্পদ তৈরির জন্য তাকে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না।
দেশটির রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, শক্তিশালী সাংস্কৃতিক পরিচয়, সংগীত, খাবার, কারুশিল্প, উৎসব, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান এবং আফ্রিকান প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক।
চ্যালেঞ্জ হলো এসব সম্পদকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার কাঠামো তৈরি করা।
এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিমাপ, কার্যকর বিতরণ, সহজ অর্থপ্রদান, মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, স্থানীয় উদ্যোক্তা, পর্যটন অবকাঠামো, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং স্থানীয় মালিকানা।
দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোর অভিজ্ঞতাও দেখায় যে সুযোগটি বাস্তব। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার নয়টি দেশে ২০২৪ সালে ১০টি শিল্প ও সাংস্কৃতিক উৎসব ১১ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করেছে এবং প্রায় ৩ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। প্রতিটি সাংস্কৃতিক আয়োজন একই ফল দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সঠিক বাণিজ্যিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হলে সাংস্কৃতিক আয়োজন অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।
সংস্কৃতিকে অর্থনীতির প্রান্তে রাখা যাবে না
সংস্কৃতিকে অর্থনৈতিক অবকাঠামো হিসেবে ভাবার অর্থ এই নয় যে এর সাংস্কৃতিক বা সামাজিক মূল্যকে বাণিজ্যিক মূল্যের কাছে বিসর্জন দিতে হবে। বরং এর অর্থ হলো, একটি দেশের অর্থনীতিতে সংস্কৃতি যে চাহিদা, আস্থা, পরিচয় ও মানুষের চলাচল তৈরি করতে পারে, তাকে আরও সচেতনভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা।
সড়ক মানুষ ও যানবাহনকে এগিয়ে নেয়। বন্দর পণ্যকে বাজারে পৌঁছে দেয়। টেলিযোগাযোগ তথ্যকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়।
সংস্কৃতি আরও কিছু করতে পারে।
এটি মানুষের মনোযোগ তৈরি করতে পারে। একটি স্থানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে পারে। মানুষের পরিচয় ও আস্থাকে সক্রিয় করতে পারে। পর্যটককে ভ্রমণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সৃজনশীল পণ্যকে সীমান্তের বাইরে পৌঁছে দিতে পারে।
কিন্তু সেই সম্ভাবনা তখনই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে, যখন এর সঙ্গে যুক্ত হবে উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি, মেধাস্বত্ব, অর্থপ্রদান, বিতরণ, পর্যটন এবং স্থানীয় মালিকানা।
তখন সংস্কৃতি আর অর্থনীতির প্রান্তে থাকা বিনোদন বা নস্টালজিয়া নয়।
তখন সংস্কৃতি নিজেই অর্থনৈতিক অবকাঠামোর একটি অংশ।
ড. ম্যাক্সওয়েল অ্যাম্পং 



















