২০১৪ সালে হাতে ছিল মাত্র ১৫ হাজার পাউন্ড। ব্যবসার শুরুতেই দুই বড় বিপণন প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় প্রায় সব আয় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সামনে ছিল একটাই প্রশ্ন—শেষ সম্বলটুকু নিয়ে নতুন করে চেষ্টা করবেন, নাকি সব ছেড়ে দেবেন?
ব্রিটিশ দুই বোন অ্যানাবেল লুই ও এমিলি লুই শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্তই আজ তাদের নিয়ে গেছে প্রায় ৮০ লাখ পাউন্ড আয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানায়। তাদের বেকারি ব্যবসা এখন প্রায় ৫০ জনের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এবং ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি গ্রাহককে সেবা দিয়েছে।
শেষ সম্বল নিয়ে শুরু নতুন লড়াই
২০১২ সালে দুই বোন মিলে গড়ে তোলেন ‘কাটার অ্যান্ড স্কুইজ’ নামের বেকারি প্রতিষ্ঠান। তাদের বিশেষ ধরনের মিষ্টান্ন দ্রুত জনপ্রিয় হতে শুরু করে। লন্ডনের দুটি বড় বিপণন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও ব্যবসায়িক চুক্তি হয়।
কিন্তু ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নেওয়ার পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। একটি প্রতিষ্ঠান জানায়, কাপকেকের বিক্রি তুলনামূলক ভালো হওয়ায় তারা আর আগের পণ্য রাখবে না। অন্য প্রতিষ্ঠানও তাদের অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। ফলে দুই বোনের আয়ের প্রায় পুরোটাই এক ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যায়।
তখন হাতে ছিল মাত্র ১৫ হাজার পাউন্ড।
অ্যানাবেল ও এমিলি দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টা বসে আলোচনা করেন। তাদের সামনে ছিল কঠিন সিদ্ধান্ত—শেষ সঞ্চয়টুকু নিয়ে নতুন করে চেষ্টা করবেন, নাকি ব্যবসা বন্ধ করে দেবেন।
শেষ পর্যন্ত তারা ঝুঁকি নেন।

বাবার আপত্তি, তবু পাশে ছিলেন
লন্ডনের ব্যস্ত সোহো এলাকায় নিজেদের একটি অস্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র চালু করেন তারা। বাবা এই সিদ্ধান্তে শুরুতে মোটেও খুশি ছিলেন না। তবে আপত্তি থাকলেও মেয়েদের কাজে সাহায্য করতে পিছপা হননি।
তিনি নিজেই মেঝে ঘষে পরিষ্কার করেছেন, বিক্রয়কেন্দ্রের কাউন্টার তৈরিতে হাত লাগিয়েছেন। তবে নির্মাণসামগ্রীর খরচ মেয়েদেরই বহন করতে হয়েছে।
পুরোনো একটি কফি তৈরির যন্ত্র ধার করে ব্যবসা শুরু হয়। অ্যানাবেল দোকান পরিষ্কার ও রং করার কাজ করেন। অন্যদিকে এমিলি তখনও আইনজীবী হিসেবে চাকরি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
সেই ছোট্ট বিক্রয়কেন্দ্রই পরে বড় ব্যবসার ভিত্তি হয়ে ওঠে।
উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে বেকারির পথে
দুই বোনের শৈশব থেকেই খাবারের ব্যবসার সঙ্গে পরিচয় ছিল। তাদের চীনা অভিবাসী বাবা-মা লন্ডনে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি ইংরেজ-ফরাসি রেস্তোরাঁ চালিয়েছেন।
মাত্র ১১ বছর বয়সেই অ্যানাবেল রান্নাঘরে কাজ করতেন। এমিলি সামলাতেন ক্রেতাদের বসার অংশ। বড়দিন কিংবা ইস্টারের মতো উৎসবের দিনগুলো তাদের কাছে ছুটির দিন ছিল না; বরং তখনই রেস্তোরাঁয় কাজের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকত।
অ্যানাবেল ১৩ বছর বয়সে বাবাকে বলেছিলেন, তিনি মিষ্টান্ন তৈরির কারিগর হতে চান। কিন্তু বাবা সরাসরি আপত্তি জানান। তিনি চেয়েছিলেন মেয়ে আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুক, একটি প্রতিষ্ঠিত পেশা গড়ে তুলুক।
অ্যানাবেল লন্ডনের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানভিত্তিক একটি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে একটি বড় হিসাব ও পরামর্শ প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণ বিভাগে কাজ শুরু করেন। এমিলি হন আবাসনবিষয়ক আইনজীবী এবং পরে নিজের প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে কম বয়সী অংশীদারদের একজন হন।
কিন্তু অ্যানাবেলের মন পড়ে ছিল নিজের ব্যবসায়।
একবার চীনা নববর্ষের সময় নিউইয়র্কের একটি ব্যবসায়িক চুক্তির কারণে তিনি বাড়ি ফিরতে পারেননি। তখনই তার মনে হয়, যদি দিন-রাত কাজ করতেই হয়, তবে নিজের জন্যই কাজ করবেন।
এরপর এক বছরের ছুটি নিয়ে তিনি বেকারি ব্যবসায় পুরোপুরি মন দেন।

পরিবারের মিষ্টান্ন থেকেই ব্যবসার ধারণা
লুই পরিবারের বাড়ি ছিল আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের মিলনস্থল। কখনো কখনো একসঙ্গে ২০ থেকে ৩০ জন মানুষ সেখানে জড়ো হতেন। আর প্রতিবারই মিষ্টান্ন তৈরির দায়িত্ব পড়ত দুই বোনের ওপর।
এমিলির ভাষায়, লুই বোনদের তৈরি কেক না থাকলে সেটি যেন শুধু বৈঠক—উৎসব নয়।
সোহোর ছোট বিক্রয়কেন্দ্র ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে ব্রুয়ার স্ট্রিটে বড় প্রধান শাখা খোলা হয়। ২০২০ সালের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির তিনটি দোকান হয়ে গিয়েছিল।
মহামারিতে বদলে গেল পুরো ব্যবসা
এরপর আসে মহামারি। তিনটি দোকানই বন্ধ হয়ে যায়। দোকানে ক্রেতা নেই, অথচ কর্মী ও অন্যান্য খরচ চালানোর জন্য অর্থও সীমিত।
তখন দুই বোন সিদ্ধান্ত নেন, এতদূর এসে তারা হাল ছাড়বেন না।
তারা ঘরে বসে বিকেলের চা-পানের আয়োজন করার একটি বাক্স তৈরি করেন, যা লন্ডনের বাইরেও ডাকযোগে পাঠানো সম্ভব। এই পণ্যই ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
আগে প্রতিষ্ঠানের আয়ের মাত্র এক-চতুর্থাংশের মতো আসত অনলাইন বিক্রি থেকে। এক বছরের মধ্যেই সেই হার প্রায় পুরো আয়ে পরিণত হয়। অনলাইন বিক্রি এক বছরে ১ হাজার ৬০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায় বলে অ্যানাবেল জানান।
পরবর্তী দুই বছর তারা প্যাকেটজাতকরণ, পণ্য পৌঁছে দেওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে ব্যস্ত থাকেন।
এই সময় চালু করা বাদামি কেকের বাক্স পরে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পণ্যে পরিণত হয়। গত বছরই তারা প্রায় ২০ লাখ বাদামি কেক বিক্রি করেছে।
দোকানের চেয়ে এখন অনলাইনেই বেশি জোর
মহামারির পর প্রতিষ্ঠানটি আর আগের মতো শুধু বেকারি ব্যবসা নেই। এখন আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে সরাসরি ক্রেতার কাছে অনলাইনে পণ্য বিক্রি করে।
সোহোর দোকান থেকে আসে প্রায় ৭ শতাংশ এবং পাইকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের কাছ থেকে আসে বাকি অংশ।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্রেতা নিজেদের জন্য নয়, অন্য কাউকে উপহার দেওয়ার জন্য পণ্য কেনেন।
জন্মদিন কিংবা ভালোবাসা দিবসের মতো প্রচলিত উপলক্ষের পাশাপাশি এখন চীনা নববর্ষ, দীপাবলি, ঈদ ও রমজান উপলক্ষেও বিশেষ পণ্য তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে উপহারসামগ্রীর ঝুড়ি বিক্রি বেড়েছে ১৭৫ শতাংশ।
প্রযুক্তি এসেছে, হাতে তৈরি পণ্যের ঐতিহ্য রয়ে গেছে
ব্যবসা বড় হওয়ার সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে পণ্যের মূল বৈশিষ্ট্য বদলায়নি। বেকারির মিষ্টান্ন এখনো মানুষের হাতেই তৈরি হয়।
অ্যানাবেলের ভাষায়, তাদের ব্যবসার হৃদয় এখনো একটি বেকারি। পণ্যটি মানুষই তৈরি করেন, তবে পণ্য তৈরির পরের প্রায় প্রতিটি ধাপেই প্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে।
বাড়ছে কাঁচামালের দাম
ব্যবসা বাড়লেও খরচের চাপ কমেনি। কোকো ও চকলেটের দাম বেড়েছে ১৭৫ শতাংশ। বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে ১৫ শতাংশ এবং ঋণের সুদের হার বেড়েছে ২৫ শতাংশ।
পেস্তা ও মাচা গুঁড়োর দামও প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। শ্রমিকদের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রতি বছর মোট খরচে আরও প্রায় ৪ শতাংশ চাপ যোগ হচ্ছে।
তবু সস্তা উপকরণ বা বিকল্প স্বাদ ব্যবহার করে পণ্যের মান কমাতে রাজি নন দুই বোন।
লক্ষ্য ২০২৭ সালে ১ কোটি পাউন্ড
২০২৫ সালে প্রায় ৮০ লাখ পাউন্ড আয় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। চলতি বছর আরও ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে তারা।
দুই বোনের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ আয় ১ কোটি পাউন্ডের সীমা পেরোনো। আর পুরো ব্যবসাটিই তারা নিজেদের অর্থে গড়ে তুলতে চান; বাইরের বিনিয়োগ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন অবশ্য তাদের বাবার মনোভাবেই।
একসময় যিনি মেয়ের বেকারি ব্যবসার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন, সেই বাবাই এখন মেয়েদের সাফল্যে গর্বিত। বেকারি শিল্পের একটি পুরস্কারে অনলাইন বেকারি হিসেবে বছরের সেরা হওয়ার পর তিনি মেয়েদের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন।
দুই বোনের কাছে সেটিই যেন সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
মাত্র ১৫ হাজার পাউন্ড থেকে শুরু করে প্রায় ৮০ লাখ পাউন্ডের ব্যবসা—অ্যানাবেল ও এমিলি লুইয়ের গল্প প্রমাণ করে, ব্যর্থতার পরও নতুন করে শুরু করার সাহস থাকলে শেষ সম্বলটুকুও কখনো কখনো নতুন সাম্রাজ্যের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















