ওয়াশিংটনের আরোপ করা ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে কানাডা। দুই দেশের মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি শুল্কের সংঘাত দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা, ব্যবসা ও বিনিয়োগে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। উচ্চমূল্যের চাপে থাকা মার্কিন অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।
শুল্কযুদ্ধের নতুন উত্তেজনা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা একাধিকবার বড় ধরনের বাণিজ্যযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছালেও শেষ মুহূর্তে ওয়াশিংটন কিছু কঠোর পদক্ষেপ থেকে সরে এসেছিল। এবার সেই আপাত শান্তি ভেঙে গেছে। শনিবার থেকে কানাডার কিছু পণ্যে ৫০ শতাংশ নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের হিসাবে, নতুন শুল্কের আওতায় কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রয়েছে। কয়েক শ ধরনের পণ্যের মধ্যে কানাডায় তৈরি হকি স্টিক, আসবাবপত্র ও দুগ্ধজাত পণ্যও রয়েছে। এসব পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার একটি অংশ মার্কিন ভোক্তাদের ওপর পড়তে পারে।

তবে দুই দেশের মোট বাণিজ্যের তুলনায় নতুন শুল্কের আওতা এখনো সীমিত। প্রাথমিক হিসাবে কানাডীয় পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কহার প্রায় ৫ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে।
পাল্টা শুল্কের আশঙ্কা
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শ্রম দিবসের পর কৃষি, ইস্পাত ও ইলেকট্রনিকসসহ কয়েকটি খাতকে লক্ষ্য করে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এমন পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ শুরু হলে দুই দেশের সীমান্তপারের ব্যবসা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু শুল্কের পরিমাণ নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা। আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসাগুলো বিনিয়োগ ও কার্যক্রম সম্প্রসারণে সতর্ক হয়ে উঠতে পারে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কানাডা পাল্টা ব্যবস্থা নিলে গাড়ি শিল্পসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে নতুন ব্যয়চাপ তৈরি হতে পারে। উৎপাদন খাতও বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় থাকায় এর প্রভাব আরও জটিল হতে পারে।
শুল্কনীতির প্রভাব যে ভোক্তাদের ওপর পড়ছে, তার একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে গরুর মাংসের আমদানি শুল্ক শিথিল করার সিদ্ধান্তে। উচ্চমূল্যের কারণে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিতে বহুমুখী চাপ
বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি আরও কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। দেশটির সরকারি ঋণ এ সপ্তাহে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ঋণের চাপ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক উদ্বেগে সরকারি বন্ডের সুদহারও বেড়েছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে চাপ তৈরি করেছে এবং জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়েছে।
তবে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে সমঝোতার সুযোগ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। আলোচনা পুনরায় শুরু হলে বড় ধরনের সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আপাতত ওয়াশিংটন শুল্ক কার্যকরের পথেই এগোচ্ছে, আর কানাডাও পাল্টা পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে উত্তর আমেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য অংশীদারের এই সংঘাত কতটা দূর গড়ায়, সেটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















