বাগেরহাটের বিষখালী নদীর দুই তীরে একসময় মৌসুমি চাষাবাদসহ নানা কাজে ব্যবহৃত চরগুলো এখন ধীরে ধীরে সবুজ হয়ে উঠছে। বন বিভাগের উদ্যোগে নদীর প্রায় ৫০ কিলোমিটার তীরজুড়ে রোপণ করা হয়েছে ৫০ হাজার চারা। বর্ষার বৃষ্টিতে চারাগুলো দ্রুত বেড়ে ওঠায় বদলে যাচ্ছে নদীপাড়ের দৃশ্যপট।
বিষখালী নদীর মোরেলগঞ্জ ও কচুয়া উপজেলার অংশে এই বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। নদীর দুই তীরের চরে সারিবদ্ধভাবে প্রায় দুই ফুট দূরত্বে চারা লাগানো হয়েছে। প্রতিটি চারার সঙ্গে দেওয়া হয়েছে খুঁটি। ইতোমধ্যে অনেক চারায় নতুন পাতা গজিয়েছে। নিম, শিসু, মেহগনি, বাবলা, জাম, কদবেল, আমলকী, হরিতকী, জামরুল, তেঁতুল, পেয়ারা, জলপাই, অর্জুন, ঝাউ ও আকাশমণিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে এই বনায়নে।
সবুজে বদলে যাচ্ছে নদীপাড়
বিষখালীর চরজুড়ে গাছের সারি এখন নদীপথে চলাচলকারী ও নদীর তীর ধরে যাতায়াতকারীদের জন্যও নতুন দৃশ্য তৈরি করেছে। তবে এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা বা নদীর তীর সবুজ করা নয়। সামাজিক বনায়ন বিধিমালা ২০২৬ অনুযায়ী, এসব গাছ ১০ বছর পর বিক্রি করা হবে। বিক্রির অর্থ নির্দিষ্ট অংশীদারদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, গাছ বিক্রির অর্থের ৫৫ শতাংশ পাবেন স্থানীয় উপকারভোগীরা। জমির মালিক পাবেন ২০ শতাংশ, ইউনিয়ন পরিষদ ৫ শতাংশ, বৃক্ষ পালন তহবিল ১০ শতাংশ এবং বন বিভাগ ১০ শতাংশ।
ফলে নদীর চরসংলগ্ন জমির মালিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকের কাছে এই বনায়ন ভবিষ্যতের সম্ভাব্য আয়ের উৎস হিসেবেও দেখা দিচ্ছে।
আয়ের আশার পাশাপাশি আছে অনিশ্চয়তা
মোরেলগঞ্জের কাঠিপাড়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নির্মল চন্দ্র দাসের বিষখালী নদীর তীরবর্তী দুটি জমি রয়েছে। তাঁর তিন ভাইয়েরও সেখানে জমি আছে। তিনি জানান, বন বিভাগ চরে চারা রোপণ করেছে এবং গাছগুলো রক্ষায় তারাও সহযোগিতা করছেন। বন বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি নেওয়া হয়েছে এবং গাছ বিক্রির পর তারা অংশ পাবেন বলে জানানো হয়েছে।
তবে গাছ কবে বিক্রি হবে এবং সেখান থেকে তিনি ঠিক কত টাকা পাবেন, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত নন তিনি।
স্থানীয়দের ব্যবহারেও পরিবর্তন
বৃক্ষরোপণের ফলে স্থানীয় কিছু মানুষের প্রচলিত কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কাঠিপাড়ার বাসিন্দা পরিমল পাল জানান, তাদের পরিবার দীর্ঘদিন বাড়ির সামনের চর ব্যবহার করে মাটির হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি ও শুকানোর কাজ করত। গাছ লাগানোর পর সেই কাজে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
তবে ভবিষ্যতে গাছ বিক্রির অর্থের অংশ উপকারভোগী হিসেবে পাওয়ার আশা করছেন তিনি। অন্য কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাও জানান, নতুন জেগে ওঠা চরে তারা মৌসুমি সবজি চাষ করতেন এবং রাস্তার পাশের খালি জায়গা নানা কাজে ব্যবহার করতেন। বৃক্ষরোপণের পর এসব জায়গা আর আগের মতো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তাদের মূল উদ্বেগ হলো, গাছ বিক্রির সময় এবং প্রতিশ্রুত অর্থের অংশ পাওয়ার বিষয়টি কতটা নিশ্চিত হবে।
জেলাজুড়ে সামাজিক বনায়ন
বিষখালী নদীর এই উদ্যোগ বাগেরহাটের বৃহত্তর সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির অংশ। সামাজিক বনায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাগেরহাটজুড়ে ৩২৬ কিলোমিটার এলাকায় ৩ লাখ ২৬ হাজার চারা রোপণ করেছে বন বিভাগ।
এ ছাড়া রামপালে ৩০ হেক্টর, মোরেলগঞ্জে ২০ হেক্টর ও শরণখোলায় ১০ হেক্টর—মোট ৬০ হেক্টর এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন গড়ে তোলা হয়েছে। রামপালে পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় গোলপাতাও লাগানো হয়েছে। নদীর চর, সড়কের পাশ ও অন্যান্য উপযুক্ত সরকারি জায়গাকে এসব কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে।
বাগেরহাটে গত ১২ বছরে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৫ কোটি টাকার গাছ বিক্রি হয়েছে। এ অর্থ থেকে প্রায় ২ হাজার উপকারভোগী তাদের অংশ পেয়েছেন।
বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. শাহীন কবীর জানান, নদী ও খালের চর, সড়কের পাশসহ উপযুক্ত বিভিন্ন স্থানে প্রতি বছর চারা রোপণ করা হয়। তাঁর মতে, এটি পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
চলতি বছর বিষখালী নদীতে রোপণ করা ৫০ হাজার চারার মধ্যে মোরেলগঞ্জ অংশে ৩০ হাজার এবং কচুয়া অংশে ২০ হাজার চারা রয়েছে। নতুন চারার পাশাপাশি আগের বছরগুলোর গাছও নিয়মিত পরিচর্যা করা হচ্ছে।
সঠিকভাবে পরিচর্যা করা গেলে আগামী এক দশকে বিষখালীর খালি চরগুলো বদলে একটি স্থায়ী সবুজ বেষ্টনী গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জন্য তৈরি হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি আয়ের একটি উৎস।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















