কলেজের প্রথম বর্ষের সেই বসন্তের কথা আমার মনে আছে। ওয়েলস কলেজের মেইন ভবনের একটি ঘরে থাকতাম। জানালার নিচের ছোট্ট জায়গাটিতে বাবার দেওয়া সিয়ার্সের বৈদ্যুতিক টাইপরাইটারটি বসিয়েছিলাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে বসে লিখতাম। জানালার বাইরে স্লেটের ছাদে কবুতর আসত-যেত। টাইপরাইটারটি মোটেও শান্ত ছিল না। চালু করলেই তার কম্পনে টেবিল কেঁপে উঠত, আর করিডোরের অন্য প্রান্তে থাকা মেয়েরাও আমার টাইপ করার শব্দ শুনতে পেত।
আমি তখন কী লিখছি, তা জানতাম না। শুধু মনে হতো, শব্দগুলো এত দ্রুত আমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে যে সেগুলো ধরার মতো সময়ও পাচ্ছি না। বন্ধুরা সম্ভবত আমাকে কিছুটা অদ্ভুতই ভাবত। শেষ পর্যন্ত তারাই বলল, এত কিছু লিখছ যখন, সৃজনশীল লেখার কোনো কোর্সে ভর্তি হও না কেন? তারা বলেছিল, প্রফেসর কে. অসাধারণ।
সেই বসন্তেই আমি তাঁকে দেখার জন্য একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। পরের শরতে তাঁর সৃজনশীল লেখার ক্লাসে ভর্তি হওয়ার আগে মানুষটিকে নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলাম।
প্রথম দেখায় তাঁকে আমার মনে হয়েছিল এক অদ্ভুত শক্তির মানুষ। তিনি দরজা দিয়ে ঢুকেছিলেন ভারী শীতের পোশাক পরে। তাঁর চেহারায় ছিল অগোছালো চুল, পরনে পুরোনো কালো গলার পোশাক, গাঢ় জিনস ও কাজের বুট। তিনি মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন এবং খুব অল্প কথা বললেন। তাঁর কথার ভঙ্গি ছিল তীক্ষ্ণ, দ্রুত ও দৃঢ়। মনে হচ্ছিল, সময় নষ্ট করার কোনো ইচ্ছাই তাঁর নেই।
তিনি বেশিক্ষণ থাকলেনও না। কথা শেষ করে যেভাবে এসেছিলেন, প্রায় সেভাবেই চলে গেলেন।
তবু তিনি আমার মনে থেকে গেলেন।
পরের শরতে তাঁর সৃজনশীল লেখার ক্লাসে যোগ দিলাম। আমাদের ক্লাসে শিক্ষার্থী ছিল মাত্র পাঁচজন। আমরা বসার জায়গা বেছে নিয়েছিলাম। তিনি এসে আমার পাশের চেয়ারটিতে বসলেন। তাঁর উপস্থিতিতে আমি প্রায় নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না।
কিন্তু তখনও আমি তাঁকে নিয়ে কোনো রোমান্টিক কল্পনায় ভাসিনি। বরং মনে হয়েছিল, তাঁর সামনে আমি সম্পূর্ণ জেগে উঠেছি। তিনি এমন একজন মানুষ, যার মতো কাউকে আগে কখনো দেখিনি।
সেই ক্লাসে আমার জীবনে সত্যিই কিছু বদলে গেল।
এতদিন আমি লিখতাম, কিন্তু আমার লেখাগুলো কাউকে দেখাতাম না। নিজের ভেতরে কী আছে, সেটিও জানতাম না। বরং ভয় করত—হয়তো সেখানে কিছুই নেই। এবার প্রথমবার নিজের কবিতা অন্যদের সামনে পড়তে শুরু করলাম। আর তখন যেন ভেতরে জমে থাকা সবকিছু একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে লাগল।
আমি বুঝলাম, আমি কবিতা লিখি।
শুধু কবিতা নয়—তালিকা, চিঠি, ক্লাসের লেখা—সবকিছুই আমার হাতে অন্য রূপ নিতে শুরু করল। টাইপরাইটারটি যেন আমার নিজের অজানা কণ্ঠকে কাগজে তুলে আনার একটি দরজা হয়ে উঠেছিল।
রাতের নীরবতায় লেখার তাগিদ সবচেয়ে বেশি অনুভব করতাম। কখনো ঘুম ভেঙে যেত, মনে হতো এখনই লিখতে হবে। টাইপরাইটারের সামনে বসে কাগজে শব্দ নামাতাম। সেই সময়টি ছিল উত্তেজনা, আবিষ্কার ও আনন্দে ভরা। মনে হতো, আমি ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের কোনো বন্ধ দরজা খুলে ফেলছি।
প্রফেসর কে. আমার লেখা খুব মন দিয়ে পড়তেন। তাঁর মন্তব্য ছিল প্রশংসায় ভরা। সেটি আমার কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য মনে হতো। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমি এমন ধারণা নিয়ে বড় হয়েছিলাম যে শব্দ বা অন্য কোনো বিষয়ে আমার বিশেষ প্রতিভা নেই।
তাঁর কাছ থেকে পাওয়া স্বীকৃতি তাই আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
আমি বুঝতে শুরু করলাম, আমার লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ অন্য শিক্ষার্থীদের লেখার প্রতি তাঁর প্রতিক্রিয়ার চেয়ে আলাদা। তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগল—আমার কণ্ঠ কি সত্যিই অন্য কেউ শুনতে পাচ্ছে? হয়তো একজন মানুষকে দরকার হয়, যে নিজের কণ্ঠের বাইরে থেকেও সেটিকে চিনতে পারে।
প্রফেসর কে. যেন সেই মানুষটি হয়ে উঠেছিলেন।
সেই একই সময়ে আমি আরেকটি ইংরেজি সাহিত্য ক্লাসে পড়তাম। অধ্যাপক বি.-র ক্লাসে আলোচনার কেন্দ্র ছিল নারী-পুরুষের সম্পর্ক, আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতা। ডি. এইচ. লরেন্সের লেখা নিয়ে তিনি বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। সেখানে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসত—দুজন স্বতন্ত্র মানুষের মধ্যে সম্পর্ক কি সত্যিই ভারসাম্যের ওপর দাঁড়াতে পারে?
সেই প্রশ্ন তখন আমার কাছে ছিল সাহিত্যের প্রশ্ন।
পরে বুঝেছি, সেটি আমার নিজের জীবন সম্পর্কেও একটি প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল।
জর্জ এলিয়টের ‘অ্যাডাম বেড’ নিয়ে আমাকে একটি উপস্থাপনা দিতে হয়েছিল। উপন্যাসটি পড়ে আমি দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। চরিত্রগুলো নিয়ে ভেবেছিলাম, নোট নিয়েছিলাম, আলোচনার প্রশ্ন তৈরি করেছিলাম।
কিন্তু আমার অধ্যাপকের পাঠের সঙ্গে আমার মত মিলছিল না।
তিনি যে সম্পর্ক ও চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দিতেন, আমি তার চেয়ে অন্য ধরনের নারী চরিত্রের প্রতি আকৃষ্ট ছিলাম—যে স্থির, দায়িত্বশীল এবং অন্য মানুষের কল্যাণের কথা ভাবে। আমি তখন নিজেকেও তেমন একজন নারী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম।
মনে হয়েছিল, জীবনে বুঝি দুটি পথ—একটি আবেগ ও বেপরোয়া আকাঙ্ক্ষার, অন্যটি সংযম ও দায়িত্বের। আমি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিতে চেয়েছিলাম।
উপস্থাপনার দিন আমি প্রস্তুত হয়ে ক্লাসে গেলাম। কিন্তু অর্ধেক শিক্ষার্থী এল না। যারা এসেছিল, তারাও বইটি পুরো পড়েনি। অধ্যাপক বিরক্ত হলেন এবং ক্লাস বাতিল করে দিলেন। আমাকে পরের সপ্তাহে উপস্থাপনা দিতে বলা হলো।
আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম।
এতদিন ধরে যে পরিশ্রম করেছি, তার যেন কোনো মূল্যই রইল না। সহপাঠীদের ওপর রাগ হচ্ছিল। অধ্যাপকের ওপরও। মনে হচ্ছিল, কেউই বুঝতে পারছে না আমি এই কাজটির জন্য কতটা শ্রম দিয়েছি।
আমি যখন ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে হাঁটছিলাম, প্রফেসর কে. তাঁর অফিস থেকে আমাকে দেখতে পেলেন।
তিনি বললেন, “এখানে এসো।”
আমি থামিনি।
তিনি আবার ডাকলেন।
এবার আমি তাঁর অফিসে ঢুকলাম।
সেখানে তাঁর স্ত্রীর একটি সাদা-কালো ছবি দেয়ালে ঝুলছিল। জানালা দিয়ে আলো এসে ঘরটিকে ভরে রেখেছিল। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার হাত দিতে।
আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম।
তিনি আমার হাত ধরলেন। তাঁর হাতের চাপ ছিল শক্ত। এতটাই শক্ত যে আমার ব্যথা হচ্ছিল। তিনি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এবং আমাকেও তাঁর দিকে তাকাতে বাধ্য করছিলেন।
সেই মুহূর্তটি যেন হঠাৎ তৈরি হয়নি।
পেছনে তাকালে আমি বুঝতে পারি, তার আগে অনেক কিছু ঘটে গিয়েছিল। আমার লেখার প্রতি তাঁর তীব্র আগ্রহ, তাঁর প্রশংসা, তাঁর মনোযোগ—সবকিছু মিলে আমার মধ্যে তাঁর প্রতি এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়েছিল।
তবু সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি থেকে যায়—আমি কি সত্যিই সম্মতি দিয়েছিলাম?
আমি জানি, চাইলে হাত সরিয়ে নিতে পারতাম। চাইলে তাঁর ডাকে সাড়া না দিয়ে করিডোর ধরে চলে যেতে পারতাম। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে কলেজের বাইরে চলে যেতে পারতাম।
আমি তা করিনি।
আমি থেমেছিলাম।
কিন্তু মানুষের সিদ্ধান্ত কি কেবল সেই একটি মুহূর্তেই তৈরি হয়?
আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, হয়তো না। আমাদের সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে বহু বছরের অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অন্যের স্বীকৃতির প্রয়োজন, কর্তৃত্বের প্রতি আমাদের ধারণা এবং নিজের ইচ্ছাকে চেনার ক্ষমতা।
তখন আমি একজন তরুণ শিক্ষার্থী। তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক। তিনি আমার লেখার মূল্য বুঝেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন আমি নিজেই নিজের প্রতিভা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলাম না। এই সম্পর্কের মধ্যে যে অসমতা ছিল, তখন তার পূর্ণ অর্থ আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না।
তাই আজও আমি সেই মুহূর্তের দিকে ফিরে তাকিয়ে সহজ কোনো উত্তর দিতে পারি না।
আমি শুধু ভাবি—যদি সেদিন তাঁর ডাকে সাড়া না দিতাম? যদি করিডোর ধরে হাঁটতেই থাকতাম? যদি সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাইরে গিয়ে শরতের বাতাসে দাঁড়াতাম? যদি তাঁর বাড়ানো হাতটি গ্রহণ না করতাম?
আমি জানি না।
সেই অনিশ্চয়তাই হয়তো স্মৃতিটির সবচেয়ে সত্য অংশ।
কারণ বহু বছর পর আমরা অতীতকে বিচার করতে পারি, কিন্তু তখনকার মানুষটিকে আজকের জ্ঞান দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারি না। যে সিদ্ধান্ত তখন স্বাভাবিক মনে হয়েছিল, পরে সেটিই অন্য আলোয় দেখা দিতে পারে।
সেই সাহিত্য ক্লাসে আমরা জানতে চেয়েছিলাম—দুজন পৃথক মানুষ কি সত্যিই সমান ভারসাম্যে থাকতে পারে, নাকি কোনো এক পর্যায়ে একজন অন্যজনের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে?
আমি তখন প্রশ্নটির উত্তর দিইনি।
আমি শুধু আমার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।
আজও মনে আছে, তাঁর হাতের চাপ আমার হাতের চেয়ে অনেক বেশি শক্ত ছিল।
আর সেই শক্তির ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে ছিল সেই প্রশ্ন, যার উত্তর খুঁজতে আমার এত বছর লেগেছে—কখন একটি সম্মতি সত্যিই নিজের হয়, আর কখন তা আমাদের আগের সব অভিজ্ঞতা, আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার সম্পর্কের দ্বারা গড়ে ওঠে?
মার্সিয়া অলড্রিচ 


















