একসময় বিবাহবিচ্ছেদ মানেই ছিল কষ্ট, সামাজিক চাপ আর লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার চেষ্টা। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন অনেকেই বিবাহবিচ্ছেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ্যে তুলে ধরে শুধু সহমর্মিতা ও সমর্থনই পাচ্ছেন না, বরং সেখান থেকে তৈরি করছেন আয়ের নতুন পথ।
বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে খোলামেলা কথা বলা, নিজের নতুন জীবনযাত্রা দেখানো, একাকী ভ্রমণ, নতুন সম্পর্ক, আত্মযত্ন কিংবা বিচ্ছেদের পর নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার গল্প—এসব নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তৈরি হয়েছে নতুন এক প্রবণতা। এর কেন্দ্রেই রয়েছেন ‘ডিভোর্স ইনফ্লুয়েন্সার’ বা বিবাহবিচ্ছেদকে ঘিরে জনপ্রিয়তা পাওয়া নির্মাতারা।
হৃদয় ভাঙার গল্প থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন পরিচয়
অস্ট্রেলিয়ার বিষয়বস্তু নির্মাতা মেগান ম্যাকট্যাভিশের মতো অনেকেই এখন বিবাহবিচ্ছেদের পরের জীবনকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ করে তুলেছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যমে নিজের একা ভ্রমণ, একা রেস্তোরাঁয় খাওয়া, আত্মযত্ন এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করার গল্প তুলে ধরেন।
অন্যদিকে গ্যাব্রিয়েল স্টোনের গল্পটি আরও উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে বিবাহবিচ্ছেদ ও পরবর্তী মানসিক ধাক্কার পর তিনি সামাজিক মাধ্যম থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে একটি বিদায়ী বার্তা প্রকাশ করার পর বিপুলসংখ্যক মানুষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অনেকে নিজেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার গল্পের মিল খুঁজে পান এবং তাকে আরও কথা বলতে উৎসাহ দেন।
সেখান থেকেই বদলে যায় তার পথ।
বর্তমানে স্টোনের সামাজিক মাধ্যমের অনুসারীর সংখ্যা ইনস্টাগ্রামে এক লাখের বেশি এবং টিকটকে প্রায় ১৩ লাখ। তিনি নিজের লেখা স্মৃতিকথা প্রকাশ করেছেন, একটি পডকাস্ট পরিচালনা করেন এবং ভক্তদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেন। ব্যক্তিগত কষ্টের একটি গল্প ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ছোট একটি গণমাধ্যম ব্যবসায়।

বিবাহবিচ্ছেদের সঙ্গে বদলেছে সমাজের ভাষাও
বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে এটি অনেকের কাছে ছিল ব্যর্থতা কিংবা লজ্জার বিষয়। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অংশে বিবাহবিচ্ছেদকে স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা ও নতুন জীবনের শুরু হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
বিচ্ছেদের পর নিজেকে আরও সুখী, আত্মবিশ্বাসী ও পরিপূর্ণ মনে করার গল্প ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ নিজের চেহারা ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনছেন, কেউ আবার বিয়ের আংটির বদলে বিচ্ছেদের স্মারক হিসেবে নতুন আংটি পরছেন। এমনকি বিচ্ছেদ উদ্যাপন করে আয়োজন করা হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানও।
ফলে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে যে লজ্জা ও নীরবতা একসময় ছিল, তার জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে এসেছে প্রকাশ্য আলোচনা ও আত্মবিশ্বাসের ভাষা।
কষ্টের গল্পই হয়ে উঠছে আয়ের উৎস
বিবাহবিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার ফলে শুধু অনুসারী বাড়ছে না, অনেকের জন্য তৈরি হচ্ছে বাস্তব আয়ের সুযোগও।
কোরা লেকি নামের এক বিষয়বস্তু নির্মাতা গত বছরের জানুয়ারিতে সামাজিক মাধ্যমে নিজের বিবাহবিচ্ছেদের খবর জানান। ভিডিওটি তার স্বাভাবিক দর্শকসংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ দেখেন। এরপর তিনি বিচ্ছেদের পরের জীবন, একা বাসা খোঁজা, নতুন সম্পর্ক এবং একাকিত্বের অভিজ্ঞতা নিয়ে নিয়মিত কথা বলতে শুরু করেন।
তার খোলামেলা বক্তব্যের কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাকে প্রচারের কাজে যুক্ত করে। পরিচর্যা পণ্য, ঘরবদল এবং নতুন সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি কাজ পান। নিজের ভাষায়, এই অতিরিক্ত আয় তার জন্য ছিল আর্থিকভাবে টিকে থাকার গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।
স্কারলেট লংস্ট্রিটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন সন্তান লালন-পালনের কারণে ঘরকেন্দ্রিক জীবন কাটানোর পর বিবাহবিচ্ছেদের পরের জীবন নিয়ে বিষয়বস্তু তৈরি শুরু করেন তিনি। পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে উল্লেখযোগ্য আয় করতে সক্ষম হন।

একা থাকা মানেই পিছিয়ে পড়া নয়
এই নতুন প্রবণতার বড় একটি বার্তা হলো—বিবাহবিচ্ছেদের পর জীবন থেমে যায় না।
মেগান ম্যাকট্যাভিশ সামাজিক মাধ্যমে এমন একটি জীবন দেখান যেখানে একা ভ্রমণ করা, নিজের জন্য সময় বের করা, নিজের যত্ন নেওয়া কিংবা একা কোনো সুন্দর জায়গায় খাবার খাওয়া—এসবকে নেতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে না।
তার বক্তব্যের মূল ভাবনা হলো, নিজের ভালো লাগার জন্য কিছু করার অধিকার একজন মানুষের রয়েছে। জীবনে সঙ্গী থাকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু নিজের যত্ন ও আত্মতৃপ্তির মূল্যও কম নয়।
তবে সমালোচনাও কম নয়
সবাই অবশ্য এই প্রবণতাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। সামাজিক মাধ্যমে অনেকে অভিযোগ করছেন, এ ধরনের বিষয়বস্তু বিবাহবিচ্ছেদকে অতিরিক্ত আকর্ষণীয় করে তুলছে এবং মানুষকে সম্পর্ক ভেঙে ফেলার ব্যাপারে উৎসাহিত করছে।
কেউ কেউ মনে করছেন, ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন একটি অধ্যায়কে ব্যবসায়িক পণ্যে পরিণত করা সবসময় স্বাস্থ্যকর নয়। বিশেষ করে যখন সৌন্দর্য, ভ্রমণ, পোশাক বা আত্মযত্নের পণ্য বিক্রির সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের গল্পকে যুক্ত করা হয়, তখন বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
তবে ম্যাকট্যাভিশের বক্তব্য, তিনি কাউকে সম্পর্ক ভেঙে ফেলতে উৎসাহিত করতে চান না। বরং তার উদ্দেশ্য হলো, কেউ যদি একটি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চান, তাহলে শুধু একা হয়ে যাওয়ার ভয়েই যেন সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে না যান।
বিবাহবিচ্ছেদ যখন আর লুকানোর বিষয় নয়
বিবাহবিচ্ছেদ যে এখন আর বিরল কোনো ঘটনা নয়, তারও উদাহরণ রয়েছে প্রতিবেদনে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৩ সালে ১৮ লাখের বেশি মানুষের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। বহু মানুষের প্রথম বিয়েও শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদে গড়িয়েছে।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা হওয়াকে কেউ কেউ সামাজিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবেও দেখছেন।
তবে ব্যক্তিগত কষ্টকে প্রকাশ্যে তুলে ধরে জনপ্রিয়তা ও আয় করার এই নতুন সংস্কৃতির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন থেকেই যায়—মানুষ কি নিজের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির গল্প বলছে, নাকি সেই যন্ত্রণাকেই পণ্যে পরিণত করছে?
সম্ভবত দুটিই সত্য।
বিবাহবিচ্ছেদের গল্প এখন আর শুধু ভাঙনের গল্প নয়। কারও কাছে এটি নতুন জীবনের শুরু, কারও কাছে আর্থিকভাবে দাঁড়ানোর লড়াই, আবার কারও কাছে নিজের পরিচয় নতুন করে খুঁজে পাওয়ার পথ। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই ব্যক্তিগত গল্পকে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছে, যেখানে হৃদয়ভাঙার অভিজ্ঞতাও কখনো কখনো হয়ে উঠছে জীবিকা ও নতুন পরিচয়ের ভিত্তি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















