প্রত্যাশিত দাম না পাওয়া ও বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে হিমাগারে সংরক্ষিত আলু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বাজারে দরপতনের কারণে অনেকেই হিমাগার থেকে আলু খালাস করছেন না। ফলে উৎপাদন, পরিবহন, বাছাই ও হিমাগার ভাড়াসহ প্রতি ৬২ কেজির বস্তায় গড়ে প্রায় ৪৬০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
হিমাগারে পড়ে আছে ১ লাখ ৪৩ হাজার বস্তা
ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সেখানে ১ লাখ ৭৮ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়। ২২ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৩৫ হাজার বস্তা খালাস হয়েছে। এখনও প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার বস্তা আলু হিমাগারেই পড়ে আছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব আলু খালাস না হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছে হিমাগার কর্তৃপক্ষ। গত বছরও বাজারে দরপতনের কারণে প্রায় ৩৫ হাজার বস্তা আলু কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগার থেকে নেননি। পরে এর বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লোকসান গুনতে হয়েছিল হিমাগার কর্তৃপক্ষকে। এবারও একই পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

খরচ ১ হাজার ৪০০, বিক্রি ৯২০-৯৬০ টাকায়
বর্তমানে হিমাগার গেটে ৬২ কেজির প্রতি বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে ৯২০ থেকে ৯৬০ টাকায়। অথচ উৎপাদন, পরিবহন, বাছাই ও হিমাগার ভাড়াসহ কৃষকের প্রতি বস্তায় খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকা। ফলে গড়ে ৯৪০ টাকা দরে বিক্রি হলে প্রতি বস্তায় লোকসান দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪৬০ টাকা।
বাজনাপাড়া গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন ও আমড়া গ্রামের আব্দুর রশিদ জানান, বাজারের দর নিম্নমুখী থাকায় আলু বিক্রি করলেই বড় অঙ্কের লোকসান হচ্ছে। এতে তারা আর্থিকভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
আমনের খরচ জোগাড়েও সংকট
এদিকে আমন ধানের মৌসুম শুরু হওয়ায় কৃষকদের জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ, সার ও শ্রমিকের মজুরি দিতে নগদ অর্থ প্রয়োজন। সাধারণত এ সময় হিমাগার থেকে আলু বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে আমন চাষের খরচ মেটান তারা।
কিন্তু আলুর দাম কম থাকায় কৃষকদের মূলধন হিমাগারেই আটকে আছে। ফলে একদিকে আলু বিক্রি করে লোকসান, অন্যদিকে আমন চাষের প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড়—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছেন তারা।
লোকসানে ব্যবসায়ীরাও
আলুর বাজারের মন্দার প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ীদের ওপরও। পৌরবাজারের ব্যবসায়ী বিধান দত্ত ও জয়ন্ত সাহা জানান, বিভিন্ন বাজারে আলু পাঠিয়েও পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ উঠছে না। প্রতি ট্রিপে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং প্রতি বস্তায় ৫০ থেকে ৫৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হওয়ায় অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে বসে আছেন।

মৌসুমী ব্যবসায়ী ফেরাজুল ইসলাম ও নূরুল হক জানান, ঋণ নিয়ে আলু মজুদ করেছিলেন তারা। এখন বাজার পড়ে যাওয়ায় সেই ঋণ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ফুলবাড়ী উপজেলায় ১ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ৩৭ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণেই মূলত আলুর দাম কমেছে। বাজার সচল করা এবং কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের যৌক্তিক দাম পান, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি মহলের সঙ্গে সমন্বয় করে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।
ফুলবাড়ীতে আলুর এই দরপতনে একদিকে বিপুল পরিমাণ আলু হিমাগারে আটকে রয়েছে, অন্যদিকে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগও আটকে পড়েছে। নির্ধারিত সময়ে এসব আলু খালাস না হলে গত বছরের মতো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















