যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন দেশটির সামরিক বাহিনীভিত্তিক সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত সংবাদমাধ্যম ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর প্রধান সম্পাদক এরিক স্লাভিন ও প্রকাশক ম্যাক্স লেডেরারকে বরখাস্ত করেছে। একই দিনে প্রতিষ্ঠানটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদদাতা লারা কোর্টেকেও চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই সামরিক সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিয়ে পেন্টাগনের হস্তক্ষেপের আশঙ্কার মধ্যেই সর্বশেষ এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
দীর্ঘদিনের স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রশ্ন
‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ মূলত মার্কিন সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের জন্য সংবাদ প্রকাশ করে। কয়েক দশক ধরে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, সেনাসদস্যদের সমস্যা এবং সামরিক পরিবারের নানা সংকট নিয়ে স্বাধীনভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সামরিক সম্প্রদায়ের ওপর এর প্রভাব নিয়েও সংবাদ প্রকাশ করছিল সংবাদমাধ্যমটি। চাকরিচ্যুতির প্রায় ১০ দিন আগে এর সাংবাদিকেরা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীর নাবিকদের নানা সংকট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। যুদ্ধের কারণে ওই জাহাজটির মোতায়েনের মেয়াদ বাড়িয়ে নয় মাস করা হয়েছিল।
বরখাস্তের কারণ নিয়ে বিতর্ক
পেন্টাগনের পক্ষ থেকে শুক্রবার বরখাস্তের নোটিশ পাঠানো হয় স্লাভিন ও লেডেরারকে। লেডেরার চলতি সপ্তাহের শুরুতেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পেন্টাগন নেতৃত্বের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমটির ভবিষ্যৎ পরিচালনা ও সম্পাদকীয় দিকনির্দেশনা নিয়ে মতপার্থক্যের মধ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
স্লাভিন জানান, তার বরখাস্তের নোটিশে ‘অবাধ্যতা’ এবং অনুমোদন ছাড়া গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। জুলাইয়ে সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ও কোর্টে ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর সম্পাদকীয় কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে কথা বলেছিলেন।
স্লাভিন বলেন, সাক্ষাৎকারে সেনাসদস্যদের জন্য প্রকাশিত সংবাদে সেন্সরশিপকে ‘লালসীমা’ হিসেবে উল্লেখ করাই তার বরখাস্তের অন্যতম কারণ। তার বক্তব্য, আইন ও পেন্টাগনের নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় থাকা প্রয়োজন।
নীতিমালায় পরিবর্তন
দশকের পর দশক ধরে ফেডারেল বিধি ও পেন্টাগনের নীতিতে ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর সম্পাদকীয় স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেখানে পাঠকদের কাছে কোনো ধরনের সংবাদ ব্যবস্থাপনা বা সেন্সরশিপ ছাড়াই তথ্য ও সংবাদ পৌঁছানোর কথা বলা ছিল।
তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে পেন্টাগন সেই বিধান প্রত্যাহার করে। পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, সংবাদমাধ্যমটির বিষয়বস্তুকে ‘অপ্রাসঙ্গিক ওক’ ইস্যু থেকে সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। মার্চে পেন্টাগন একটি স্মারকলিপি জারি করে, যাতে সংবাদমাধ্যমটিকে কার্টুন প্রকাশ এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন পুনর্মুদ্রণ থেকে বিরত রাখা হয়।
![]()
ওয়াচডগও চাকরিচ্যুত
এপ্রিল মাসে ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর অভ্যন্তরীণ সম্পাদকীয় তদারক কর্মকর্তা জ্যাকুলিন স্মিথকেও বরখাস্ত করে পেন্টাগন। সম্পাদকীয় কাজে হস্তক্ষেপের সমালোচনা করার পর তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে কংগ্রেস এই পদ সৃষ্টি করেছিল এবং কর্মকর্তা হিসেবে স্মিথের দায়িত্ব ছিল সরাসরি আইনপ্রণেতাদের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া ও সংবাদমাধ্যমটির স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করা। স্মিথ এ ঘটনায় পেন্টাগনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
স্লাভিনের অবস্থান
জুলাইয়ে সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্লাভিনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ধারাবাহিকভাবে হুমকির মুখে পড়লে তিনি কোন অবস্থানকে নিজের ‘শেষ লড়াই’ হিসেবে দেখবেন।
জবাবে তিনি বলেন, সেনাসদস্যদের জন্য স্বাধীন সংবাদ সরবরাহ করতে পারা জরুরি। সেটি সম্ভব না হলে সংবাদমাধ্যমটি স্বাধীন সাংবাদিকতার জায়গা থেকে সরে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।
পেন্টাগনের নতুন প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন উইলিয়াম আরবান শুক্রবার এক চিঠিতে বলেন, ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এ সর্বোচ্চ মানের সম্পাদকীয় স্বাধীন সংবাদ নিশ্চিত করাই তার অগ্রাধিকার। তবে সর্বশেষ বরখাস্তের বিষয়ে প্রতিরক্ষা দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















