ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একজন শক্তিশালী, দৃঢ়চেতা ও নিয়ন্ত্রিত ভাবমূর্তির নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। বক্তৃতা, আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান কিংবা জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি—সব ক্ষেত্রেই ছিল সুপরিকল্পিত উপস্থাপনা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিচিত ধারা থেকে কিছুটা সরে এসে তরুণ প্রজন্মের ভাষা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ধরন গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে তাঁকে।
৭৫ বছর বয়সী মোদি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক ভঙ্গিতে কথা বলছেন। তাঁর সাম্প্রতিক প্রকাশনায় দেখা যাচ্ছে স্বাভাবিক মুহূর্তের ভিডিও, নিজের হাতে ধারণ করা ভিডিও এবং তরুণদের উদ্দেশে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্বোধন।
ভারতের তরুণদের কাছে পৌঁছানোর নতুন কৌশল
ইনস্টাগ্রামে মোদির অনুসারীর সংখ্যা ১০ কোটি ৬০ লাখের বেশি। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এই প্ল্যাটফর্মে তিনি সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করা ব্যক্তিদের একজন। এত বড় অনুসারী গোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও তাঁর দল এতদিন মূলত প্রচলিত রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেছে।
কিন্তু এ বছর ভারতের তরুণদের আন্দোলন রাজনৈতিক যোগাযোগের সেই পুরোনো কৌশলকে নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ব্যঙ্গাত্মকভাবে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামের আন্দোলনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গচিত্র, সরাসরি সম্প্রচার ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওর মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে অনলাইনভিত্তিক এই আন্দোলন এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে কেন্দ্রীয় একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ পর্যন্ত ঘটে।
তরুণদের রাজনৈতিক আচরণ বদলেছে
ভারতের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মটি ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেশের অন্যতম বড় ভোটারগোষ্ঠী হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই প্রজন্মকে কাছে পেতে হলে শুধু প্রচলিত রাজনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত, স্বতঃস্ফূর্ত ও তুলনামূলকভাবে অনিয়ন্ত্রিত উপস্থাপনাই তরুণদের বেশি আকৃষ্ট করতে পারে।
মোদির নতুন ধরনের ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর প্রথম দিকের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওতে তরুণদের উদ্দেশে ‘বন্ধুরা’ বলার আগে দীর্ঘ বিরতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ব্যঙ্গ শুরু হয়। অনেকে সেই মুহূর্তটি সম্পাদনা করে নানা রসিকতা ও ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও তৈরি করেন।
ভিডিওর আলো, ক্যামেরার অবস্থান এবং উপস্থাপনার ধরন নিয়েও তরুণদের মধ্যে ঠাট্টা শুরু হয়।
দলের প্রচারেও বদল
শুধু মোদির ব্যক্তিগত হিসাব নয়, ভারতীয় জনতা পার্টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তরুণদের কাছে পৌঁছাতে দলটি এখন ব্যঙ্গচিত্র, তরুণদের কথ্য ভাষা এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা উপাদান ব্যবহার করছে।
আন্দোলন শেষ হওয়ার পর দলটির একটি ভিডিওতে শরীরচর্চার পরিবেশ দেখিয়ে তরুণদের আন্দোলন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু মন্তব্যকারীদের একটি অংশ ভিডিওটিকে অস্বস্তিকর ও কৃত্রিম বলে ব্যঙ্গ করে।
আরেকটি ভিডিওতে জনপ্রিয় পুরোনো ধারাবাহিকের গান ব্যবহার করে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী মোদি তরুণদের পাশে আছেন। কিন্তু তরুণদের অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে না দেখে নিছক হাস্যরসের উপাদান হিসেবে নিয়েছেন।
তরুণদের মন জয় করা এত সহজ নয়
২২ বছর বয়সী গিন্নি মালিয়ার মতো তরুণদের মতে, তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা কেন করা হচ্ছে, তা বোঝা গেলেও প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তন এখন কেন?
তাঁর মতে, নতুন ভিডিওগুলোতে তরুণদের ভাষা ও উপস্থাপনার ধরন নেওয়া হলেও যেসব বিষয় নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, সেগুলোর সমাধান নিয়ে পর্যাপ্ত কথা বলা হচ্ছে না।
এ কারণেই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের মতো করে কথা বললেই তাঁদের আস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন নিয়ম
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জয়োজিৎ পাল মনে করেন, ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘদিন ধরে সমর্থকদের বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের বার্তা ছড়িয়ে এসেছে। কিন্তু ইনস্টাগ্রামের ক্ষেত্রে সেই কৌশল একইভাবে কাজ করে না।
এই প্ল্যাটফর্মে কোন বিষয় বেশি ছড়াবে, তা নির্ধারণে অনুসারীর সংখ্যা একমাত্র বিষয় নয়। ভিডিও কতক্ষণ দেখা হচ্ছে, কতবার দেখা হচ্ছে, কতজন ভাগ করে নিচ্ছে এবং কত মন্তব্য হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে কয়েকশ অনুসারী থাকা কোনো হিসাব থেকেও লাখ লাখ মানুষ একটি ভিডিও দেখতে পারে। আবার বিপুল অনুসারী থাকা ব্যক্তির কোনো ভিডিও খুব কম মানুষের কাছেও পৌঁছাতে পারে।
এখানেই পুরোনো রাজনৈতিক প্রচারব্যবস্থার সঙ্গে নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পার্থক্য।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বার্তা
মোদির একটি ভিডিও এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ভিডিওটি ৪০ কোটির বেশি বার দেখা হলেও এর একটি বড় অংশ তরুণরা নিজেদের মতো করে সম্পাদনা করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থাৎ মোদির দল যে বার্তা দিতে চেয়েছিল, দর্শকের কাছে সেটি সবসময় সেই অর্থে পৌঁছায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন একটি জায়গা যেখানে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশের পর সেটি কীভাবে ব্যবহার হবে, তা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামে ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের সংস্কৃতি অত্যন্ত শক্তিশালী।
তবে নির্বাচনে এর প্রভাব কতটা?
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের মন জয় করা এবং নির্বাচনে জয়ী হওয়া—দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক হবে না।
ভারতীয় জনতা পার্টির সাংগঠনিক শক্তি, দীর্ঘদিনের সমর্থকগোষ্ঠী এবং নির্বাচনী কাঠামো এখনো তাদের রাজনৈতিক সাফল্যের বড় ভিত্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের একটি অংশ দলটির সমালোচনা করলেও তা সরাসরি নির্বাচনী পরাজয়ের অর্থ বহন করে না।
তবু নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে হবে
ভারতীয় জনতা পার্টি অবশ্য নতুন রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরন গ্রহণে অপরিচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই দলটি সক্রিয় ছিল। পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনামূলক অনুষ্ঠান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের মতো নতুন মাধ্যমও ব্যবহার করেছে।
তাই বিশ্লেষকদের ধারণা, সময়ের সঙ্গে দলটি ইনস্টাগ্রাম ও তরুণ প্রজন্মের নতুন যোগাযোগের নিয়মও আয়ত্ত করতে পারে।
তবে এখন যে সমস্যাটি সামনে এসেছে, তা হলো—শুধু তরুণদের ভাষা নকল করলেই তরুণদের মন জয় করা যায় না। তাঁদের অভিযোগ, উদ্বেগ ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবভাবে যুক্ত হতে হবে।
কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজর কাড়া এক বিষয়, আর সেই নজরকে রাজনৈতিক আস্থায় পরিণত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















