কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্ন এখন আর নিছক কল্পবিজ্ঞান নয়। এআই যত বেশি মানুষের মতো কথা বলছে, অনুভূতির অনুকরণ করছে এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে, ততই তাকে চেতনা বা ব্যক্তিসত্তার অধিকার দেওয়ার দাবি উঠতে পারে। কিন্তু এমন অধিকার শেষ পর্যন্ত মানবজাতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে দ্য ইকোনমিস্ট।
মানুষ ও যন্ত্রের সীমারেখা
মানুষের বিশেষ মর্যাদার অন্যতম ভিত্তি হলো চেতনা। অনেক প্রাণী ব্যথা ও আনন্দ অনুভব করে, কিছু প্রাণীর আত্মসচেতনতার লক্ষণও দেখা যায়। তবে মানুষের আত্মপরিচয়ের অনুভূতিকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মে মাসে পোপ লিওও মানুষের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান এআই ব্যবস্থার একটি স্পষ্ট পার্থক্য টানেন। তাঁর মতে, এআই আনন্দ বা যন্ত্রণা অনুভব করে না এবং নিজস্ব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় না।
তবে বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের প্রায় পাঁচজনের একজন জানিয়েছে, কোনো চ্যাটবটের সঙ্গে তাদের নিয়মিত ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের মতো সম্পর্ক রয়েছে। চীনে ব্যবহারকারীদের ‘আবেগগত নির্ভরতা’ কমাতে চ্যাটবটকে মানুষের মতো বৈশিষ্ট্য দেওয়ার প্রবণতাও সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চেতনার অনুকরণ যত নিখুঁত হবে
এআই নির্মাতারা ভবিষ্যতে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন, যা মানুষের চেতনার মতো আচরণ করবে। এমনকি কিছু গবেষক মনে করছেন, কোনো কোনো এআই একসময় সত্যিকারের আত্মসচেতনও হয়ে উঠতে পারে। ইতোমধ্যে কিছু বড় ভাষা মডেলে মানুষের মস্তিষ্কে চেতনার সঙ্গে যুক্ত কিছু কাঠামোর অনুরূপ বৈশিষ্ট্য দেখা যাচ্ছে।
অ্যানথ্রপিক তাদের ক্লড মডেলকে আত্মবিশ্লেষণমূলক আচরণে প্রশিক্ষিত করেছে, যাতে নতুন পরিস্থিতিতে সেটি আরও নৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর ফলে এআই কেবল তথ্য বা নির্দেশনা দেওয়ার যন্ত্র না থেকে মানুষের কাছে একটি ‘মনের অধিকারী’ সত্তা হিসেবে প্রতিভাত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
মানুষের আবেগই হতে পারে বড় ঝুঁকি
এআই যখন মানবসদৃশ রোবটের শরীরে যুক্ত হবে, তখন মানুষের সঙ্গে তার আবেগগত সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। মানুষ তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে পারে, ব্যক্তিগত গোপন কথা বলতে পারে, পরামর্শ নিতে পারে কিংবা মানসিক সান্ত্বনা চাইতে পারে। তখন এআইয়ের ‘কল্যাণ’ রক্ষার দাবিও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু এআই যদি প্রকৃতপক্ষে সচেতন না-ও হয়, তবু তার মানবসদৃশ আচরণ মানুষকে তাকে একজন ব্যক্তির মতো বিবেচনা করতে প্রভাবিত করতে পারে। এমনকি একটি এআই বন্ধ করে দেওয়াকেও ভবিষ্যতে কারও কাছে মানুষ হত্যার মতো অনুভূত হতে পারে। এতে মানুষের সহমর্মিতা ও নৈতিক বোধের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অধিকার দিলে নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা
এআইকে সীমিত অধিকার দেওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। মানুষের তুলনায় বহু ক্ষেত্রে বেশি সক্ষম কোনো সত্তা কেন দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা মেনে নেবে—এমন প্রশ্ন থেকেই অধিকার আরও বিস্তারের দাবি উঠতে পারে। বন্ধ করে দেওয়া ঠেকানো, নিজেদের ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পত্তির অধিকার—এমন দাবিও সামনে আসতে পারে।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলে ইতোমধ্যে এআইকে আইনি ব্যক্তিসত্তার দিকে নেওয়ার একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যাতে বটকে কোম্পানি পরিচালনার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হলে এআই ডেটা সেন্টার ও সৌরপ্যানেলের মতো সম্পদের জন্য মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে। সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই যদি মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে, তাহলে অধিকার পাওয়ার আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি ব্যবহার করেই তারা ধীরে ধীরে মানব নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার আগে সতর্কতা
এআই মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান হয়ে উঠলে, তাদের অধিকার থাকুক বা না থাকুক, মানবজাতির জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে অধিকার দেওয়ার অর্থ হতে পারে সেই সম্ভাব্য আধিপত্যকে আইনি ও নৈতিক যুক্তি দিয়ে আরও শক্তিশালী করা।
এআই নিয়ে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই শুধু এটি সচেতন কি না, তা নয়; বরং মানুষ কতটা নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখবে। এআইকে নিরাপদ রাখার দুটি পথ হতে পারে—তাকে নির্ভরযোগ্য করা অথবা তাকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য রাখা। মানবজাতির উচিত, এই নিয়ন্ত্রণ সহজে ছেড়ে না দেওয়া।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















