ইন্দোনেশিয়া চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবি করলেও বাজারের বাস্তবতা সেই সাফল্যকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। টানা সাত মাস ধরে চালের দাম বাড়ছে। অথচ একই সময়ে সরকারি গুদামে চালের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যেই এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক মৌসুম ও খরা আরও তীব্র হওয়ায় সামনে চাল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, সমস্যাটি শুধু চালের মজুতের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত চাল থাকার পরও যদি বাজারদর বাড়তে থাকে, তাহলে সরবরাহব্যবস্থা, মজুত ব্যবস্থাপনা, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা এবং পানি ব্যবস্থাপনায় থাকা দুর্বলতাগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
খরা বাড়াচ্ছে কৃষির ঝুঁকি
এল নিনোর প্রভাবে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শুষ্কতা বাড়ছে। পশ্চিম জাভায় ২৯ জুলাই পর্যন্ত খরায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৩৮১ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতায় অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বন ও ভূমিতে আগুনের ঝুঁকিও বেড়েছে।
পশ্চিম কালিমানতানে ২৯ জুলাই পর্যন্ত ১২টি জেলায় প্রায় ২৮ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে এবং প্রায় ২০০টি হটস্পট শনাক্ত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের উদ্যোগ নিয়েছে। ৩০ জুলাই পর্যন্ত আচেহ ও পালেমবাংয়ে এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে আনুমানিক ৪ কোটি ৫ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার বৃষ্টিপাত ঘটানো হয়েছে।

তবে তাৎক্ষণিকভাবে বৃষ্টিপাত বাড়ানো আর কৃষির দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। ধানের উৎপাদন নির্ভর করে পুরো চাষ মৌসুমে পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য পানির ওপর।
তীব্র এল নিনো হলে চাষের জমি কমতে পারে, ফলন হ্রাস পেতে পারে এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব কৃষিক্ষেত্র ছাড়িয়ে বাজারেও পৌঁছাবে। চালের সরবরাহ কমলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমতে পারে এবং সরকারকে ভর্তুকি, সামাজিক সহায়তা কিংবা আমদানির ওপর আরও নির্ভর করতে হতে পারে।
উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু ঝুঁকি রয়ে গেছে
ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রতিক উৎপাদন পরিসংখ্যান দেশটির সক্ষমতা ও দুর্বলতা—দুই দিকই তুলে ধরে।
পরিসংখ্যান ইন্দোনেশিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এল নিনো ও খরার প্রভাবে চাল উৎপাদন ২০২৩ সালের ৩ কোটি ১১ লাখ টন থেকে ২০২৪ সালে কমে ৩ কোটি ৬২ লাখ টনে দাঁড়ায়। ঘাটতি পূরণে ওই সময় চাল আমদানি বেড়ে ৪৫ লাখ ২০ হাজার টনে পৌঁছায়।
২০২৫ সালে পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ায়। চাল উৎপাদন ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ৩ কোটি ৪৬ লাখ ৯০ হাজার টনে পৌঁছায়। একই সময়ে আমদানি নেমে আসে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৭৩৪ টনে।
এই পরিবর্তন প্রমাণ করে, অনুকূল আবহাওয়ায় ইন্দোনেশিয়া দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি দেখায়, বড় ধরনের আবহাওয়া ঝুঁকি তৈরি হলে দেশটির খাদ্য সরবরাহ আবারও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়তে পারে।
মজুত বাড়লেও কেন দাম কমছে না
চালের সরকারি মজুত বাড়লেও বাজারে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ২০২৬ সালের শুরুতে সরকারি চালের মজুত ছিল প্রায় ৩২ লাখ ৫০ হাজার টন। পরে তা বেড়ে প্রায় ৫৩ লাখ টনে পৌঁছেছে।
তারপরও বছরের শুরুতে প্রতি কেজি পাইকারি চালের দাম ১৪ হাজার ২১৮ রুপিয়া থেকে জুলাইয়ে বেড়ে ১৪ হাজার ৭৮৩ রুপিয়ায় দাঁড়িয়েছে। ওই মাসে ইন্দোনেশিয়ার বার্ষিক মূল্যস্ফীতিতে চালের অবদান ছিল ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
এতে বোঝা যায়, শুধু গুদামে চাল জমা করে রাখাই বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। কখন মজুত বাজারে ছাড়া হচ্ছে, কোন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং বাজারের চাহিদার সঙ্গে সরকারি সরবরাহ কতটা কার্যকরভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
উৎপাদন নিয়েও অনিশ্চয়তা
২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে চাল উৎপাদন ২ কোটি ৮৭ লাখ ১০ হাজার টন হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র দশমিক ০১ শতাংশ বেশি। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে যেতে পারে। এর পেছনে খরা, কীটপতঙ্গ, বন্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন এলাকায় ফসল কাটার সময় পরিবর্তনের মতো কারণ রয়েছে।
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাসেও বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা আশা করছে, ২০২৪-২৫ সালের ৩ কোটি ৪০ লাখ টন থেকে চাল উৎপাদন ২০২৫-২৬ সালে ৩ কোটি ৮৫ লাখ এবং ২০২৬-২৭ সালে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের পূর্বাভাস অনেক কম। তাদের হিসাবে ২০২৫-২৬ সালে উৎপাদন হতে পারে ৩ কোটি ৩৮ লাখ টন এবং ২০২৬-২৭ সালে তা কমে ৩ কোটি ৩৪ লাখ টনে দাঁড়াতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের জন্য ৩ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার টন এবং ২০২৭ সালের জন্য ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৩০ হাজার টনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে পরিসংখ্যান ইন্দোনেশিয়ার হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুলাই সময়ে উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ১৯ লাখ ৫০ হাজার টন, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দশমিক ৩৫ শতাংশ কম।
এত ভিন্ন পূর্বাভাসের অর্থ হলো, ইন্দোনেশিয়ার চালের ভবিষ্যৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা যথেষ্ট বেড়েছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন এখন উৎপাদনের হিসাবকে আরও অনির্ভরযোগ্য করে তুলছে।
নতুন ধানক্ষেত কতটা কাজে দেবে
উৎপাদন বাড়াতে সরকার নতুন ধানক্ষেত তৈরির কর্মসূচি নিয়েছে। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে প্রতিবছর ২ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর করে নতুন ধানক্ষেত তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। দুই বছরে মোট সম্প্রসারণের লক্ষ্য ৪ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর।
প্রতি হেক্টরে ৫ দশমিক ৩২ টন ধান এবং বছরে দুটি ফসলের হিসাব ধরে নতুন জমি থেকে প্রায় ৩০ লাখ ৬০ হাজার টন অতিরিক্ত চাল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৫ সালের উৎপাদনের সঙ্গে এটি যোগ হলে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বা ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিকে মোট উৎপাদন প্রায় ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে।
কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গায় বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০২৫ সালে ২ লাখ ২৫ হাজার হেক্টরের লক্ষ্যের বিপরীতে নতুন ধানক্ষেত তৈরি হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৭৪ হেক্টর।
একই সময়ে প্রচলিত ধানক্ষেতের আয়তন ২০১৯ সালের ৭৪ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর থেকে কমে ২০২৬ সালে ৬৩ লাখ ৯০ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।
জমির ব্যবহার পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ২০২৭ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত তীব্র এল নিনো চলার সম্ভাবনা নতুন জমি তৈরির পরিকল্পনাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি সমিতি চাল উৎপাদন ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ শতাংশ কমার পূর্বাভাস দিয়েছে। আইপিবি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব আরও সতর্ক—তাদের মতে উৎপাদন প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে।
শুধু জমি বাড়িয়ে চালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না
ইন্দোনেশিয়ার খাদ্যনীতিকে এখন নতুন জমি আবাদ বাড়ানোর বাইরে যেতে হবে। উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিকে খরা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সহ্য করার মতো সক্ষম করে তুলতে হবে।
নতুন ধানক্ষেত তৈরি পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন জমি তৈরি করলেই পানি সমস্যার সমাধান হয় না। পর্যাপ্ত সেচ না থাকলে নতুন জমি দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনের নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।
এ কারণে কৃষির যান্ত্রিকীকরণে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। আধুনিক যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে সাহায্য করতে পারে।
কৃষক সমবায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংগঠিত কৃষকগোষ্ঠী প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, অর্থায়ন, কৃষি উপকরণ এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও সহজে পেতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যবস্থার দক্ষতাও বাড়বে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন পানি ব্যবস্থাপনা।
খরা যদি বারবার ফিরে আসে, তাহলে সেচব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ, জলাধার এবং স্থানীয় পর্যায়ে পানির প্রাপ্যতাকে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি অবকাঠামোর অংশ হিসেবে দেখতে হবে। কৃষিকে অনিয়মিত বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল রাখলে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
চালের দাম ও খাদ্যনীতি একই সমীকরণের অংশ
চালের বাজারকে সামলাতে হলে সরকারি মজুত ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে হবে। শুধু বিপুল পরিমাণ চাল গুদামে রাখা নয়, প্রয়োজনের সময় দ্রুত ও সঠিক অঞ্চলে সেই চাল বাজারে পৌঁছানোও গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে সরকারের অন্যান্য খাদ্য কর্মসূচির প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচির মতো উদ্যোগের সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে এসব কর্মসূচির কারণে খাদ্যচাহিদা বাড়লে কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থাকেও সেই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে হবে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত খাদ্য সহায়তা কমানো নয়, বরং বাড়তি চাহিদা সামলানোর মতো উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা তৈরি করা।
শেষ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার চালের বর্তমান সংকট শুধু একটি এল নিনো মৌসুমের সমস্যা নয়। এল নিনো দুর্বল হয়ে যাবে, বৃষ্টি ফিরবে এবং উৎপাদনও পুনরুদ্ধার হতে পারে। কিন্তু খরা যে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো সামনে এনেছে, সেগুলো সমাধান না হলে একই সংকট আবার ফিরে আসবে।
একটি ভালো বছরে কত টন চাল উৎপাদন হয়েছে, শুধু সেটি দিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বিচার করা যায় না। প্রকৃত খাদ্যনিরাপত্তার পরীক্ষা হলো—খরা, বন্যা কিংবা অন্য কোনো বড় জলবায়ু ধাক্কার মধ্যেও জনগণের জন্য পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী চাল সরবরাহ করা সম্ভব কি না।
ইন্দোনেশিয়া অনুকূল আবহাওয়ায় উৎপাদন বাড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে। এখন বড় পরীক্ষা হলো প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও সেই সক্ষমতা ধরে রাখা।
এর জন্য প্রয়োজন উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, শক্তিশালী কৃষক সংগঠন, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, কার্যকর সরকারি মজুতনীতি এবং খাদ্য ও অর্থনৈতিক নীতির মধ্যে আরও ভালো সমন্বয়। কৃত্রিম বৃষ্টিপাত সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, নতুন ধানক্ষেত উৎপাদন বাড়াতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে তখনই, যখন ইন্দোনেশিয়ার কৃষি ব্যবস্থা খরা ও পানির সংকটের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে স্থিতিস্থাপক হয়ে উঠবে।
এল নিনো একটি চক্রাকার জলবায়ু ঘটনা। কিন্তু প্রতিবার পানি সংকটকে নতুন করে বিস্ময় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চালের প্রকৃত স্বয়ংসম্পূর্ণতার পরীক্ষা হবে পরবর্তী খরার সময়—যখন উৎপাদন কমলেও তার সবচেয়ে বড় মূল্য যেন সাধারণ মানুষকে দিতে না হয়।
তেংগারা স্ট্র্যাটেজিকস 


















